X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

সাইবার লিটারেসি ও সোশাল মিডিয়া

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:২৩
আশফাক সফল তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সাইবার নিরাপত্তা। প্রযুক্তিবিদসহ নীতিনির্ধারকদের প্রতিনিয়ত চিন্তিত করে তুলেছে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তার বিষয়াদি। বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত ঝুঁকি ও দুর্বলতা নিয়ে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তারা। ডিজিটালাইজেশনের স্রোতে থাকা বাংলাদেশেও গড়ে উঠেছে একাধিক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য– সরকারি সংস্থা BGD e-GOV CIRT, বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার সাপোর্ট সেন্টার, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন ইত্যাদি।

এ কথা মানতেই হবে, করোনার ঢেউ যেমন আঘাত হেনেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক সম্পর্কের মাঝে; ঠিক তেমনই জোয়ার এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে। যারা ঘণ্টাদুয়েক রাস্তায় জ্যামে বসে থেকে অফিসে যেতেন বা অফিস থেকে ফিরে আসতেন; তারা অনেকেই এখন বাসায় বসেই কাজ করছেন বা করেছেন লকডাউনের সময়। কমবেশি ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠানই, বিশেষ করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান হোম অফিস বা ভার্চুয়াল অফিস প্রয়োগ করেছেন বেশ আকর্ষণীয়ভাবে। এমনকি সংবাদ সংস্থাগুলো (বিশেষ করে অনলাইন ভিত্তিক), তাদের মাঠ-পর্যায়ের কর্মী ছাড়া অন্য অনেককেই বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দেখা গেছে অনলাইন ক্লাসের ছড়াছড়ি। অবশ্য অবকাঠামোগত কারণে শহরাঞ্চলের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, তারপরও বেশ ভালোই চলছে সব মিলিয়ে।

এককথায় প্রযুক্তি আগের চেয়েও বেশি জড়িয়ে পড়েছে আমাদের জীবনে। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে (এবং বাড়বে) তথ্যপ্রযুক্তি বা সাইবার দুনিয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি। করোনা বিপর্যয়কে লক্ষ্য করেই বিশ্বব্যাপী আলোড়নকারী কিছু সাইবার অপরাধ দেখা গেছে, যার মধ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১-এর জানুয়ারিতে করোনা ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজারের তথ্য চুরি হওয়া উল্লেখযোগ্য।

অবশ্য বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত অপরাধগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম। এটি শুধু ঘটে যাওয়া এবং প্রকাশ হওয়া তালিকা সাপেক্ষে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সাইবার অপরাধের প্রভাব বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি, যেমন– বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার কিছু অভিযোগ আসছে।

ডিজিটালাইজেশনের পথ ধরে দেশে বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যানুয়ায়ী, ২০২১ সালের নভেম্বরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৬৬ লাখ; গত বছরের শুরুতে যা ছিল ১০ কোটির ঘরে। সেই সঙ্গে মুঠোফোন সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়। ১১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে তাদের ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা। অনেক সাইবার বিশেষজ্ঞের মতে এই সংখ্যা আরও বেশি। পরিসংখ্যান সংক্রান্ত স্বীকৃত ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টা’র মতে, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ৮০ লাখ। এছাড়া প্রায় ২০ লাখ ব্যবহারকারীর আছে ইনস্টাগ্রামে। মোটের ওপর বাংলাদেশের সাইবার ফুটপ্রিন্ট বেশ বড়।

দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সাইবার ক্রাইমও বেড়েছে সমানতালে। বিভিন্ন উৎসের তথ্য থেকে দেখা যায়, ব্যক্তিপর্যায়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েক ধরনের সাইবার অপরাধ সংগঠিত হয়। তার মধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিং সার্ভিস বা এমএফএসের (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) পাসওয়ার্ড বা পিন হাতিয়ে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা, ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা পেজ খুলে পোস্ট দেওয়া, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, পর্নোগ্রাফির প্রচার, সাইবার বুলিং ইত্যাদি। মোটা দাগে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেই বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ ঘটছে বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের কারণে বেশকিছু বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে দেখেছি আমরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সাইবার ক্রাইম বেড়েছে বহুলাংশে। বিশেষ করে অনলাইন অ্যাকাউন্ট (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইমেইল ইত্যাদি) হ্যাকিং বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ, যা মোট সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগীর ২৮ শতাংশ। এছাড়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স কেলেঙ্কারিগুলোকে আমলে না নিলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

একই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, যা শতকরা হিসাবে ৮৬ শতাংশেরও বেশি। ১৮ বছরের চেয়ে কম বয়সী এবং ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগী হয়েছেন, যার মধ্যে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, সাইবার বুলিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সাইবার অপরাধ রোধে যেমন প্রয়োজন আইন এবং তার সঠিক প্রয়োগ; তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা ও সাইবার লিটারেসির।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অজ্ঞতা ও অসচেতনতা থেকে অনেকেই সাইবার অপরাধে জড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ব্যবহারকারীদের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে আইসিটি বিভাগ প্রণীত ‘সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’র আলোকে সরকারি উদ্যোগগুলো চলছে। প্রান্তিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে করে নিরাপদ সাইবার স্পেসের সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সাইবার লিটারেসির ক্ষেত্রে (সামগ্রিক অর্থে, শুধু সাইবার নিরাপত্তার বিচারে নয়) দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী বেশ পিছিয়ে আছে। যদিও সাম্প্রতিক সিলেবাসগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থায় কম্পিউটার সংক্রান্ত কোর্স সংযুক্ত করায় তরুণ ও কিশোর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কম্পিউটার লিটারেসির মান তুলনামূলক ভালো।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের ২০২০ সালের এক গবেষণায় গ্রামাঞ্চলে সাইবার বা ডিজিটাল লিটারেসির করুণ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে ৯২ শতাংশ বাড়িতে অন্তত একটি মোবাইল ফোন আছে। আর প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়িতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। এছাড়া অন্তত ২২ শতাংশ বাড়িতে অন্তত একজন প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার বিপরীতে হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে সেই গবেষণা পত্রে। মাত্র ১০ শতাংশ বাড়িতে ইমেইল ব্যবহারের সক্ষমতা আছে, সেখানে প্রায় ৪৫ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (বিশেষ করে ফেসবুক) ব্যবহারে সক্ষম। নিঃসন্দেহে তথ্য আদান-প্রদান এবং এমনকি বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে (যেমন এফ-কমার্স) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবদান অনস্বীকার্য।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন এবং ব্র্যাকের গবেষণাকে একই পাতায় রাখলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বেশিরভাগ সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ঘিরে। এসব ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের পাশাপাশি সাইবার বুলিংয়ের সংখ্যা প্রচুর। গ্রামীণফোন, টেলেনর ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌথ এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী সাইবার বুলিং নিয়ে শঙ্কিত। ওই জরিপের ফল অনুযায়ী, ২৯ শতাংশ তরুণ করোনা মহামারির আগেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন এবং অন্তত ১৮ শতাংশ তরুণ কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় একাধিকবার সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার ও জনপ্রিয়তাকে ভিত্তি করে বাংলাদেশ সাইবার ও ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে বাড়ানো সম্ভব তথ্য প্রযুক্তির নিরাপত্তা। ইতোমধ্যে র‍্যাব, পুলিশ, ডিএমপি ও সিআইডি তাদের সাইবার পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে ফেসবুক ভিত্তিক পেজ ও গ্রুপ চালু করেছেন। এছাড়া শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ এবং এটুআই, ফেসবুকের সহযোগিতায় চালু করেছে ‘উই থিংক ডিজিটাল’ প্রোগ্রাম। এটি তৈরি হয়েছে সাইবার সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। প্রোগ্রামটির প্রশিক্ষণ ও কোর্সগুলোকে তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা অনলাইন প্রাইভেসি, ইন্টারনেটে ব্যক্তি ও অ্যাকাউন্ট নিরাপত্তা, অনলাইন শিষ্টাচারসহ সর্বোপরি ভুল ও মিথ্যা তথ্যকে আলাদা করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাইবার লিটারেসি বাড়াতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা ও নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে আলোচনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাইবার দুনিয়ার অন্ধকার দিকগুলোর পাশাপাশি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করা, সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা শেয়ার করা ইত্যাদি।

পরিশেষে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঘটে চলা অপ্রীতিকর ঘটনা ও পরিস্থিতিগুলোকে সামলে নেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকেই যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।  

লেখক: ব্লগার ও আইটি প্রফেশনাল


/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ