দেশ বিক্রির অলীক কাহিনি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:১৮, অক্টোবর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, অক্টোবর ১০, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী৩ অক্টোবর থেকে ৬ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে ছিলেন। মূলত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তার বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভারত সরকারের অনুরোধে এ সফরকে দ্বিপক্ষীয় রূপ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হায়দ্রাবাদ হাউসে বৈঠক করেছেন। কয়েকটা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকও সম্পাদিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এবং ভারতের সঙ্গে কোনও চুক্তি করলে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক লোকের কাছে তাদের দেশ বিক্রির চুক্তি হয়ে যায় এবং তারা দেশের মানুষের কাছে বিভ্রান্তিকর প্রচার-প্রচারণা চালায়। তাই আমি আজকে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত প্রধান প্রধান চুক্তিগুলো সম্পর্কে আলোচনা করে দেখাতে চাই, অভিযোগগুলো কতটা মিথ্যা এবং নির্মম।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টার ফলে। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছে চৌদ্দশত, আর পশ্চিম সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ হাজার। ভারত পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ করেছে, তাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশগ্রহণের কারণে। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের লোক, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ। সুতরাং আমাদের লোকক্ষয়ের বিবরণ না হয় নাইবা দিলাম।

১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কলকাতা গিয়েছিলেন জনসভায় বক্তৃতা করার জন্য। জনসভার পর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজভবনে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতের সময় বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন এবং ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রতিটি সেনা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এক লেখায় দেখেছি তিনি আর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ওসমানী সাহেব নাকি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যশোর থেকে হেলিকপ্টারে করে কুমিল্লায় এসেছিলেন এবং কুমিল্লা সার্কিট হাউসে ভারতীয় আইসিএস অফিসারে ভর্তি দেখেছিলেন। তারা নাকি এসেছিলেন সিভিল প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এ কথা যদি সত্য হয়, তবে এক মাস ২০ দিন পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হন কীভাবে! সিভিল প্রশাসনের অফিসার বসিয়ে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ যদি ভারত নিতে চাইতো, তবে সেনা প্রত্যাহারের তো প্রশ্নই আসে না।

১৭ মার্চ সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়। এপ্রিলের শেষ নাগাদ একজন ভারতীয় সেনাও বাংলাদেশে ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৭২ বছর, অথচ এখনও জাপানে, জার্মানিতে আমেরিকান সৈন্য অবস্থান করছে। বড় শক্তি কোনও দেশে প্রবেশ করলে তা তারা সহজে ত্যাগ করতে চায় না। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে আসেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ২৫ বছরের জন্য একটি মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন। তখনকার বিরোধী দলগুলো এই চুক্তিকে দাসত্ব চুক্তি বলে আখ্যায়িত করতো।

এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল মাত্র তিন বছর ৬ মাস। বাকি ২১ বছর ৬ মাস ক্ষমতায় ছিল জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া। এই চুক্তি উভয়পক্ষের যেকোনও পক্ষ বাতিল করা বা সংশোধনের প্রশ্ন তোলার এখতিয়ার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কেউ বাতিলও করেননি, সংশোধনের প্রস্তাবও উত্থাপন করেননি। ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসে আর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন তখন এই চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। শেখ হাসিনা আর এই চুক্তির মেয়াদ বাড়াননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আরও একটা উল্লেখযোগ্য চুক্তি হয়েছিল। তা হলো গঙ্গার পানি চুক্তি। এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে দেওয়া হয় ৪৪ হাজার কিউসেক পানি। শেখ সাহেব ক্ষমতায় থাকতে আরও একটা চুক্তি হয়েছিল—ছিটমহল বিনিময় ও সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে। চুক্তি তখনই পাকাপাকি হয়েছিল, কিন্তু ভারতীয় লোকসভায় এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে শাসনতন্ত্র সংশোধন করতে হয় বিধায় তা বাস্তবায়নের সম্ভব হয়নি। কারণ ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের তখন শাসনতন্ত্র সংশোধনের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ছিল না।

বিরোধীরা ভোট দিতে অসম্মত ছিল। আগেই বলেছি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতায় ছিল জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া। তাদের সময় বারবার গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছিল। জিয়ার আমলে সাড়ে ৩৪ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার চুক্তি হয়। এরশাদের আমল চুক্তি ছাড়া এমওইউর ওপর চলে। খালেদা জিয়ার সময় যে চুক্তি হয়, তাতে বাংলাদেশ পানি পেয়েছিল মাত্র ১০ হাজার কিউসেক।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার চুক্তিতে গঙ্গার পানির ভাগ নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়। প্রয়োজনে বাংলাদেশ গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ করলে ভারতের সম্মতির কথা ওই চুক্তিতে রয়েছে। পানির হিস্যা সমান সমান এবং বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ওই চুক্তিতে।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাসীন হয় আর নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হন। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২০১৫ সালের ২৭ মে পূর্বের সেই ছিটমহল বিনিময় ও সীমান্ত চুক্তি ভারতীয় লোকসভায় পেশ করেন এবং বিজেপি ও কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থনে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। এটি ভারতীয় সংবিধানের ১০০তম সংশোধনী। ভারতের লোকসভায় কোনও সংশোধনী আর কখনও শতভাগ সমর্থন পায়নি। পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় উভয় প্রধানমন্ত্রীর মাঝে ছিটমহল বিনিময় ও সীমান্ত চুক্তি নামে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ তার ৫১টি ছিটমহল ছেড়ে দেয় আর ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত তাদের ১১১টি ছিটমহলের অধিকার বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রায় আট হাজার একর ভূমি বেশি পায়। শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের সঙ্গে জল ও স্থল সীমান্ত চূড়ান্ত করেন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সর্বশেষ চুক্তি হয়েছে গত ৫ অক্টোবর ২০১৯ সাল। এসব চুক্তিতে গ্যাস রফতানি, ভারতকে ফেনী নদীর পানি দেওয়া এবং রাডার স্থাপন নিয়ে যে কথা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এলএনজি গ্যাস বাংলাদেশ আমদানি করছে। তা থেকে কিছু গ্যাস ভারতে রফতানি করবে। এটি কোনও মতেই আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস না। তাতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। সাবরুম শহরে খাওয়ার পানি নেই, তা চুরি করে ফেনী নদী থেকে নিয়ে যায় ভারত। চুরিটাকে বৈধতা দিয়ে ১.৮২ কিউসেক পানি ভারতকে দেওয়ার চুক্তি হয়েছে। বদান্যতাও হলো, চুরিও বন্ধ হলো।

প্রধানমন্ত্রী ৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে এই সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবং স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ত্রিপুরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তারা শুধু বাঙালি শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়নি, একইসঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেই মূলত ট্রেনিং নিয়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছে। সুতরাং ত্রিপুরার অবদানকে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরার সম্পর্ক ছিল এবং সেটি আরও দৃঢ় থাকবে। আর খাওয়ার পানি না পাওয়া তো অমানবিক।

রাডার বিষয়টা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশের উপকূলে ভারতের যে রাডার সিস্টেম বসাতে দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে, তার ধরন এবং ব্যবহার কী হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে দু’দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন সমুদ্রপথে আসা বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় এই রাডার ব্যবস্থা দু’দেশের জন্যই কার্যকরী হবে। ভারত অতীতে মরিশাস, সেশেলস এবং মালদ্বীপে এ ধরনের রাডার ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। মিয়ানমারে একই ধরনের ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য আলোচনা চলছে।

সমুদ্রপথে চীনের সামরিক গতিবিধি নজরে রাখার জন্য ভারত এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে বলে অনেকে মনে করেন। সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে যৌথভাবে একটি ‘কোস্টাল সার্ভেইল্যান্স’ বা উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। তবে এই রাডার উপকূলের কোথায় স্থাপন করা হবে কিংবা এই ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বে কারা থাকবে, সে বিষয় এখনও অস্পষ্ট।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, রাডার ব্যবস্থা স্থাপনের পর তার পরিচালনার দায়িত্বে কারা থাকবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাডার পরিচালনায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের লোকবল ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে যৌথ লোকবল ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আশা করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিষয়টি জাতীয় সংসদে ব্যাখ্যা করবেন। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার যেসব চুক্তি করেছে তা খোলামেলা আলোচনা করা হলো, সুতরাং দেশ বিক্রির অলীক কাহিনি পাঠকেরা সম্যক অনুধাবন করতে পারবেন বলে আশা করি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ