X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

দুবলার চরে নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ

হেদায়েৎ হোসেন, সুন্দরবন থেকে ফিরে
৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০০

সুন্দরবনের ভেতরে মূল সাগরের কোল ঘেঁষে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ দুবলার চর। প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসের জন্য এই দ্বীপে গড়ে ওঠে অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী। এ সময়ে শুঁটকি উৎপাদনকারী দ্বীপের কয়েকটি চরে জেলে-মহাজনরা অস্থায়ী ঘর, শুঁটকি মাচা, শুঁটকি সংরক্ষণের ঘর তৈরি করেন। এই দ্বীপ ও আশপাশের এলাকার আলোরকোল, মাঝের কিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, মেহের আলীর চর ও শ্যালার চর; এই পাঁচটি চরেই মূলত শুঁটকি পল্লীগুলো গড়ে ওঠে। এসব চরে প্রায় ২৫ হাজার জেলে-বহদ্দার অবস্থান নেন। এই পাঁচ মাস এখানে জেলে ও মহাজনদের থাকার জন্য ৯৮৫টি অস্থায়ী ঘর এবং ৬৬টি ডিপো ঘরের অনুমোদন দেয় বনবিভাগ। পাশাপাশি প্রতিবছর নভেম্বর মাসে রাস পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে তিন দিনের মেলা বসে দুবলার চরের আলোরকোলে। এ মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী ও পুরুষ ও দর্শনার্থীসহ ১০ হাজার লোকের আগমন ঘটে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও উৎসবের আয়োজন থাকলেও এখনও দুবলার চর এলাকায় গড়ে ওঠেনি স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

মানববর্জ্যসহ নানা ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলা হয়। কোথাও কোথাও তৈরি হয় কিছু অস্থায়ী পায়খানা। কিন্তু এসব পায়খানা থেকেও পয়োবর্জ্য মেশে পানিতে। এর ফলে ক্রমেই দূষিত হচ্ছে বিশ্বের সবচে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের পরিবেশ। বিষয়টি সমাধানের জন্য নাগরিক নেতারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সুষ্ঠু স্যানিটেশন ব্যবস্থার জন্যও দাবি জানিয়েছেন তারা।

পরিবেশবাদীদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করতে হলে স্যানিটেশনের এই ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও মাথায় রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো স্বল্প মেয়াদে বা আপাতত ক্ষতিকর মনে না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে; যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলোরকোলে অবস্থান নেওয়া খুলনার পাইকগাছার দেবদুয়ারের জেলে সন্তোষ কুমার মল্লিক বলেন, ‘এই চরে খাবার পানি পাওয়া কঠিন। চিকিৎসা নেই, সাপে কাটলে ওষুধ নেই ও টয়লেটের ব্যবস্থা নেই।’

বাগেরহাটের রামপালের শ্রীফলতলার জেলে গোলাম মহম্মদ বলেন, ‘আলোরকোলে বেশি সমস্যা টয়লেট। যেখানে-সেখানে প্রস্রাব করতে হয়। কয়েকটি কাচা টয়লেট আছে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। চিকিৎসা সমস্যার কারণে মানুষ মারাও যাচ্ছে।’

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পদ্মপুকুর এলাকার জেলে মো. আব্দুল গফুর বলেন, ‘গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি সাপে কাটায় দুই জন মারা গেছেন। চিকিৎসা দেওয়া যায়নি। ১০ জানুয়ারি দুই জন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। দুর্গম পথ। স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় স্বাস্থ্যগত সমস্যা বাড়ছে।’

দুবলার চর

খুলনার নাগরিক নেতা আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘দুবলারচরে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে জেলেরা অবস্থান নেন। সংখ্যায় কিন্তু কম না। আবার রাসমেলা উপলক্ষে সেখানে ১০ হাজার লোকের আগমন ঘটে। ফলে রান্নাসহ নানা বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। মানববর্জ্যও যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে। যার সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পানি ও পরিবেশের ওপর।’

‘জনউদ্যোগ, খুলনা’র সদস্য সচিব মহেন্দ্রনাথ সেন বলেন, ‘শুঁটকি পল্লী ও রাসমেলা কেন্দ্রিক পরিবেশ ও পানি দূষণ রোধে স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর আয়োজকদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ৫ মাসের জেলে পল্লী ও তিন দিনের রাসমেলাকে ঘিরে দুবলার চরের এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষের পদচারণা হয়। ফলে এত মানুষের আগমনে সেখানে নানা ধরনের বর্জ্য সৃষ্টি হয়। যা পরিবেশ ও পানি দূষণ ঘটায়। সাগরের বুকে ও জনশূন্য এলাকায় এই ধরনের ঘটনায় ক্ষতির প্রভাব আপাতত দৃষ্টিতে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদি একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; যা হিসেবে আসছে না। কিন্তু এ অবস্থা চলতে থাকলে তা এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই স্যানিটেশন ব্যবস্থায় সফলতা অর্জনে রাসমেলা কেন্দ্রিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপরও দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।’

জেলেদের নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করা সংগঠন অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিন বলেন, ‘দুবলার চর এলাকায় অবস্থান নেওয়া জেলেদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রোধে স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। সমুদ্রগামী জেলেদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ দুর্গম এলাকায় বিকল্প কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুযোগ নেই।’

দুবলার চরে নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ

তিনি বলেন, সুন্দরবনের ঘরগুলোতে স্যানিটেশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা, সুপেয় খাবার পানির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা ও হাইজেনিক ল্যাট্টিনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। স্বাস্থ্য বিষয় নিশ্চিতে ভাসমান হাসপাতাল ও দ্রুতগামী নৌযানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিষধর সাপে কাটা রোগীর জীবন বাঁঁচাতে ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। আর চরে ৫ মাসের জন্য অবস্থান নেওয়া জেলেদের প্রয়োজন মতো প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের শুটকির চাহিদার ৮০ ভাগ আসে দুবলা চর থেকে। সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুবলাচর যেতে এক দিন সময় লাগে। এ জন্য লঞ্চ বা বড় যানবাহন ভাড়া করা প্রয়োজন। আর ৫ মাসের জন্য এত লোকের জন্য প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা করার অর্থও প্রয়োজন। সব মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন। যা সামগ্রিক স্যানিটেশন সফলতার অর্জনের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। দূরত্বের কারণে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, শুঁটকি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় চর হচ্ছে আলোরকোল। এখানে শুঁটকি সংরক্ষণ ও বসতের জন্য ৭৭৬টি ঘর রয়েছে। জেলে-মহাজন মিলিয়ে রয়েছে ৮ হাজার ৩০০ জন।

দুবলার চরে নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার বলেন, সুন্দরবনকে সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ঘরগুলোতে মিঠা পানির পুকুর কাটা হয়েছে। প্রত্যেকরা সমস্যা ধরে ধরে সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে শুরু হয় পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চর জেলে পল্লীর আওতাধীন পাঁচটি চরে শুঁটকি উৎপাদন। চলে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। জেলে, মহাজন ও অন্যান্য ব্যবসায়ী মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ অবস্থান করছে এ সব চরে। আর প্রতিবছর নভেম্বর থেকে দুবলার চরে রাস পূর্ণিমার তিনদিনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ উৎসবকে ঘিরে বনবিভাগ থেকে দুবলার চরে যাতায়াতে দর্শনার্থী ও পূণ্যার্থীদের জন্য আটটি রুট নির্ধারণ করে। র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা এ সব রুটের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। দুবলা শুঁটকি পল্লীতেও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকে।

/ইউএস/
টাইমলাইন: নাগরিক শৌচাগার চিত্র
৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০০
দুবলার চরে নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ
২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০১
সম্পর্কিত
আসন্ন বাজেটে ওয়াশ খাতের বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
রাজধানীতে প্রতি ৭৫ হাজার মানুষের জন্য একটি টয়লেট
এক কারাগারে ধারণক্ষমতার তিনগুণ বন্দি, শৌচাগার সংকটে ভোগান্তি
সর্বশেষ খবর
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা গায়ক ও নায়ক
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা গায়ক ও নায়ক
হাইতির প্রধান বিমানবন্দর দখলের চেষ্টা গ্যাংদের
হাইতির প্রধান বিমানবন্দর দখলের চেষ্টা গ্যাংদের
ফকিরাপুলে আবাসিক হোটেল থেকে ঠিকাদারের মরদেহ উদ্ধার
ফকিরাপুলে আবাসিক হোটেল থেকে ঠিকাদারের মরদেহ উদ্ধার
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে ছায়া ফেলেছে এমবাপ্পে ইস্যু!
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে ছায়া ফেলেছে এমবাপ্পে ইস্যু!
সর্বাধিক পঠিত
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি খেলাফত মজলিসের
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি খেলাফত মজলিসের
সাত মসজিদ রোডের সব বুফে রেস্তোরাঁ বন্ধ
সাত মসজিদ রোডের সব বুফে রেস্তোরাঁ বন্ধ
বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষে ভারতে গিয়েই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ব্রাজিলিয়ান তরুণী
বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষে ভারতে গিয়েই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ব্রাজিলিয়ান তরুণী
ইউক্রেন অবশ্যই রাশিয়ার অংশ: পুতিন মিত্র
ইউক্রেন অবশ্যই রাশিয়ার অংশ: পুতিন মিত্র
গাউসিয়া টুইন পিকের সব রেস্টুরেন্ট সিলগালা
গাউসিয়া টুইন পিকের সব রেস্টুরেন্ট সিলগালা