X
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১৫:৪৭

রুমিন ফারহানা আট বছর আগে ঘটা রানা প্লাজা দুর্ঘটনার কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বেরিয়ে আছে রক্তাক্ত হাত, কোথাও কেবল একটা পা, সিমেন্ট, বালি আর কংক্রিটের ফাঁকে ফাঁকে রক্তের ছোপ। কী মর্মান্তিক আর করুণ ছিল গণমাধ্যমে আসা ছবিগুলো। এই বীভৎস সময়কে ছাপিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য। ভবন ধসের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু হরতাল সমর্থক ভবনটির ফাটল ধরা দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করেছে বলে আমি জানতে পেরেছি। ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে সেটাও একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।’ বক্তব্যটি যে শুধু নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ তা-ই নয়, এটি ব্যক্তির চরিত্রের নিষ্ঠুরতাকেও নির্ভুলভাবে তুলে ধরে।  

একই ধরনের কথা এত বছর পর আবারও বললেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম শাহীন। তার এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পিলার ভেঙে পড়ার কারণ হিসেবে বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য রাতের আঁধারে কে বা কারা ধাক্কা দিয়ে ষড়যন্ত্র করে ঘরের একটি পিলার ফেলে দিয়েছে। নয়তলা প্রকাণ্ড এক ভবন রানা প্লাজা, যাতে কাজ করতো অন্তত ৫০০০ হাজার মানুষ, সেটাকে যদি আওয়ামী বয়ান মতে ‘স্তম্ভ’ ধরে নাড়াচাড়া করিয়ে ধসিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই অতি ক্ষুদ্র বাড়ির ‘স্তম্ভ’ তো ফেলে দেওয়া সম্ভবই। আসলে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একের পর এক বাড়ি নিয়ে হচ্ছে কী?

সমাজের একেবারে প্রান্তিক, ভূমিহীন মানুষের জন্য ছিল আশ্রয়ণ প্রকল্প। এতে প্রায় নয় লক্ষ মানুষকে ঘর দেওয়ার কথা ছিল। ইতোমধ্যে ৬৬ হাজারের বেশি মানুষকে ঘরের চাবি বুঝিয়েও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ঘর বুঝিয়ে দিতে না দিতেই ভেঙে পড়েছে অনেকের ঘর। প্রকল্পের প্রধান হিসাবে তলব পড়েছে সংশ্লিষ্ট ইউএনও’দের। ইতোমধ্যে ওএসডি করা হয়েছে ৫ জনকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এখন পর্যন্ত ২২ জেলার ৩৬ উপজেলায় ঘর তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। আরও অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

ঘর ভেঙে পড়েছে তৈরি হওয়ার পরে। কিন্তু ঘর তৈরি হওয়ার আগেই এই প্রকল্পের দুর্নীতির খবর মিডিয়ায় নিয়মিত এসেছে। ঘরের বরাদ্দ পাওয়ার জন্য দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা নেওয়া হয়েছে। কাউকে বলা হয়েছে বালি, সিমেন্টের দাম, কেউ দিয়েছেন ইলেকট্রিসিটি লাইন বসানোর খরচ। এমনকি স্রেফ ঘুষ বাবদও টাকা তোলা হয়েছে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছ থেকে। এমনকি টাকা পরিশোধ করার পরও ঘর পায়নি এমন খবরও এসেছে মিডিয়ায়। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক কিছু মানুষকে নিয়ে এমন কাণ্ড করা হতে পারে, এটা বোধ করি বর্তমান বাংলাদেশেই সম্ভব।  

এই প্রকল্পে বাড়িপ্রতি বরাদ্দ ছিল ১ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই প্রকল্পের বাজেট থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত তদারক করেছেন, তাই ধরে নেওয়া যাক এ ধরনের একটি ঘর নির্মাণে এই টাকাটি যথেষ্ট। তাহলে একের পর এক ঘর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার একটাই অর্থ দাঁড়ায়, আর তা হলো এই ঘর নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রাথমিক তদন্ত এবং গৃহীত ব্যবস্থা দুর্নীতির স্বীকৃতি দেয়।  

আমি বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করলাম, যেহেতু এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প, সেহেতু অনেকেই ভেবেছিলেন, এতে কোনও অনিয়ম/দুর্নীতি হবে না। এই ভাবনাটাই অপরিপক্ব এবং শিশুতোষ। এই দেশেই আমরা দেখেছি আমলারা কী বীভৎস দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য করে পুরো চাকরি জীবন একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনায় দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আপত্তিকর আচরণ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। কোথাও তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায় না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ৫৯৫৭ টাকায় বালিশ (যা ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ হয়েছে ৯৩১ টাকা), চেয়ার ৬ লাখ টাকায়, অন্যান্য প্রকল্পে ১০ হাজার টাকায় বঁটি, ১ হাজার টাকায় চামচ, ৩ লাখ ৩২ হাজার টাকায় দুধে পানি মাপার যন্ত্র, ২.৫ লাখ টাকায় বর্জ্য রাখার পাত্র, ৫৫৫০ টাকায় তালা, ১৮৯০ টাকায় বালতি, ৮৯৯৫ টাকায় ডাস্টবিন কেনার খবর আমাদের সবার জানা। একটা দেশে আমলারা কী পর্যায়ের দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত হতে পারে তার এক টেক্সট বুক এক্সাম্পল হতে পারে এসব ঘটনা।

আমলাদের বিষয়ে গত কয়েক বছরে যে কথাগুলো সর্বাধিক উচ্চারিত হয়েছে তা হলো তারা নিজেদের সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। বিশেষ করে সরকার গঠন এবং এর কার্যক্রম পরিচালনায় নিজেদের অপরিহার্যতা নিয়ে তাদের এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে প্রজাতন্ত্রের মালিক তারা। এর নমুনাও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা গেছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়নি। নানা প্রকার অনিয়ম আর দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত আমলারা হঠাৎ করেই সাধু হয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজের আগ্রহের এই প্রকল্পে সৎ থাকবেন, এমন ভাবার কোনও কারণ তো নেই। টিআইবি’র খানা জরিপ অনুযায়ী এই দেশে প্রতি বছর সরকারি কাজ করতে জনগণকে ঘুষ দিতে হয় ১২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে যদি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঘুষ এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

এদিকে মিডিয়ায় এই সংবাদও এসেছে, দুটি কক্ষ, রান্নাঘর ও শৌচাগারসহ ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি প্রস্থের মোটামুটি টেকসই ঘর তৈরিতে ব্যয় হওয়ার কথা কমপক্ষে আড়াই লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য যে নির্মাণ ব্যয় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা করা হলো, সেটাও ন্যূনতম ব্যয়ের চাইতে অনেক কম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি বরাদ্দের একটি টাকা দুর্নীতি না হয়ে থাকলেও বরাদ্দ ১ লাখ ৭১ হাজার টাকায় তৈরি করা ঘর কি বৃষ্টিতে বা নিজে থেকেই ভেঙে পড়ার কথা নয়?

ন্যূনতম ব্যয়ের এই হিসাব যদি সঠিক হয় তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারি, পরিকল্পনার একেবারে কেন্দ্রে এই গলদ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ আমলারা জেনেশুনে এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। খরচ কম করে বেশি সংখ্যক বাড়ি তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেদের অতি দক্ষ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তারা। ব্যয়ের এই হিসাব যদি সঠিক হয় তাহলে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নিযুক্ত ইউএনওদের আসলে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে; তাদের ওএসডি করা কিংবা অন্য কোনও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া তাদের ওপর পরিষ্কার অন্যায়।

এই দফায় হস্তান্তরকৃত ঘরের সংখ্যা ৬৬ হাজারের কিছু বেশি। এতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। এক মাসের মধ্যে আরও এক লক্ষ ঘর হস্তান্তরের কথা রয়েছে, যাতে ব্যয় হবে এক হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই পর্যায়ে মোট ব্যয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এই ঘরগুলো ভেঙে পড়বে সহসাই কিংবা কিছুকাল পরে। অর্থাৎ এই দেশের জনগণের টাকা নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করেছেন আমলারা। এই পর্যায়ের আমলাদের বিরুদ্ধে কি তাহলে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?

সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক আমলাদের তাদের চৌহদ্দির বাইরে ক্ষমতায়িত করার বিরুদ্ধে নানা মহল থেকে সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচনা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ নেতাও। এই দেশের রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের দক্ষতা-সততার সুনাম কি ছিল কোনোকালে? সাম্প্রতিক সময়ে মনে হচ্ছিল এই দেশে তারাই দক্ষতা-সততার প্রতিমূর্তি। এটা যে একেবারেই ভুল, সেটা আশ্রয়ণ প্রকল্প একেবারে স্পষ্ট করে দিলো।

দুর্নীতিতে অভ্যস্ত আমলারা কোনও ‘বিশেষ’ প্রকল্পে দুর্নীতিতে জড়িত হবেন না, রাখঢাক করবেন, এটা আসলে হয় না। সততা বা অসততা পিক অ্যান্ড চুজ করে হয় না। আমাদের মনে রাখা উচিত, দুর্নীতিবাজ মানুষ, হোন রাজনীতিবিদ কিংবা আমলা, আসলে ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব। ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব একদিন যেমনি তার স্রষ্টা ফ্রাংকেনস্টাইনকেও আক্রমণ করতে যায়, ঠিক তেমনি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত আমলাতন্ত্রের হাত থেকে রেহাই পায় না কোনও প্রকল্পই, এমনকি হোক না সেটা প্রধানমন্ত্রীর আবেগের সঙ্গে জড়িত।        

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে কেন এই মিথ্যাচার?

বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে কেন এই মিথ্যাচার?

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

পুলিশ সদস্য স্বামী নিচ্ছে খবর দিচ্ছে না খরচ, অভিযোগ স্ত্রীর

পুলিশ সদস্য স্বামী নিচ্ছে খবর দিচ্ছে না খরচ, অভিযোগ স্ত্রীর

কাউন্সিলর সোহেল হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রসহ আরও একজন গ্রেফতার

কাউন্সিলর সোহেল হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রসহ আরও একজন গ্রেফতার

সাত দিনই সারাদেশে গণপরিবহনে হাফ ভাড়া চান শিক্ষার্থীরা

সাত দিনই সারাদেশে গণপরিবহনে হাফ ভাড়া চান শিক্ষার্থীরা

নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে হিজাব প্রদর্শনী

নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে হিজাব প্রদর্শনী

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একশ্রেণির নেতার কাছে জিম্মি: জিএম কাদের

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একশ্রেণির নেতার কাছে জিম্মি: জিএম কাদের

ডুবোচরে আটকে গেলো ৪ শতাধিক পর্যটকবাহী জাহাজ

ডুবোচরে আটকে গেলো ৪ শতাধিক পর্যটকবাহী জাহাজ

চাকরি হারালেন বিমানের পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব

চাকরি হারালেন বিমানের পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির উদ্দেশ্য: তথ্যমন্ত্রী 

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির উদ্দেশ্য: তথ্যমন্ত্রী 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবার দুটি বিভাগ না রাখার সুপারিশ!        

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবার দুটি বিভাগ না রাখার সুপারিশ!        

ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের ‌‘পিটায়ে শোয়ায়ে’ দিতে বললেন সহকারী প্রক্টর

ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের ‌‘পিটায়ে শোয়ায়ে’ দিতে বললেন সহকারী প্রক্টর

শহীদ মিনারে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কফিনে শ্রদ্ধা

শহীদ মিনারে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কফিনে শ্রদ্ধা

‘ছাত্রদের আন্দোলনে ভর করে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে’

‘ছাত্রদের আন্দোলনে ভর করে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune