X
বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয়: বাংলাদেশের কী লাভ!

আপডেট : ০৪ মে ২০২১, ১৬:১৮

আনিস আলমগীর পশ্চিমবঙ্গে টানা তিনবারের মতো তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হওয়ার পর দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বুধবার, ৫ মে ২০২১। অভূতপূর্ব ফলাফল করেছে তৃণমূল, যেখানে মমতা আবার ক্ষমতায় আসতে পারবেন কিনা সন্দেহ ছিল অনেকের। সবক’টি এক্সিট পোল ভুয়া প্রমাণিত করে ২১৩ আসন নিয়ে তৃণমূল জয়ী হয়েছে। বিজেপির সাবেক সভাপতি অমিত শাহ ২০০ আসনে জেতার ফাঁকা আওয়াজ দিলেও ৭৭ আসন পেয়েছে তারা। মমতা নিজের আসনে পরাজিত হলেও শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ৬ মাসের মধ্যে আরেকটি আসনে সহজে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব চালিয়ে যেতে পারবেন।

মমতা বিজয়ী হওয়াতে তাকে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- দিদি বিজয়ী হওয়ায় এবার কি বাংলাদেশ তিস্তার জল পাবে, নাকি এবারও অভিনন্দন জলে যাবে? স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, পশ্চিমবঙ্গে দিদি জয়ী হলে বাংলাদেশের কী লাভ! আমি ওই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সংক্ষেপে বলতে চাই মমতার জয়ের মূল কারণ কী কী। প্রথমে বলি প্রশান্ত কিশোর এবং তার আইপ্যাক কোম্পানির কথা। প্রশান্ত কিশোর ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া এক ভোট কারিগর। মাঝখানে রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছিলেন বিহারের নীতিশ কুমারের জনতা দলে (ইউনাইটেড) যোগ দিয়ে। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (২০১৯)-এর প্রতি নীতিশ কুমারের সমর্থনের সমালোচনা করায় তাকে ২০২০ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

এই প্রশান্ত কিশোর এবং তার কোম্পানি এবার মমতাকে জেতানোর কাজ নিয়েছিলেন। তাদের সেবা নিয়ে তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে-ও বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয়, পুরো মিডিয়া যখন উল্টো কথা বলছিল তখন প্রশান্ত চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ১০০-এর নিচে না হলে তিনি এই প্রফেশন ছেড়ে দিবেন। অবশ্য জেতার পরও এনডিটিভির সঙ্গে একান্ত আলাপে প্রশান্ত বলেছেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর এই কাজ করবেন না। তবে আইপ্যাক থাকবে এবং সেখানে তার দায়িত্ব পালন করার মতো দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বিজয়ের পরও তিনি নির্বাচন কমিশনের ওপর গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

তার অভিযোগ, কমিশন বিজেপিকে জেতানোর জন্য হেন কোনও কাজ নেই করেনি। বিজেপি যা বলেছে নির্বাচন কমিশন তাই করার ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যে নির্বাচনকে ৮ পর্বে করেছে যাতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা দফায় দফায় পশ্চিমবঙ্গে আসতে পারেন। যেসব জেলায় বিজেপির অবস্থান ভালো সেসব এলাকার নির্বাচন শুরুতে এবং একযোগে করেছে আর তৃণমূলের ঘাঁটিগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক জেলায় ৪/৫ পর্বে নির্বাচন করেছে যাতে তৃণমূল কর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য একযোগে চোখে না পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ৩০ শতাংশ ভোট এবার পুরোটাই তৃণমূল পেয়েছে, সে কারণে বাম এবং কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে এমন তত্ত্বও আছে। বাস্তবে মাইনরিটি ভোট পুরোটাই তৃণমূল তো পেয়েছেই, ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটারদের যারাই বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের সমর্থক ছিল তারাও বিজেপি ঠেকাও প্রশ্নে ‘ভোট নষ্ট’ না করে তৃণমূল প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। ‘হিন্দুরা বিপদে, ৭০ শতাংশ ভোটার তোমরা কেন একজোট হয়ে হিন্দুদের উদ্ধার করছো না’- বিজেপির এই পুরনো ভাঁওতাবাজি এখানে খাটেনি। কারণ, দেখা যাচ্ছে যেসব এলাকায় মুসলমানের সংখ্যা ৫ শতাংশ সেখানেও বিপুল ভোটে তৃণমূল জিতেছে। ভোট হয়েছে বিজেপি বনাম সব দল। সে কারণে অন্য সব দলের অস্তিত্ব নেই ফলাফলে। ভোট হয়েছে মমতা বনাম মোদি নয়, মমতা বনাম শূন্যতা। কারণ, মমতার বিকল্প রাজ্যে কোনও লিডার ছিল না বিজেপির, যাকে মমতার উচ্চতায় সামনে আনতে পারে।

আসলে প্রশান্ত কিশোরের টিম এই নির্বাচনকে বাঙালি বনাম বহিরাগত রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালির যত গৌরবময় অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রনাথ-বিদ্যাসাগর-নেতাজি-সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে যত কৃতী বাঙালি রয়েছে, গত প্রায় দুই বছর ধরে তাদের জীবিত করার চেষ্টা করেছে। হিন্দুত্ববাদী স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’-এর বিপরীতে ‘জয় সীতারাম’ প্রতিষ্ঠিত করেছে। নির্বাচনকালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এনেছে। বিজেপি যখন যোগী আদিত্যনাথদের ডেকে মুসলমানদের ভিটেমাটি, দেশছাড়া করার হুমকি দিয়েছে, প্রশান্ত কিশোরের টিম মমতাকে মুসলমানদের একমাত্র রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। আবার শুভেন্দু অধিকারী নামের মমতার ডান হাত বিজেপিতে গিয়ে তাকে ‘বেগম মমতা’ বলে কটাক্ষ করলে মমতাকে কালীর পূজারিও বানিয়েছে। মমতা হিন্দুত্ব ত্যাগ করেননি প্রমাণ দিতেন, জনসভায় নানা মন্ত্র পড়েছেন।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে যতটাই হিন্দুত্ববাদের জোয়ার আনতে চেয়েছে, হিন্দিভাষী বক্তা এনে জনসভা করেছে, রথযাত্রা করেছে, গেরুয়া রঙে ঢেকে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গকে- সবই তাদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগিয়েছে আইপ্যাক। মমতার প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন বাংলার সঙ্গে সম্পর্কিত নেতা ও ব্যক্তিত্বরা, যেমন জয়া ভাদুড়ী বচ্চন। আর বিজেপির জন্য এসেছেন স্মৃতি ইরানীর মতো হিন্দি সিরিয়ালের এককালের নায়িকা, বর্তমানের বিজেপি নেতা। বিজেপি প্রেসিডেন্ট জগৎ প্রকাশ নাড্ডা, অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথ তো পড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পদের কোনও লোক এর আগে একরাজ্যে এত জনসভা করেনি, নরেন্দ্র মোদি এবার যা করেছেন পশ্চিমবঙ্গে।

সব মিলিয়ে মমতার ভোট পরিকল্পকরা এসবকে বাঙালি বনাম বহিরাগত, বাঙালির সংস্কৃতি ধ্বংসকারী উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে দেখিয়েছে। এমনকি নরেন্দ্র মোদির ‘দিদি..ওওওও দিদিইই’ ব্যঙ্গাত্মক বাক্যকে যৌন হয়রানির হিসেবে তুলে ধরেছে। উদাহরণ এসেছে যোগীর ইউপির নারী নির্যাতন চিত্র। পশ্চিমবঙ্গের নারীদের একজোট করা হয়েছে এবং এরাই ছিল মমতার প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী। তার সরকার নারী, শিশু, কিশোরের জন্য অনেক ভালো কাজ করেছে- তারও প্রতিদান দিয়েছে মহিলারা। সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে এটা বাংলার মানুষের মমতার প্রতি ভালোবাসা নয়, মোদি এবং তার বিজেপির রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ।

অন্যদিকে, একের পর এক নেতারা তৃণমূল ছেড়ে গেছেন। সবাই তাতে তৃণমূল দুর্বল হবে ভেবেছিলেন কিন্তু তাদের দল ত্যাগের আসল কারণ প্রশান্ত কুমারের টিম, যেখানে একান্তভাবে সহায়তা করেছে মমতার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জি। এই টিমের রিপোর্টের ভিত্তিতে যারা জিততে পারবেন না তাদের তালিকা করা হয়েছিল। নমিনেশন পাবেন না এই পূর্বাভাস জেনেই তারা বিজেপিতে ভিড়েছে। আর বিজেপি আগে থেকে যারা ত্যাগী নেতা তাদের বাদ দিয়ে তৃণমূল থেকে আসা ‘বিরাট নেতাদের’ প্রার্থী করেছেন। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিজেপি প্রার্থীদের মধ্যে এরাই সিংহভাগ হেরেছে।

যাই হোক, তিস্তার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তা জেনেও এবার নির্বাচনে মমতা জেতায় বাংলাদেশের কি লাভ সে কথা বলি। তার আগে দেখেন পশ্চিমবাংলা এত প্রয়োজন হয়ে গিয়েছিল কেন বিজেপির জন্য। শুধু কি মমতাকে হারানো। না, কারণ বাংলাদেশকে বিজেপির নেতারা কখনও মনেপ্রাণে মেনে নেয়নি। ভারতের পাশে তারা বাংলাদেশকে ‘আরেকটি পাকিস্তান’ মনে করেন। কারণ, ধর্মের বাইরে সুস্থভাবে কোনও কিছু বিবেচনা করার বোধশক্তি এদের নেই। তাই বাংলাদেশকে বিপন্ন এবং পদে পদে বিপর্যস্ত করতে হলে পশ্চিমবাংলায় তাদের নিজস্ব সরকার দরকার ছিল।

অমিত শাহের কথা আর কী বলবো। সবাই জানেন এই নির্বোধ লোকটি বাংলাদেশিদের কতটা হেয় করে কথা বলেন। পশ্চিমবাংলা বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, রাজ্যটিতে ‘অবৈধভাবে’ বাস করা এক কোটি বাংলাদেশি মুসলিমকে ফেরত পাঠানো হবে। দিলীপ ঘোষ দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী এক কোটি অবৈধ মুসলিম সরকারের দুই রুপির ভর্তুকির চাল খেয়ে বেঁচে আছে, আমরা তাদের ফেরত পাঠাবো বলে মন্তব্য করেছেন। দিলীপ ঘোষ পশ্চিমবাংলার আড়াই কোটি মুসলমানের ১ কোটিকে বাংলাদেশি বানিয়ে ফেরত পাঠানোর খায়েশ প্রকাশ করতেন। কারণ, দিলীপ ভালো জানেন মুসলমান ভোট বিজেপির পক্ষে যাবে না। তিনি এটাও জানেন, পশ্চিম বাংলায় কোনও বাংলাদেশি মুসলমান নেই, থাকলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে যাওয়া হিন্দুরা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক আছে। নানা প্রতিকূলতা আছে সত্য, কিন্তু তারা উল্লেখযোগ্য কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ঘৃণা, বৈষম্যের শিকার নয়। স্বাধীনভাবে তারা ধর্ম পালন করে। এসব তথ্য পশ্চিবঙ্গে যায় না। বরং বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলিকে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয় গুরুত্ব দিয়ে। বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে পশ্চিমা দেশে প্রবাসী বাঙালি হিন্দুদের একটা বড় অংশ এ ধরনের নেগেটিভ ক্যাম্পেইনে জড়িত আছেন। এরা মোদির দলকে বিপুল পরিমাণে ডোনেশনও করে, যাদের ইচ্ছা পশ্চিমবঙ্গ হবে বাঙালি হিন্দুদের তীর্থভূমি। মমতা বিজয়ী হওয়ায় সে পথ রুদ্ধ হয়েছে। বেঁচে গেছে দুই বাংলা। কারণ, ওপারে নিরীহ মুসলমানদের যোগী আদিত্যনাথের অনুসারীরা নির্যাতন করলে এই পারের ধর্মান্ধরাও হিন্দুদের প্রতি নির্যাতন চালাতো। কিংবা এই পারে হিন্দুদের ওপর কোনও নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া পড়তো ওই পারের মুসলমানদের ওপর। অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৪৬-এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আগে থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন রয়েছে সম্প্রীতির বন্ধন, তেমনি ঘৃণাও একেবারে কম না।

আপাতত সেই মুসিবত থেকে রক্ষা পেলো দুই বাংলা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১.
কয়দিন থেকে আমার নিজেকে অশুচি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি বুঝি আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত হয়ে আছি। শুধু আমি নই, এই দেশে আমার মতো অসংখ্য মানুষের একই অনুভূতি, মনে হচ্ছে জাতির একটি বড় একটি অংশ বিষণ্ণতায় ডুবে আছে।

কারণটি নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পারছেন। যে দুর্গাপূজাটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আনন্দোৎসব হওয়ার কথা সেটি এবারে সবচেয়ে বড় তাণ্ডবের কেন্দ্রস্থল। আমি যে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেবো সেটিও করতে পারছি না। কুমিল্লা থেকে শুরু হয়ে এটি শুধু কুমিল্লায় থেমে থাকেনি, বলতে গেলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যার অর্থ সারা দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক মানুষ রয়েছে, তারা লুকিয়ে নেই, তারা প্রকাশ্যে আছে, বুক ফুলিয়ে আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে এই দেশে ৩৬৮৯ বার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পর হামলা হয়েছে। যারা সংখ্যাটি কত ভয়ানক অনুভব করতে পারছেন না তাদের অন্যভাবে বলা সম্ভব, এই দেশে গড়ে প্রতিদিন একবার কিংবা তার বেশি দেশের কোথাও না কোথাও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে! এটি হচ্ছে প্রকাশিত তথ্যের কথা, প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও বেশি। এই দেশটি আমরা যেভাবে গড়ে তুলবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এই দেশের শতকরা দশভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয় তারা কেমন আছেন, তাদের কেউ কী বলবেন ভালো আছেন? একটা দেশ কেমন চলছে সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে সেই দেশের সংখ্যালঘুদের জিজ্ঞেস করা তারা কেমন আছে। তারা যদি বলে ভালো নেই তাহলে বুঝতে হবে দেশটি ভালো নেই।

সেজন্য আসলে আমরাও ভালো নেই। আমি ক’দিন থেকে আমার হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না। তীব্র এক ধরনের লজ্জা এবং অপরাধবোধে ভুগছি। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে এই বিষয়টি নতুন করে সবার সামনে এসেছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এটি প্রথমবার হয়েছে, কিংবা এটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কেউ কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি হঠাৎ করে ফেলেছে। এই ভয়ংকর সাম্প্রদায়িকতা এখানে বহুদিন থেকে শিকড় গেড়েছে, আমরা কেউ কেউ নিজেদের মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করছি, কেউ কেউ এটাকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমরা যে আসলে আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত, কেন আমরা সেই সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করি? কেন ভাণ করি সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে? বিষয়টির একটু গভীরে গেলেই আমরা টের পাই সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে না। যে দুর্গাপূজায় একটি হিন্দু শিশুর আনন্দে আত্মহারা থাকার কথা, কেন সেই দুর্গাপূজায় শিশুটির বুকে ভয়ের কাঁপুনি? আমরা কেন এই শিশুদের বুকে আগলে রক্ষা করতে পারি না?

২.

যখন পূজার সময় আসে, সারা দেশে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন থেকে আমি নিজের ভেতর এক ধরনের চাপা অশান্তি অনুভব করি। অবধারিতভাবে খবর পাই দেশের এখানে সেখানে সেই প্রতিমা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যখন পূজা শুরু হয় তখন আমি নিশ্বাস বন্ধ করে থাকি, যারা শোলাকিয়া ঈদের জামাতেও বোমা মারতে প্রস্তুত তারা পূজার অনুষ্ঠানে না জানি কী করার চেষ্টা করে। যখন সবকিছু শেষ হয় আমি শান্তির নিশ্বাস ফেলি।

আমার মতো অতি সাধারণ একজন নাগরিকের ভেতর যদি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে এক ধরনের চাপা অশান্তি থাকে তাহলে কী এই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সময়টিতে ঘুম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা নয়? দুঃখটা আমার এখানে, আমি জানি তারা চাইলেই একটা তাণ্ডব থামাতে পারে। আজকাল এই দেশের পুলিশ বাহিনী অনেক করিৎকর্মা, আমার হিসাবে এই বিষয়গুলো তারা আমাদের থেকে আরও অনেক ভালো করে জানে। তাই কুমিল্লার অবাস্তব ষড়যন্ত্রটির খবর ভোর সাতটার সময় পাওয়ার পরও বেলা ১১টায় তাণ্ডব শুরু হতে দেওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে যখন আমরা জানতে পেরেছি ভোরবেলা থেকে ওসি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই দেশে আগে অনেকবার এরকম ঘটনা ঘটেছে। কাজেই বিষয়গুলো কীভাবে দানা বাঁধে তা এখন আর কারও জানতে বাকি নেই। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয়ের পর এই দেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে আছে সেটি তো কারও অজানা নয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তানে শুক্রবারে জুমার নামাজে বোমা হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আমাদের দেশেও কোনও একটা ধর্মান্ধ ষড়যন্ত্র দানা বাঁধলেও যে শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার একটা শোডাউন হয় সেটাও তো আমরা বহুকাল থেকে দেখে এসেছি। কমন সেন্সের এতগুলো বিষয় আমরা সবাই জানি কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে না, এবং সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে না, এটা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি? হতদরিদ্র একজন জেলের সহায় সম্পদ সবকিছু পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র যদি নতুন করে তার ঘরবাড়ি তৈরি করেও দেয়, তারপরেও কী তার বুকের ভেতরের যে আতঙ্ক, হতাশা, দুঃখ, কষ্ট এবং অসহায় অভিমানের জন্ম হয়, আমরা কী তার এক বিন্দুও দূর করতে পারবো? এই দেশের নাগরিক হয়ে শুধু নিজের ধর্মের কারণে তাদের একটি অসহায় আতঙ্কে জীবন কাটাতে হবে, সেটি কেমন করে মেনে নেওয়া যায়?

এখানে রাষ্ট্রের অনেক বড় দায়িত্ব, কিন্তু আমরা যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনি তখন এক ধরনের হতাশা অনুভব করি। কিছু একটা ঘটলেই তারা চোখ বন্ধ করে মুহূর্তের মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দোষ চাপিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যান। যদি এর মাঝে সত্যতা থাকেও তাদের এই ঢালাও রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে সেটি তার নিজের দলের মানুষও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষ তখন অনুমান করে নেয় রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনেতারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তরিক নয়, হয়তো তারা এটাকে একটা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখিয়ে তার থেকে কোনও একটা সুবিধা নিতে চান। অথচ মূল কথাটি খুবই সহজ, কেন এটি ঘটেছে তার খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা জেনে কোনও লাভ নেই, ঘটনাটি না ঘটলে অনেক লাভ আছে।

একটা সমস্যা সমাধান করতে হলে সবার আগে মেনে নিতে হয় যে, সমস্যাটা আছে। তারপর সমস্যাটা বুঝতে হয় তাহলে নিজ থেকেই সমস্যা সমাধানের পথ বের হয়ে যায়। আমরা যদি সমস্যাটাই অস্বীকার করি তাহলে সেটা সমাধান করবো কেমন করে? কিছু দুর্বৃত্ত হঠাৎ এটা করে ফেলেছে বললে সমস্যাটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। সেই দুর্বৃত্তরা যে এখানে তাদের কাজকর্মের জন্য একটা অভয়ারণ্য পেয়েছে সেটি তো সবার আগে স্বীকার করে নিতে হবে।

এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর আমাদের দাবি অনেক বেশি। হেফাজতের হুমকি শুনে পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন আমাদের চরমভাবে হতাশ করেছিল, কাজেই দেশের এই সাম্প্রদায়িক রূপটিকে ঠিক করার ব্যাপারে তাদের কতটুকু সদিচ্ছা আছে সেটা নিয়ে আমাদের কারও কারও ভেতরে যদি এক ধরনের দুর্ভাবনা থাকে, কে আমাদের দোষ দিতে পারবে?

৩.

আমি আজন্ম আশাবাদী মানুষ। জীবনের চরম দুঃসময়েও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করেছি এবং দেখেছি একদিন আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কাজেই এবারও আমি আশাবাদী থাকতে চাই, স্বপ্ন দেখতে চাই যে এই দেশটি থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ একদিন শিকড়সহ উৎপাটন করে ফেলা হবে। তবে এটি এমনি এমনি শুধু মুখের কথায় হবে না, তার জন্য কাজ করতে হবে। আমার হিসাবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এটি।

আমি আমার জীবনে যে কয়টি সত্য আবিষ্কার করেছি তার একটি হচ্ছে পৃথিবীর সৌন্দর্য  হচ্ছে বৈচিত্র্যে। একটি দেশে যখন নানা বর্ণের, নানা কালচারের, নানা ধর্মের, নানা ভাষার মানুষ পাশাপাশি থাকে, একে অন্যের সাহচর্যে সুখে দুঃখে বড় হয়, সেটি হচ্ছে সত্যিকারের সৌন্দর্যময় জীবন। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য খুব কম, কাজেই আমাদের জীবনধারায় যেটুকু বৈচিত্র্য আছে সেটাই আমাদের বুক আগলে রক্ষা করতে হবে, আমাদের শিশুদের সেটা শিখাতে হবে। নিজ ধর্মের বিধিবিধান শেখার আগে তাদের অন্য ধর্মের সৌন্দর্যের কথা জানতে হবে, যেন তারা সব ধর্মের জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বড় হয়।

এই দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে উগ্র মানসিকতার নয়, জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই তারা বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। সারা পৃথিবীর ধর্মান্ধতার উত্থানের ঢেউ এখানেও এসেছে এবং কিছু মানুষ সেটি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ফেসবুক নামে ‘মানসিক বর্জ্য ক্লেদ সংরক্ষণ ও বিতরণ’-এর যে পদ্ধতি বের হয়েছে সেটি ব্যবহার করে যেটি আগে কখনও সম্ভব হয়নি এখন সেটিও করে ফেলা যাচ্ছে। যে মানুষটির কথাকে আগে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল না, এখন সেই মানুষটি তার ভয়ানক আপত্তিকর বক্তব্য সবাইকে শোনাতে পারছে, শুধু তা-ই নয়, দ্রুততম সময়ে দুর্বৃত্তদের একত্র করে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এটি অনেক বড় একটি সমস্যা। পৃথিবীর অন্য দেশ কী করবে জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে আমাদের প্রয়োজনে এর একটা সমাধান এখন খুব দরকার। শুধু তা-ই নয়, একসময় যেকোনও সাম্প্রদায়িক সমস্যা হলে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক পথে নেমে আসতো, এখন সবাই ফেসবুকে একটা বক্তব্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলতে চায়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এ দেশের গ্রামে গ্রামে যেটুকু সংস্কৃতির চর্চা ছিল এখন সেটি নেই। বাসায় বাসায় হারমোনিয়ামে শিশুর গলায় গান শোনা যায় না, রাত জেগে কেউ যাত্রা কিংবা পালাগান শুনতে যায় না। মাঝ নদী থেকে মাঝির গলায় ভাটিয়ালি গান শুনি না, স্কুলে স্কুলে কিংবা পাড়ার ছেলেমেয়েরা হ্যাজাক লাইটের আলোতে জরির কাপড় পরে সিরাজদ্দৌলার নাটক করে না। মাঠে রঙিন জার্সি পরে তুমুল উত্তেজনায় ফুটবল খেলা হয় না। নদীতে নৌকা বাইচ হয় না। বাউল হওয়া এখন অনেক সময় অপরাধ, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এক কথায় আমরা আগে যেটুকু বাঙালি ছিলাম এখন আমরা আর সেই বাঙালি নেই। আমাদের সংস্কৃতির জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেই তা দ্রুত পূরণ করতে আসছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী।

কাজেই এখন ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার আমাদের বাঙালি হওয়ার সময় এসেছে। একসময় বাঙালি হয়ে আমরা আমাদের ভাষাটিকে পেয়েছিলাম, তারপর আবার বাঙালি হয়ে দেশটিকে পেয়েছিলাম। এখন আবার বাঙালি হয়ে সেই দেশকে অসাম্প্রদায়িক করার সময় এসেছে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও লেখক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আমাদের আয়শা আপা

আমাদের আয়শা আপা

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৯:১০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মহাশূন্যে প্রথম ছায়াছবির শুটিং শেষ করে রাশিয়ার একটি সিনেমা নির্মাতা দল নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। মহাশূন্যে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী নিয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবনাও এগিয়ে চলছে। বিমান সংস্থাগুলো জানাচ্ছে তারা কত দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে পৌঁছে দিতে পারবে। বিশ্বব্যাপী বড় গণমাধ্যমে এখন এগুলো বড় খবর। মানুষে মানুষে এই যে নৈকট্য স্থাপনের প্রচেষ্টা, উল্লাস, আনন্দ তখন আমরা আমাদের দেশে হিন্দুপাড়া খুঁজছি জ্বালিয়ে দিতে, লুট করতে।  

রাজনৈতিক কারণে সংঘাত আমাদের বহু দিনের চেনা। সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার ইতিহাসও প্রাচীন। কিন্তু এবার হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার সময় যেভাবে ধর্মকেন্দ্রিক অসহিষ্ণুতা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো তার বিচার আইনি পদ্ধতিতে না হলেও ইতিহাস এর বিচার নিশ্চয়ই করবে। কারণ, ইতিহাস কোনোকালেই প্রশ্ন ও বিচারের ঊর্ধ্বে ছিল না।

এটা ঠিক হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়া নয়। সরাসরি হিংসার উল্লাস। একটি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করতে পরিকল্পিত সহিংসতা। বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমরা যত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছি, তত দ্রুতই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি সেই জায়গা দখলে নিচ্ছে। এবং এটা হয়েছে রাজনীতির কারণেই। যাদের আমরা উদারনৈতিক বলে জানতাম সেসব রাজনৈতিক দলও এখন ধর্মাশ্রয়ী হচ্ছে, ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বন্ধু হয়ে উঠছে। রাজনীতির এই তালেবানিকরণ বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা ভাবতে পারছেন না কেউ। তবে বুঝতে পারছে ১৯৭১-এ যে আদর্শ আর স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছিল মানুষ, তা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। উন্নয়নের কথা আমরা দিন রাত বলছি। কিন্তু উন্নয়ন যদি আমাদের লক্ষ্য হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিকাশ যদি আমাদের সাধনা হয়, তাহলে সাম্প্রদায়িকতাকে দূরে সরিয়ে রেখেই এগোতে হবে।

শাসক দল, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে নিজেকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে আওয়ামী লীগকে। সে কেন তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত হতে পারে না, কেন প্রতিরোধ করতে পারে না, কেন তার ভেতরে মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা জায়গা পেয়ে যায়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে নিজেকেই।

টানা ১২ বছর দল ক্ষমতায়, তাহলে মৌলবাদী শক্তির এই বাড়বাড়ন্ত হয় কী করে, সে জিজ্ঞাসার সঙ্গে এটাও জানা দরকার, দলের ন্যারেটিভ কেন আজ তরুণ মনকে প্রভাবিত করতে পারছে না। কথাটা এ কারণে বলা যে কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুরে যে হামলাগুলো হয়েছে তাতে অংশ নেওয়া বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৫। এখন যার বয়স ১৮, ১২ বছর আগে ছিল ৬ বছর, এখন যার বয়স ২৫, ১২ বছর আগে ছিল ১৩ বছর। দল ১২ বছর ধরে ক্ষমতায়, অথচ তারুণ্যের মনোজগৎ দখলে নিলো মৌলবাদী গোষ্ঠী?

কে কোন রাজনীতি করবে সেটা তাদেরই বিষয়, কিন্তু প্রত্যাশা থাকে মানুষের। বাংলাদেশের সমাজ যখন অনিশ্চয়তা এবং হিংসার আবর্তে, তখন রাজনীতির কাছে আশ্রয় চায় আক্রান্তরা। আজ আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। বলতে গেলে নৈরাজ্য নেমে এসেছে গোটা দেশে। পরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের ওপর জুলুম চলছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সব ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লুট করা হয়, তখন অনেক স্থানে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সব জায়গার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আক্রমণকারীরা সশস্ত্র হয়ে এসেছিল। শুধু লাঠি নয়, সূক্ষ্ম ধারালো অস্ত্রও ছিল তাদের সঙ্গে।  

হিন্দুদের ওপর আঘাত নতুন নয়। তবে গত কয়েক বছরে এই হিংসা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই অনেক জায়গায় অসহায় পড়ছেন মৌলবাদীদের দাপটের কাছে। তালিবানি কায়দায় এরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে জ্বালিয়েছে, এবার করলো কুমিল্লা, ফেনী ও রংপুরে। প্রতিবার তাদের সাফল্যে তারা উজ্জীবিত হচ্ছে আর বাকি সবাই নীরব দর্শক হয়ে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে।  

ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে কিন্তু দেখা যায়, স্বাধীন যুক্তিবাদী চিন্তার একটা ধারা বরাবর মুসলমানদের মধ্যে ছিল। যারা লেখাপড়া করেন তারা জানেন, ইসলামি সভ্যতায় যুক্তিবাদী নেতৃত্বের অভাব ছিল না কখনোই। আধুনিককালেও স্যার সৈয়দ আহমেদ, কাজী আব্দুল ওদুদের মতো অনেকে নিজেদের উদারনৈতিক হিসেবেই পরিচিত করেছিলেন। এই যুক্তিবাদীরা শরিয়তকেও অন্ধভাবে অনুসরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। সেই মুক্তমনে এক ভয়াবহ সংকট এসেছে আজ। অন্ধত্ব, পশ্চাৎপদতাকেই পুঁজি করছে সহিংস ধর্ম ব্যবসায়ীরা।

রাজনীতি আমাদের সবটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এবার সবাই চায় সেই হিংসাকে হারানোর রাজনীতি। পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে এমন হয়েছে যে উদার মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবার হামলার শিকার হলেও সমাজে মোল্লাতন্ত্রবিরোধী সুর কমে আসছে। যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বিপরীত যুক্তি নেই এদের, সরাসরি খুন।

এমনটা ছিল না আমাদের চারপাশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগিয়ে না গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। বিভাজিত হতে হতে এমন হয়েছি যে ধর্ম ও রাজনীতি এসবের বাইরে গিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারছি না আমরা। রাজনীতি আমাদের সুস্থ সমাজ গঠনের স্তম্ভ। তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে সমাজ। রাজনীতিকেরা বিভিন্ন দল করেন, আবার সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ান দল-মত বিবেচনা না করেই। কিন্তু সেটা নেই এখন। ব্যক্তি, দল নির্বিশেষে শুভচিন্তার উন্মেষের মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের, সম্প্রীতির বাতাবরণ বজায় রাখার রাজনীতিটা আবার ফিরবে, সেই বিশ্বাস করতে মন চায়। আশা করি আয়নায় মুখ দেখবেন সবাই।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উদ্বেগ ও অবসাদ

উদ্বেগ ও অবসাদ

মূল্য ছ্যাঁকা

মূল্য ছ্যাঁকা

আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

সাম্প্রদায়িক হামলার রাজনৈতিক-সামাজিক অর্থনীতি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৩:৫৩

জোবাইদা নাসরীন বেশ কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলায় চলছে সাম্প্রদায়িক হামলা। প্রাণহানি ঘটেছে। এখন পর্যন্ত এই হামলার সর্বশেষ স্থান ছিল রংপুরের পীরগঞ্জ। প্রতিবছরই পূজার সময় প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা আমাদের অনেকটাই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। এগুলোকে আমরা ‘বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত  ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে বছরের পর বছর সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদকে উসকে দিয়েছি, সেই দায়ভার নিতেই হবে।

বাংলাদেশের গত দশ বছরে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর সূত্রপাতের অভিনব ধরন তৈরি হয়েছে। সেখানে এতদিন ধরে কেন্দ্রে ছিল ‘আজগুবি’ এবং হাওয়া থেকে আসা ফেসবুক স্ট্যাটাস, যার বেশিরভাগই ভুয়া আইডি থেকে দেওয়া; এবার সেখানে জায়গা পেয়েছে মণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। এবার এই সাম্প্রদায়িক হামলার সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে।  এবারই সম্ভবত একসঙ্গে এত জেলায়  সাম্প্রদায়িক হামলা শুরু হয় এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। পাঠক লক্ষ করবেন, প্রতিটি হামলার প্রেক্ষাপট কিন্তু কাছাকাছি। হয় কোনও ফেসবুক স্ট্যাটাস, নয় কোনও ধরনের সাজানো ইস্যু। এই হামলাগুলো যে পরিকল্পিত তা স্পষ্টভাবেই খালি চোখেই বোঝা যায়।

হামলার বিষয়ে আমরা অনেকটাই জেনেছি। তাই হামলা কীভাবে হচ্ছে , কোথায় কোথায় হচ্ছে, কারা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেসব ন্যারেটিভের চেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কারা, কী জন্য এই হামলাগুলো করেন বা করান? এর পছনে কী উদ্দেশ্য থাকে? একই সঙ্গে অনেক এলাকায় এই ধরনের হামলা চালানোর পেছনে আসলে কী ধরনের রাজনীতি কাজ করে সেটি দেখা প্রয়োজন।

প্রায় প্রতি বছরই ঘটে যাওয়া এবং এবারের সিরিজ হামলার কারণ বিশ্লেষণ করে আমরা গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, এই হামলাগুলো ঝোঁকের মাথায় নিছক ঘটে যাওয়া কোনও হামলা নয়। এর পেছনে প্রথমত থাকে  জমি/ভূমি  দখলের রাজনীতি। কারণ, হামলাকারীরাও ‘সাধারণ’ কোনও মানুষ নয়, ধর্মীয় অনুভূতির  মিথ্যা 'ফানুস' উড়িয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে এদের মূল লক্ষ্য থাকে ভূমি দখলের রাজনীতি। অন্যদিকে অনেক কারণের মধ্যে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে সামনের জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক হামলা খুব বেশি নতুন নয়। বরং নির্বাচনি সময়ের আশপাশে এবং নির্বাচনের পরেও সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশের জন্য দগদগে দুঃসহ স্মৃতি। কিন্তু  এই সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ থেমে নেই।

আরও একটি কারণ হিসেবে বর্তমান সময়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, প্রতিবেশী ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক। এই দুটো দেশেই সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরুর সম্পর্কের টানাপড়েন মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা চালায়। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করার কথা গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি। সুতরাং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের সমর্থন এবং অসমর্থন সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। তাই রংপুরের পীরগঞ্জ, নোয়াখালীর চৌমুহনী, কুমিল্লাসহ আরও যেসব জেলায়  এই আক্রমণগুলো হচ্ছে সেক্ষেত্রে এটি ভাবার কোনও কারণ নেই যে এটি কয়েকজন মানুষের সাময়িক ধর্মীয় উত্তেজনার পেছনে যুগ যুগ ধরে গেড়ে থাকা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিসহ আরও অনেক ধরনের  রাজনৈতিক অর্থনীতি জড়িত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতেই পেয়েছি যে এসব ক্ষেত্র রাষ্ট্রের নিশ্চুপতায় হামলাকারীরা প্রশ্রয় পায়। এর পাশাপাশি ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সুকৌশল নড়াচড়াও এই প্রশ্নকে অনেকটা এগিয়ে নেয়। এবারও আমরা দেখতে পেয়েছি হাজার হাজার লোককে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা যে আসলে কোনও কার্যকর মামলা না তা আমরা জানি। তাই প্রতিকারের পথগুলোও বন্ধ।

তবে অন্যবারের চেয়ে এবার প্রতিরোধের স্বরগুলোও ক্ষীণ। সরকারের বিরোধী দলকে দোষারোপের সুরের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধও তেমন জোরালো নয়। এই জায়গাটিই সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হয়ে হাজির হচ্ছে।

কী কী হবে এই মামলার পর? আক্রান্তদের প্রতি হয়তো আরও ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, যে পর্যন্ত তারা ভূমি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়। অনেক সময় সেই হামলাকারীদের কাছেই নামমাত্র মূল্যে জমিটি বিক্রি করে দেন তারা। কারণ, ক্ষমতার ক্রমাগত চাপে এবং তাপে ততদিনে জেনে যায় সেখানে তারা আর থাকতে পারবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত (২০১৬ ) তাঁর কাজে উল্লেখ করেছেন, “আগামী ৩০ বছরে হয়তো বাংলাদেশে কোনও হিন্দু জনসংখ্যা থাকবে না।” অধ্যাপক বারাকাত তাঁর গবেষণায় দেখান,  ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু বাংলাদেশে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। পূর্বের সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর মিল সবচেয়ে বেশি হলো, প্রত্যেকটি হামলার পরপরই সেই এলাকা থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা চলে যায়। কখনও এলাকা ছাড়ে, আবার কখনও বা ছাড়ে দেশ। এমনকি এর আগে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষেত্রে সরকার যখন ঘোষণা করলেন যে যাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের সেই ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ির চেয়ে ‘ভালো’ ঘরবাড়ি তাদের তৈরি করে দেওয়া হবে। তখন তাদের অনেকেই বলেছেন সেই নতুন ঘরবাড়ি তারা চান না। কারণ, এটি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, তাদের যে ভয়ের স্মৃতি তা মুছে দিতে পারবে না। আরও কিছু যদি বিষয় আমরা বিশ্লেষণের উপকরণ হিসেবে আমলে নিই তাহলে দেখতে পাই যে সেখানে প্রত্যেকটি হামলাতেই নারীর প্রতি সহিংসতাও গুরুত্ব পায়। এবং এটি যখন হয় তাহলে আরও ভীত হয়ে পড়ে আক্রান্ত পরিবারগুলো। তখনই তারা দেশ কিংবা সেই এলাকা ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়।

অনেকেই বলেন, হিন্দুরা তো দেশ ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু এটি বলার আগে একবার কী ভেবে দেখেন কেন সংখ্যালঘুরা দেশ ছাড়ে বা ছাড়তে বাধ্য হয়? কারণ, হামলার আগে এলাকায় সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যে সুসম্পর্ক ছিল সেটি আর ফিরে আসে না। নষ্ট হয়ে যায় একে অপরের প্রতি আস্থা বা বিশ্বস্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও। এ কারণে সেই জায়গা কোনোভাবেই তাদের জন্য স্বস্তির এবং নিরাপদ হয়ে ওঠে না। তাই তারা শুধু জীবনের নিরাপত্তার জন্য  চুপি চুপি, আর কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে দেশ ছাড়ে। সকালে ঘুম থেকে হয়তো প্রতিবেশীরা দেখতে পান সেই ঘরে কেউ নেই। আর আমরাই এই দেশটির চিত্র এমন করছি।

ধর্মকে ব্যবহার করেই রাজনীতি করছে বাংলাদেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। তাই তারাও নিশ্চুপ থেকে এই হামলায় রাজনৈতিক আসকারা দেয় এবং এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা আরও প্রসারিত হতে থাকে।

‘তাই ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ কিংবা ‘রাষ্ট্র সবার’ এই ধরনের কথাবার্তা আসলেই শুধু বুলি ‌এবং কতটা ফাঁপা তা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো আমাদের আঙুল উঁচিয়ে দেখায়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘ভুতুড়ে’ অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসের উৎস খুঁজে বেড়ানো, কিংবা গুজব চর্চায় মনোযোগী না হয়ে হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করতে আগ্রহী হোন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, হামলার মূল জায়গা ফেসবুক স্ট্যাটাস কিংবা  গুজব নয়; এটির পেছনে রয়েছে মানুষকে ভূমি ছাড়া করা এবং সেই ভূমি দখলের ভয়াবহ পরিকল্পনা। এর পেছনের রাজনীতি সম্পর্কে বোঝাপড়াটা জরুরি এবং তাই সরকার কী করলো তার আগেই আপনার প্রতিবেশী কিংবা এলাকার কোনও মানুষ যেন এই ধরনের হামলার শিকার না হয়, সেই বিষয়ে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করার জন্য নিজেদের প্রস্তুতিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

পাপের বোঝা হালকা হলো কি?

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৮:৩১

ধ্রুব নীল কুকুরের একটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য আছে। গাড়ি দেখলেই তাড়া করে। গাড়িটা থামলে বা সেটাকে যদি ধরেও ফেলে, তারপর যে কী করবে, সেটা ওই কুকুর জানে না। তবু সে উদভ্রান্তের মতো তাড়া করে। ইংরেজিতে যাকে বলে ন্যাচারাল ইনস্টিংক্ট। কুকুরের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাচ্ছি না। স্রেফ উদাহরণ দেওয়ার খাতিরে বলা। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতার কারণে প্রাণীটি এ কাজ করে। অন্য কোনও কারণে নয়।

প্রাণী হিসেবে মানুষেরও ন্যাচারাল ইনস্টিংক্ট ওরফে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য আছে। মানুষ শুধু কিছু করেই সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, একটা কিছু ঘটিয়ে দিতে চায়। বিজ্ঞানীরা চান নতুন কিছু বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে, লেখক চান এমন গল্প লিখে হইচই ফেলে দিতে, সিনেমার পরিচালক মনে মনে ভাবেন, এবার অস্কারে ডাক না দিয়ে যাবে কই। তো, এমন কিছু মানুষ আছে, যারা ‘গাড়ি’ দেখলেই ছোটে। গাড়ির পেছনের বাম্পারে ঝুলে পড়লে কী হবে জানে না তারা। অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে আহত হওয়ার ভয় আছে, সেটা জেনেও ছোটে। তারা ওই ‘একটা কিছু করার’ মোহে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারায়। তাদের দরকার একটা কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার। শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, এরপর যে চেইন রিয়েকশন শুরু হবে এটা তারা জানে। একান ওকান হতে হতে তারা তখন গল্প বলে ‘রানি কাক প্রসব করেছেন’। তারপর আনন্দের সাগরে হাবুডুবু খায়। ‘আমি কী ঘটিয়ে দিলাম!’ ভাবতে ভাবতেই দিন কাটে রাত কাটে। খবরে খবরে তার কীর্তি। আনন্দের চোটে জিভ দিয়ে চুইয়ে পড়ে ডোপামিন হরমোন। মগজের কোণায় কোণায় বিকৃত খেলা দেখার আনন্দ। সে এটা বোঝে না যে, এসব খেলা একটা অসুখ—‘ভাইরাল’ ফিভার। আর ভাইরাল শব্দটা যে ভাইরাস থেকে এসেছে, এটা কি তারা জানে না?

যাদের কথা বলছিলাম, সেই ‘ভাইরাল’ জ্বরে অসুস্থ মানুষগুলো কোনও কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করে না। পুলিশ, প্রশাসন সবাই চায় সব সময় পরিস্থিতি নিয়্ন্ত্রণে রাখতে। ব্যাপারটি ওদের পছন্দ নয়। নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে যত বড় ঘটনাই হোক, তাতে একশ্রেণির মানুষ ওই থ্রিলটুকু বোধ করে না। তারা চায় একটা কিছু ঘটিয়ে সেই নিয়ন্ত্রণের খুঁটি নড়বড়ে করে দিতে। দমকল বাহিনীর ছোটাছুটি, লাঠি হাতে হই হই করা কিছু তাগড়া জোয়ানের হুংকার, মাইকে মাইকে রক্ত টগবগ করা ভাষণ—  আড়াল থেকে এসব দেখা ওই সব খেলুড়েদের কাছে বিশাল এক বিনোদন বটে।

তারা এও জানে, এখনকার ফেসবুক-যুগে ‘সামান্য’ কিংবা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে কিছু নেই। যে কারণে কুমিল্লার গাছে কাক বসলে রংপুরে তাল পড়ে।

এরা তবে কারা? বেকার লোকজন? চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া বখাটে যুবক? অনবরত হুংকার দিয়ে কথা বলা কোনও বক্তা? নাহ, এভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যাবে না ওদের। ওরা সবখানেই আছে। এরা হলো তারা, যাদের কাছে মানুষের সংজ্ঞা হলো ‘হিউম্যান ইজ আ স্যোশাল অ্যানিমেল।’ তারা একতাবদ্ধ, সামাজিকও বটে। কিন্তু অ্যানিমেল ক্যাটাগরি থেকে বের হতে পারেনি।

অনেকেই এখন বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, অধ্যায় ও লাইন নম্বর টুকে বলছেন, ইসলামে এভাবে বিধর্মীদের ঘর পোড়াতে বলা হয়নি কিংবা ইসলামে সহনশীলতার এই এই উদাহরণ দেওয়া আছে। এটা কি আদৌ জরুরি? কোনও ধর্মেই তো এমন জ্বালাও পোড়াওকে বৈধতা দেওয়ার কথা নেই। ধর্ম মানেই তো সহনশীলতা, শান্তি। যে কারণে অন্তত আমার মনে হয় ‘রেফারেন্স’ টানার চর্চাটা বন্ধ করতে হবে। যারাই দাঙ্গা-হাঙ্গামার সমর্থনে কথা বলবে, তাদের চিনে রাখতে হবে। তার সঙ্গে জেনে বুঝে বাতচিৎ করতে হবে। তাকে চটানো চলবে না। তাকে হাসিমুখে বলতে হবে যে ভাই আপনার নাতনির আকিকার মিষ্টিটা কিন্তু জয়গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে আনা হয়েছে। মানসিক বিকলাঙ্গকে তো আর ধরেবেঁধে রিমান্ডে নিয়ে ‘মানুষ’ বানানো যাবে না। তাতে বিদ্বেষের দুষ্ট চক্রটাই বাড়বে।

আরও একটা বিষয় এখানে কাজ করতে পারে— পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু ঘটলে (ধরুন চালের দাম ১৫০ বা ব্রয়লারের দাম ৩০০ টাকা হলো) তাতে আমরা সাধারণত প্যানিকড হই না। আমরা মানে সাতে-পাঁচে-চারে না থাকা জনগণ এসবে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এসব ঘটনায় কোটি কোটি টাকা লুটপাট বা অগণিত মানুষের একবেলা খাবার অনিশ্চিত হলেও একজোট হয়ে জ্বালাও-পোড়াওয়ের প্রশ্নই আসে না। কেননা, এসব ঘটনায় বিশেষ সেই ‘ভাইরাল’ মজাটা নেই। পরিস্থিতি যখন পরিকল্পনার বাইরে যায়, তখনই খেলাটা জমে। আর খেলা মানে তো মগজের রসদ। সুতরাং এই যে জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়েছে এর উদ্দেশ্য মূলত একটাই, ভিন্ন কিছু খেলা চাই। নিরানন্দ ইস্যুবিহীন দিন যে ওই খেলুড়েদের কাটতেই চায় না। তারা মানুষকে দাবার ঘুঁটি বানায়। দুর্বল বিবেকসম্পন্ন ওই স্যোশিওপ্যাথদের ধর্মীয় ট্যাগ দেওয়াটাই বোকামি।

এ কারণে আমাদের আগেই বুঝে নিতে হবে, যে হিন্দুদের বাড়ি পোড়ায় সে কোন ধর্মের? উত্তর পেতে খানিকটা ফ্রয়েডীয় রিপ্রেশেন তত্ত্ব কপচানো জরুরি। ওই তত্ত্বমতে, আমরা আমাদের ভেতর যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা, স্মৃতি বা কোনও পাপের অনুভূতি ধরে রাখতে চাই না। তখন আমাদের অবচেতন মন সেই ঘটনা বা অনুভূতিটাকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ কাজটা অবচেতন মনও করে, আবার আমরা নিজেরাও করি। আগুন, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, খুন—এসব ঘটনায় দেশের বেশিরভাগ মানুষ জড়িত না হলেও একটা বড় অংশ কিন্তু সেই বিকৃত খেলার অতি-নীরব দর্শক সেজে বসে আছে। তাদের ভেতর কাজ করে সেই রিপ্রেশন। নিজের ভেতর পাপের বোঝা এত বেশি যে তাদের অবচেতন মন বলছে, কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হলেও বোঝাটা হালকা করি। প্রতিমা, ঘর, মন্দির যারা পোড়ালেন, যদি ধর্মের দোহাই দিয়েই পোড়ান, তবে তাদের কাছে প্রশ্ন— পাপের বোঝা হালকা হলো, নাকি বাড়লো?

পরিশেষে ব্যাটম্যান সিরিজের ‘ডার্ক নাইট’ সিনেমার শেষের দিককার একটি দৃশ্যের প্রসঙ্গে টানা যাক। দুটো জাহাজ। একটিতে সাধারণ লোকজন, আরেকটিতে আছে সাজাপ্রাপ্ত একদল কয়েদি। দুটো জাহাজেই রিমোট কন্ট্রোলারচালিত বোমা রাখা আছে। একটি জাহাজের বোমার কন্ট্রোলার রাখা আছে আরেকটি জাহাজের লোকজনের হাতে। সময় দেওয়া হলো রাত ১২টা। এরমধ্যে কয়েদিরা যদি বাটনে চাপ দেয় তো সাধারণ লোকজন মারা যাবে, আর সাধারণ মানুষরা যদি বাটনে চাপ দেয় তো কয়েদিরা মারা যাবে। শেষতক ১২টা বেজে গেলেও কেউ বাটনে চাপ দেয়নি। দুটো জাহাজই ছিল অক্ষত। হারলো ভিলেন, জিতলো মানবতা।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আফগানিস্তানে একটি বাতি বদলাতে ক’জন লাগবে?

আফগানিস্তানে একটি বাতি বদলাতে ক’জন লাগবে?

তোতাকাহিনি

তোতাকাহিনি

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৪

আনিস আলমগীর সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান বা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা খুব বলা হচ্ছে। এই নিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে। তিনি চান বঙ্গবন্ধু সরকার প্রণীত ওই সংবিধানে ফিরে যেতে এবং প্রয়োজনে সংসদে প্রস্তাব আনতে। তবে এটি তার নিজের ইচ্ছায় নাকি দলীয় সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে তার বক্তব্য পরিষ্কার নয় বা তিনি কায়দা করে এটি এড়িয়ে গেছেন।

বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং পরিকল্পনা কতটা আছে সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। বাহাত্তরের সংবিধানের সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা।

ভারত উপমহাদেশ থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দেখতে দেখতে এই অঞ্চলের মানুষ বড় হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিল, যেটি হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। বাঙালি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সবাই এক হয়ে দেশ গড়বে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এই স্বাধীন বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কখনও থেমে থাকেনি।

গত ১৩ অক্টোবর ২০২১ কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর ওই ঘটনার জের ধরে ঢাকা, কুমিল্লা, ফেনী, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এমন দেশটি কারও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। বাহাত্তরের চেতনার সঙ্গে তা যায় না। পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৩ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, স্থাপনা ও বাড়িঘরে হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে ৭১টি মামলা হয়েছে এবং ১৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত এসব মামলায় ৪৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুসলিম মৌলবাদীরাই এসব করেছে তাতে সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সন্তোষজনক না হলেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের নানা শ্রেণির ব্যক্তিরা এসব কলঙ্কজনক ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। ওদিকে, ঘোলা পানিতে মাছ ধরায় ব্যস্ত ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীরা।

বিবিসি বাংলা রিপোর্ট করেছে, ‘কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়া এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মন্দিরে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে ভারতের সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষার দাবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম পোস্ট এবং কমেন্ট করা হচ্ছে। ভারতের সামাজিক মাধ্যমে শুধু যে বাংলা ভাষাভাষীরা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তা নয়। অনেক পোস্ট দেখা যাচ্ছে হিন্দি এবং ইংরেজিতে লেখা। বেশিরভাগ মানুষের পোস্ট বা টুইট দেখে বোঝাই যাচ্ছে তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিকল্পনা মাফিক পোস্ট করছেন। বিশেষত যেগুলো হিন্দি বা ইংরেজিতে লেখা সেখানে সরাসরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হচ্ছে।’

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়েছে। আবার এই নির্যাতনকে কেন্দ্র করে ভারতেও বাড়ছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যা এবং ২০২০ সালে দিল্লি গণহত্যায় মুসলমানদের প্রাণ দিতে হয়েছে হিন্দু জঙ্গিদের হাতে, যদিও এগুলোকে দাঙ্গা বলা হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশকে উদাহরণ দিয়ে ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীরা এসব বেশি প্রচার করছে তাদের হত্যা নির্যাতন জায়েজ করতে। এমনকি এই ঘটনাকে ক্যাশ করে আসন্ন উপনির্বাচনে জিতবে সেটাও প্রকাশ্যে বলছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির মৌলবাদী নেতৃত্ব।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে তা ধর্মীয় আবরণে ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিস আর ভারতে বিজেপি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভোটের বাজারে বক্তৃতা দিচ্ছে, যেন সংখ্যালঘুরা ভিন দেশি নাগরিক। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মর্যাদা দিতেও আপত্তি বিজেপি সরকারের। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের ভিন দেশি নাগরিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু সেটা মগজে মৌলবাদ, হিংসা লালন করা ব্যক্তি বিশেষের কাজ, রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নয়।

সম্ভবত এসব কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেছেন। ১৩ অক্টোবর হিন্দু নেতাদের পূজার শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় দেওয়া বিবৃতিতে তিনি যেভাবে সরাসরি ভারতের প্রসঙ্গ টেনেছেন, তার নজির বিরল। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকেও সচেতন হতে হবে। ‘সেখানেও (ভারতে) এমন কিছু যেন না করা হয় যার প্রভাব আমাদের দেশে এসে পড়ে, আর আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত আসে।’

বাংলাদেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর কোনও বিষয় নিয়ে আপত্তি-অস্বস্তির কথা বলার নজির বিরল, যদিও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রশ্নে পান থেকে চুন খসলে ভারতের তরফ থেকে প্রকাশ্যে নসিহত করা হয়। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে আগে ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীর প্রসঙ্গ টেনে তাদের উইপোকার সঙ্গে তুলনা করলেও সরকারের তরফ থেকে অন্তত প্রকাশ্যে তা নিয়ে ভারতের কাছে কোনও প্রতিবাদ জানানো হয়নি।

যাহোক, অসাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি বাহাত্তরের সংবিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র। আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার এমনভাবে খুলে দিয়েছি যে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র বাজারকে এতটা নিয়ন্ত্রণহীন করে দেওয়া ঠিক না।

একটি রাস্তায় যদি ট্রাক-বাস-গাড়ি-রিকশা যে যেভাবে পারে চলে তাহলে সেখানে চলাচল অসম্ভব। সেই কারণে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ট্রাফিক পুলিশকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া আছে। এই তদারকি ছাড়া রাস্তায় যেমন যান চলাচল সম্ভব না, তেমনি ব্যবসার ওপর রাষ্ট্রের তদারকি না থাকলে বাণিজ্য বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না। বাজারের ওপর যে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই সেটা তো নিত্যপণ্যের বাজারে গেলেই দেখা যাচ্ছে।

ইভ্যালির মতো ভুঁইফোড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়ার মধ্যেও তা প্রমাণিত। ডেসটিনি, যুবকের মতো প্রতিষ্ঠান একের পর এক জনগণের টাকা মেরে দিচ্ছে। রাষ্ট্র দেখে যাচ্ছে শুধু।

মাহবুবুল কবীর মিলন নামে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব ইভ্যালির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন প্রকাশ্যে, কিন্তু রাষ্ট্র তার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা সম্পর্কে প্রতিদিন সরকারকে সতর্ক করেছেন, সেখানেও রাষ্ট্র কোনও মাথা ঘামায়নি। তাতে মনে হচ্ছে সরকারের মধ্যে এই ভীতি কাজ করছে যে ব্যবসায়ীরা ক্ষেপে গেলে তাদের বিপদ হতে পারে। সরকার ব্যাংক লোন আদায় করতে পারছে না তাদের কাছ থেকে।

বাহাত্তরের সংবিধানে আমরা যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখি যে সেখানে ব্যবসায়ীদের এই লুটেরার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্যবসায়ীদের সম্মানজনক পরিচয়ও ছিল না। সোসাইটি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে সম্মান করতো, সমাজে ব্যবসায়ী নয়, পেশাজীবীদের সম্মান ছিল। বঙ্গবন্ধু তার কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একজন বিজ্ঞানীকে পছন্দ করেছিলেন। আজকের দিনে বিয়ের বাজারে বিজ্ঞানীর দাম ব্যবসায়ী থেকে বেশি নয় বলেই তো এখন আর বিজ্ঞান পড়ার শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।

বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রকে ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা ইউরোপে এখনও বিরাজমান। সেই সামাজিক আদর্শ ধারণ করলে সমাজে আজ এই বৈষম্য সৃষ্টি হতো না। গরিব আর ধনীর মাঝখানের ব্যবধান এত বেশি দেখা যেত না। মধ্যবিত্ত নিষ্পেষিত হতো না।

জাতীয় সংসদ চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। সচিবালয়ও ব্যবসায়ীদের হাতে। ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেই বলছেন তিনি কী ব্যবসায়ী না মন্ত্রী মাঝে মাঝে সেটা ভুলে যান। ‘ক্ল্যাস অব ইন্টারেস্ট’ দেখা হচ্ছে না মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে। আগে একজন ব্যবসায়ী একজন উপ-সচিবের রুমে ঢুকতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকতেন। এখন সেই ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী-মন্ত্রীর বন্ধু বলে উপ-সচিবকে মন্ত্রী তার রুমে ডেকে ব্যবসায়ী বন্ধুকে দেখিয়ে বলেন, উনার কী সমস্যা ওই সোফায় বসে ঝামেলা শেষ করে ফেলেন।

বিচার ব্যবস্থা আজ এত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাহাত্তরের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে আইন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার কোনোটারই প্রতিফলন নেই। বিচারপতি নিয়োগের কোনও যোগ্যতার মাপকাঠি লিপিবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হতে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা নেই।

এমনকি সংস্কৃতির জগতেও এই ব্যবসায়ীরা প্রভাব ফেলেছে।

শেষ করার আগে বলতে চাই, ‘৭২-এর মূল সংবিধান এত কাটাছেঁড়া করার পর হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ওই সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা একটা রাজনৈতিক বুলি মাত্র। কিন্তু আমরা যেটি করতে পারি সেটা হচ্ছে, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, সকল প্রকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আমাদের ফেরত যাওয়ার অফুরান সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই আদর্শ, লক্ষ্যকে ফিরিয়ে আনতে পারি। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

জাতীয় পার্টির সম্প্রীতি সমাবেশ শুক্রবার

জাতীয় পার্টির সম্প্রীতি সমাবেশ শুক্রবার

যুক্তরাষ্ট্রে করোনার বুস্টার ডোজের অনুমোদন

যুক্তরাষ্ট্রে করোনার বুস্টার ডোজের অনুমোদন

সরকারও চায় দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক: ওবায়দুল কাদের

সরকারও চায় দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক: ওবায়দুল কাদের

পিএনজির বিপক্ষে হারের ইতিহাসও আছে বাংলাদেশের!

পিএনজির বিপক্ষে হারের ইতিহাসও আছে বাংলাদেশের!

সামিয়া রহমানের গবেষণা জালিয়াতি সংক্রান্ত সব নথি হাইকোর্টে

সামিয়া রহমানের গবেষণা জালিয়াতি সংক্রান্ত সব নথি হাইকোর্টে

ভ্যানভর্তি সরকারি চাল রেখে ইউপি সদস্যের দৌড়

ভ্যানভর্তি সরকারি চাল রেখে ইউপি সদস্যের দৌড়

বদরুন্নেসার সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

বদরুন্নেসার সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

শাহরুখ খানের বাসায় তল্লাশি

শাহরুখ খানের বাসায় তল্লাশি

‘ডিজিটাল ডিভাইস হবে সবচেয়ে বড় রফতানি পণ্য’

‘ডিজিটাল ডিভাইস হবে সবচেয়ে বড় রফতানি পণ্য’

ছেলেকে দেখতে কারাগারে শাহরুখ

ছেলেকে দেখতে কারাগারে শাহরুখ

অতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: উ. কোরিয়া

অতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: উ. কোরিয়া

মুগদা হাসপাতালের আগুন নিয়ন্ত্রণে

মুগদা হাসপাতালের আগুন নিয়ন্ত্রণে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune