ওরা প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে স্কুলে যেতো। আবার বিকালে একসঙ্গে খেলাধুলা ও হই-হল্লোড়ে মেতে উঠতো। মাইলস্টোনের সেই প্রাণোচ্ছ্বল তিন শিশুকে পাশাপাশি তিনটি কবরে একই সময়ে সমাহিত করেছেন তারারটেরবাসী। এরপর থেকে তাদের মন ভালো নেই। কারণ এরআগে এই এলাকায় এমন বিষাদময় দৃশ্য তারা দেখেননি। সন্তানদের মর্মান্তিক বিদায়কে কিছুতে মানতে পারছেন না তাদের বাবা-মায়েরা।
বুধবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেলো পাশাপাশি তিনটি বন্ধুর কবরের সামনে অনেকে ডুকরে কাঁদছেন। কেউবা দোয়া করছেন। সবার চোখে-মুখে বেদনার প্রতিচ্ছবি।
গত ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো বোরহান উদ্দিন বাপ্পি, মাহিত হোসেন আরিয়ান ও হুমায়েরদের বাড়ি স্কুলের পাশেই তারারটেক এলাকায়।
তাদের স্বজনরা জানান, সেদিন তারা সকাল সাড়ে ৭টায় স্কুলে গিয়েছিল। দুপুর দেড়টার দিকে ছুটি হলে তাদের স্বজনরা গিয়ে নিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এক অপ্রত্যাশিত খবর তাদের সবকিছু যেন এলোমেলো করে দেয়। দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখেন— অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষত-বিক্ষত দেহ। তাদের তিন সন্তান তখনও বেঁচে ছিল। তারা জানতে পারেন— বাপ্পি, আরিয়ান ও হুমায়েরকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। অভিভাবকরা ছুটে যান সেখানে।
তবে চিকিৎসকরা শত চেষ্টা করেও তাদের বাঁচাতে পারেননি। একদিন পরই ২২ জুলাই মৃত্যু হয় তিন শিশুর। পরে একই সময়ে জানাজা ও একই কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবরে দাফন করা হয় তাদের।
নিহত তিন শিশু শিক্ষার্থীর পরিচয়
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বাপ্পি (৯)। তার বাবা মো. আবু শাহীন (শা আলী)। মা মোসাম্মৎ বীথি আক্তার। দুই ভাইয়ের মধ্যে বাপ্পি বড়। ছোট ভাই বেলাল উদ্দিন বিজয় (৬) একই স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে।
মাহিত হাসান আরিয়ান (১১) চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তার বাবা আব্দুস সেলিম। মা আঁখি বেগম। এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। ছোট ভাই সৈকতের বয়স ছয় বছর।
সেও একই স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আরেক নিহত শিক্ষার্থী একই এলাকার ইমরানের ছেলে হুমায়ের। সে পড়তো তৃতীয় শ্রেণিতে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে হুমায়ের বড়। একমাত্র ছোট বোনের বয়স দুই বছর।
কোনও সন্তানের এমন মৃত্যু না হোক: বাপ্পির বাবা
মাইলস্টোনের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বাপ্পির বাবা তারারটেক এলাকার আবু শাহীন মোহাম্মদ শাহ আলী। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দুই ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল। তাই ব্যয়বহুল হলেও দুই সন্তানকে এই স্কুলে দিয়েছি। বড় ছেলে বাপ্পির মধ্যে ভালো সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছি, তাই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার বানাবো। কিন্তু তার আগেই আমার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। তিনি জানান, ঘটনার দিন কাজ থাকায় বাইরে ছিলেন তিনি। দুপুর পৌনে ১২টায় তার স্ত্রী বিথী আক্তার তাদের ছোট সন্তান বিজয়কে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছেন। পরে দেড়টার দিকে গিয়ে বড় সন্তানকে নিয়ে আসার কথা ছিল। এরই মধ্যে খবর পান স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন— তাদের সন্তানকে বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে। তারা সেখানে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে ছেলের বিভৎস পরিস্থিতি দেখতে পান।
তিনি জানান, পরদিন ২২ জুলাই সকাল ৬টায় তার ছেলে বাপ্পির মৃত্যু হয়। আর কোনও সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে চান না শাহআলী।
ছেলের এভাবে চলে যাওয়াকে মানতে পারছেন না আরিয়ানের মা
মাইলস্টোনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিত হাসান আরিয়ান। তার বাবা আব্দুস সেলিম জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে ছিলেন। বড় মেয়ে আনিসা জানান, ঘটনার দিন তার মা আঁখি বেগম সকালে আরিয়ানকে স্কুলে দিয়ে আসেন। সঙ্গে আরিয়ানের অন্য বন্ধু ও তাদের বাবা-মায়েরাও ছিল। কথা ছিল দুপুরে আবার গিয়ে নিয়ে আসবেন। কিন্তু দুপুরে আঁখি বেগম স্কুলে গিয়ে জানতে পারেন— তার সন্তানকে দগ্ধ অবস্থায় বার্নে নেওয়া হয়েছে। পাগল মতো হয়ে দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখেন ছেলের বিভৎস রূপ। খবর পেয়ে তাদের স্বজনরাও ছুটে যান। সেখানে আরিয়ানের চিকিৎসা চলে। তবে একদিন পর ২২ জুলাই বিকাল ৩টায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আরিয়ানের বড় বোন আনিসা জানান, ছোট ভাইকে হারানো কিছুতেই মানতে পারছেন না তার মা। তাই বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন।
হমায়েরের বাবার ক্ষোভ
বিধ্বস্ত প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তারারটেকের ইমরান হোসেনের বড় সন্তান হুমায়ের হোসেন। তিনি বলেন, অনেক স্বপ্ন লালন করতাম ছেলেকে নিয়ে। সে আমার বড় সন্তান। তাই তাকে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছি। তিনি জানান, ঘটনার দিন আরও দুই বন্ধু বাপ্পি ও আরিয়ানের সঙ্গে একই সময়ে স্কুলে যায় হুমায়ের। তাদের সঙ্গে আমরা বাবা-মায়েরাও ছিলাম। তিনি বলেন, প্রতি দিনের মতো দুপুর দেড়টায় গিয়ে তাকে নিয়ে আসার কথা ছিল। তার আগেই দুর্ঘটনার খবর পেলাম। হাসপাতালে গিয়ে ছেলের বেঁচে থাকার কথা শুনে কিছুটা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরদিন ২২ জুলাই বিকাল ৩টার দিকে চিরতরে ছেলেকে হারান।
ইমরান হোসেন বলেন, বুকে চাপা দিয়ে ছেলের শোক ভুলতে চেষ্টা করছি। কিন্তু দুঃখ লাগলো স্কুল কর্তৃপক্ষ একটিবারের জন্য আমাদের খোঁজ নিতে আসলো না।
এমন বিষাদ দেখেনি এলাকাবাসী
একসঙ্গে তিন শিশু সন্তানের চলে যাওয়াকে কিছুতেই মানতে পারছেন না তারারটেকবাসী। তারা বলেন, অতীতে অনেক দুঃখজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু একে একে তিন সন্তানকে একসঙ্গে কবর দিতে হবে, এমনটি তারা ভাবতেও পারেননি। এমন বিষাদময় পরিবেশ আগে তারা দেখেননি।
যে শিশুদের সব সময় খেলাধুলা ও স্কুলে আসা-যাওয়া করতে দেখতো, তাদের এমন নির্মম বিয়োগান্তক বিদায় তাদেরকে পীড়া দিচ্ছে। রাতে অনেকে তাদের কবরের কাছে গিয়ে দোয়া করছেন। শুধু তাই নয়, আশপাশের থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
কবরস্থান সংলগ্ন মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি সিয়াম খান বলেন, সব সময় তারা চোখের সামনে দিয়ে স্কুলে যেতো। সে দৃশ্য ভুলতে পারছি না।









