গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের এই গল্প। ব্রিটিশ বাহিনীর সহায়তায় আরব রাষ্ট্র ওমান সালতানাতের অধীনস্থ ছোট্ট এক আফ্রিকান দ্বীপ জাঞ্জিবার। তার সমুদ্রবন্দর থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে এক বাড়ি। সে বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যেতো বন্দরের জেটিতে অবস্থিত উঁচু এক মিনার। বন্দরে সোমালিয়া, আরব পেনিনসুলা, কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশসহ যে দেশেরই জাহাজ এসে ভিড় করতো, মিনারের চূড়ায় চড়িয়ে দেওয়া হতো সে দেশের পতাকা। সেই পতাকা দেখেই দ্বীপের মানুষজন ঠাহর করতেন, কোন দেশি জাহাজ এসে ভিড়ছে বন্দরে। সেসব জাহাজের পেট থেকে বেরিয়ে আসা নাবিকদের সঙ্গে বন্দরজুড়ে ছড়িয়ে পড়তো বিচিত্র সব দেশের মালামাল, সংস্কৃতি, আদবকেতা, আর আখ্যান।
উপকূলবর্তী সে বাড়িতে বসেই প্রথমবারের মতো বিশ্ববীক্ষা লাভ করা কিশোর তখনও জানে না যে সে একদিন ছেড়ে যাবেন তার জন্মস্থল। আশ্রয় নেবে পৃথিবীর একসময়ের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ডে। সেখানেই সে পড়াশোনা করবে, পড়াশোনা শেষে সে দেশেরই এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে, আর ক্রমাগত লিখে চলবে তার ফেলে আসা মাতৃভূমির কথা, রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে দেশত্যাগের কথা, রচনা করবে এমন সব মানুষদের আখ্যান, যাদের প্রতিদিন এতবার আমরা চোখের সামনে দেখি যে তারা আর আলাদা করে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। এই অচ্ছুৎ, ভুলে যাওয়া ‘লিটল পিপল’ তথা বামনশ্রেণির মানুষের জীবন নিয়ে রচিত আখ্যানের কারণে সে গৃহত্যাগী কিশোর একদিন লাভ করবে জগৎজোড়া খ্যাতি। জিতবে বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে নন্দিত (একই সঙ্গে বিতর্কিত) স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার। আবদুলরাজাক গুরনাহ নামটি হয়ে উঠবে আমাদের মাঝে স্মরণীয়, নোবেল কমিটির ভাষ্যে যে লেখক আপসহীন এবং সহমর্মী লেখনীর মাধ্যমে রচনা করেছেন উত্তর ঔপনিবেশিক জীবনধারার আলেখ্য, এবং মমতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শরণার্থীদের মাথাগোঁজার ঠাঁইয়ের খোঁজে ভিন্ন ভূগোলে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে খাবি খেতে থাকার ইতিহাস।
গুরনাহ অবশ্য তার মাতৃভূমি জাঞ্জিবার থেকে ইংল্যান্ডে থিতু হবার গল্প বলার সময় উল্লেখ করেন, এখন যে অর্থে আফগান, সিরিয়ান, কুর্দি, কিংবা ইউক্রেনিয়ান বাস্তুচ্যুত মানুষদের ‘আশ্রয়প্রার্থী’, কিংবা ‘শরণার্থী’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, ১৮ বছর বয়সে তার ইংল্যান্ডে এসে ভিড়বারকালে ওরকম নেতিবাচক অর্থে আশ্রয়প্রার্থী মানুষদের ব্র্যাকেটবন্দি করবার প্রচলন ছিল না। তিনি ও তার ভাই ইংল্যান্ডের ভিসা প্রসেসিং কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ‘টুরিস্ট’ হিসেবে। সেই টুরিস্ট ভিসা পরিণত হয় স্টুডেন্ট ভিসায়। একপর্যায়ে স্থায়ী নাগরিকতাও লাভ করেন। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টে তার পিএইচডি, সেই ইউনিভার্সিটিতেই একপর্যায়ে শিক্ষকতা শুরু করেন উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অব ডিপারচার’-এর শুরু হয় জাঞ্জিবারে তার ফেলে আসা জীবন নিয়ে ডায়রির পাতায় সংকলিত ছোট ছোট স্মৃতিচারণমূলক লেখার মাধ্যমে। চিন্তার সঙ্গে চিন্তা দানাবাঁধে, লেখার আকৃতি কলেবরে আরও বড় হয়ে ওঠে। পরে সে লেখাগুলোকেই ‘ফিকশনালাইজ’ তথা কাল্পনিকতার মোড়কে উপস্থাপন করে পরিণত করেন উপন্যাসে। গুরনাহ এ কথা স্পষ্টভাবে বরাবর বলে এসেছেন যে তিনি কি লিখবেন, এটা নিয়ে কখনোই সংশয়ে ছিলেন না; কিন্তু যা লিখতে চান, তা কীভাবে লিখবেন, বা উপস্থাপন করবেন– এটা নিয়ে দীর্ঘসময় তার কাগজ কলমের সঙ্গে যুঝতে হয়েছে। অন্তর্জালে উপস্থিত তার প্রতিটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিদারুণ গম্ভীর, মেপে মেপে হাসা, গুনে গুনে শব্দ উচ্চারণ করা লোকটি ব্যক্তিজীবনে এত গভীরভাবে স্মৃতিকাতর, তার লেখা না পড়লে সেটা বোঝা মুশকিল। ইংল্যান্ডে বসেও প্রতিনিয়ত তার নাকে ভেসে আসতো তার ছেলেবেলার বাড়ির পাশে প্রবহমান সমুদ্রের নোনাজলের ঘ্রাণ, মাঝিমাল্লা, সারেংদের কলরোল। স্মৃতি, উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যানকারদের তূনের অন্যতম হাতিয়ার।
যদি উত্তর-ঔপনিবেশিক সহিংসতার কারণে লেখককে বাস্তুচ্যুত হতে হয়, তবে তো কথাই নেই। সে কারণেই, সেভাবেই আবদুলরাজাক গুরনাহের লেখায়ও ফিরে আসে তার ফেলে আসা মাতৃভূমির স্মৃতি। কেবল সমাজের উপরিতলে বিদ্যমান সহিংসতা না, গল্প বলার ছলে তিনি ঢুকে যান জাঞ্জিবারের সমাজব্যবস্থার মাইক্রো-ক্রোমজমে, পরিবার ব্যবস্থায়। খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, কেন তাদের জীবন ওখানে অমন ছিল? কেন পরিবার ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্ঠুরতার চর্চা করা হতো? কেন বাবা-মায়েরা এতটা নির্মম ছিলেন তাদের সন্তানদের বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে? একটা সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকাঠামো ঠিক কতটা সহিংস হয়ে উঠতে পারে?
রাজারাজড়াদের নিয়ে তার উপন্যাসে কারবার নেই। তিনি প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো নায়কদের আরও নায়কোচিত করে উপস্থাপন করবার লক্ষ্যে উপন্যাস লেখেননি। খুব স্পষ্ট করেই তিনি বলেন, যেমনটা এই লেখায় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি লেখেন ‘দ্য লিটল পিপল’ তথা সহজ সাধারণ অচ্ছুৎ শ্রেণির মানুষদের ইতিহাস, যাদের বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়ায় বিশ্ব ইতিহাসের কুটোটিও নড়ে না। (মিলান কুন্দেরা যেমন করে তার অবিস্মরণীয় উপন্যাস ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং’– এর একদম প্রথম অধ্যায়ে নিটশের ‘থিওরি অব ইটারনাল রিটার্ন’ উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একপর্যায়ে বলেন– ‘...চতুর্দশ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত দুটো আফ্রিকান রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের চেয়ে বেশি গুরুত্ব নেই তার, যে যুদ্ধে হাজারো, লাখো কালো মানুষ অপরিসীম কষ্টে ছটফট করে মারা গেলেও তাতে পৃথিবীর ইতিহাসের বালটাও ছেড়েনি।’) সেই বামনশ্রেণির মানুষদের তার উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় করেছেন গুরনাহ। তারা আফ্রিকান, আরব আফ্রিকান, তাদের চুল কোঁকড়া, গায়ের রঙ কালো। গুরনাহের প্রয়াস ছিল এইসমস্ত লোকেদের অতীত স্মৃতির ‘ট্রমা’ বা ভীতি থেকে অর্থবহ কিছু উপাদান পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
বৃহৎ পরিসরে তার সে চেষ্টা সফল হয়নি। মোটের ওপর যে দশখানা উপন্যাস তিনি রচনা করেছেন, তার বেশিরভাগই ইংল্যান্ডের বাইরে পৌঁছায়নি কখনও। ব্যবসায়িক সাফল্যের মুখও তারা দেখেনি তেমন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে তার সাহিত্যচর্চার দুনিয়াবি অর্জন বলতে ছিল ‘প্যারাডাইজ’ (১৯৯৪) আর ‘বাই দ্য সি’ (২০০১) - এই দুটো উপন্যাসের বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, আর ডেজার্শন (২০০৫) উপন্যাসটির কমনওয়েলথ রাইটার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রবেশ। ইংরেজি ভাষায় কথাসাহিত্যের চর্চা করলেও তার উপন্যাসে প্রায়ই সোয়াহিলি, আরবি শব্দের ব্যবহার করেন। এই ক্ষেত্রে গুরনাহর বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে চর্চিত এক ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে অভিনব এক অবস্থান রয়েছে। তিনি জোর দেন, যাতে তার মুদ্রিত উপন্যাসে ব্যবহৃত ভিনদেশি শব্দগুলোকে ‘ইটালিসাইজ’ তথা বাঁকিয়ে না লেখা হয়। তার মতে, ছাপাখানার এই অভ্যাসটি হচ্ছে মূলত– ‘মেইক দ্য এলিয়েন সিম এলিয়েন’ তথা ‘অপর’ এর ভাষাকে আরও ‘অপর’, আরও ভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
সব শেষে এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে, প্রায় সারা জীবন অখ্যাত থেকে সত্তর-ঊর্ধ্ব বয়সে ‘হঠাৎ’ নোবেল পেয়ে যাওয়া আবদুলরাজাক গুরনাহ কি নিছক নোবেল কমেটির আরেক খামখেয়ালিপনা? প্রবলভাবে জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের কেউ কেউ (মিলান কুন্দেরা, বা হারুকি মুরাকামি, উদাহরণত)– যাদের প্রভাব বিশ্বব্যাপী পাঠকদের মাঝে প্রবল, তাদের লেখালিখির জগতে এই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে আমাদের মনে এই প্রশ্ন জাগে। এছাড়াও, নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যেও একাংশ আমাদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় তাদের কলোনিয়াল লেগেসির কারণে, (উদাহরণ, পৃথিবীব্যাপী ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের মধ্যে ইয়েটস, ইলিয়ট, বারনার্ড শ, উইলিয়াম ফকনার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, জন স্টেইনবেক, উইলিয়াম গোল্ডিং, স্যামুয়েল বেকেট, গুন্টারগ্রাস, টনি মরিসন, নাইপল, হ্যারল্ড পিন্টার ইত্যাদির লেখা অ্যাকাডেমিকভাবেই পড়া লাগে), বা স্বদেশিয়ানার কারণে (উদাহরণত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), কিংবা কারও সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে উপস্থিত ধর্মীয় (উদাহরণ, ওরহান পামুক যেমন লেখেন সর্বশেষ ইসলামি খেলাফত অটোম্যান বাদশাহদের সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে) বা সাংস্কৃতিক (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে মুখপাত্র বানিয়ে ল্যাটিন সাহিত্যের যে বিস্ফোরণ আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের খুব ঘনিষ্ঠ এক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়) নৈকট্যের কারণে।
বাকি থেকে যায় আবদুলরাজাক গুরনাহের মতো সাহিত্যিক, যার চিন্তাজগতের কেন্দ্রে কাজ করে ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে তার মাতৃভূমি জাঞ্জিবারে ঘটে যাওয়া রক্তাক্ত সহিংসতা, যাতে গুরনাহর মতো জন্মসূত্রে আরব আফ্রিকানদের মধ্যে কয়েক হাজার অধিবাসীকে গুলি করে হত্যা করার পর গণকবর দেওয়ার ভিডিও এখনও ইউটিউবে মজুত। অথবা ২০১৫ সালের নোবেল বিজয়ী স্বেতলানা আলেক্সিভিচ, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া যে লেখিকা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন মূলত সোভিয়েত রাশিয়ায় সংঘটিত চেরেনবিল বিস্ফোরণে আক্রান্ত মানুষদের সাক্ষাৎকার, বিশ্লেষণ সংক্রান্ত পুস্তক রচনার জন্য। কিংবা প্যাট্রিক মোদিয়ানো, ২০১৪ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী যে ফরাসি লেখকের সাহিত্যের মুখ্য উপজীব্য বিষয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইহুদিদের হারানো স্মৃতির প্রত্নতাত্ত্বিক অন্বেষণ ও পুনর্বিন্যাস। আমাদের পঠনপাঠনে, আমাদের জীবনযাপনের ধারায় হয়তো জাঞ্জিবার, চেরেনবিল, কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদিদের প্রাসঙ্গিকতা তেমন একটা নেই। কিন্তু সাহিত্যে নোবেল প্রদানকারী কমেটি, যাদের কাজ হলো বিশ্ব ইতিহাসের বিচিত্রমুখীন আখ্যান রচয়িতাদের রচনার সাহিত্যমান যাচাই এবং তাদের স্ব-স্ব ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের যথার্থ ও সৎ উপস্থাপনের মূল্যায়ন– সেই নোবেল কমিটি যদি খুঁজে খুঁজে কেবল পপ কালচারে বিখ্যাত বিষয়বস্তুর লেখকদেরই পুরস্কৃত করেন, তবে পুরস্কারটি তার আবেদন ও যৌক্তিকতা উভয়ই হারাবে। কাজেই আবদুলরাজাক গুরনাহর যে পাঠক সংকট, তা আমাদের পঠনরুচির সীমাবদ্ধতাকেই দৃশ্যমান করে, তার নোবেল পুরস্কার বিজয়কে মোটেও প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
(লেখায় ব্যবহৃত গুরনাহ সংক্রান্ত তথ্যাবলি মূলত নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারসমূহ ও নোবেল লেকচার থেকে সংগ্রহ করা)।









