X
সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: টুকলিফাই ঈদ ও ট্রেন্ডি মৃত্যু আতঙ্ক

আপডেট : ১৬ মে ২০২১, ১৮:৫৩

মাকসুদুল হক ভয় মৃত্যুকে প্রতিরোধ করে না। ভয় জীবনকে প্রতিরোধ করে। - গৌতম বুদ্ধ

মহামারির ঈদের দিনটা সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর মতোই কেটে গেলো। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও ভক্তকুলের হাজারো ঈদের শুভেচ্ছা এলো মেসেঞ্জার, ইমেইল কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের কল্যাণে। খুবই ভালো কথা, তবে ঈদ নিয়ে সবাই এতই ব্যস্ত যে দুই কলম ‘ঈদ মোবারক’ লেখার সময় মনে হলো অনেকেরই নেই– তাই ‘ডিজিটাল গ্রিটিং কার্ড’ একমাত্র ভরসা। যে সময়টুকু  ‘ঈদ মোবারক’ লিখতে লাগে তা ‘নষ্ট’ না করে ১০টা ডিজিটাল কার্ড ‘ফরওয়ার্ড’ করে পাঠানো সম্ভব এবং তাতেই ল্যাঠা চুকে যায়- এ হলো ‘ট্রেন্ডি’ মানসিকতা। একই নকশার গ্রিটিং কার্ড অন্তত কয়েকশ’ পেয়েছি - অর্থাৎ যে কার্ডটি নিজে পেয়েছি সেটাই অন্যদের পাঠিয়ে দিচ্ছি... ডিজিটাল যুগে এটাই ‘ঈদের আনন্দ বিলিয়ে দেওয়া’... বাহ!

এক স্বনামধন্য গায়িকা অনুরূপ এক কার্ড আমার ওয়ালে সেঁটে দিলেন। অবাক হয়ে দেখলাম সেটা এক ব্যাংক-এর কার্ড ও প্রেরকের নামও সেখানে ছাপা– শিল্পীর নয়। কৌতূহলবশত প্রশ্ন করলাম ‘কার্ড কি তুমি আমাকে পাঠিয়েছ নাকি এই অপরিচিত ব্যাংকার?’ সম্ভবত বিব্রত হয়ে পোস্টটা ডিলিট করে ফেললেন! যাক... কিছু মানুষের লজ্জা-শরম এখনও আছে দেখে প্রীত হলাম।

এই ডিজিটাল যুগে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় খুব ‘স্মার্ট’ হলেও একেবারে নিখাদ টাটকা না- কেমন জানি বাসি-বাসি ঠেকে। নতুনত্বের প্রয়াস বা তার চর্চা আদতে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে উধাও হয়ে গেছে। তার বদলে এসেছে ‘কপি পেস্ট’ বা ‘ফরওয়ার্ড’ করার আধুনিকতা নামের চৌর্যবৃত্তি। ‘টুকলিফাই’ শব্দটা আগামীতে বাংলা অভিধানে নিজের যথাযোগ্য ‘সম্মানের স্থান’ করে নেবে, তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

তবে একটা দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। এই ডিজিটাল ‘অনলাইন’ শিক্ষার যুগে টুকলিফাই সংস্কৃতি যদি ‘ভাইরাল’ হয়ে যায় (বা ইতোমধ্যে হয়ে থাকলে) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কি দুরবস্থা হবে তা চিন্তা করার কি সময় এসেছে? আমরা যেখানে এতটাই ব্যস্ত যে ‘ঈদ মোবারক’ লেখার সময় পাই না–আমাদের সন্তানাদিদের পড়ালেখার কি অবস্থা তা খোঁজ-খবর রাখছি তো?

এসব কার্যক্রম আন্তরিকতা-বহির্ভূত তা কেবল নয়, ডিজিটাল শুভেচ্ছা আমাকে আনন্দ দেয় নাকি বিরক্ত করে সেটাই বোঝা দায়। ঈদ যদি ‘আনন্দের’ দিন হয়ে থাকে তাহলে আনন্দে থাকার অধিকার সকল মানুষের মতো আমারও আছে। আমি এতটুকু জানি যে আমি কম জানি- এতটুকু বুঝি যে আমি কিছুই বুঝি না- কিন্তু এই ঈদের সকালটা হাজারো দুঃখ-কষ্টে অতিবাহিত করোনাকালে আমাকে মিশ্র অনুভূতিতে ঠেলে দেয়- তা মোটেও ভালো লাগেনি। হয়তো ‘কোমল মনের’ শিল্পী বলে আমি একটু বেশি ‘সেনসিটিভ’? হতে পারে...।

কিন্তু এমনও হতে পারে আমি একটু ‘সেকেলে’ টাইপের পাবলিক এবং সেদিনগুলোর কথা ভেবে ধন্য হই যখন শত শত ঈদকার্ড ডাকপিয়ন এসে বাসায় বিলি করে দিয়ে যেতো। অংকন শিল্পীদের জন্য ঈদ ছিল ব্যস্ততম সময়। অনেক কার্ড বাচ্চাদের হাতে আঁকা হতো এবং একেকজন প্রেরকের আন্তরিকতা, ভালোবাসাসহ রুচির স্বাক্ষর বহন করতো। অনেক কার্ডে গোলাপ ফুলের পাপড়ি এমনকি সুন্দর আতর বা পারফিউমের সুগন্ধও যুক্ত থাকতো। আর প্রিয়জনের গোছানো সুন্দর হাতের লেখা? সে যে কি মিস করি তা আর বলার নেই। কী আর বলবো, নিজের হাতের লেখাই বা কেমন তা মাঝেমধ্যে কোথাও স্বাক্ষর দিলেই কেবল টের পাই।

নাহ বাদ দেই এসব ‘পুরনো জামানার’ বোরিং নস্টালজিক কথা...।

সমগ্র রমজান মাসটা ছিল ‘ঘটনাবহুল’। তবে কমবেশি প্রত্যেকটা ঘটনার সঙ্গে ছিল রমরমা, রগরগে যৌন উত্তেজক কনটেন্ট। ইসলামের তথাকথিত ‘হেফাজতকারী’ এক কুলাঙ্গার হুজুর ও তার ‘মানবিক স্ত্রীর’ গল্প, তার ‘হালাল স্ত্রী’কে ‘সীমিত পরিসরে’ মিথ্যা কথা বলার ইসলামি ‘অধিকার’ ছাড়াও ধনাঢ্য বসুন্ধরা গ্রুপের এক পরিচালকের গার্লফ্রেন্ডের আত্মহত্যা (নাকি হত্যা?)।

টাকা ও ক্ষমতার জোরে বাংলাদেশে এখনও অনেকেই পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের ঊর্ধ্বে- এই অপ্রিয় সত্যটা আবার জাতির বিবেকে দিলো সজোরে ধাক্কা। তবে ব্যালেন্সে যা তীব্র হয়ে উঠলো তা মিডিয়ার দুর্নীতি। এ একটা জায়গায় আমাদের ‘শকুনের’ মতো চোখ রাখতে হবে।

জনগণের প্রাপ্তি ছিল এসব নিয়ে যে কী পরিমাণের অশ্লীল, ইরোটিক ও পর্নোগ্রাফিক কথাবার্তা সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়াতে পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে জাতিগতভাবে আমাদের রুচি ও চিন্তাচেতনা কত নিম্নমুখী তার একটা সূক্ষ্ম মাপ পাওয়া গেলো। ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’ শব্দযুগল আজ কেবল ‘আনফেশনেবল’ হয়নি- তা এখন প্রাচীন ও বিলুপ্ত।

উল্টোভাবে চিন্তা করলে এমন অনেকেই মনে করতে পারেন যে আমাদের সমাজ কতটা ‘আধুনিক’ হচ্ছে তারই এসব প্রতিচ্ছবি। তা হতেই পারে তবে অধুনা বিশ্ব- যার সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত সীমিত জ্ঞান এহেন পাবলিক আচরণকে ‘পার্ভার্শন’ বা যৌন বিকৃতি ছাড়া অন্য কিছুই মনে করা হয় না।

এতকিছুর ভেতরে আমাদের তথাকথিত ‘ইসলাম পাসন্ড’ জনগণ কেন জানি ভুলে গিয়েছিল এটা ‘পবিত্র’ রমজান বা সিয়াম সাধনা, আত্মসংযম চর্চার মাস। মোদ্দা কথা নোংরা চিন্তা করবো না, নোংরা কথা বলবো না, নোংরা কিছুই দেখবো না- এটাই ইসলামের বিধান।

এক মাস রোজা রেখে যে ভাষায় আমরা কথা বলেছি, ট্রলিং করে যে হাসি-তামাশা করেছি, যেসব ছবি কেবল দেখিনি- তা হাজার হাজার বার শেয়ার করেছি তা সবই যে ইসলাম পরিপন্থী ও গুনাহ বা ‘মহাপাপ’- এসব কিছুরই আমরা ধার ধরিনি। বছরের বাকি ১১ মাস আমরা কি করবো তা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমরা কেবল ঝাঁপিয়ে পড়েছি দু-চারটা অশ্লীল কথা ও অভিব্যক্তি মানুষকে জানান দিতে। কারণ, এটাই সময়ের ‘ট্রেন্ড’ বা প্রবণতা ও এ কাজ করাটাই ‘ট্রেন্ডি’? চলন্ত বাস কোনোভাবেই মিস করা যাবে না।

আরেক ‘ট্রেন্ড’ মহামারি শুরু হওয়ার আগ থেকেই খেয়াল করেছেন হয়তো। তা হলো– মানুষের ‘অতি ধার্মিক’ হয়ে যাওয়া। ধর্মচর্চা নিয়ে কোনও আপত্তি কোনও সুস্থ লোকের থাকার কথা না। মানুষ বিপদে পড়লে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করাটাই স্বাভাবিক। তবে এও খেয়াল করবেন মৃত্যু আতঙ্ক চড়ানোও এখন একটা নতুন ‘ট্রেন্ডি’ ব্যাপার-স্যাপার।

প্রতিদিন কেউ না কেউ স্ট্যাটাস দেবে ‘মরে যাচ্ছি, মরে যাচ্ছি’ আর্তনাদ করে- সাথে থাকবে কোথা থেকে টুকলিফাই করা কঠিন সব আরবি শব্দ, যার বাংলা অর্থ কেউ বুঝে না- এমনকি যারা লিখেছেন- তারাও না! একজনকে প্রশ্ন করলাম- ‘ভাই এই কথা বাংলায় লিখলে কি সৃষ্টিকর্তা বুঝবেন না’? উত্তর যেটা পেলাম তার সারসংক্ষেপ হলো- ‘পাক্কা মুসলিম’ হতে হলে আরবি ভাষা বাঞ্ছনীয়। তাই? কী আশ্চর্য!

সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত না, তা পবিত্র ও গোপনীয়। সেই নিরিখে ইসলামের পরিষ্কার বিধান- জন্ম, মৃত্যু আর আহার সৃষ্টিকর্তা নিয়ন্ত্রণ করেন- মানুষ না। এই তিনটি বিষয় মনের ওপরে শক্ত ভিত করেই আমাদের ‘ঈমান’, আমরা ধর্ম পালন করি- এর বাইরে না।

যদি সৃষ্টিকর্তার ওপরেই সব ভরসা রাখি তাহলে মৃত্যুর ভয় আসে কি করে? মৃত্যুর ভয় তারাই বেশি করে যারা ইহ জগতের মোহ থেকে বঞ্চিত হতে চান না। নিজের ব্যক্তিগত মৃত্যুর ভয় সর্বজনের ওপর সংক্রমণ করা হলো নিজের ইমানের সঙ্গে বেইমানি। আমাদের ইমান কতটা পোক্ত, কতটা পাকা- তা প্রমাণ করতে গিয়ে আমরা আরেকজনের ইমান কেবল দুর্বল করছি না- করছি বিনষ্ট।

ধর্মের ভুল ও মিথ্যা ব্যাখ্যা দিয়ে আমরা নিজেরাই মানুষকে করছি বিভ্রান্ত ও ধর্মান্ধ। কথায় কথায় আমাদের অতি ভঙ্গুর ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ঘষা খেয়ে চুরমার হয়ে গেলেও নিজের তথাকথিত সাচ্চা ধর্ম পালন করতে গিয়ে নিজ ধর্মেরই অন্যদের ধর্মীয় অনুভূতিতে যে আঘাত করছি- তার খবর কে রাখে? মানুষ দেখানো ধর্ম পালন মানুষের সেবায় কখনও আসতে পারে না। প্রকৃতি ধর্ম পালন হলো মানুষকে মনে সাহস ও আশার আলো দেখানো। এ ছাড়া আছে সৎ কর্ম ও সৎ জীবনযাপন।

আমাদের সব চেয়ে বড় সমস্যা হলো উন্নত শিক্ষার জন্য আমরা ভিন্ন দেশে যাই- প্রাইভেট ও পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করি, গুগল ঘেঁটে পিএইচডি নিই- এসবই ভালো। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে আমরা স্বেচ্ছায় বেছে নেই অশিক্ষিত ও মিথ্যাবাদী কিছু হুজুরদের। অবাক লাগে, অনেক শিক্ষিত মানুষও এসব হুজুরের কথা ১০০ ভাগ সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং তাদের অত্যন্ত জঘন্য ওয়াজ শুনতে বা শেয়ার করেতে দ্বিধাবোধ করেন না। এমনও দেখেছি, শিক্ষিত নারীগণ এসব কুলাঙ্গার ওয়াজওয়ালার ওপরে মহা ‘ক্রাশ’ খাচ্ছেন। অথচ কি পরিমাণের মিথ্যাবাদী এই ধর্ম ব্যবসায়ীগণ, ন্যায়পরায়ণতার ধুম-ধারাক্কা করে ‘জিহাদ ও ইমানের লড়াই’ করনেওয়ালা এসব হুজুরদের চরিত্রেরই বা কী তার ‘নমুনা’- তা এই রমজান মাসেই আমাদের সবার কাছে অতি পরিষ্কারভাবেই ‘পেশ-এ-খেদমত’ হয়েছে। এটাই রমজান ২০২১-এ আমাদের প্রকৃত অর্জন।

মূলকথা হচ্ছে আমাদের চলমান ‘আত্মপরিচয়ের’ রাজনীতি বা ‘পলিটিক্স অব আইডেন্টিটি’ কেন জানি এই বাংলাদেশে ‘মানুষ’ পরিচয়টা আর যথেষ্ট ঠেকছে না। ধর্ম নিয়ে দাম্ভিকতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা সময় বলে দেবে। আপাতদৃষ্টিতে আমরা যা করতে পারি তা হলো এই হিপোক্রেসির, এই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে শক্ত ও যুক্তিসঙ্গত অবস্থান নেওয়া এবং সবকিছু হোক শান্তিপূর্ণভাবে।

শেষ করছি ঈদের দিনের শ্রেষ্ঠ ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেট দিয়ে। লিখেছেন অরণ্য হৃদি।

“সবচেয়ে বিশ্রী অহংকার হলো ‘ইবাদতের অহংকার’। ৫ ওয়াক্ত নামাজ আর এক খতম কুরান (কুরআন) পড়ে যদি নিজের মধ্যে কিঞ্চিৎ সুপিরিয়র ভাব চলে আসে এবং ২টা লেকচার শুনে যদি হুট করেই সবাইকে জাহেল মনে হয় তাহলে ধরে নিবেন আপনি ইসলামের সবচেয়ে প্রাচীন পাপের পথে হাঁটছেন... যে পথে হেঁটেছিল বিতাড়িত শয়তান।”

লেখক: সংগীতশিল্পী

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২১
মো. জাকির হোসেন সৃষ্টিতত্ত্বে মানুষে মানুষে কোনও পার্থক্য নেই। মহান আল্লাহ এই ধরণীতে মাটি থেকে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করেন এবং তারপর তা থেকে ক্রমশ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন এই মানব জাতি। আল্লাহ বলেন– ‘হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)।

অন্য এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী’। (সুরা নিসা: ১)।

মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিয়ে পার্থক্য করে দেখাই সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল কথা শান্তি, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, মৈত্রী। এই শিক্ষা থেকে সরে এসে এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ, হিংসা ও আক্রোশেই সাম্প্রদায়িকতা।

গল্পে আছে শকুনের বাছা পিতার কাছে মানুষের মাংস খেতে চেয়েছিল। শকুন পিতা শূকরের মাংস জোগাড় করে তা মসজিদের পাশে আর গরুর মাংসের টুকরা মন্দিরের পাশে রেখে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। অগণিত লাশ পড়ে হিন্দু ও মুসলমানের। শকুন পরিবার মনের আশ মিটিয়ে মানুষের মাংস ভক্ষণ করে। সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন প্রকাশ মানুষকে পশুতে পরিণত করে। সাম্প্রদায়িকতার কাছে পরাস্ত হয় মানবতা, সভ্যতা, মনুষ্যত্ব ও বিবেক। সাম্প্রদায়িকতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ঐক্য, সংহতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্তরায়। সাম্প্রদায়িকতা সমাজে শান্তি বিনষ্ট করে ধ্বংসের মুকে ঠেলে দেয়। সাম্প্রদায়িকতা তাই মানবজাতির জন্য এক ভয়ানক অভিশাপ।

বাংলাদেশ কোনও একক জনগোষ্ঠীর নয়। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন আনন্দে ভরে উঠবে এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের যারা এই দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানব সভ্যতার একটি বড় ব্যর্থতা ও লজ্জা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাদের অধিকার ভোগে কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা। আজকের আমেরিকাবাসী অনেকের পূর্ব পুরুষগণ ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতি-গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতিত হয়ে নিজ রাষ্ট্র ছেড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানে বের হয়ে মার্কিন মুলুকে বসতি গড়েন। একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপ, আমেরিকায় সংখ্যালঘু মুসলমান, এশিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হচ্ছে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থা বর্ণনাতীত। গান্ধীর অহিংস ভারত এখন সংখ্যালঘুদের জন্য সহিংস ভারত। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সময়ে সময়ে নিপীড়িত হয়েছে, ভয়ংকর অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে অস্বীকার করার উপায় নেই। সবকিছু পরও বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় নজিরবিহীন। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের পরস্পরের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান একত্রে লড়েছে। ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। যদিও দুই সামরিক শাসক জিয়া-এরশাদ সংবিধানের শল্য চিকিৎসা করে এর ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভয়ংকর মতবিরোধ থাকলেও একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই দেশের মানুষ, একই বাঙালি জাতিভুক্ত আমরা এরকম একটি সম্প্রীতির অনুভূতি সাধারণভাবে লক্ষণীয়। তবে ক্রমাগত বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে সেই সম্প্রীতি ম্লান হতে বসেছে। সম্প্রতি কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হনুমানের প্রতিমার কোলে কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, খুলনা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফেনী ও সিলেটের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চৌমুহনী পৌর এলাকায় জুমার নামাজের পর মিছিলকারীরা শহরের সড়কের দুই পাশে হিন্দুদের দোকানপাটে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম ও বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলার সময় ইসকন মন্দিরে থাকা যতন সাহা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

নতুন করে সহিংসতা এড়াতে শনিবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে বিজিবি, র‌্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-প্রতিবাদের মধ্যেই ফেনী শহরে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল (শনিবার) বিকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মানববন্ধন চলাকালে ঢিল ছোড়াকে কেন্দ্র করে সেখানে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাসহ আহত হয়েছেন ১৫ জন। এ সময় ফেনী শহরে কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর করা হয়। আগুন দেওয়া হয় একটি গাড়িতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আশ্রম ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়।

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা বিধানের জন্য ২৩ জেলায় বিজিবি নামানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের রক্তের মিলিত স্রোতধারায় এই বাংলার জমিন রক্তাক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের আক্রমণের প্রধান দুটি টার্গেট ছিল – আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সম্প্রদায়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি নামিয়ে হিন্দুদের পূজার নিরাপত্তা বিধান সব বাঙালির জন্য, বিশেষ করে মুসলমানের জন্য বড়ই লজ্জার!

ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফায়দা লুটার ষড়যন্ত্র কিংবা ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষের কারণে যদি কোনও হিন্দু প্রতিমার কোলে কোরআন রাখার মতো ঘৃণ্য কাজ করেও থাকে, তাহলে তার/তাদের শাস্তি হবে। হিন্দুদের উপাসনালয় কেন আক্রান্ত হবে? হিন্দু সম্প্রদায় কেন দায়ী হবে? রাষ্ট্রের আইন বলছে, একজনের অপরাধের জন্য অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। আর কোরআনের আইন একাধিকবার উচ্চারণ করেছে, যার অপরাধের দায় সে বহন করবে। একজনের অপরাধের দায় কোনোভাবেই আরেকজন বহন করবে না।

একজন মুসলমান অপরাধ করলে কি সব মুসলমানকে শাস্তি দেওয়া হয়? তাহলে অপরাধী হিন্দুর দায় নিরপরাধ হিন্দুদের ওপর কেন চাপানো হবে? প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা এটা যেন নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে ধর্ম অবমাননা কিংবা কোরআন অবমাননার কথা বলে নাসিরনগর, রাউজান, ফটিকছড়ি, কক্সবাজার, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ, যশোর ও খুলনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

কুমিল্লায় নানুয়া দিঘির পাড়ের একটি মণ্ডপের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরে হামলার ঘটনা মোটেই সরলরৈখিক নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে অন্তত ৩০টি বাড়ি এবং ৫০টি দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

‘তৌহিদি জনতা’র নামে বারবার এই যে অমুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, পূজামণ্ডপ, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালানো হয়, তা কি ইসলাম সমর্থন করে?

মদিনার সংহতির কথা চিন্তা করে রাসুল (সা.) সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে তথা পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে এক লিখিত সনদ বা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ সনদকেই ‘মদিনা সনদ’ বলা হয়। মদিনা সনদে বলা হয়, স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিমরা মদিনা রাষ্ট্রে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং একটি জাতি (উম্মাহ) গঠন করবেন। সব শ্রেণির লোক নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। রাসুল (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে বলছিলেন, ‘যদি কোনও মুসলিম কোনও অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তাকে কষ্ট দেয় এবং তার থেকে কোনও বস্তু বলপ্রয়োগ করে নিয়ে যায়; তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অমুসলিমদের পক্ষে অবস্থান করবো। (আবু দাউদ, ৩০৫২)

সাম্প্রদায়িকতা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে এবং জীবন উৎসর্গ করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৫১২৩)

একজন প্রকৃত মুসলমানের পক্ষে মন্দির-প্রতিমা ভাঙা তো দূরের কথা, মন্দির কিংবা প্রতিমা ভাঙার চিন্তা করাও সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ! তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেব-দেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। …।” (সুরা আনআ’ম: ১০৮)। অন্যদিকে, যুদ্ধের সময়ও ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘……  ‘তোমরা কোনও নারীকে হত্যা করবে না, অসহায় কোনও শিশুকেও না; আর না অক্ষম বৃদ্ধকে। আর কোনও গাছ উপড়াবে না, কোনও খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দেবে না। আর কোনও গৃহও ধ্বংস করবে না।’ (মুসলিম, ১৭৩১)। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিয়ে প্রেরণ করছি, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, ভীরুতা দেখাবে না, শত্রুপক্ষের কারও চেহারার বিকৃতি ঘটাবে না, কোনও শিশুকে হত্যা করবে না, কোনও উপাসনালয়ও জ্বালিয়ে দেবে না এবং কোনও বৃক্ষও উৎপাটন করবে না।’ (মোসান্নাফ আবদুর রাযযাক, ৯৪৩০)

যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেওয়া নিষিদ্ধ সেখানে মন্দির ভাঙচুর ও মানুষ হত্যা কীভাবে বৈধ হতে পারে? যারা এমনটি করছেন, তাদের পরিচয় আর যাইহোক তারা মুসলমান নয়। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত আসে এমন কোনও কাজ করতে পারে না। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান করে দোষীদের চিহ্নিত করার আগেই যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যাচারের মাধ্যমে মানুষকে উসকে দিয়েছেন, তারা সমাজে শান্তি বিনষ্ট করে সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে ভয়ানক ফিতনা সৃষ্টি করেছেন। এটি পবিত্র কোরআনের বিধানের লঙ্ঘন। মহান আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, “শৃঙ্খলাপূর্ণ পৃথিবীতে তোমরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা কাসাস: ৭৭)

ফিতনা-ফাসাদ আর বিশৃঙ্খলা যে কত জঘন্য কাজ, তা আমরা পবিত্র কোরআনের ছোট্ট এই আয়াত থেকে বুঝতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন, ফিতনা-ফাসাদ হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ।” (সুরা বাকারা : ১৯১)

‘তৌহিদি জনতা’কে যারা মিথ্যাচার করে উত্তেজিত করে আমরা তাদের যেমন প্রতিরোধ করতে পারিনি, তেমনি ‘তৌহিদি জনতা’কেও বুঝাতে সক্ষম হইনি অমুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণ পূজামণ্ডপ, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট কোরআন-হাদিসের বিধানের লঙ্ঘন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও মণ্ডপে হামলার বিষয়টিকে সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক কারণে ধর্মের অবমাননা ঘটছে কিনা’ এ প্রশ্ন রেখে একটি জরিপ চালায় ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগ। মোট ৪১ হাজার দর্শক এ জরিপে অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীদের শতকরা ৯২ ভাগের মতে, রাজনৈতিক কারণে ধর্মের অবমাননা ঘটছে। রাজনৈতিক কারণে যারা বারবার ধর্মের অবমাননা করছে, বিচার করে আমরা দোষীদের শাস্তি দিতে পারিনি।

হিন্দুদের দুর্গাপূজা উপলক্ষে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে যারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যানার টানিয়ে ছিল, জেলায় জেলায় যখন মণ্ডপ, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলো, তাদের অধিকাংশই প্রতিরোধ দূরে থাক, খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারে এমন প্রতারণামূলক শুভেচ্ছা বাণীর ব্যবসা আর কতদিন চলবে?

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছিল কক্সবাজারের রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও ৩৪টি বসতি। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট। হামলার ঘটনায় পুলিশের করা ১৮টি মামলার মধ্যে ৯ বছরে একটিরও বিচার হয়নি। রামু হামলার প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ বড়ুয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বৌদ্ধদের ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চললেও পল্লির ভেতরে থাকা মুসলিম বাড়িগুলো ছিল সুরক্ষিত। এতে বোঝা যায়, হামলা যারা করেছিল, তারা চেনাজানা লোক। হামলার ঘটনা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। তরুণ বড়ুয়া অভিযোগ করেছেন, যারা বৌদ্ধবিহারে হামলা চালিয়েছিল, অগ্নিসংযোগ করেছিল, সবার ছবি তখন ফেসবুকে, জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। হামলার আগে তারা মিছিল-মিটিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তদন্তের সময় আমরা হামলাকারীদের নামধাম পুলিশকে দিয়েছিলাম, হামলার ঘটনার ছবিও দিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দাখিল করা পুলিশের অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) তাদের একজনের নামও নেই। যারা হামলা করেনি, তাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা আদালতে গিয়ে কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবো?’

তরুণ বড়ুয়া চাপা কষ্ট আর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, ‘রামু হামলার বিচার পাবেন না সংখ্যালঘুরা, আশাও করি না। আমরা ঘটনাটা জিইয়ে রাখতে চাই না। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। যারা বিহারে হামলা করেছিল, অগ্নিসংযোগ চালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করেছে, আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। হামলার বিচারও চাই না। এখন আদালত মামলাগুলো ডিসমিস করে দিলে পারেন।’

রামু ধ্বংসযজ্ঞের এক বছরের মাথায় প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের ওপর ১২টি দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বিহার, মন্দির প্রতিমা সবই নতুন করে গড়ে তোলা যায়, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষতটা শুকাবে কী দিয়ে?

শক্তি আর অস্ত্র দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যায় না। মনের অন্ধকার দূর করাটাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বড় হাতিয়ার। সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্মের প্রকৃত বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে। এমন শিক্ষা ও মননের চর্চা করতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে এমন মানুষ তৈরি করবে, যার মধ্যে উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। আর এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে। অমুসলিমদের নির্যাতনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন অবমাননার ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত পরিকল্পিত সন্ত্রাসের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখার প্রত্যাশা করছি।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বার্তা

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বার্তা

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

মাসুদা ভাট্টি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না– এই সত্য এখন প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগের মতো একটি ঘোষিত সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও এই নিরাপত্তা কেন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে, কেন পালা-পার্বণে কিংবা কোনোরকম অজুহাত ছাড়াই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত আসছে তার কারণও আমাদের কাছে এখন আর অজ্ঞাত নয়। জ্ঞাত এবং সাদা চোখে দেখতে পাওয়া কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে, এ দেশের সংখ্যাগুরু ধর্মবিশ্বাসীদের ধর্ম-মানসে পরিবর্তন, যা ইতিবাচক নয় এবং পূর্বে ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘু-নির্যাতনের বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বিচার না হওয়া। আরও বড় কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মতো বড় ও সেক্যুলার ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকেও সর্বধর্ম সম্মিলন কিংবা অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, একত্রে বসবাসের ইচ্ছা ইত্যাদি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাওয়া।

এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে এবং এখন এটি এতটাই প্রকট হয়ে পড়েছে যে এতদিন এ দেশের ধর্মবাদী শক্তির মধ্যে যে পরধর্ম-বিদ্বেষ ও আক্রমণাত্মক আচরণ লক্ষ করা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন আওয়ামী-রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের মধ্যেও সেই একই আচরণ বা মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটিই সবচেয়ে বিপদের কথা।

খুব বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই, এবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীর দিনে কুমিল্লায় যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা যে ইচ্ছাকৃত ঘটানো হয়েছে তা নিশ্চয়ই প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। বোঝাই যাচ্ছে যে এই ঘটনা দিয়ে সারা বাংলাদেশকে একটি নরককুণ্ড বানানোর চেষ্টা হয়েছে এবং যারা এটি করতে চেয়েছে তারা সর্বোতভাবে সফলই হয়েছে বলতে হবে। নিঃসন্দেহে এই ভয়ংকর কাণ্ডের পর বাংলাদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু ধর্ম-সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আতঙ্ক তৈরি হবে এবং এ দেশে বসবাস বিষয়ে তাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এবং এটাই যে এ দেশে সংখ্যালঘু-নির্যাতনের অন্যতম কারণ তা তো সেই পাকিস্তান আমল থেকে নির্মম সত্য হিসেবে আমরা জানি এবং বুঝি, কিন্তু এর প্রতিকার হিসেবে আমরা কোনও পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছি।

আমরা এই সত্যও স্পষ্টভাবে জানি যে ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ দেশে হিন্দুদের জীবন ও সম্পদ পুরোপুরি অনিরাপদ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দু’দু’টি সামরিক শাসক ও তাদের হাতে সৃষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে সংখ্যাগুরুর ধর্ম ও তাদের আরও ক্ষমতাবান করার যে কদর্য রাজনীতি আমরা দেখেছি এ দেশে, তা অন্য কোনও আধুনিক রাষ্ট্রে দেখা যায়নি।

রাষ্ট্রের নগ্ন পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের সংখ্যা তীব্রভাবে কমেছে এবং যেকোনও ছল-ছুতোয় এই জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের তীব্রতা এবং পরিমাণ কেবল বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংখ্যাগুরুর ধর্মের কল্পিত শত্রু হিসেবে সব সময় সংখ্যালঘুর ধর্মকে দাঁড় করানোর ফলে এ দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বেও তার প্রচণ্ড বিরূপ প্রভাব পড়েছে, ফলে দুই সম্প্রদায়ের ভেতর আর মিল বা বন্ধুত্বের সুযোগও গেছে কমে। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের সেই পুরনো অবস্থান অর্থাৎ ‘ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ নয়’ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বললে পরিস্থিতির সম্পূর্ণ সত্য বিবরণ দেওয়া হবে না; বরং একথাটিই বলতে হবে যে জাতীয় পর্যায়ে যদিও দলটির নেতৃত্ব দেশের ভেতর ধর্ম-সম্মিলনকে বজায় রাখতে ইচ্ছুক কিন্তু দলটির তৃণমূলে এই ধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। ১৩ বছরকাল সর্বাধিক সক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকার পরও দলটির এই ব্যর্থতা দেশের সুস্থ বিবেককে শুধু পীড়া দেয় তা নয়, বরং দলটির প্রতি এ বিষয়ে আস্থা রাখতেও অনেকে ভয় পাচ্ছেন।

দুঃখজনক সত্য হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘু ধর্মবিশ্বাসীদের জীবন ও সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে আর কেউ বা কোনও পক্ষ কখনোই এগিয়ে আসেনি। এমনকি তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সমাজের বিশিষ্টজনের সংখ্যাও এ দেশে কমে গেছে। কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করে অনবরত কথা বলে চলছেন নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা ছোট-বড় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। প্রমাণ দেওয়ার যেহেতু দায় নেই সেহেতু তাদের সেসব বক্তব্য দেদার বণ্টন হচ্ছে অনলাইনে এবং কারা করছেন এসব?

যারা আসলে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে হিন্দু বা অমুসলিমশূন্য করে  কেবল মুসলিম-রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারা। বরাবরের মতো বিএনপিও তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে এজন্য দায়ী করছে এবং সর্বোতভাবে এদেশে তাদের ভারতবিরোধী রাজনীতি জীবিত রাখতে ‘হিন্দু-কার্ড’ খেলাকেই এখনও প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

এতদিন ধরে এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় সবচেয়ে প্রধান প্রতিবাদকারীর ভূমিকা পালন করেছে দেশের সুশীল সমাজ। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সমাজের পরিচিত মুখগুলোকে আমরা আর দেখতে পাচ্ছি না। এর কারণ হয়তো এটাই, তারা মনে করেন যে প্রতিবাদ করবেন কার বিরুদ্ধে? এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন ও সম্পদ যদি আওয়ামী লীগের আমলেই সুরক্ষিত না থাকে তাহলে আর কখন থাকবে? এই চিন্তা থেকে হয়তো তারা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে একটু পিছিয়ে আছেন। কিন্তু আমরা যদি দেশের সুশীল সমাজের শক্তির কথা বলি তাহলে ১/১১-র কালে তাদের রাজনীতিবিদ হওয়া এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীজন হওয়ার খায়েশ তাদের শক্তিকে যে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেছে তাতে সত্যিই আর কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, এরপর থেকে কোনও রাজনৈতিক দলের কাছেই আর এই পক্ষটির কোনও ‘মূল্য’ নেই সেই অর্থে। এখনও আমরা কেবল দেশের সুশীল সমাজকে সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন ইত্যাদি বড় বড় বিষয় নিয়েই কথা বলতে দেখি বা শুনি, কিন্তু দেশের ভেতর ঘটা সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতনের মতো ‘ছোট’ বিষয় নিয়ে কথা বলতে বা কোনোরকম ভূমিকা পালন করতে দেখি না। ফলে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর (নারীসহ) পক্ষে কথা বলা মানুষের সংখ্যা এখন বলতে গেলে শূন্য।

এই অচলাবস্থার সঙ্গে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে উন্মুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এই মাধ্যমটি সম্পূর্ণভাবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গুজব ছড়িয়ে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে। ব্যক্তি-আক্রমণ, কুৎসা রটনা এবং মিথ্যা সংবাদ সাজিয়ে মানুষকে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে বাংলাদেশে ভয়ংকর নজির স্থাপন করেছে তার প্রমাণ কুমিল্লা, রামু, বাঁশখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা, সুনামগঞ্জসহ দেশের সর্বত্র ছড়ানো। দেশে ভয়ংকর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বলবৎ রয়েছে কিন্তু এই আইনে কেবল সাংবাদিক নির্যাতনের কথাই শোনা যায় কিন্তু এই আইনে কোনও সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তকে বিচারের আওতায় এখনও আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানা যায় না। তবে হ্যাঁ, এই আইনে মূল আসামি গ্রেফতার বা সাজা ভোগ না করলেও কল্পিত অভিযুক্ত হিসেবে অনেকেই ইতোমধ্যে বিনা বিচারে কারাভোগ করেছেন বলে প্রমাণ রয়েছে।

এতসব নেতিবাচক ঘটনার সঙ্গে সর্বসম্প্রতি কুমিল্লার ঘটনার পরে জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের বিষয়টি। বিশেষ করে কুমিল্লার ঘটনা-পরবর্তী অন্যান্য জায়গায় সংখ্যালঘু আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাঠানো পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতার চিঠি নিয়ে রাজনৈতিক জল শুধু ঘোলা নয়, একেবারে কৃষ্ণকালো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ভারতবিদ্বেষী রাজনীতির আগুনে ঘি নয়, এই ঘটনা কেরোসিন ঢালার মতো কাজ করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। যদিও নোয়াখালী ওবায়দুল কাদেরের নিজের জেলা এবং সেখানকার ঘটনা মর্মান্তিক। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভেতর এ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়েও দলটির মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুবান্ধব হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও যদি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেওয়া না যায় তাহলে সেই ব্যর্থতা অন্য কারও ওপর চাপানোর যে সুযোগ থাকে না সে বিষয়টি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বুঝতে পারছে বলে প্রকাশিত খবরটি জানাচ্ছে। এখন কেবল কথার কথা নয়, কেবল ‘আনা হবে’ ‘করা হবে’ জাতীয় প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে বলে বিশ্বাস করার কোনও সুযোগ নেই। বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেশের ভেতর শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য অপরাধী যে ধর্মেরই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির উদাহরণ তৈরি না করা গেলে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ দেশের রক্তপিপাসু রাজনৈতিক অপশক্তি তাদের রক্তাকাঙ্ক্ষা যেকোনও উপায়ে বজায় রাখবে বলেই মনে করি। তাতে কাদের রাজনৈতিক লাভ বা কাদের রাজনৈতিক ক্ষতি তা বলা না গেলেও দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ‘মানুষের’ যে আরও জীবনহানির ঘটনা ঘটবে তা নিয়ে কারও সন্দেহ থাকার কোনোই কারণ নেই।

লেখক: এডিটর ইনচার্জ, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৪

তুষার আবদুল্লাহ গতকাল রাতে ভেবেছিলাম আজ লিখবো না কিছু। লেখা কিংবা কথা বলা, সবই তো অপচয়। পত্রিকা বা পোর্টালের জায়গা ভরাট করে দেওয়ার জোগালি করা মাত্র। যা নিজে বিশ্বাস করি না তাই হয়তো লিখছি। যা বিশ্বাস করি তা হয়তো লিখতে পারছি না। বলার বেলায়ও একই চিত্র। এই যে মন ও কর্ম বা আচরণের দূরত্ব, এটা এক ধরনের অসুস্থতা। যারা রাজনীতি করছেন আর আমরা যারা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত, সবাই পোশাকি বচন নিয়ে আছি। একে অপরকে পোশাকি বচনে তুষ্ট বা দমন করে রাখতে চাই। কিন্তু যার সঙ্গে বিশ্বাস বা মনের যোগাযোগ নেই, সেই বচন টেকসই হয় না। দুর্যোগ প্রতিরোধ করতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতা ‘ফনা’ তুলে দাঁড়ালেও বীণার কৃত্রিম সুর তাকে বশ মানাতে ব্যর্থ হয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িকতা ‘ফোঁস’ করে উঠলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দিকে আঙুল তুলি আমরা। নির্দিষ্ট করে ধর্মভিত্তিক দল বলে কিছু নেই এখন। সব রাজনৈতিক দলই ভোটবাজারে ধর্মকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজনীতি কি শুধু সরকারি-বেসরকারি দফতরে কাজ আদায় কিংবা কাজ ফাঁকিতে? শিক্ষা, ব্যবসা, পণ্য বিক্রিতে উদারভাবে ধর্মের ব্যবহার হচ্ছে।

ধর্ম নিয়ে কট্টর অবস্থান সব অনুসারীর মধ্যেই আছে। হিন্দু-মুসলমানদের এ বিষয়ে একতরফা দোষারোপ করা যাবে না। রোগটি শুধু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মিয়ানমারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সবাই রোগাক্রান্ত গোলকের। ভেতরে একটু উঁকি দিলেই, জীবন আচরণ ও অন্য ধর্মের প্রতি রাগ-অনুরাগ প্রত্যক্ষ করলেই রোগের লক্ষণ বোঝা যাবে। বাংলাদেশ ও এর চারপাশের ব্রিটিশশাসিত দেশগুলোতে ব্রিটিশরা যে বিষফোঁড়া ফাটিয়ে দিয়ে গেছে, সেই পুঁজ এখনও প্রবাহিত। উত্তাপটা বাড়ছেই।

মানুষ সাম্প্রদায়িক হলো কবে? ইতিহাস এর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দেবে কিনা জানি না। কোনও ইতিহাসই সংশয় ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সবাই নিজ নিজ মতলব মতো ইতিহাস তৈরি করে নিয়েছে। রাজনীতি, ধর্ম সবাই। তবে নিশ্চিত করে আমরা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী ও বিশ্বাসীরা বলতে পারি- আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে যখন ধর্মের ব্যবহার শুরু হলো তখন থেকেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক হতে শুরু করে। এখন ক্ষমতায় আরোহন এবং টিকে থাকাও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল। অসাম্প্রদায়িকতার পতাকা উড়ে বিস্ফোরিত হয় অসাম্প্রদায়িকতার ফাঁকা বুলি। আমরা ভোটের মতলবে, সামাজিক স্বার্থে অসাম্প্রদায়িকতার বসন নেই। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে, আচরণে, চর্চায় আমাদের বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রদায়িক। এজন্যই দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী যখন তাদের স্বার্থ হাসিলের রণক্ষেত্রের নকশা তৈরি করে, তখন মুফতে পেয়ে যায় আমাদের মতো সৈনিক।

সাম্প্রদায়িক শক্তি যেকোনও জনপদেই লঘুদের ওপর চড়াও হয়। এটাই আধিপত্যবাদের ধর্ম। লঘুরা নির্যাতনের শিকার হলে, বিপন্ন বোধ করলে, নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে থাকলে, অসাম্প্রদায়িকতার চাদর নিয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এগিয়ে যায়। নিপীড়িতরা প্রথম প্রথম কারও কারও প্রতি বিশ্বাস রাখতো। কিন্তু দেখা গেলো- তাতে আগুন নেভে না। জমি, কন্যা, স্ত্রী, মায়ের ওপর থেকে লোভের চোখ সরে না। অঙ্ক কষে দেখা যায়, ভোটবাজারে বিক্রি হতে হতে আর কোনও ভাগশেষ নেই।

অভিবাসনের অন্যতম একটি কারণ সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। দেশভাগের পর থেকে কম মানুষ তো ভিটে ছেড়ে এপার-ওপার হলো না। সব ভূখণ্ডেই এমন ভিটে ছাড়া মানুষের দল আছে। কিন্তু নতুন বসতিতেও কি তারা নিশ্চিত যাপনে আছে? সিদুঁর রাঙা মেঘ সর্বত্র তাদের তাড়া করেই বেড়াচ্ছে। কারণ ‘সাম্প্রদায়িকতা’র মতো আর কোনও পণ্যের চৌকাঠ অবধি বাজারজাত হয়নি। দুয়ার বন্ধ রেখেও কি এই পণ্যের প্রবেশ রোধ করা যাচ্ছে? যাচ্ছে না বলেই লেখন, বচন সবই অপচয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শেখ হাসিনায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি: স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:০৮

ড. প্রণব কুমার পান্ডে বঙ্গবন্ধু চারিত্রিকভাবে ছিলেন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যের অনুসারী এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বদ্ধপরিকর। সেই ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় একবার জেলা শিক্ষা অফিসারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে তিলে তিলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রের। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিল দেশবাসী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা যখন ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, ঠিক সেই সময় বাংলার মানুষ কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই জানতেন এই হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাংলার মাটি ও মানুষকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেই হবে।

আর এই কারণেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক মহাকাব্যিক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন।  একটি অলিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যেভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের দৃশ্যপট রচনা করেছিলেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল। সেই দিন বঙ্গবন্ধু যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে তাঁকে গ্রেফতার করে বাংলার মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি রহিত করতো পাকিস্তানি জান্তা। কিন্তু, পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে চিনলেও তার ভেতরের যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেটা চিনতে কিছুটা হলেও ভুল করেছিলেন। আর এই কারণেই বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে কূটনৈতিক ভাষায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে। তাঁর সেই বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই নয়, বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করেছিল। এটি এমন এক ধরনের আবেগময় ভাষণ ছিল সে আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার লাখো লাখো আবাল বৃদ্ধ বনিতা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। কারণ, মাত্র নয় মাসে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে।

অনেকের মনে এতক্ষণ একটি প্রশ্ন জেগেছে যে আজকের লেখার শিরোনামের সঙ্গে এই বিষয়ের অবতারণা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমি মনে করি এটি সত্যিই যুক্তিযুক্ত। ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করা সব নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই ধরনের ভাষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্যরকম নেতৃত্ব, যা হবে নির্ভীক, বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। প্রথমদিকে সব ভালোই চলছিল। কিন্তু যখনই তাঁর এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম পাকিস্তানপন্থীদের স্বার্থে আঘাত হানে, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এর ভয়াল রাতে তাঁকে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পুরোটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

এরপরে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করে দলকে সংগঠিত করে ক্ষমতায় নিয়ে যান। গত ১২ বছর শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ শাসন করছেন তাতে স্পষ্টতই তার বাবার রাজনৈতিক গুণাবলি তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে কোনও তর্কের অবকাশ নেই। বঙ্গবন্ধুর যেমন বাঙালির ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনার রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু যেমন নীতির সঙ্গে কখনোই আপস করেননি, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনাও নীতির কাছে আপস না করে কঠোরভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হবো এবং আশা করছি ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বে উন্নীত হবো। গত এক দশকে উন্নয়ন এমনি এমনি হয়নি। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে হয়েছে। তিনি চেষ্টা করেছেন উন্নয়নের সব মাত্রায় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে, যাতে সার্বিকভাবে উন্নয়ন সূচকে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা যেমন এশিয়ান টাইগার হয়েছি, ঠিক তেমনি সামাজিক সূচকে গত এক দশকের আমাদের উন্নয়ন পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করেছি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্যের কারণে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) কর্তৃক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘এসডিজি প্রগ্রেস ওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়েছে জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ অধিবেশনে।

বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১২ বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এটি সত্যিই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। পিতামাতার আদর্শ সাধারণত সন্তানদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শেখ হাসিনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারগুলোতে এই বিষয়টি সব সময় স্বাভাবিক হতে দেখা যায়নি। আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে সন্তানরা বিভিন্নভাবে দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। অবশ্যই কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সেসব সন্তানকে প্রতিপালনের ক্ষেত্রে হয়তো পিতামাতা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও  ঠিক, যখন কেউ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন তাঁর উচিত নিজের সম্মান রক্ষার্থে এবং দেশের মানুষের কথা ভেবে নিজের সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি, অনেকেই তাঁদের সন্তানদের একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, আবার পাশাপাশি নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকের সন্তানদের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

সেই জায়গা থেকে বিচার করলে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো শেখ হাসিনার চরিত্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনা তাঁর বাবার আদর্শকে শুধু লালনই করেননি, তাঁর  অপূর্ণ স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ অবশ্যই সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। তবে পাশাপাশি এটিও ঠিক, বঙ্গবন্ধু যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সেভাবে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কখনও বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আবার কখনও বা মৌলবাদের হামলার শিকার হয়েছেন। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তিনি প্রতিবারই অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। ১২ বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফলে শেখ হাসিনা আঞ্চলিক নেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন। বড় বড় দেশের রাজনৈতিক নেতারা শেখ হাসিনার কাছে প্রায়ই জানতে চান বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র। শেখ হাসিনা বারবার একই কথা বলেছেন যে জনগণকে ভালোবেসে, তাদের কথা চিন্তা করে, এবং সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করলে দেশের উন্নয়ন হবে এটিই স্বাভাবিক। এবং এই কারণেই তিনি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের জনগণকে সোনার বাংলার জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাঁর লড়াই চলমান রয়েছে। আবার এটিও ঠিক, তাঁর আশপাশে, এমনকি তাঁর দলেও এখনও কিছু অপশক্তির অন্তর্ভুক্তি হয়েছে, যারা সব সময় চেষ্টা করছে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে।  

অতএব, এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহের কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজের খাবার শেয়ার করতেন। সেই খন্দকার মোশতাক গংয়ের প্রেতাত্মারা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে কারা তাঁর ভালো চায় এবং কারা তার খারাপ চায়? এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। পরিশেষে বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা পিতা-কন্যার সম্পর্কের খাতিরে স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, এতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/এমএম/

সম্পর্কিত

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৯

স্বদেশ রায় রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভ যেদিন ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসার সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান ওই দিনটি ছিল  দিমিত্রি মুরাতভ সম্পাদিত নোভায়া গেজেটের অন্যতম পরিচিত সাংবাদিক আন্না পলিতিভস্কয়ার নিহত হবার ১৫তম বার্ষিকী। ২০০৬ সালে তিনি পেশাগত কাজ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত নোভায়া গেজেটের ছয় জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। আর এই সাংবাদিক টিমেরই নেতৃত্ব দেন দিমিত্রি মুরাতভ। অন্যদিকে মারিয়া রেসার বিরুদ্ধে এখনও দুটি মামলা চলছে।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যু, হামলা ও মামলা এটা সাংবাদিকের সঙ্গে শুরু থেকে চলে আসছে। আর এ কারণে সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বলেই চিরকাল চিহ্নিত। প্রত্যেকটা পেশায় ঝুঁকি নেওয়ার একটা কারণ থাকে, একটা স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এ ঝুঁকি নিতে হয়। সাংবাদিকতার মূল স্বার্থ রাষ্ট্র ও সমাজকে মানুষের কাছে স্বচ্ছ রাখা। অধিকাংশ মানুষই মূলত সাংবাদিকের চোখ দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখতে পায়। তাই অধিকাংশ মানুষকে সঠিক বিষয়টি দেখানোর সততা নিয়ে নির্ভয়ে এ কাজটি করার দায়িত্ব সাংবাদিকের ঘাড়ে বর্তায়। আর পৃথিবীতে যেখানেই যেকোনও ধরনের ভয় বা ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই সেখানে মৃত্যুসহ নানান ঝুঁকি আসবেই।

তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে এই ঝুঁকির ঊর্ধ্বে যতটা নেওয়া যায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। আর এটা যতটা না সাংবাদিকের ও সাংবাদিকতার স্বার্থে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে। এই স্বাধীন সাংবাদিকতা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি দেশ অনেক বড় বড় বিপর্যয় থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে।

যেমন, একটা বিষয় লক্ষ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ চলে যাবার পরে ভারতে আজ অবধি বড় কোনও দুর্ভিক্ষ হয়নি। অথচ ব্রিটিশ আমলের শুরুতে দ্বৈত শাসনামলে ১৭৬৯-৭০ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে খ্যাত দুর্ভিক্ষে সে সময়েই তৎকালীন বেঙ্গলে প্রায় ৩০ লাখ লোক মারা যায়। আবার ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় এক কোটি। সেদিনের এই বড় দুটি দুর্ভিক্ষের অর্থাৎ  ছিয়াত্তরের মনন্বতর ও ৪৩-এর দুর্ভিক্ষকে ঠেকাতে না পারার কারণ হিসেবে অনেক বিষয় গবেষকরা সামনে এনেছেন। তার ভেতর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর না ঠেকাতে পারার অন্যতম কারণ সে সময়ের মিডিয়াবিহীন রাষ্ট্র আর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে না পারার কারণ সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। ১৯৪৩-এ ব্রিটিশ সরকার দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে কোনও সঠিক সংবাদ প্রকাশ করতে দেয়নি। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পরে সেদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করায় দরিদ্র দেশ হলেও সেখানে প্রতিটি দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। আর সরকার সেই পূর্বাভাস পাবার পরপরই দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর ব্যবস্থাগুলো নিতে পেরেছে। যার ফলে সব দুর্ভিক্ষই তারা ঠেকাতে সমর্থ হয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া আর সব দেশই প্রায় মূল খাদ্য অভাবটি দূর করতে সমর্থ হয়েছে।  বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর এ মুহূর্তে মোটা দাগে মূল কাজ-  মানুষে মানুষে ধনবৈষম্য কমানো, টেকসই উন্নয়ন করা, রাষ্ট্রের ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা, যুদ্ধ উন্মাদনা কমানো, সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা থেকে পৃথিবীকে বের করে আনা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও বর্ণবাদ মুক্ত করা। আর সর্বোপরি মানুষের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সব ধরনের সুযোগ দিয়ে চিন্তা ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো। যাতে মনোজাগতিকভাবে মানুষ নিজেকে উন্নত করতে পারে।

এ মুহূর্তের পৃথিবীতে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রযুক্তির উন্নতি ঘটছে কিন্তু ওই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে না। আঠারো শতক, উনিশ শতক এবং বিশ শতকে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মনোজগতে যে বিকাশ ঘটেছিল, এ মুহূর্তের পৃথিবীতে মনোজগতের বিকাশের গতি সেখানে নেই। বরং সবখানেই কমে গেছে। মনোজগতের এই বিকাশ কমে গেলে মানুষের সাহস কমে যায়, চিন্তার উদারতা কমে যায়, মানুষ অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। যার ফল দাঁড়ায় রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদ ও কুসংস্কার বাসা বাঁধতে থাকে। এবং ধীরে ধীরে এগুলোই রাষ্ট্র ও সমাজে চালকের ভূমিকায় বসে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে দুর্নীতি, মৌলবাদ, কুসংস্কার এগুলো দূরে রাখতে হলে এর বিরুদ্ধে সমাজে সব সময়ই একটা প্রতিবাদ থাকতে হয়। কারণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করা, কুসংস্কার বা মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা। এর বিপরীতে মানুষের চিন্তার জগৎকে জাগ্রত করতে পারলে, বোধকে জাগ্রত করতে পারলে তখন মানুষ এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সুস্থ ও আধুনিকতার পথে যাবার সুযোগ পায় বা মানুষকে সে পথে নিয়ে যেতে পারে।

আধুনিক এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের বোধ ও চিন্তার জগৎ জাগ্রত রাখার জন্যে অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আসছে সেই পনের শতক থেকে। পৃথিবীর এই পথ চলাতে এখন অবধি দেখা যাচ্ছে, অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই মন্দের ভালো। কারণ, গণতন্ত্র কোনও রাষ্ট্রের একক কোনও শক্তির বিষয় নয়। এটা রাষ্ট্রের অনেক শক্তির ওপর নির্ভর করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন রাষ্ট্রীয় সব কাঠামোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়, তেমনি সামাজিক শক্তিগুলোকেও শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়। রাজনৈতিক দল জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয় ঠিকই, কিন্তু তারা যদি মনে করে রাষ্ট্রের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তারাই, তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের ও সমাজের সব ধরনের শক্তির সঙ্গে নিজেকে ভারসাম্যমূলক অবস্থানে নিয়ে যখন চলতে পারে তখনই কেবল ওই রাষ্ট্র ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হয়।

রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের সব শক্তিকে নিয়ে ভারসাম্যমূলকভাবে চলছে কিনা, রাষ্ট্রে মৌলবাদ, কুসংস্কার, বর্ণবাদ জাগছে কিনা, আবার রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্যে সমানভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করছে কিনা, রাষ্ট্র কাউকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে কিনা- এ বিষয়গুলো সব সময়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করতে হয়। আর এই চেষ্টার প্রথম সারিতে কাজ করে মিডিয়া। মিডিয়া এগুলোকে যতটা স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে নিয়ে আসবে ততই মানুষ এর ত্রুটিগুলো দূর করার জন্যে রাষ্ট্রের প্রতি চাপ দিতে পারে। এখানে মিডিয়ার ওপর কোনও ভয়ের সংস্কৃতি থাকলে চলে না।

এবারের দুই জন সাংবাদিককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া তাই বাস্তবে দুই জন সাংবাদিককে নোবেল দেওয়া নয়, এটা মূলত পৃথিবীজুড়ে মিডিয়ায় যে ভয়ের সংস্কৃতি ঢুকে গেছে, তার বিরুদ্ধে একটি বার্তা। তাই এবারের শান্তিতে এ নোবেলটি শুধু সময়োপযোগী নয়, এটা সারা পৃথিবীর মিডিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি আহ্বান। কারণ, এ কাজটি এমন একসময়ে হয়েছে যে সময়ে সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্র, পুঁজি, মৌলবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মীয়বাদ ও বর্ণবাদ দ্বারা মিডিয়া অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর এই কাজ পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্রের এক ধরনের ভুল চিন্তা বা পুঁজি নিয়ন্ত্রিত চিন্তার কারণেই ঘটছে সব থেকে বেশি। এই চিন্তার এক বড় স্লোগান হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মিডিয়ার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এই স্লোগানের সপক্ষে কর্তৃত্ববাদী সরকার পরিচালিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচককে সামনে আনা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর এই অর্থনৈতিক সূচক বাস্তবে কতটা সত্য তা কেউই জানে না। কারণ, ওই দেশগুলোর বাস্তব অবস্থা কি তা সেখানে স্বাধীন মিডিয়া না থাকায় জানার কোনও সুযোগ নেই । যেমন, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের আগে অবধি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক নিয়ে পৃথিবীর নানান প্রান্তে অনেক মানুষ উচ্ছ্বসিত ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো তখন দেখা গেলো, ওই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক আসলে ছিল কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রোপাগান্ডার ফানুস। তাই আজ পৃথিবীর দেশে দেশে যেসব কর্তৃত্ববাদী সরকার তাদের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের সূচক তুলে ধরছে নিয়ন্ত্রিত ও সরকারি প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে, তাও যে অমনি ফানুস নয় তা কে জানে?

তবে এর কিছু কিছু লক্ষণ কিন্তু দেখা যাচ্ছে। যেমন, বেশ কয়েক দশক ধরে বলা হচ্ছে আগামী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হবে এশিয়া। আর সেখানে সামনের সারিতে রাখা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোকে । কিন্তু এখন অবধি এসব দেশ প্রোডাকশন হাউজই থেকে গেলো। তারা এখনও নিজের দেশের বাজারকে বড় করতে পারেনি বা মূল বাজারে পরিণত করতে পারেনি। তাদের দেশে শ্রমের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত করতে পারেনি। বাস্তবে শুধু শ্রম বিক্রি করেই যাচ্ছে। এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, সেখানে প্রবৃদ্ধি কেবল কিছু সংখ্যক লোকের জন্যে ঘটেছে। কিছু লোকই ধনী হয়েছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য মোটেই কমেনি। আর কোনও সমাজে যখন রাতারাতি কিছু লোক ধনী হতে থাকে, তখন নিশ্চিত ধরে নিতে হয় ওই রাষ্ট্রের সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এবং সরকারি আনুকূল্যে কিছু লোক ধনী হচ্ছে। সরকারি আনুকূল্যে যখন কিছু লোক ধনী হয় তখন তারা যতটা না সঠিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনী হয়, তার থেকে বেশি হয় জনগণের অর্থ নয়-ছয় করে। যারা জনগণের এই অর্থ নয় ছয় করে তারা তখন ওই অর্থ দিয়েই রাজনীতি ও প্রশাসনকে কিনে ফেলে। আর তখন যে রাজনীতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে ওই রাজনীতি ও প্রশাসন জনগণের ওপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। এই ভয়ের খড়গটি সব থেকে বড় হয়ে আঘাত করে মিডিয়ার ওপর। এমনকি অনেক সময় অনেক সৎ রাজনীতিকও সরকারি আনুকূল্যের বাণিজ্যের মাধ্যমে তথাকথিত উন্নয়নের প্রতারণায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, সত্যি সত্যি দেশের উন্নয়ন ঘটছে। এবং তারাও মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজকে ভালো মনে করেন।

যেমন, একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমনকি সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। তবে তারপরেও আজ বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। যেখানে সত্যি অর্থে কোনও শিল্প নেই; বরং রয়েছে চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। অথচ ১৯৪৭-এ যখন ভারত স্বাধীন হয় সে সময়ে শিল্প ও অর্থনীতি মিলিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে চার নম্বরে ছিল বেঙ্গল। আর আজ তাদের এ অবস্থা। এখানে তারা বলতে পারে বেঙ্গল ভাগ হবার একটা ধাক্কা তাদের ওপর পড়েছে।

তবে তারপরেও সেখানে এখন সচেতন সবাই বলেন, পশ্চিমবঙ্গের যা প্রকৃত উন্নয়ন তা শুধু বিধান রায়ের আমলেই হয়েছিল। তারপরে আর হয়নি। এই বিধান রায়ের আমলে সেখানে মিডিয়ার স্বাধীনতা এমন ছিল যে বিধান রায় বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে একটি প্রদেশ বা রাজ্য করতে চেয়েছিলেন। মিডিয়ার সমালোচনাই কিন্তু বিধান রায়কে এ কাজ থেকে বিরত হতে বাধ্য করে। অন্যদিকে জ্যোতিবসু’র কমিউনিস্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া ও মানুষের মনোজগৎ, দুটোই সরকার শাসিত ছিল। আর মমতা ব্যানার্জির  আমলে ‘আনন্দবাজার’ ও ‘বাংলা স্টেটসম্যানে’-এর  সম্পাদককে সরে যেতে হয়েছে শুধু সরকারের সমালোচনা করার অপরাধে। এভাবে প্রাইভেট মিডিয়াও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। আর তার ফল ভোগ করছে পশ্চিমবঙ্গ দারিদ্র্য দিয়ে। সেখানে উন্নয়ন বলতে কয়েকটি ফ্লাইওভার। যে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে হেঁটে চলে হাজার হাজার বেকার তরুণ-তরুণী। শুধু দারিদ্র্য নয়, তাদের মনোজগতেরও পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেখানে কোনও আদর্শবাদী রাজনীতি এখন আর নেই।  সুবিধাবাদী ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিও স্থান করে নিয়েছে উপমহাদেশের আধুনিকতার রেনেসাঁ ঘটেছিল যে এলাকাটিতে, সেই মাটিতেই।

তাই এই স্বাধীন মিডিয়ার বাধা এখন শুধু আর কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোতে নয়। সবখানেই কম বেশি বাধার মুখে মিডিয়া।  মাত্র কিছু দিন আগেও যে দেশের সংবিধানে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ নিশ্চিত করা হয়েছে সেই আমেরিকার হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পও মিডিয়াকে ‘শত্রু’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতের লোকেরা এখনও আমেরিকাতেও কম নয়। তাই এবারের শান্তির নোবেল সারা পৃথিবীর সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জন্যে একটি ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা। এ মুহূর্তে তাই যেকোনও দেশের  সাংবাদিকতা ও মিডিয়া এই সত্য উপলব্ধির বাইরে থাকলে ভুল করবে।

কারণ, স্বাধীন মিডিয়া ছাড়া, সাহসী সাংবাদিকতা ছাড়া একটি মনোজাগতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমাজ গড়া মূলত গ্রিক দেবতা ‘কাইমেরা’। অর্থাৎ আশা করা যেতে পারে কিন্তু বাস্তবে অসম্ভব।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

‘তালেবান সরকার স্বীকৃতি না পেলে লাভবান হবে আইএস’

‘তালেবান সরকার স্বীকৃতি না পেলে লাভবান হবে আইএস’

সেই স্কটল্যান্ডেই ধরাশায়ী বাংলাদেশ

সেই স্কটল্যান্ডেই ধরাশায়ী বাংলাদেশ

দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ৪২ হাজার প্রার্থী

দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ৪২ হাজার প্রার্থী

তাইওয়ান প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যুদ্ধজাহাজ

তাইওয়ান প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যুদ্ধজাহাজ

সাকিব-মুশফিকের ফেরায় বিপদে বাংলাদেশ

সাকিব-মুশফিকের ফেরায় বিপদে বাংলাদেশ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, গ্রেফতার ৩

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, গ্রেফতার ৩

সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে মা-ছেলেসহ ৩ জন নিহত

সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে মা-ছেলেসহ ৩ জন নিহত

১৮ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে ‘ক্ষমা’ চাইলেন চেয়ারম্যান

প্রকল্প ছাড়াই টাকা উত্তোলন১৮ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে ‘ক্ষমা’ চাইলেন চেয়ারম্যান

রাসেল বেঁচে থাকলে আদর্শ নেতা পেতাম: প্রধানমন্ত্রী

রাসেল বেঁচে থাকলে আদর্শ নেতা পেতাম: প্রধানমন্ত্রী

পানি থেকে ব্যাপক আকারে হাইড্রোজেন উৎপাদনে সাফল্য

পানি থেকে ব্যাপক আকারে হাইড্রোজেন উৎপাদনে সাফল্য

সাকিব-মুশফিকের ব্যাটে জবাব দিচ্ছে বাংলাদেশ

সাকিব-মুশফিকের ব্যাটে জবাব দিচ্ছে বাংলাদেশ

শিশু-কিশোর, তরুণদের কাছে ভালোবাসার নাম শেখ রাসেল: রাষ্ট্রপতি

শিশু-কিশোর, তরুণদের কাছে ভালোবাসার নাম শেখ রাসেল: রাষ্ট্রপতি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune