করোনার সঙ্গে ডেঙ্গুর ছোবল!

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:৫০, এপ্রিল ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১৮, এপ্রিল ১৩, ২০২০

সালেক উদ্দিনসারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশ যখন করোনা নিয়ে মহাসংকটে রয়েছে, তখনই নীরবে চলে এলো এপ্রিল মাস। শুরু হলো এ দেশে ডেঙ্গুর মৌসুম। এপ্রিল থেকে অক্টোবরকেই আমরা ডেঙ্গুর মৌসুম বলে জানি। এরমধ্যে আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। গেলো বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ জন মারা গেছেন।
আজকে করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আতঙ্ক চলছে; গেলো বছর ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে আমাদের দেশে সে রকমই একটি আতঙ্ক কাজ করেছিল। ওই সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়েছি, দেখেছি দুই সিটি করপোরেশনের অবহেলা ও দুর্নীতির কথা, যার জন্যই ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ এসেছিল এ দেশের মানুষের ওপর। সে বছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার আগে থেকেই সিটি করপোরেশনের এডিস মশা নিধনের ব্যবস্থা নেওয়া যেমন উচিত ছিল, তেমনি ব্যবস্থা নেওয়াও হয়েছিল। পত্রিকাগুলোর অনুসন্ধানী রিপোর্ট থেকে জেনেছিলাম, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উত্তর সিটি করপোরেশন মশক নিধনে ১৪ কোটি টাকার এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১৭ কোটি টাকারও বেশি ওষুধ কিনেছিল। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা সিটি করপোরেশন দুটোকেই ওই ওষুধ কিনতে হয়েছিল সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই। সিন্ডিকেটের সরবরাহকৃত ওষুধ ছিল ভেজাল। মশক নিধনের এই ওষুধ পরীক্ষা করে আইসিডিডিআরবি এবং সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সিভিসি বলেছিল ‘অকার্যকর’। তারপরও সিটি করপোরেশন সেই ওষুধই ছিটায়। ফলে কাজের কাজ হয়নি কিছুই। বংশবিস্তার করেছিল এডিশ মশা। আর তাদের কামড়ে দেশের লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন ৩০০ জন। সে সময়ে পত্রিকাগুলোর অনুসন্ধানী রিপোর্টে আরও এসেছিল যে সংসদ নির্বাচনের বছর ছিল বলে ডেঙ্গুর অকার্যকর ওষুধ নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। সেটি ছিল এক চরম দেশপ্রেমহীনতার উদাহরণ!

এসব দেখেশুনে সে সময়ে আমার একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, একটি জীবনের মূল্য কত তা মেয়র সাহেবদের জানা নেই। জানা থাকলে এই অকার্যকর ওষুধ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ওষুধ সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতেন। ভয় পাচ্ছিলাম জনরোষে মেয়র সাহেবদের বারোটা বাজবে ভেবে। কিন্তু কিছুই হয়নি তাদের। এ দেশের মানুষ সেবার প্রমাণ করেছিল যে আমাদের সহ্যশক্তি অনেক অনেক বেশি! না হয় ধরেই নিয়েছিল এটাই নিয়ম!

এসব পুরনো কথা। পুরনো অনিয়মের কথা মানুষ ভুলে যায় তখনই, যখন দেশে সু-নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা আশা করতেই পারি, গেলো বছরের অনিয়ম থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার মেয়র সাহেবরা প্রত্যাশিত সু-নিয়ম প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেবেন। এডিস মশা নিধনের কার্যকর ওষুধ যথানিয়মে যথেষ্ট পরিমাণে ছিটানো হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সরকার অবশ্য আগেভাগেই বলেছে—গেলো বছর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করা হয়েছিল এপ্রিল মাসে এবার জানুয়ারি থেকেই শুরু করা হয়েছে। ফলে গত বছরের মতো ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এ বছর দেখা যাবে না।

সরকারি এই আশ্বাসে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। দেখতে চাই বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে সরকারি প্রত্যাশা। আর যদি তা না হয়, তবে দেশ করোনা নিয়ে যে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি রয়েছে, তার ওপর যদি ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ অতীতের মতো পড়ে, তবে তা হবে আত্মহত্যার সমতুল্য। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ যে কী, তা শুধু সময়ই বলতে পারবে। তবে আপাতত করোনা প্রতিরোধের পাশাপাশি এডিস মশা নিধন তথা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম শুরুর বিকল্প নেই। কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।
মশা নিধন কঠিন কাজ বটে, তবে অসাধ্য নয়। এ বিষয়ে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। গত শতাব্দীতে যখন তৎকালীন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, তখন ঢাকা ছিল মশা মাছির এক নোংরা শহর। মানুষের মুখে মুখে ডায়ালগ ছিল—‘রাতে মশা দিনে মাছি এই নিয়ে ঢাকায় আছি।’ এমন পরিস্থিতিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকার মশা মাছি নিধনের জন্য ৩০ দিনের এক অভিযান চালিয়েছিলেন। প্রতিনিয়ত জঙ্গল পরিষ্কার করা, উড়োজাহাজ থেকে মশার ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেকটা যুদ্ধ অবস্থার মতো ছিল সেই অভিযান। বিষয়টি শুধু আমার নয়, আমাদের সময়কার অনেকের স্মৃতিতেই আছে। গেলো বছর ২৫ জুলাই তারিখে বাংলা ট্রিবিউনেরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীর ‘মেয়র সাহেবরা জনরোষকে ভয় করুন’ শিরোনামের একটি লেখায়ও সেই মশা নিধনের ঘটনা প্রসঙ্গক্রমে এসেছিল।

অগ্রসর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং মেয়র সাহেবরা সেই অনগ্রসর সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চেয়েও অনেক অনেক আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করুন যেন এডিস মশা নির্মূলের জন্য সেটা যথেষ্ট হয়। প্রতিবছর ডেঙ্গুজ্বরের আতঙ্কে মরার আগেই আমাদের বারবার মরতে না হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পত্রিকান্তরে দেখলাম, বর্তমান সময়ে ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত বছরের চেয়ে কম নয়, বরং বেশি।  
ভয়ের বিষয় এখানেই। এবার যদি এডিস মশা নিধন কার্যক্রম সফলভাবে না হয়, যদি গত বছরের মতো এ বছরও ডেঙ্গুজ্বরে সারাদেশ জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে করোনা জ্বর আর ডেঙ্গুজ্বর মিলেমিশে এক কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। করোনা ভেবে ডেঙ্গুজ্বরের রোগীরা পরিবার-পরিজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অনাদরে মরবে করোনার মতো ডেঙ্গুজ্বরের রোগীরা। শুধু কি তা-ই? করোনা ও ডেঙ্গু—এই দুই মহামারির তাণ্ডব সামলানোর ক্ষমতা থাকবে না আমাদের। নীরবে নিভৃতে অপেক্ষা করতে হবে অসহায় মৃত্যুর জন্য।
সবশেষে যে কথাটি দিয়ে শেষ করবো তা হলো—গত বছরের মতো ডেঙ্গু যেন এ বছরে করোনার পাশাপাশি ভয়াল ছোবল না দেয়, সে ব্যাপারে এখনই সময় চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার। এবার আর ভুল করার অবকাশ নেই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ