সমাজ এবং আমাদের মুখোশ

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৫:৩২, মার্চ ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪০, মার্চ ২৪, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনডাস্টবিন, ড্রেন কিংবা বস্তায় মোড়ানো নবজাতক পাওয়ার খবর মাঝে মাঝে পত্রিকায় আসে। সেই নবজাতকদের কেউ জীবিত, কেউবা মৃত। কারো কারো গায়ে পোকামাকড়ের কামড় এবং শরীরের কিছু অংশ খেয়ে ফেলার চিহ্ন থাকে। সমাজের লোকেরা আহা! কী করুণ! বলেন। সেই সন্তানদের মাতা-পিতার খোঁজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা জানতে পারি না। কী কারণে একজন মা নয় মাস গর্ভে ধারণ করা সন্তান ফেলে দেওয়ার চিন্তা করেন কিংবা মেরে ফেলেন, আমরা সেটি জানারও চেষ্টা করি না। আমরা শুধু সেই অদেখা মায়েদের প্রতি একদলা থুতু ছিটিয়েই নিজেদের বিবেকের জয়গান করি। কিন্তু আমরা কখনও ভাবি না এ ধরনের প্রত্যেকটি মৃত্যুর জন্য আসলে মূল দায়ী আমরা, আমাদের সমাজ। কারণ, আমরা জানি সমাজের কারণে এই মায়েরা সন্তানকে নয়-দশ মাস পেটে ধরে রাখতে পারলেও আমাদের কারণে এই পৃথিবীতে তার সন্তানটি সুস্থভাবে বসবাস করতে পারবেন না। কারণ, সর্বদাই তাকে নানাভাবে হেয় করার চেষ্টা করবে। অথচ আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই রক্ষা করতে পারতো এই সন্তাদের। আমরা যতটা দোষ দেই এই সন্তানের মাকে, ঠিক ততটাই এড়িয়ে যাই আমাদের নেতিবাচক মনস্কতা। কারণ, আমরা ‘আহা, উহু’ করে নিজেদের ‘মানবিক’ হিসেবে হাজির করাতে পছন্দ করি, কিন্তু এই আমরাই জানি আমাদের এই মানবিকতা শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য কোনও কাজে লাগেনি। আমাদের এই দ্বৈততা আরও স্পষ্ট হয় যখন ড্রেন কিংবা ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটি কেউ লালন-পালন করলে আমরা যতটা মানবিকতার বাহবা দিই, অথচ এই শিশুটিই যদি তার জন্মধাত্রী মায়ের কাছে থাকতো তাহলে ‘বৈধ-অবৈধ’র প্রশ্ন তুলে মা এবং সন্তানের জীবন ‘তামা’ করে দিতাম আমরা সেই বিষয়ে নিশ্চিত।

এই আলাপের প্রয়োজন এই কারণেই যে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রীর সন্তান ট্রাংকে ভরে রাখা এবং পরবর্তীতে শিশুটির মৃত্যু মেয়েটিকে এই সমাজের সবচেয়ে খারাপ মা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইতোমধ্যেই। কারণ, সে তার সন্তানকে ট্রাংকের ভেতরে ঢুকিয়ে রেখেছিল ভয়ে। বাচ্চাটি নীল হয়ে গিয়েছিল, মরে গিয়েছিল। বাচ্চাটির মা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মেয়েটি বারবার বলেছে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার পর মেয়েটি আরেক দফা নিপীড়নের শিকার হন। সমাজের চোখে তিনি ঘৃণিত। কারণ, সে সন্তান হত্যা করেছেন। বেশিরভাগ মানুষই একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কাছে এ ধরনের আশা করে না। অথচ এই সন্তানের পিতার প্রতি সমাজের ক্ষোভ কম। কারণ, সন্তানের মৃত্যুর যে কারণ সেটির সঙ্গে পিতার সম্পর্ক নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বলেই হয়তো মেয়েটির প্রতি আমাদের অভিযোগ বেশি। মেয়েটি এবং তার অভিভাবক বারবার বলছেন মেয়েটি ভয় পেয়েছিল। বোঝাই যায় এই ভয় সাধারণ হঠাৎ কোনও পাওয়া ভয় নয়,এই ভয় অনেক দিন ধরে মনে ভর করা ভয়। এখন প্রশ্ন হলো কেন মেয়েটি ভয় পেয়েছিল? কিসের এত ভয় তাকে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য করে দিয়েছিল?

এই ভয়ের কারণ খুঁজতে গেলে যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলার প্রচলিত নিয়মের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পারি, সেগুলোতে নিয়ম হলো যে  বিবাহিত মেয়েরা হলে থাকতে পারে না। কিন্তু বিবাহিত ছেলেদের হলে থাকার বিষয়ে এ ধরনের কোনও নিয়ম নেই। মেয়েদের হল কর্তৃপক্ষ যদি জানে মেয়েটি বিবাহিত তাহলে তারা মেয়েটির সিট বাতিল করে দেবে– এই ভয়ে হয়তো মেয়েটি প্রথম দফায় গোপন করেছে তার বিয়ের তথ্যটি। সেই একই ভয়ে সে তার সন্তান পেটে থাকার তথ্যটিও গোপন করে হল কর্তৃপক্ষ এবং হলের বন্ধুদের কাছে। এখানে উল্লখ করা প্রয়োজন, যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রী হলের নিয়ম  বিবাহিত মেয়েরা হলে থাকতে পারবেন না সেটির যৌক্তিকতা আদৌ নেই। এই নিয়মগুলো বাতিল করতে হবে।

তবে এই সময়ে যে তার প্রচুর স্বাস্থ্যসেবা দরকার সেটিও সে হয়তো পায়নি। কারণ, সে যে গর্ভবতী এটা হলের কেউ জানতে না। কোনও আবাসিক হলের এই ধরনের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ কম, তবু হয়তো জানলে বন্ধুরা তার প্রতি যত্নশীল হতে পারতো। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, বাবা-মাও মেয়েটির গর্ভধারণের কথা জানতেন না। কেন সেই মেয়েটি কাউকেই জানায়নি কিংবা সন্তানের পিতা-মাতা উভয়েই নিজেদের মধ্যে কী ধরনের ঐক্যে পৌঁছেছিলেন সেটিও আমরা জানি না।

মেয়েটি সন্তানকে মেরে ফলতে চেয়েছে এটি আমার বিশ্বাস হয় না। যারা জন্ম দেওয়া পর্যন্ত সন্তানটিকে গর্ভে ধারণ করেন তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান, সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখানোর। মেয়েটিও সেই লড়াই চালিয়েছিল। তা না হলে হয়তো সে ভ্রূণ থাকা অবস্থায় সন্তানটি নষ্ট করে ফেলতো, কিন্তু তা সে করেনি। তাই সে ইচ্ছে করে সন্তানটিকে মেরে ফেলার জন্য ট্রাংকে ঢুকিয়ে রেখেছিল, এমন যুক্তিও অকাট্য হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। তবে তার হয়তো কিছুটা ভুল ছিল, কারো সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থা শেয়ার না করা। সন্তানের বাবারও সন্তানের মায়ের প্রতি সতর্কতা এবং যত্নের প্রয়োজন ছিল। এর কোনোটাই সে পায়নি। গর্ভকালীন সময়ে নানা ধরনের হরমোনাল পরিবর্তন, সামাজিক চাপজনিত ভয় এবং সেদিন সকাল থেকেই রক্তপাত দেখে এবং প্রসব বেদনায় হয়তো সে আরও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে অনেক ভয় একসঙ্গে কাজ করেছে তার মনে। সে রুমে একা ছিল। সন্তান জন্মদানের সময় কী ঘটেছিল সে সময় সেটি জানা সম্ভব নয়।

এগুলো বিবেচনায় না এনে এই ঘটনায় মেয়েটিকে হেয় করা আমাদের এই নেতিবাচক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। হ্যাঁ, হয়তো একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ববান বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে পারতো। কিন্তু সেটা নানা কারণেই হয়নি। কিন্তু আমরা তাদের হেয় না করে এই ধরনের ঘটনায় সহযোগিতার হাত বাড়াই, যেন প্রতিটা শিশুই বেঁচে থাকতে পারে এই পৃথিবীতে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ