X
মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪
১০ বৈশাখ ১৪৩১
সাক্ষাৎকারে ওয়াটার এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর

‘গণশৌচাগারে পাঁচতারকা হোটেলের সুবিধা নিয়ে এসেছি আমরা’

রাশেদুল হাসান
১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:০৬

একসময় দেশে গণশৌচাগার বলতে মোটামুটি বোঝাতো অন্ধকার খুপড়ির মতো নোংরা জায়গা। যেখানে দরজা-জানালা ভাঙা, ছিটকিনি নেই। আর সাবান,  টিস্যু তো দূর স্বপ্ন– এরকম একটি জায়গা। নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা উপেক্ষিত ছিল এসব শৌচাগারে। সেখান থেকে আধুনিক মানের গণশৌচাগার ও গোসলখানা, যেখানে থাকবে খাবার পানি, লকার সুবিধা, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়ক আলাদা সুবিধা–এগুলো চিন্তাও করা যেতো না। কিন্তু এসব বিষয়কে মাথায় রেখে পাবলিক টয়লেটের নকশা, নির্মাণকাজ ও ব্যবস্থাপনার মডেল নিয়ে আসে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইড।

এ পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ৪৪টি গণশৌচাগার  স্থাপন  করেছে। এরমধ্যে সিলেট নগরে তিনটি, চট্টগ্রাম নগরে সাতটি, খুলনা নগরে একটি, ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৬টি, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৫টি এবং ঢাকা ও পঞ্চগড় রেলস্টেশনে দুটি। এর পেছনে রয়েছেন সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি শুনিয়েছেন ওয়াটার এইডের হাত ধরে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু পরিবর্তনের গল্প।

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকা শহরের গণশৌচাগারের সঙ্গে আপনাদের যাত্রা কখন ও কীভাবে?

হাসিন জাহান: আমরা পুরোপুরি কাজ শুরু করি ২০১১ সালে। আমাদের প্রথম গণশৌচাগার নির্মাণ করি গাবতলীতে, যা ২০১৪ সালের ২১ মে উদ্বোধন করা হয়।

পঞ্চগড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেল স্টেশনে ওয়াটার এইড পরিচালিত পাবলিক টয়লেট

বাংলা ট্রিবিউন: কী উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করেন এই কাজ?

হাসিন জাহান: আমরা হাইপ্রোফাইল শৌচাগারের বিষয়টি পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছি। কারণ, ২০১১-১২ সালের দিকেও গণশৌচাগার মানে আমাদের মনের মধ্যে যে জিনিসটি আসতো তা হলো একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন খুপড়ির মতো কারাগারের মতো চেহারা। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে একটা পাঁচতারকা মানের সুবিধা, যা রিকশাচালকের মতো  সাধারণ মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারবেন, এরকম একটা ধারণা প্রচলনের জায়গা থেকেই আমাদের এগুলো করা। আমরা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে আমাদের ধারণাগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছি। আমরা সেভাবেই নকশা করেছি। সিটি করপোরেশন শুধু জমি দিয়েছে। আমরা গবেষণা করে দেখেছি, আগে লিজ দিয়ে গণশৌচাগার পরিচালনার যে পদ্ধতি ছিল সেটা আসলে কার্যকর হয় না। কারণ, এখানে লিজ সাধারণত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই পান। উনি দেখা যায় আরেকজনকে দেন। তিনি আবার আরেকজনকে দেন। এভাবে হাতবদল হয়।

এরপর যার হাতে পড়ে তার আসলে লাভ হয় না। তখন দেখা যায় তিনি পানি বেচেন, বিদ্যুৎ বেচেন।  আমরা এখান থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটা মডেল তৈরি করলাম। তৎকালীন সিটি করপোরেশনের মেয়ররা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং বর্তমান মেয়ররা এখনও করছেন। আমরা তখন স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলাম। আমরা যে ব্যবস্থাপনা করি তা হলো পারফরম্যান্স বেজড চুক্তিভিত্তিক সমঝোতা।

আমাদের একটা বড় লক্ষ্য ছিল, মেয়েরা যেন গণশৌচাগার ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর মানুষকে একটি ধারণা থেকে বের করে নিয়ে আসা যে নিম্নমানের গণশৌচাগারে যেতে হবে না। আরেকটা লক্ষ্য ছিল, আমাদের শৌচাগার আদর্শ হবে। সেটি হয়েছে। এখন যে গণশৌচাগারগুলো সিটি করপোরেশন বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে, আমাদের মডেল অনুসরণ করেছে। আমরা একটা মডেল সেট করেছি। স্বাস্থ্যকর পরিবেশও আমাদের লক্ষ্য ছিল, সেখানে সাবান থাকবে, স্যানিটারি ন্যাপকিন, বাচ্চাদের জন্য ব্রেস্টফিডিংয়ের ব্যবস্থা, খাবার পানির ব্যবস্থা থাকবে।

বাংলা ট্রিবিউন: শৌচাগারগুলোর ব্যবস্থাপনা কীভাবে হয় এবং এটা কি টেকসই?

হাসিন জাহান: সারা দেশে ৪৫টি ও ঢাকায় ৩২টি গণশৌচাগার আছে আমাদের। আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলো প্রাইভেট সেক্টরেও কাজ করে। আমরা চুক্তিভিত্তিক সমঝোতায় এগুলো তাদের দেই। কোনও কোনও সময় ভর্তুকিও তাদের দিতে হয়। কারণ, সব গণশৌচাগার একই সংখ্যক ব্যবহারকারী পায় না। এজন্য আমরা আরও টেকসই ব্যবস্থাপনা করতে চাচ্ছি। এজন্য বিজ্ঞাপন দেওয়ার জায়গা, কোনও কোনও গণশৌচাগারে এটিএম বুথ আমরা বসিয়েছি, যাতে কিছু অর্থ সাশ্রয় হয়। একটায় ক্যাফে বসিয়েছি, যেটা এখনও চালানো শুরু হয়নি। এভাবে করলে এটা নিজ নির্ভরতায় চলতে পারবে।

আমাদের সহযোগী সংস্থা কাজ করছে কিনা আমরা তা তদারকি করি। গণশৌচাগারে যারা সেবা দেবেন আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রতিটি শৌচাগারে শিফট অনুযায়ী কর্মীরা কাজ করেন। যেখানে ব্যবহারকারী বেশি সেখানে তিন জন, আর যেখানে কম সেখানে দুই জন থাকে। কর্মীদের মধ্যে একজন নারী থাকতে হবে। যেহেতু শৌচাগারে নারী-পুরুষ আলাদা ব্যবস্থা। আর সার্বক্ষণিক একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখা হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

হাসিন জাহান: এখন আমরা কাজ শুরু করেছি বিশেষায়িত শৌচাগার। এটায় একটু বেশি সেবামূল্য থাকবে। এখানে সুগন্ধি  টিস্যু পেপার, এয়ার ফ্রেশনার, শাড়ি ঠিক করার জন্য আয়না, কোট ঝুলিয়ে রাখা যাবে। প্রতিবার ব্যবহারের পর শৌচাগার পরিষ্কার করা হবে। এটা আমরা পঞ্চগড় থেকে শুরু করবো। এখানে আমরা সর্বজনীন শৌচাগার করছি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও হিজড়ারাও এটা ব্যবহার করতে পারবেন। তারা চাইলে বিনামূল্যে এটা ব্যবহার করতে পারবেন। এটা করা হয়েছে কারণ হিজরারা পুরুষ ও নারীদের রাখা চেম্বার ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

কমলাপুর রেল স্টেশনে ওয়াটার এইড পরিচালিত গণশৌচাগার

বাংলা ট্রিবিউন: শৌচাগার থেকে আয় কেমন আসে?

হাসিন জাহান: আমরা সেবা দিতে গিয়ে দেখেছি আমরা যে জনবল দরকার হয় তার বেতন আসলে সেবামূল্য যেটা আমরা পাই তাতে কুলায় না। আমাদের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়।

এর একটা কারণ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও পানির বিল। আমাদের এই বিল এক টাকাও বাকি নেই। সিটি করপোরেশন ব্যবহার মূল্যের ৫-১০ টাকা যে সীমা দিয়েছে তা তুলে নেওয়া দরকার। কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সেবা দেওয়া যেতে পারে। যেমন ভিক্ষুক। কেউ বেশি টাকা দিলে ব্যালান্স হয়। কোনও শৌচাগার থেকে বেশি আয় হলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। সেটা দিয়ে কিছু রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হয়, যেমন রঙ করা। ছোটখাটো কাজ তো লেগেই থাকে। আমাদের সচরাচর যে শৌচাগারগুলো দেখি সেখানে ছিটকিনি ভাঙা। এত লোক ছিটকিনি লাগায়, কয়েক দিনে ভেঙে যায়। কমোডের ফ্ল্যাশ ভেঙে যাওয়ার কারণ অনেকেই ফ্ল্যাশ করতে জানে না। এর জন্য অনেক টাকা লাগে। আর নিয়মিত কাজ, টিস্যু-সাবান এগুলো তো লাগেই।

বাংলা ট্রিবিউন: শৌচাগারের অবস্থান জানাতে একটি অ্যাপ নিয়ে কাজ করছিলেন। এ বিষয়ে অগ্রগতি কতদূর?

হাসিন জাহান: আমাদের অ্যাপটিতে ২২শ’ শৌচাগারের তথ্য আছে। এটা খুব বেশি মানুষ ব্যবহার করে না। এখন আমাদের যেটা করতে হবে, এটা উন্নত ও ব্যবহারকারীবান্ধব করতে হবে। তখন মানুষই এটাকে জনপ্রিয় করে তুলবে। জনগণই তখন তথ্য দিয়ে এটাকে সমৃদ্ধ করবে। আমরা তো সারা দেশের শৌচাগারের তথ্য এটাতে ঢোকাতে পারবো না। জনগণ যাতে তথ্য ঢোকাতে পারে আমরা ওই ব্যবস্থা করছি। আমরা ইতোমধ্যে গুগলের সঙ্গে কথা বলেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: গণশৌচাগারের ভগ্নদশা উন্নত করতে কী কী অন্তরায় ছিল?

হাসিন জাহান: এটা সবসময় ছিল। ইজারাদার যারা তারা এখনও এগুলো নিতে চায়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন দারুণ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু আমরা যে মডেল উন্নয়ন করেছি সেটি সিটি করপোরেশনের অন্যান্য শৌচাগারে বাস্তবায়নের জন্য যে তাগিদ, পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা থাকা দরকার সেগুলো আসলে নাই। ওনারা টয়লেট নির্মাণের মডেলটি নিয়েছেন। যেমন মহিলা চেম্বার, প্রতিবন্ধী চেম্বার রাখা। কিন্তু আমাদের ব্যবস্থাপনার মডেলটি গ্রহণ করেননি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের অর্জন কী?

হাসিন জাহান: অর্জন বলতে আমাদের শৌচাগারগুলো এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৩০ লাখ বার ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে নারীরা ব্যবহার করেছেন ৩০ লাখ বার।

ছবি: প্রতিবেদক।

/এফএস/এমওএফ/
টাইমলাইন: নাগরিক শৌচাগার চিত্র
২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০১
১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০০
‘গণশৌচাগারে পাঁচতারকা হোটেলের সুবিধা নিয়ে এসেছি আমরা’
সম্পর্কিত
রাজধানীর শ্যামবাজার ঘাটে লঞ্চে আগুন
বিএনপির ৭ আইনজীবীর আদালত অবমাননার বিষয়ে আদেশ বুধবার
মুগদায় রাস্তা বাড়াতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির উচ্ছেদ অভিযান
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে ‘বড় পরিবর্তন’ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে ‘বড় পরিবর্তন’ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র
পদে থেকেই ইউপি চেয়ারম্যানরা উপজেলা নির্বাচন করতে পারবেন
পদে থেকেই ইউপি চেয়ারম্যানরা উপজেলা নির্বাচন করতে পারবেন
জীবনানন্দ পুরস্কার পেলেন জাহিদ হায়দার ও মোস্তফা তারিকুল আহসান
জীবনানন্দ পুরস্কার পেলেন জাহিদ হায়দার ও মোস্তফা তারিকুল আহসান
শাকিবের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা অন্যরকম: চঞ্চল
শাকিবের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা অন্যরকম: চঞ্চল
সর্বাধিক পঠিত
রাজকুমার: নাম নিয়ে নায়িকার ক্ষোভ!
রাজকুমার: নাম নিয়ে নায়িকার ক্ষোভ!
সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করবে দুদক
সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করবে দুদক
তাপপ্রবাহ থেকে ত্বক বাঁচানোর ৮ টিপস
তাপপ্রবাহ থেকে ত্বক বাঁচানোর ৮ টিপস
মাতারবাড়ি ঘিরে নতুন স্বপ্ন বুনছে বাংলাদেশ
মাতারবাড়ি ঘিরে নতুন স্বপ্ন বুনছে বাংলাদেশ
আজকের আবহাওয়া: তাপমাত্রা আরও বাড়ার আভাস
আজকের আবহাওয়া: তাপমাত্রা আরও বাড়ার আভাস