X
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

নির্বাচন কমিশন: বড় হোক সাংবিধানিক ক্যানভাস

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ২০:০৩

এস এম মাসুম বিল্লাহ  প্রতিবার নির্বাচন আসে আর আমাদের নির্বাচন কীভাবে হবে এই আলাপ বাড়ে। পঞ্চাশ বছর কেটে গেলো। একটা ঘাতসহ নির্বাচন ব্যবস্থা দাঁড়ালো না! এমনকি একটা নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে তা নিয়ে আমাদের বাহাসের শেষ নেই। অনুমান করি এ আলাপ অব্যাহত থাকবে।

নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। একজন থাকেন প্রধান, বাকিরা সদস্য। সাবেক নির্বাচন কমিশনার প্রয়াত বিচারপতি নাঈমুদ্দীন আহমেদকে একবার একটা অনুষ্ঠানে বলতে শুনেছিলাম, বাংলাদেশে ভালো নির্বাচন করার জন্য চার জন সৎ ও দৃঢ়চেতা মানুষই যথেষ্ট।

অতিরঞ্জিত শোনালেও কথাটার স্পন্দন ধরা যায়। আমাদের সংবিধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারকে (এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গকে) নির্বাচন কমিশনের খেদমতে পেশ করেছে। যেমন, ১২৬নং অনুচ্ছেদে বলা আছে: ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ সংবিধান থেকে শক্তি নিয়ে প্রশাসনকে হুকুম তামিল করানোর মতো মানুষ দরকার।

সে রকম মানুষ নেই আমাদের? থাকতেও পারে। দরকার খুঁজে বের করা। সার্চ!

৫৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন বানানোর একটা লিখিত আইন তৈরি করতে সরকারকে আহ্বান করেছেন। বিবরণে প্রকাশ, তারা আসলে ৫৪ জন। আমি ধরে নিলাম তিপ্পান্ন– ‘যাহা বাহান্ন, তাহা তিপ্পান্ন!’ তবে ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ তকমা খটকার জন্ম দেয়। আমরা সব নাগরিকই তো সমান।

ধরুন, ভিন্ন কোনও গোষ্ঠী বা সংগঠন বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করতে বললেন। তাহলে কি তাদের কথা গুরুত্ব পাবে না?

রাষ্ট্রপতি (জিল্লুর রহমান ও আব্দুল হামিদ) সার্চ কমিটি করে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে গত দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। আওয়ামী লীগ এবারও এই ফর্মুলায় আস্থা রাখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী সেটা সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানান দিয়েছেন। বিএনপির তরফে কোনও ফর্মুলা জানা যায় না। তত্ত্বাবধায়ক বা সেই গোছের কোনও সরকার না এলে নির্বাচন কমিশন কেমন করে হচ্ছে– এ আলাপ তাদের কাছে এই মুহূর্তে অতটা আগ্রহোদ্দীপক হওয়ার কথা নয়। তবু মনে হচ্ছে তারা ৫৩ নাগরিকের বক্তব্যে সওয়ার হতে চান।
 
বিধিবদ্ধ একটি আইন কেন দরকার? এর প্রথম যুক্তি হলো, এটা একটা সাংবিধানিক আজ্ঞা ও  অভিজ্ঞান। কমিশন গঠন করার ব্যাপারে এবং এর কাজের পরিধি বর্ণনার সময় সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ বেশ কয়েকবার ‘আইনের সাপেক্ষে’ কথাটির দোহাই দিয়েছে। তাই এমন একটি আইন না করার কোনও কারণ নেই। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, আইন দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য সদস্যদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও কর্মপরিধি ঠিক করা থাকলে একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন দল তাদের নিজস্ব পছন্দের মানুষ নিয়োগ দিতে পারবে না, অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনাররাও  তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।

তৃতীয়ত, একটা বিধিবদ্ধ আইন উপস্থিত প্রয়োজন চালানোর দায় থেকে সরকারকে নিষ্কৃতি দেবে। কমিশন গঠন প্রক্রিয়া একটা স্থায়ী রূপ পেলে, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু একটি আইন থাকলেই কি নির্বাচন সমস্যার সমাধান হবে? অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের খুব আশাবাদী করে না।
মার্কিন বিচারপতি হোমসের কথা ধার করে বলা যায়, ‘আইনের জীবন যুক্তির নয়, অভিজ্ঞতার।’

সংবিধান কর্তৃক তাগাদাপ্রাপ্ত অনেক আইন-ই তো আমাদের করার কথা ছিল, আছেও বোধহয় কয়েকটি। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি, কেউ রাখে না। আমাদের রাজনীতির পরিশুদ্ধি ঘটলো কোথায় আর নির্বাচন সমস্যার সমাধান হলো কোথায়? উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন থাকার কথা ছিল, নেই। ‘ন্যায়পাল আইন’ হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার আইন আছে, কিন্তু এখানে কসমেটিক ভাষায় ‘ফুলের মতো পবিত্ররাই’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্বাচনে দাঁড়ায় ও জেতে। তাই আইন হলেই যে সমস্যার সমাধান হবে না তার সপক্ষে শক্ত কিছু যুক্তি উত্থাপন করা যায়।

‘যার হয় না ছয়ে, তার হয় না ষাটে’। পঞ্চাশ বছর চলে গেছে, কারও মনে হয়নি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যে আলাদা একটা পূর্ণাঙ্গ আইন দরকার। যে কাজ পঞ্চাশ বছরে করতে পারা যায়নি, সে কাজ চার মাসে কেমন করে করা যাবে সেটা একটা প্রশ্ন।

একটু পেছনে যাই। বিএনপি ভাষ্যে দাবি করা হয়, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ প্রবর্তক। তো নির্বাচন কমিশন আইনের অনুপস্থিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র কীভাবে হয়েছিল তা প্রশ্ন তোলা সমীচীন হবে। সেই প্রশ্ন তো শুধু  বিএনপির কাছে নয়, এ প্রশ্ন সবার কাছেই, বিশেষত নতুন প্রজন্মের মানুষরা করতে চাইবেন।  
এরপর হলো, আইনটি বানাবে কে? বর্তমান বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত আইনটিকে যদি আলোর মুখ দেখতে হয়, তাহলে তা বানাতে হবে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদকে। সেটা কি বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে? একটা জোরালো মত রয়েছে যে বর্তমান সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত। সেই সংসদ মনোলোভা একটা আইন প্রণয়ন করবে, এই ভরসাটা আসলে কোথা থেকে আসে?

সেটা কি এই যে শেখ হাসিনা আর যা কিছুই করুন, এযাবৎ জাতীয় জীবনের নির্বাচন প্রসূত যেসব ভালো কিছু ঘটেছে তার সিংহভাগের প্রবক্তা তিনি? নাকি জনমতের চাপের মুখে ‘দুর্বিনীত’ মানুষ শেখ হাসিনাকে দিয়ে এরকম একটা আইন করিয়ে নেওয়া সম্ভব? তো সেই জনমত সৃষ্টির বাস্তবিক মেধাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচেষ্টাটি কোথায়?  

যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই আওয়ামী লীগের ‘শুভবুদ্ধির’ উদয় হলো, এবং ৫৩  নাগরিক প্রদত্ত খসড়ার ওপর পরিমার্জন করে তারা একটা আইন প্রণয়ন করলো। ধরা যাক, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই আইনে একটা ধারায় লিখলো, ‘নির্বাচন কমিশন গঠন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কোনও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন বা ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কোনও ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন কোনও দলের মতামত গ্রহণ করবেন না।’

তাহলে বিএনপি বা বিবৃতিদাতা বিশিষ্টজনদের অবস্থান কী হবে?

অথবা ধরা যাক, এসবের কিছুই থাকলো না, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কয়েকজন মানুষকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিলো। কিন্তু সেই কমিশনাররা শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক মানেন এবং সম্বোধনে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তাহলে বিএনপির মননে ও সংজ্ঞায় তাঁরা কি যোগ্য কমিশনার হবেন? এর সঙ্গে আমাদের ‘ড্রাফটিং পলিটিক্স’ তো আছেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা বর্ণনায় সামান্য ‘দৈনন্দিন কাজের’ সংজ্ঞা কি আমরা নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম?  
একটা আদর্শ আইন দিয়ে ফেব্রুয়ারি ২০২২ নাগাদ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হলেও তা বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, ইতোমধ্যে বিএনপির একটা শক্ত অবস্থান প্রতিভাত হয়েছে যে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ছাড়া ২০২৩ সালের নির্বাচনে যাবেন না। যদি তা-ই হয়, আলোচনায় আসা নির্বাচন কমিশন আইন তড়িঘড়ি করে করার কোনও মানে হয় না। সেটা নতুন সংকটের জন্ম দেবে।

আইন প্রণয়নে ‘প্রণয়’ ব্যাপারটা লাগে। এতে বোঝা যায়, আইন বানানোর প্রক্রিয়া সময় ভালোবাসা ও মনোনিবেশ দাবি করে। প্রাসঙ্গিকভাবে স্মর্তব্য যে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন (আব্দুল মান্নান খান, ২০১১)।
পরবর্তীতে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সেই বাতিলকে আরও সুসংহত করা হয়েছে।

তাই বিকল্প কোনও নির্বাচনকালীন সরকারের চিন্তা করে থাকলে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোকে নতুন কোনও সংবিধানসম্মত ফর্মুলা দিয়ে তা জনপ্রিয় করে তুলতে হবে এবং (সম্ভবত) নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে বা আলোচনা করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত দশ বছরে এরকম কোনও ফর্মুলা বিএনপি দিতে পারেনি এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে কিছু মন্ত্রণালয় ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের একটা সুযোগ বিএনপি গ্রহণ করেনি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হতে পারে, সার্চ কমিটি ফর্মুলার অবস্থান ও প্রকৃতি কী? উত্তর হচ্ছে, সার্চ কমিটির বর্তমান চর্চার মান একটা বিধিবদ্ধ আইন দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মান থেকে বেশ কিছু দিক দিয়ে বেশি সৌকর্য ও সৌন্দর্যমণ্ডিত।

এই চর্চা প্রথম শুরু করেন রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, ২০১২ সালে। তিনি প্রথমে ২৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করেন। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের পরামর্শ মতে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির (বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন) নেতৃত্বে তিনি ছয় সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। সার্চ কমিটির গঠনকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া হয়। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ‘নোটিফিকেশন’ও আইনের মর্যাদা পায়। সার্চ কমিটি প্রতি পদের বিপরীতে দুই জন করে কমিশনারের নাম প্রস্তাব করে, এবং রাষ্ট্রপতি এদের মধ্য থেকে চার জনকে সদস্য এবং একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে নির্বাচন কমিশন গঠন করেন।

২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি  জিল্লুরের ফর্মুলা অনুসরণ করে এটাকে একটা সাংবিধানিক রেওয়াজে পরিণত করেন। গতবার থেকে একজন নারী সদস্য যুক্ত হওয়ার বিধান পাকা করা হয়েছে।

টিপ্পনিতে বলে রাখি, সাংবিধানিক আইনবিজ্ঞানের এই জেন্ডার উপলব্ধি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমবার বিএনপি সক্রিয়ভাবে এবং দ্বিতীয়বার নিষ্ক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এক্ষেত্রেও বলা যায়, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই চর্চা একটা আইনের মর্যাদা পেয়েছে (অর্থাৎ ‘আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনও প্রথা বা রীতি’-দেখুন, অনুচ্ছেদ ১৫২, আইনের সংজ্ঞা)। এই চর্চার সুন্দর দিকগুলো হলো:
 
(১) সংলাপের মাধ্যমে এভাবে কমিশন গঠিত হলে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়। জনগণ খেয়াল করে বিধায়, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ফর্মুলা প্রদান ও কথাবার্তায় সতর্ক হয়। এ প্রক্রিয়ায় সার্চ কমিটিতে ও কমিশনের মনোনয়নে রাজনৈতিক দলগুলো এমন নাম প্রস্তাব করে যে, যাতে তাদের প্রস্তাবিত নামটি শ্রেয়তরভাবে অন্য দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। নাগরিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন বিধায়, এখানে অংশীমূলক গণতন্ত্রের চর্চা হয়। যেমন, এটা ভাবতেই কারও ভালো লাগতে পারে যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বা ড. মোহাম্মদ সাদিকের মতো ব্যক্তিত্বরা নাগরিক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছেন!

জনগণের ক্ষমতা অনুশীলনের একটি ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যময় উদাহরণ এটা। এভাবে গঠিত কমিশনের সদস্যরা মনে করতে থাকেন যে তারা সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিশনার হয়েছেন। সুতরাং, তাদের কাউকে ভয় পাবার কিছু নেই। মূলত রাজনৈতিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ অনুমোদন কোনও পাবলিক-ক্ষমতা অনুশীলনের মূল শক্তি।

(২) সংবিধান অনুসারে [অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩)] রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এই সাংবিধানিক লাউঞ্জটি বড় ক্যানভাসে মেলে ধরেছেন। সংলাপের আবহ থাকায় সার্চ কমিটি প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেওয়ার বিধানকে বেশ খানিকটা নিষ্প্রভ করে দেয়। বিধিবদ্ধ আইন প্রক্রিয়ায় সেটা সম্ভব নয়। বিধিবদ্ধ আইন দিয়ে সংবিধানে লেখা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শের বিধান উপেক্ষা করা যায় না।
 
সংলাপপ্রসূত বিষয়ে লিখিত সংবিধানিকতার ওপর অলিখিত সাংবিধানিক প্রজ্ঞার জয় হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনুশীলন ব্যাপারটা ওই ৪৮(৩)-এর দ্বিতীয় অংশের ওপর জোর আরোপ করে: ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনও পরামর্শদান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কী পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।’ দলীয় পরিচিতি থাকলেও রাষ্ট্রপতি জিল্লুর এই চর্চাকে ৪৮(৩) প্রভাব-বলয়ের বাইরে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মুনশিয়ানা দিয়ে।
 
(৩) ব্রিটিশ সাংবিধানিক আইনে সাংবিধানিক কনভেনশন বা রেওয়াজ সাংবিধানিক আইনের উৎস। বিচারপতি আব্দুল মতিন তাঁর ‘আনরিটেন কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ’ (মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১৯) বইয়ে দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশ সংবিধানেও কিছু অলিখিত রীতিনীতি আছে, যা সাংবিধানিক আইনের মর্যাদা পেতে পারে। যেমন, বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের সাথে রাষ্ট্রপতির পরামর্শের রীতি। তেমনি, ইদ্রিসুর রহমান মামলায় (২০১০) সুপ্রিম কোর্ট সাব্যস্ত করেছেন যে সাংবিধানিক রীতিনীতি সাংবিধানিক আইনের সমকক্ষ।

তাই বলা যায়, সংলাপের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা একটা সাংবিধানিক রীতিনীতিতে পরিণত হয়েছে বা হওয়ার মতো পরিপক্ব অবস্থায় রয়েছে। আমরা এ চর্চাকে বাংলাদেশে কতটুকু এগিয়ে নিয়ে যাবো সেটাই দেখার বিষয়।
 
মার্কিন বিচারপতি ফ্রাঙ্কফার্টার-এর একটা কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি মনে করতেন যে সবকিছুকে আক্ষরিক চোখ দিয়ে দেখা মানে হলো সংবিধানিকতাকে সাংবিধানিক প্রজ্ঞার সমান করে ফেলা। এটা উদারনৈতিকতার পরিপন্থী। দার্শনিক এমানুয়েল  কান্টের কথাও এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে: “Woe to the political legislator who aims in his Constitution to realize ethical purposes by force, to produce virtuous institution by legal compulsion. For in this way, he will not only effect the very opposite result, but will undermine and endanger his political Constitution as well.”
 
একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে সার্চ কমিটি চর্চা যদি এমন ভালোই হবে তাহলে কাজী রাকিবুদ্দিন আহমেদ বা নুরুল হুদা কমিশন জনমনে এমন খারাপ ভাবমূর্তি তৈরি করলো কেন? এর কারণ খুঁজতে গেলে একটা আলাদা প্রবন্ধ লিখতে হবে।

এখানে শুধু এটুকু বলা যাবে, ২০১৪ বা ২০১৯ সালের নির্বাচনের মান শুধু নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আলাদা সুনির্দিষ্ট দায় রয়েছে। আগেই বলেছি, নির্বাচন কমিশনের শক্তি নির্ভর করে সেটা রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষ করে প্রধান প্রধান) কতটুকু একে নিজস্ব ভেবেছে তার ওপর। নুরুল হুদা কমিশন (২০১৭) গঠন আলোচনায় বিএনপি অংশ নেয়নি (এটা তাদের একান্তই নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত)।
 
আপন না ভেবেও তারা এর অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর বড় একটা কারণ হলো, তারা অন্তত একজন মাহবুব তালুকদারকে তাদের ভাষায় কমিশনের ‘বিবেক’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাছাড়া অতীতে বিএনপি যে মডেলের নির্বাচন কমিশন উপহার দিয়েছে (কে এম সাদেক, আব্দুর রউফ, এমএ আজিজ প্রমুখ), তা থেকে রাকিবুদ্দিন কমিশন বা নুরুল হুদা কমিশন ভালো না হলেও বেশি মন্দ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

এমএ আজিজ কমিশনের ‘পাগলামি’ এখনও মানুষের মনে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। নিকট অতীতে দেখা যায় যে টালমাটাল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কেএম শামসুল হুদা কমিশন শ্রেয়তর ভালো নির্বাচন করেছেন, এর কারণ হলো সব বড় রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থন পেয়েছিল হুদা কমিশন (২০০৯)।

হুদা কমিশনের সময় রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল না সত্যি, কিন্তু সেটা ১৩তম সংশোধনী প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না মোটেও।

তাহলে লিখিত বিধিবদ্ধ আইনে নির্বাচন কমিশন গঠন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনও ফল বয়ে আনবে না। সার্চ কমিটির মাধ্যমে সেটি হলে তা কিছুটা হলেও ভালো হবে। দীর্ঘ অনুশীলনের পর, একপর্যায়ে এটা লিখিত আইনি রূপ পেতে পারে। তাহলেই সেটা যদি মজবুত হয়!

আনুষঙ্গিক হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে দুই একটা কথা বলা দরকার। কারণ, বিনম্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি (cultural humility) একটা দেশের আইন ব্যবস্থার চেহারা মূর্ত করে তোলে। শুধু সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে ‘সাংবিধানিকতাবাদ’ হয় না। মার্কিন অধ্যাপক মার্ক টাশনেট একবার বলেন যে সুপ্রিম কোর্টের (মার্কিন) উঠান থেকে সংবিধানকে লোকচর্চায় আনতে হবে (টাশনেট, ‘টেকিং দ্য কনস্টিটিউশন এওয়ে ফ্রম দ্য কোর্টস, প্রিন্সটন, ১৯৯৯)। প্যাটি স্মিথের একটা পপ গান ব্যাপারটা চমৎকার করে ধরেছে (১৯৮৮):

The People Have the Power
To Redeem the Work of the Fools
Upon the Meek the Graces Shower
It's Decreed--
The People Rule.

একটা রাজনৈতিক সমাজকে সংবিধান পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হয়। একটা সংলাপময় আবহ জারি রাখলে আইনের শাসনের লাভ হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে দেশ পরিচালনাকারীদের মতবিনিময় চর্চা অব্যাহত রাখা উচিত।

অধ্যাপক বিউ ব্রেসলিন তাঁর বইয়ে লেখেন (২০০৯): ‘রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতার খোঁজে সংবিধান বানানোর কাজ শুরু হয় সংবিধানের ভাষা ও নাগরিকের মধ্যে রূপক সংলাপের মধ্য দিয়ে।’ সম্ভবত এটাকেই বিখ্যাত আর্জেন্টাইন সংবিধান বিশেষজ্ঞ রবার্তো গার্গারেলা নাম দিয়েছেন ‘ডায়ালজিক কনস্টিটিউশনালিজম’।
যে সংকট আমাদের জাতীয় জীবনকে নিয়মিত বিরতিতে তাড়িত করে, সে সংকট আমাদের জবান (word) ও জগতের (world) মধ্যে গরমিলের। আমাদের রাজনীতিকদের উচিত প্রতিশ্রুতি (word), বাস্তবতা (world) ও জবাবদিহিতার (accountability) মধ্যে সমন্বয় ঘটানো। বৃহৎ আমাদের সাংবিধানিক ক্যানভাস। সেখানে যে  বাধা তা মূলত ক্ষমতা অনুশীলন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার, সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের এবং আক্ষরিক ও চেতনাগত  দৃষ্টিভঙ্গির । এই বাধাগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে।

নেলসন ম্যান্ডেলার একটা কথা দিয়ে শেষ করি। ম্যান্ডেলা বলেন যে, ‘আইনের শক্তি আইন থেকে আসে না, আসে আইন মানার সক্ষমতা থেকে। একটা সংবিধানের মহত্তম প্রভাব লুকিয়ে থাকে এর একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সমাজ প্রতিমূর্ত করে তোলার ক্ষমতা থেকে।’
 
লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

দায় ও ব্যর্থতা কার?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৩৭
প্রভাষ আমিন আমাদের দেশে কোনও একটা ঘটনা ঘটলে রাজনীতিবিদদের প্রথম কাজ দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো। তদন্ত শুরুর আগেই তারা বলে দিতে পারেন, ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি আওয়ামী লীগ এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে সরকারই এই হামলা করিয়েছে।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, অনেককে গ্রেফতার করেছে। আমি পুলিশের তদন্তে আস্থা রাখতে চাই। তাই রাজনীতিবিদদের মতো চট করে কাউকে দায় দিতে চাই না। এমনিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক ধারার নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। আর সাম্প্রদায়িক ধারার মূল নেতৃত্ব বিএনপির কাঁধে। কিন্তু সবসময় সবকিছু এমন সরল হিসাবে চলে না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার উদাহরণও আমাদের সমাজে কম নয়।

পুলিশের তদন্তের ওপর আস্থা রাখার কথা আগেই বলেছিল। সেই আস্থার প্রতিদান তারা দিয়েছে। কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোনও সিসিটিভি ছিল না। কিন্তু আশপাশের একাধিক সিসিটিভির ফুটেজ মিলিয়ে ঘটনার ধারাক্রম তৈরি করেছে পুলিশ। তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা গেছে। তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট, পুরো ঘটনাটিই পরিকল্পিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্যই এটা করা হয়েছে। গভীর রাতে ইকবাল হোসেন নামে এক যুবক পাশের মসজিদ থেকে একটি পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে পূজামণ্ডপে ঢোকে এবং হনুমানের হাতের গদাটি কাঁধে করে বেরিয়ে আসে। তার মানে এই দুর্বৃত্ত কোরআন শরিফটি হনুমানের পায়ে রেখে সেখান থেকে গদাটি নিয়ে বেরিয়ে আসে। ভোরে ইকরাম নামে একজন পূজামণ্ডপে গিয়ে কোরআন শরিফ দেখে ৯৯৯-এ ফোন করে। পুলিশ আসার পর ফয়েজ নামের একজন ফেসবুকে লাইভ করে উত্তেজনা ছড়ায়।

পুলিশ ইকরাম আর ফয়েজকে আগেই গ্রেফতার করেছে। তবে ইকবালকে এখনও ধরা যায়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আপাতত যে তিন জন এই ষড়যন্ত্রের সামনে আছে, তারা তিন জনই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইকবালের মা আমেনা বিবি দাবি করেছেন, তার ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। তবে স্রেফ মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তার অপরাধকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। ইকবাল উন্মাদ, তবে ধর্মোন্মাদ।

ইকবালের মতো ধর্মোন্মাদরাই বারবার বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। ছেলেকে মানসিক ভারসাম্যহীন বললেও আমেনা বিবি তার শাস্তি চেয়েছেন, ধরে তাকে মেরে ফেলার দাবি করেছেন। এমনকি মা হয়ে ছেলের লাশও নেবেন না বলে জানিয়েছেন। তার ছেলের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গার সহিংসতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এমন কুলাঙ্গার ছেলে জন্ম দিয়েছেন বলে নিজেকেই নিজে অভিশাপ দিয়েছেন।

‘অশিক্ষিত’ আমেনা বিবি তার সন্তানের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হলেও আমাদের দেশের একটি মহল পুরো ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা জজ মিয়া নাটকের কথা বলছেন। সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে সন্দেহের কথা বলছেন। তাদের এই সন্দেহের কারণ, অপরাধের দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। ঘুরেফিরে মুসলিম নামধারী দুর্বৃত্তদের কাঁধেই চলে আসছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরও বেশি চাপে ফেলা গেলো না বলে অনেকের খুব আফসোস। আমি আগেও লিখেছি, কোনও ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই কাজ করতে পারে না। কারণ, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষে কোনোভাবেই কোরআন অবমাননা করা সম্ভব নয়। আবার কোনও ধর্মপ্রাণ হিন্দুর পক্ষেও এটা করা সম্ভব নয়। কেউ চাইবে না নিজের বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবটি মাটি হয়ে যাক। বিষয়টি পরিষ্কার, কিছু ধর্মোন্মাদ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ছুতো খোঁজার জন্য এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এক দু’জন ব্যক্তির অপরাধের দায় আমি কখনোই কোনও সম্প্রদায়ের ওপর দিতে চাই না। সেটা হিন্দু হলেও না, মুসলমান হলেও না। ইকবাল, ইকরাম, ফয়েজ মুসলিম ঘরের সন্তান হলেও তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পায়নি। তারা কোরআন অবমাননা করেছে, ইসলামকে খাটো করেছে। এরা দুর্বৃত্ত, এরা ধর্মোন্মাদ; এদের কঠিন শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে।

পর্দার সামনের তিন কুশীলবকে চিহ্নিত করা গেলো। তাদের দু’জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পর্দার পেছনে আরও বড় কুশীলবরা রয়েছে। এই তিন যুবকের পক্ষেই এত বড় ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই পেছনের কুশীলবদেরও চিহ্নিত করতে হবে, ধরতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মের নামে সন্ত্রাস করার সাহস না পায়।

ঘটনার ধারাক্রম জানা গেলো। সামনের দায়ীদেরও পাওয়া গেলো। কিন্তু আমি ভাবছি, কুমিল্লার এই ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবটি যে পণ্ড হয়ে গেলো; চাঁদপুর, চৌমুহনী, চট্টগ্রাম, পীরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হলো, লুটপাট হলো, অগ্নিসংযোগ হলো, নারীদের নির্যাতন করা হলো; তার দায় কে নেবে? হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে যে নিরাপত্তাহীনতার গভীর ক্ষত তৈরি হলো, তার উপশম হবে কোন উপায়ে?

মুসলমান ভাইদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা, কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী কে সেটা না জেনেই আপনার চিলের পেছনে দৌড়ালেন, মন্দিরে হামলা করলেন, লুটপাট করলেন; এটা কি আপনার ধর্ম অনুমোদন করে, ইসলাম ধর্ম কি কখনও অন্য ধর্মের ওপর আঘাত করাকে সমর্থন করে? আপনারা যে না জেনে না বুঝে হামলা করলেন তার জন্য কি এখন আপনাদের মনে কোনও অনুশোচনা হচ্ছে, গ্লানি হচ্ছে?

আপনারা যে ধর্মের নামে অধর্ম করে পাপ করলেন, সেটা কি আপনারা বুঝতে পারছেন? তবে পরকালের পাপ হবে, এটুকু বলেই এই ধর্মোন্মাদদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যারা ফেসবুকে উসকানি দিয়েছে, যারা হামলা করেছে; তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

কুমিল্লার ঘটনার তিন দায়ীকে চিহ্নিত করা গেলেও দায় কিন্তু সরকারকেও নিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সহজাতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অপরাধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশজুড়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকে, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু রামু, নাসিরনগর, ভোলা, অভয়নগর, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সর্বশেষ শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর যে হামলা হয়েছে; তাতে সেই ধারণা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। প্রবল পরাক্রমশালী সরকারও সংখ্যালঘুদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাই শৈথিল্য, গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় সরকার এড়াতে পারবে না। কুমিল্লার ঘটনা না হয় সরকার টের পায়নি, কিন্তু কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যা হলো, সেটা প্রশাসন ঠেকাতে পারলো না কেন?

বিএনপি-জামায়াতকে সরকার রাস্তায়ই নামতে দেয় না। সেখানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কীভাবে মাইকে ঘোষণা দিয়ে, ফেসবুকে উত্তেজনা ছড়িয়ে হামলা চালালো? পুলিশ তাদের ঠেকাতে পারলো না কেন? কেন কুমিল্লার ঘটনার চার দিন পর রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো?

সরকারি দল হিসেবে যেমন আওয়ামী লীগের দায় আছে, তেমনি সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে দায় নিতে হবে। এখন তো দেশে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। কোথাও তাদের মুখের ওপর কথা বলার মতো কেউ নেই। ছাত্রলীগ-যুবলীগের ভয়ে সবাই অস্থির। কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, চৌমুহনী, পীরগঞ্জ– যেসব জায়গায় হামলা হয়েছে, সব জায়গায় আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য। তাহলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সেখানে প্রতিরোধ গড়তে পারলো না কেন? ঘটনা সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের সম্প্রীতি সমাবেশ আসলে সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। ভোটের হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে হবে। সরকারকে জিরো টলারেন্সে সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার করতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তো বটেই, সব মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৫

আবদুল মান্নান বুধবার এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখন বাংলাদেশে তিনটি প্রধান ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন। মুসলমানের ঈদে মিলাদুন্নবী (ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন), সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্মীপূজা আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমা। সাধারণত, এমনটি সব সময় হয় না। দুই-একদিন আগে পিছে হয়। এবার এমন একসময় এই তিন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান একই দিনে হলো, যখন গত কয়েক দিনে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ঘটে গেছে। এই সহিংস ঘটনায় কয়েকটি স্থানে সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ নষ্ট হয়েছে, দিনে আনে দিনে খায় এমন কিছু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে, আর দেশের অনেক স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে ভয় ঢুকে গেছে। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন দু’একটা ঘটনা ঘটলেও তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতার কারণে তেমন একটা বেশিদূর গড়ায়নি। এবার তার কিছু ব্যতিক্রম দেখা গেলো। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন  যদি আরও একটু সচেতন হতো তাহলে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছিল না। তারা হয়তো বুঝতে পারেনি এমন একটি ঘটনা ঘটানোর জন্য একটি মহল দীর্ঘদিন পরিকল্পনা করেছে এবং শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হলে তাদের এই ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে। টার্গেট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর সরকারকে বিতর্কিত করা এবং আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে যে সুসম্পর্ক বর্তমানে আছে তা প্রশ্নবিদ্ধ করা। তারা ভুলে গেছে ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলমান বাস করে এবং এই দুর্বৃত্তদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে ভারতে বসবাসরত মুসলমানরা বিপদে পড়তে পারে।  ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন এসব সহিংস ঘটনার পেছনে যারাই আছে বা যারা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তির বিধান করার জন্য।

সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশে এই বছর ৩২ হাজার ১১৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই হাজারটি বেশি। কোনও কোনও সূত্রমতে এবার মোট দুর্গাপূজার সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার। বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে এই পূজার ব্যবস্থা তো হয়েছিলই, তবে তার চেয়ে বেশি হয়েছে অস্থায়ী মণ্ডপে। প্রধানমন্ত্রী নিজ তহবিল হতে তিন কোটি টাকা দিয়ে এসব পূজায় অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে, একে অপরের অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগ করেছে। একসঙ্গে দেশকে মুক্ত করার জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করে রক্ত ঝরিয়েছে।  কে হিন্দু আর কে মুসলমান তা কখনও বিচার্য ছিল না।

১৯৬৪ সালে যখন ভারতের কাশ্মিরের হজরত বাল মসজিদ হতে হজরত মুহাম্মদ(সা.)-এর কেশগুচ্ছ চুরি হয়ে গিয়েছিল বলে খবর রটে, তখন এই দেশে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ তাকে কেন্দ্র করে অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা সফল হয়নি। ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ এই ব্যানার নিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং তার নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরও এই মহলটি আবার অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল, তবে জনগণের প্রতিরোধের মুখে তারা তেমন সফল হয়নি।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে। দেশটির ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের যে চারটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তার অন্যতম ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। দেশটির প্রবাদ পুরুষ ও যার নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে মানুষকে বুঝিয়েছিলেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র অর্থ ‘ধর্মহীনতা’ নয়। এর অর্থ যার যার ধর্ম সে সে শান্তিতে পালন করবে, রাষ্ট্র সেখানে কোনও হস্তক্ষেপ করবে না আর রাষ্ট্র কোনও ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতাও করবে না। শেখ মুজিবকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করার পর কয়েক সপ্তাহের মাথায় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আসেন। তিনি প্রথমে যে কাজটি করেন তা হচ্ছে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারাটি তুলে দেন। বলেন, একটি মুসলমান প্রধান দেশে এটি বেমানান। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মাশ্রিত দলগুলো, যেমন- মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি প্রভৃতি দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, এই দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে। জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার দোহায় দিয়ে এসব দলকে আবার রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। নিজে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সেখানে এসব একসময়ের নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেন। বিএনপি’র রাজনীতির প্রধান মূলধন ছিল ভারত বিরোধিতা আর সাম্প্রদায়িকতা।

১৯৮১ সালে জেনারেল জিয়া এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে দলটির হাল ধরেন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি তাঁর স্বামীর চেয়েও বেশি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত বিরোধিতার আশ্রয় নেন। নির্বাচন এলেই বলতেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি পড়বে।

২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছিলেন একাত্তর সালে যারা সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল সেই জামায়াতে ইসলামের দুই শীর্ষ নেতাকে। বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী (বর্তমানে প্রয়াত) সংসদে বলেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করা বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর স্থলে বর্তমানে লন্ডনে পলাতক বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও ভারতে অস্ত্র পাচারের অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। লন্ডনে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।

শারদীয় দুর্গোৎসবকে নিয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে পূর্ব পরিকল্পিত। ঘটনার সূত্রপাত সপ্তমীর দিন। কুমিল্লায় একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপের বাইরে স্থাপিত একটি ছোট প্রতিমার কোলের ওপর ভোরের আলো ফোটার আগেই কে বা কারা মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন রেখে মোবাইলে তার ছবি ধারণ করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয় আর বলে ‘শেখ হাসিনার শাসনকালে এই দেশে ইসলাম ধর্মও এখন নিরাপদ নয়’। অথচ কোনও পাগলও বিশ্বাস করবে না এই কাজ কোনও সনাতন ধর্মাবলম্বী করতে পারে। ভোরের আলো ফোটার পরপরই সেখানে জড়ো হয় কয়েকশ’ জামায়াত কর্মী আর ছিন্নমূল বস্তিবাসী। যদিও খবর পেয়েই স্থানীয় পুলিশ সেই কোরআনের কপি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছিল। বিএনপি গত কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নাশকতা কার্য পরিচালনা করার জন্য জামায়াতের সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রশিবিরকে ব্যবহার করে। এই ঘটনার দু’দিন পর শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র জুমার দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুমিল্লার ঘটনা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে  অনেক জায়গায় ভুয়া ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে এই অজুহাতে এর ফলে বেশ কয়েক জায়গায় পূজামণ্ডপ আর মন্দিরে হামলা করে ভাঙচুর করা হয়। এমনকি পূজার দুই-তিন দিন পরেও অনেক স্থানে দোকানপাট ও বসতবাড়িতে হামলা করা হয় এবং কোনও কোনও স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।  শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে এমন ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী সময় মতো বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। পারলে যে ঘটনা কুমিল্লায় শুরু হয়েছিল তা সেখানেই শেষ হয়ে যেত।

এটি ধারণা করার যথেষ্ট কারণ আছে ষড়যন্ত্রটা শুরু হয় বেশ কয়েক দিন আগে। এর আগে বিএনপি সাংগঠনিক সভার আড়ালে ছয় দিন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে, যেখানে লন্ডন থেকে তাদের ভারপ্রাপ্ত পলাতক চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিল। সপ্তম দিনে তাদের মতাদর্শে দীক্ষিত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গেও তারেক সভা করেছে। এটি এখন পরিষ্কার যে, যদিও বলা হচ্ছে এটি ছিল সাংগঠনিক সভা, আসলে এটি ছিল ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে জেতার কর্মকৌশল নির্ধারণ করা এবং তার আগে বর্তমান সরকার ও শেখ হাসিনাকে বিব্রত করা। এটি বুঝতে প্রশাসনের সময় লেগেছে। সাধারণত, কোনও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সভা সাত দিনব্যাপী হয় না।

গত কয়েক দিন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র জনতা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক,আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, প্রগতিশীল সুশীল সমাজ রাস্তায় নেমেছে, ঘটনার প্রতিবাদ করেছে। বলেছে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ।  মিছিল ও সমাবেশ করেছে, ইতোমধ্যে প্রায় চারশত পঞ্চাশ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা এই সন্ত্রাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার  জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। মন্দিরসহ যেসব স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়েছে তা মেরামত করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটা ঠিক, বিএনপি বা তার সমমনা দলগুলো আগামীতেও এই ধরনের নাশকতা চালাতে পারে। কারণ, সামনের নির্বাচনে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া চাই। পাঠকদের মনে আছে, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত মিলে দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল তাতে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। পেট্রোলবোমায় প্রায় ১৬৬ জন  নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল,সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল কমপক্ষে তিনশ’ কোটি টাকার। এই সহিংসতা পরিচালনা করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং বিএনপি প্রধান বেগম জিয়া। নব্বই দিন তিনি গুলশানের নিজ দফতরে থেকে এই সহিংসতা পরিচালনা করেছিলেন।

এখনও সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি’র কর্মকাণ্ড চলছে। দৃষ্টি ২০২৩ সালের সাধারণ সংসদ নির্বাচন।  যদিও এই মুহূর্তে নেতৃত্ববিহীন এই দলটির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ, বিশেষ করে যখন দেশটির অর্থনীতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার চেয়ে এগিয়ে আর বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। যখন দুর্বৃত্তরা দেশের কোনও কোনও জায়গায় এই ধরনের সহিংসতায় লিপ্ত তখন উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাটে একই প্রাঙ্গণে মসজিদ আর মন্দিরের সহ-অবস্থানের ছবি দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মন্দিরে বেশ নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসবও হয়েছে।  বাস্তবে সত্তরটির মতো পূজামণ্ডপে সহিংসতা হয়েছে বাকি পূজামণ্ডপগুলোতে পূজা যথাযথভাবে চলেছে, সময় মতো বিসর্জন হয়েছে। অনেক স্থানে এলাকার মানুষ রাত জেগে মন্দির, পূজামণ্ডপ পাহারা দিয়েছে। এটাই তো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনা প্রায় বলেন ‘ধর্ম যার যার উৎসব সভার’। এর চেয়ে সম্প্রীতির স্লোগান আর কী হতে পারে। সব শেষে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বাণী দিয়ে লেখাটি শেষ করি। তিনি তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে’।  এর আগে সংগঠিত এমন সহিংস ঘটনাগুলোর বিচার হলে হয়তো এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গত কুড়ি বছরে এ ধরনের কোনও সহিংস ঘটনার এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি।  এবার হবে আশা করি।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

তালেবানের আফগানিস্তান পুনর্দখল ও নতুন আতঙ্ক

তালেবানের আফগানিস্তান পুনর্দখল ও নতুন আতঙ্ক

বাংলাদেশ কি করোনা যুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের কাছেও হেরে যাচ্ছে?

বাংলাদেশ কি করোনা যুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের কাছেও হেরে যাচ্ছে?

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১.
কয়দিন থেকে আমার নিজেকে অশুচি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি বুঝি আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত হয়ে আছি। শুধু আমি নই, এই দেশে আমার মতো অসংখ্য মানুষের একই অনুভূতি, মনে হচ্ছে জাতির একটি বড় একটি অংশ বিষণ্ণতায় ডুবে আছে।

কারণটি নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পারছেন। যে দুর্গাপূজাটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আনন্দোৎসব হওয়ার কথা সেটি এবারে সবচেয়ে বড় তাণ্ডবের কেন্দ্রস্থল। আমি যে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেবো সেটিও করতে পারছি না। কুমিল্লা থেকে শুরু হয়ে এটি শুধু কুমিল্লায় থেমে থাকেনি, বলতে গেলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যার অর্থ সারা দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক মানুষ রয়েছে, তারা লুকিয়ে নেই, তারা প্রকাশ্যে আছে, বুক ফুলিয়ে আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে এই দেশে ৩৬৮৯ বার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পর হামলা হয়েছে। যারা সংখ্যাটি কত ভয়ানক অনুভব করতে পারছেন না তাদের অন্যভাবে বলা সম্ভব, এই দেশে গড়ে প্রতিদিন একবার কিংবা তার বেশি দেশের কোথাও না কোথাও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে! এটি হচ্ছে প্রকাশিত তথ্যের কথা, প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও বেশি। এই দেশটি আমরা যেভাবে গড়ে তুলবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এই দেশের শতকরা দশভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয় তারা কেমন আছেন, তাদের কেউ কী বলবেন ভালো আছেন? একটা দেশ কেমন চলছে সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে সেই দেশের সংখ্যালঘুদের জিজ্ঞেস করা তারা কেমন আছে। তারা যদি বলে ভালো নেই তাহলে বুঝতে হবে দেশটি ভালো নেই।

সেজন্য আসলে আমরাও ভালো নেই। আমি ক’দিন থেকে আমার হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না। তীব্র এক ধরনের লজ্জা এবং অপরাধবোধে ভুগছি। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে এই বিষয়টি নতুন করে সবার সামনে এসেছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এটি প্রথমবার হয়েছে, কিংবা এটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কেউ কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি হঠাৎ করে ফেলেছে। এই ভয়ংকর সাম্প্রদায়িকতা এখানে বহুদিন থেকে শিকড় গেড়েছে, আমরা কেউ কেউ নিজেদের মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করছি, কেউ কেউ এটাকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমরা যে আসলে আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত, কেন আমরা সেই সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করি? কেন ভাণ করি সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে? বিষয়টির একটু গভীরে গেলেই আমরা টের পাই সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে না। যে দুর্গাপূজায় একটি হিন্দু শিশুর আনন্দে আত্মহারা থাকার কথা, কেন সেই দুর্গাপূজায় শিশুটির বুকে ভয়ের কাঁপুনি? আমরা কেন এই শিশুদের বুকে আগলে রক্ষা করতে পারি না?

২.

যখন পূজার সময় আসে, সারা দেশে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন থেকে আমি নিজের ভেতর এক ধরনের চাপা অশান্তি অনুভব করি। অবধারিতভাবে খবর পাই দেশের এখানে সেখানে সেই প্রতিমা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যখন পূজা শুরু হয় তখন আমি নিশ্বাস বন্ধ করে থাকি, যারা শোলাকিয়া ঈদের জামাতেও বোমা মারতে প্রস্তুত তারা পূজার অনুষ্ঠানে না জানি কী করার চেষ্টা করে। যখন সবকিছু শেষ হয় আমি শান্তির নিশ্বাস ফেলি।

আমার মতো অতি সাধারণ একজন নাগরিকের ভেতর যদি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে এক ধরনের চাপা অশান্তি থাকে তাহলে কী এই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সময়টিতে ঘুম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা নয়? দুঃখটা আমার এখানে, আমি জানি তারা চাইলেই একটা তাণ্ডব থামাতে পারে। আজকাল এই দেশের পুলিশ বাহিনী অনেক করিৎকর্মা, আমার হিসাবে এই বিষয়গুলো তারা আমাদের থেকে আরও অনেক ভালো করে জানে। তাই কুমিল্লার অবাস্তব ষড়যন্ত্রটির খবর ভোর সাতটার সময় পাওয়ার পরও বেলা ১১টায় তাণ্ডব শুরু হতে দেওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে যখন আমরা জানতে পেরেছি ভোরবেলা থেকে ওসি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই দেশে আগে অনেকবার এরকম ঘটনা ঘটেছে। কাজেই বিষয়গুলো কীভাবে দানা বাঁধে তা এখন আর কারও জানতে বাকি নেই। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয়ের পর এই দেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে আছে সেটি তো কারও অজানা নয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তানে শুক্রবারে জুমার নামাজে বোমা হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আমাদের দেশেও কোনও একটা ধর্মান্ধ ষড়যন্ত্র দানা বাঁধলেও যে শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার একটা শোডাউন হয় সেটাও তো আমরা বহুকাল থেকে দেখে এসেছি। কমন সেন্সের এতগুলো বিষয় আমরা সবাই জানি কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে না, এবং সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে না, এটা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি? হতদরিদ্র একজন জেলের সহায় সম্পদ সবকিছু পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র যদি নতুন করে তার ঘরবাড়ি তৈরি করেও দেয়, তারপরেও কী তার বুকের ভেতরের যে আতঙ্ক, হতাশা, দুঃখ, কষ্ট এবং অসহায় অভিমানের জন্ম হয়, আমরা কী তার এক বিন্দুও দূর করতে পারবো? এই দেশের নাগরিক হয়ে শুধু নিজের ধর্মের কারণে তাদের একটি অসহায় আতঙ্কে জীবন কাটাতে হবে, সেটি কেমন করে মেনে নেওয়া যায়?

এখানে রাষ্ট্রের অনেক বড় দায়িত্ব, কিন্তু আমরা যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনি তখন এক ধরনের হতাশা অনুভব করি। কিছু একটা ঘটলেই তারা চোখ বন্ধ করে মুহূর্তের মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দোষ চাপিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যান। যদি এর মাঝে সত্যতা থাকেও তাদের এই ঢালাও রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে সেটি তার নিজের দলের মানুষও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষ তখন অনুমান করে নেয় রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনেতারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তরিক নয়, হয়তো তারা এটাকে একটা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখিয়ে তার থেকে কোনও একটা সুবিধা নিতে চান। অথচ মূল কথাটি খুবই সহজ, কেন এটি ঘটেছে তার খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা জেনে কোনও লাভ নেই, ঘটনাটি না ঘটলে অনেক লাভ আছে।

একটা সমস্যা সমাধান করতে হলে সবার আগে মেনে নিতে হয় যে, সমস্যাটা আছে। তারপর সমস্যাটা বুঝতে হয় তাহলে নিজ থেকেই সমস্যা সমাধানের পথ বের হয়ে যায়। আমরা যদি সমস্যাটাই অস্বীকার করি তাহলে সেটা সমাধান করবো কেমন করে? কিছু দুর্বৃত্ত হঠাৎ এটা করে ফেলেছে বললে সমস্যাটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। সেই দুর্বৃত্তরা যে এখানে তাদের কাজকর্মের জন্য একটা অভয়ারণ্য পেয়েছে সেটি তো সবার আগে স্বীকার করে নিতে হবে।

এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর আমাদের দাবি অনেক বেশি। হেফাজতের হুমকি শুনে পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন আমাদের চরমভাবে হতাশ করেছিল, কাজেই দেশের এই সাম্প্রদায়িক রূপটিকে ঠিক করার ব্যাপারে তাদের কতটুকু সদিচ্ছা আছে সেটা নিয়ে আমাদের কারও কারও ভেতরে যদি এক ধরনের দুর্ভাবনা থাকে, কে আমাদের দোষ দিতে পারবে?

৩.

আমি আজন্ম আশাবাদী মানুষ। জীবনের চরম দুঃসময়েও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করেছি এবং দেখেছি একদিন আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কাজেই এবারও আমি আশাবাদী থাকতে চাই, স্বপ্ন দেখতে চাই যে এই দেশটি থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ একদিন শিকড়সহ উৎপাটন করে ফেলা হবে। তবে এটি এমনি এমনি শুধু মুখের কথায় হবে না, তার জন্য কাজ করতে হবে। আমার হিসাবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এটি।

আমি আমার জীবনে যে কয়টি সত্য আবিষ্কার করেছি তার একটি হচ্ছে পৃথিবীর সৌন্দর্য  হচ্ছে বৈচিত্র্যে। একটি দেশে যখন নানা বর্ণের, নানা কালচারের, নানা ধর্মের, নানা ভাষার মানুষ পাশাপাশি থাকে, একে অন্যের সাহচর্যে সুখে দুঃখে বড় হয়, সেটি হচ্ছে সত্যিকারের সৌন্দর্যময় জীবন। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য খুব কম, কাজেই আমাদের জীবনধারায় যেটুকু বৈচিত্র্য আছে সেটাই আমাদের বুক আগলে রক্ষা করতে হবে, আমাদের শিশুদের সেটা শিখাতে হবে। নিজ ধর্মের বিধিবিধান শেখার আগে তাদের অন্য ধর্মের সৌন্দর্যের কথা জানতে হবে, যেন তারা সব ধর্মের জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বড় হয়।

এই দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে উগ্র মানসিকতার নয়, জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই তারা বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। সারা পৃথিবীর ধর্মান্ধতার উত্থানের ঢেউ এখানেও এসেছে এবং কিছু মানুষ সেটি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ফেসবুক নামে ‘মানসিক বর্জ্য ক্লেদ সংরক্ষণ ও বিতরণ’-এর যে পদ্ধতি বের হয়েছে সেটি ব্যবহার করে যেটি আগে কখনও সম্ভব হয়নি এখন সেটিও করে ফেলা যাচ্ছে। যে মানুষটির কথাকে আগে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল না, এখন সেই মানুষটি তার ভয়ানক আপত্তিকর বক্তব্য সবাইকে শোনাতে পারছে, শুধু তা-ই নয়, দ্রুততম সময়ে দুর্বৃত্তদের একত্র করে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এটি অনেক বড় একটি সমস্যা। পৃথিবীর অন্য দেশ কী করবে জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে আমাদের প্রয়োজনে এর একটা সমাধান এখন খুব দরকার। শুধু তা-ই নয়, একসময় যেকোনও সাম্প্রদায়িক সমস্যা হলে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক পথে নেমে আসতো, এখন সবাই ফেসবুকে একটা বক্তব্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলতে চায়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এ দেশের গ্রামে গ্রামে যেটুকু সংস্কৃতির চর্চা ছিল এখন সেটি নেই। বাসায় বাসায় হারমোনিয়ামে শিশুর গলায় গান শোনা যায় না, রাত জেগে কেউ যাত্রা কিংবা পালাগান শুনতে যায় না। মাঝ নদী থেকে মাঝির গলায় ভাটিয়ালি গান শুনি না, স্কুলে স্কুলে কিংবা পাড়ার ছেলেমেয়েরা হ্যাজাক লাইটের আলোতে জরির কাপড় পরে সিরাজদ্দৌলার নাটক করে না। মাঠে রঙিন জার্সি পরে তুমুল উত্তেজনায় ফুটবল খেলা হয় না। নদীতে নৌকা বাইচ হয় না। বাউল হওয়া এখন অনেক সময় অপরাধ, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এক কথায় আমরা আগে যেটুকু বাঙালি ছিলাম এখন আমরা আর সেই বাঙালি নেই। আমাদের সংস্কৃতির জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেই তা দ্রুত পূরণ করতে আসছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী।

কাজেই এখন ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার আমাদের বাঙালি হওয়ার সময় এসেছে। একসময় বাঙালি হয়ে আমরা আমাদের ভাষাটিকে পেয়েছিলাম, তারপর আবার বাঙালি হয়ে দেশটিকে পেয়েছিলাম। এখন আবার বাঙালি হয়ে সেই দেশকে অসাম্প্রদায়িক করার সময় এসেছে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও লেখক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আমাদের আয়শা আপা

আমাদের আয়শা আপা

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৯:১০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মহাশূন্যে প্রথম ছায়াছবির শুটিং শেষ করে রাশিয়ার একটি সিনেমা নির্মাতা দল নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। মহাশূন্যে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী নিয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবনাও এগিয়ে চলছে। বিমান সংস্থাগুলো জানাচ্ছে তারা কত দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে পৌঁছে দিতে পারবে। বিশ্বব্যাপী বড় গণমাধ্যমে এখন এগুলো বড় খবর। মানুষে মানুষে এই যে নৈকট্য স্থাপনের প্রচেষ্টা, উল্লাস, আনন্দ তখন আমরা আমাদের দেশে হিন্দুপাড়া খুঁজছি জ্বালিয়ে দিতে, লুট করতে।  

রাজনৈতিক কারণে সংঘাত আমাদের বহু দিনের চেনা। সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার ইতিহাসও প্রাচীন। কিন্তু এবার হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার সময় যেভাবে ধর্মকেন্দ্রিক অসহিষ্ণুতা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো তার বিচার আইনি পদ্ধতিতে না হলেও ইতিহাস এর বিচার নিশ্চয়ই করবে। কারণ, ইতিহাস কোনোকালেই প্রশ্ন ও বিচারের ঊর্ধ্বে ছিল না।

এটা ঠিক হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়া নয়। সরাসরি হিংসার উল্লাস। একটি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করতে পরিকল্পিত সহিংসতা। বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমরা যত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছি, তত দ্রুতই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি সেই জায়গা দখলে নিচ্ছে। এবং এটা হয়েছে রাজনীতির কারণেই। যাদের আমরা উদারনৈতিক বলে জানতাম সেসব রাজনৈতিক দলও এখন ধর্মাশ্রয়ী হচ্ছে, ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বন্ধু হয়ে উঠছে। রাজনীতির এই তালেবানিকরণ বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা ভাবতে পারছেন না কেউ। তবে বুঝতে পারছে ১৯৭১-এ যে আদর্শ আর স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছিল মানুষ, তা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। উন্নয়নের কথা আমরা দিন রাত বলছি। কিন্তু উন্নয়ন যদি আমাদের লক্ষ্য হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিকাশ যদি আমাদের সাধনা হয়, তাহলে সাম্প্রদায়িকতাকে দূরে সরিয়ে রেখেই এগোতে হবে।

শাসক দল, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে নিজেকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে আওয়ামী লীগকে। সে কেন তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত হতে পারে না, কেন প্রতিরোধ করতে পারে না, কেন তার ভেতরে মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা জায়গা পেয়ে যায়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে নিজেকেই।

টানা ১২ বছর দল ক্ষমতায়, তাহলে মৌলবাদী শক্তির এই বাড়বাড়ন্ত হয় কী করে, সে জিজ্ঞাসার সঙ্গে এটাও জানা দরকার, দলের ন্যারেটিভ কেন আজ তরুণ মনকে প্রভাবিত করতে পারছে না। কথাটা এ কারণে বলা যে কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুরে যে হামলাগুলো হয়েছে তাতে অংশ নেওয়া বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৫। এখন যার বয়স ১৮, ১২ বছর আগে ছিল ৬ বছর, এখন যার বয়স ২৫, ১২ বছর আগে ছিল ১৩ বছর। দল ১২ বছর ধরে ক্ষমতায়, অথচ তারুণ্যের মনোজগৎ দখলে নিলো মৌলবাদী গোষ্ঠী?

কে কোন রাজনীতি করবে সেটা তাদেরই বিষয়, কিন্তু প্রত্যাশা থাকে মানুষের। বাংলাদেশের সমাজ যখন অনিশ্চয়তা এবং হিংসার আবর্তে, তখন রাজনীতির কাছে আশ্রয় চায় আক্রান্তরা। আজ আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। বলতে গেলে নৈরাজ্য নেমে এসেছে গোটা দেশে। পরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের ওপর জুলুম চলছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সব ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লুট করা হয়, তখন অনেক স্থানে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সব জায়গার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আক্রমণকারীরা সশস্ত্র হয়ে এসেছিল। শুধু লাঠি নয়, সূক্ষ্ম ধারালো অস্ত্রও ছিল তাদের সঙ্গে।  

হিন্দুদের ওপর আঘাত নতুন নয়। তবে গত কয়েক বছরে এই হিংসা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই অনেক জায়গায় অসহায় পড়ছেন মৌলবাদীদের দাপটের কাছে। তালিবানি কায়দায় এরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে জ্বালিয়েছে, এবার করলো কুমিল্লা, ফেনী ও রংপুরে। প্রতিবার তাদের সাফল্যে তারা উজ্জীবিত হচ্ছে আর বাকি সবাই নীরব দর্শক হয়ে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে।  

ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে কিন্তু দেখা যায়, স্বাধীন যুক্তিবাদী চিন্তার একটা ধারা বরাবর মুসলমানদের মধ্যে ছিল। যারা লেখাপড়া করেন তারা জানেন, ইসলামি সভ্যতায় যুক্তিবাদী নেতৃত্বের অভাব ছিল না কখনোই। আধুনিককালেও স্যার সৈয়দ আহমেদ, কাজী আব্দুল ওদুদের মতো অনেকে নিজেদের উদারনৈতিক হিসেবেই পরিচিত করেছিলেন। এই যুক্তিবাদীরা শরিয়তকেও অন্ধভাবে অনুসরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। সেই মুক্তমনে এক ভয়াবহ সংকট এসেছে আজ। অন্ধত্ব, পশ্চাৎপদতাকেই পুঁজি করছে সহিংস ধর্ম ব্যবসায়ীরা।

রাজনীতি আমাদের সবটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এবার সবাই চায় সেই হিংসাকে হারানোর রাজনীতি। পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে এমন হয়েছে যে উদার মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবার হামলার শিকার হলেও সমাজে মোল্লাতন্ত্রবিরোধী সুর কমে আসছে। যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বিপরীত যুক্তি নেই এদের, সরাসরি খুন।

এমনটা ছিল না আমাদের চারপাশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগিয়ে না গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। বিভাজিত হতে হতে এমন হয়েছি যে ধর্ম ও রাজনীতি এসবের বাইরে গিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারছি না আমরা। রাজনীতি আমাদের সুস্থ সমাজ গঠনের স্তম্ভ। তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে সমাজ। রাজনীতিকেরা বিভিন্ন দল করেন, আবার সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ান দল-মত বিবেচনা না করেই। কিন্তু সেটা নেই এখন। ব্যক্তি, দল নির্বিশেষে শুভচিন্তার উন্মেষের মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের, সম্প্রীতির বাতাবরণ বজায় রাখার রাজনীতিটা আবার ফিরবে, সেই বিশ্বাস করতে মন চায়। আশা করি আয়নায় মুখ দেখবেন সবাই।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উদ্বেগ ও অবসাদ

উদ্বেগ ও অবসাদ

মূল্য ছ্যাঁকা

মূল্য ছ্যাঁকা

আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

সাম্প্রদায়িক হামলার রাজনৈতিক-সামাজিক অর্থনীতি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৩:৫৩

জোবাইদা নাসরীন বেশ কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলায় চলছে সাম্প্রদায়িক হামলা। প্রাণহানি ঘটেছে। এখন পর্যন্ত এই হামলার সর্বশেষ স্থান ছিল রংপুরের পীরগঞ্জ। প্রতিবছরই পূজার সময় প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা আমাদের অনেকটাই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। এগুলোকে আমরা ‘বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত  ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে বছরের পর বছর সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদকে উসকে দিয়েছি, সেই দায়ভার নিতেই হবে।

বাংলাদেশের গত দশ বছরে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর সূত্রপাতের অভিনব ধরন তৈরি হয়েছে। সেখানে এতদিন ধরে কেন্দ্রে ছিল ‘আজগুবি’ এবং হাওয়া থেকে আসা ফেসবুক স্ট্যাটাস, যার বেশিরভাগই ভুয়া আইডি থেকে দেওয়া; এবার সেখানে জায়গা পেয়েছে মণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। এবার এই সাম্প্রদায়িক হামলার সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে।  এবারই সম্ভবত একসঙ্গে এত জেলায়  সাম্প্রদায়িক হামলা শুরু হয় এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। পাঠক লক্ষ করবেন, প্রতিটি হামলার প্রেক্ষাপট কিন্তু কাছাকাছি। হয় কোনও ফেসবুক স্ট্যাটাস, নয় কোনও ধরনের সাজানো ইস্যু। এই হামলাগুলো যে পরিকল্পিত তা স্পষ্টভাবেই খালি চোখেই বোঝা যায়।

হামলার বিষয়ে আমরা অনেকটাই জেনেছি। তাই হামলা কীভাবে হচ্ছে , কোথায় কোথায় হচ্ছে, কারা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেসব ন্যারেটিভের চেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কারা, কী জন্য এই হামলাগুলো করেন বা করান? এর পছনে কী উদ্দেশ্য থাকে? একই সঙ্গে অনেক এলাকায় এই ধরনের হামলা চালানোর পেছনে আসলে কী ধরনের রাজনীতি কাজ করে সেটি দেখা প্রয়োজন।

প্রায় প্রতি বছরই ঘটে যাওয়া এবং এবারের সিরিজ হামলার কারণ বিশ্লেষণ করে আমরা গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, এই হামলাগুলো ঝোঁকের মাথায় নিছক ঘটে যাওয়া কোনও হামলা নয়। এর পেছনে প্রথমত থাকে  জমি/ভূমি  দখলের রাজনীতি। কারণ, হামলাকারীরাও ‘সাধারণ’ কোনও মানুষ নয়, ধর্মীয় অনুভূতির  মিথ্যা 'ফানুস' উড়িয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে এদের মূল লক্ষ্য থাকে ভূমি দখলের রাজনীতি। অন্যদিকে অনেক কারণের মধ্যে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে সামনের জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক হামলা খুব বেশি নতুন নয়। বরং নির্বাচনি সময়ের আশপাশে এবং নির্বাচনের পরেও সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশের জন্য দগদগে দুঃসহ স্মৃতি। কিন্তু  এই সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ থেমে নেই।

আরও একটি কারণ হিসেবে বর্তমান সময়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, প্রতিবেশী ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক। এই দুটো দেশেই সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরুর সম্পর্কের টানাপড়েন মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা চালায়। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করার কথা গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি। সুতরাং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের সমর্থন এবং অসমর্থন সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। তাই রংপুরের পীরগঞ্জ, নোয়াখালীর চৌমুহনী, কুমিল্লাসহ আরও যেসব জেলায়  এই আক্রমণগুলো হচ্ছে সেক্ষেত্রে এটি ভাবার কোনও কারণ নেই যে এটি কয়েকজন মানুষের সাময়িক ধর্মীয় উত্তেজনার পেছনে যুগ যুগ ধরে গেড়ে থাকা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিসহ আরও অনেক ধরনের  রাজনৈতিক অর্থনীতি জড়িত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতেই পেয়েছি যে এসব ক্ষেত্র রাষ্ট্রের নিশ্চুপতায় হামলাকারীরা প্রশ্রয় পায়। এর পাশাপাশি ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সুকৌশল নড়াচড়াও এই প্রশ্নকে অনেকটা এগিয়ে নেয়। এবারও আমরা দেখতে পেয়েছি হাজার হাজার লোককে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা যে আসলে কোনও কার্যকর মামলা না তা আমরা জানি। তাই প্রতিকারের পথগুলোও বন্ধ।

তবে অন্যবারের চেয়ে এবার প্রতিরোধের স্বরগুলোও ক্ষীণ। সরকারের বিরোধী দলকে দোষারোপের সুরের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধও তেমন জোরালো নয়। এই জায়গাটিই সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হয়ে হাজির হচ্ছে।

কী কী হবে এই মামলার পর? আক্রান্তদের প্রতি হয়তো আরও ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, যে পর্যন্ত তারা ভূমি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়। অনেক সময় সেই হামলাকারীদের কাছেই নামমাত্র মূল্যে জমিটি বিক্রি করে দেন তারা। কারণ, ক্ষমতার ক্রমাগত চাপে এবং তাপে ততদিনে জেনে যায় সেখানে তারা আর থাকতে পারবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত (২০১৬ ) তাঁর কাজে উল্লেখ করেছেন, “আগামী ৩০ বছরে হয়তো বাংলাদেশে কোনও হিন্দু জনসংখ্যা থাকবে না।” অধ্যাপক বারাকাত তাঁর গবেষণায় দেখান,  ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু বাংলাদেশে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। পূর্বের সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর মিল সবচেয়ে বেশি হলো, প্রত্যেকটি হামলার পরপরই সেই এলাকা থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা চলে যায়। কখনও এলাকা ছাড়ে, আবার কখনও বা ছাড়ে দেশ। এমনকি এর আগে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষেত্রে সরকার যখন ঘোষণা করলেন যে যাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের সেই ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ির চেয়ে ‘ভালো’ ঘরবাড়ি তাদের তৈরি করে দেওয়া হবে। তখন তাদের অনেকেই বলেছেন সেই নতুন ঘরবাড়ি তারা চান না। কারণ, এটি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, তাদের যে ভয়ের স্মৃতি তা মুছে দিতে পারবে না। আরও কিছু যদি বিষয় আমরা বিশ্লেষণের উপকরণ হিসেবে আমলে নিই তাহলে দেখতে পাই যে সেখানে প্রত্যেকটি হামলাতেই নারীর প্রতি সহিংসতাও গুরুত্ব পায়। এবং এটি যখন হয় তাহলে আরও ভীত হয়ে পড়ে আক্রান্ত পরিবারগুলো। তখনই তারা দেশ কিংবা সেই এলাকা ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়।

অনেকেই বলেন, হিন্দুরা তো দেশ ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু এটি বলার আগে একবার কী ভেবে দেখেন কেন সংখ্যালঘুরা দেশ ছাড়ে বা ছাড়তে বাধ্য হয়? কারণ, হামলার আগে এলাকায় সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যে সুসম্পর্ক ছিল সেটি আর ফিরে আসে না। নষ্ট হয়ে যায় একে অপরের প্রতি আস্থা বা বিশ্বস্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও। এ কারণে সেই জায়গা কোনোভাবেই তাদের জন্য স্বস্তির এবং নিরাপদ হয়ে ওঠে না। তাই তারা শুধু জীবনের নিরাপত্তার জন্য  চুপি চুপি, আর কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে দেশ ছাড়ে। সকালে ঘুম থেকে হয়তো প্রতিবেশীরা দেখতে পান সেই ঘরে কেউ নেই। আর আমরাই এই দেশটির চিত্র এমন করছি।

ধর্মকে ব্যবহার করেই রাজনীতি করছে বাংলাদেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। তাই তারাও নিশ্চুপ থেকে এই হামলায় রাজনৈতিক আসকারা দেয় এবং এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা আরও প্রসারিত হতে থাকে।

‘তাই ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ কিংবা ‘রাষ্ট্র সবার’ এই ধরনের কথাবার্তা আসলেই শুধু বুলি ‌এবং কতটা ফাঁপা তা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো আমাদের আঙুল উঁচিয়ে দেখায়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘ভুতুড়ে’ অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসের উৎস খুঁজে বেড়ানো, কিংবা গুজব চর্চায় মনোযোগী না হয়ে হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করতে আগ্রহী হোন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, হামলার মূল জায়গা ফেসবুক স্ট্যাটাস কিংবা  গুজব নয়; এটির পেছনে রয়েছে মানুষকে ভূমি ছাড়া করা এবং সেই ভূমি দখলের ভয়াবহ পরিকল্পনা। এর পেছনের রাজনীতি সম্পর্কে বোঝাপড়াটা জরুরি এবং তাই সরকার কী করলো তার আগেই আপনার প্রতিবেশী কিংবা এলাকার কোনও মানুষ যেন এই ধরনের হামলার শিকার না হয়, সেই বিষয়ে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করার জন্য নিজেদের প্রস্তুতিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

তালেবানের সঙ্গে বৈঠক ভারতের

তালেবানের সঙ্গে বৈঠক ভারতের

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ২৪ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ২৪ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সেলফি তোলায় পুলিশ সদস্যদের নোটিস

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সেলফি তোলায় পুলিশ সদস্যদের নোটিস

‘স্বাধীনতাবিরোধীরাই সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা চালাচ্ছে’

‘স্বাধীনতাবিরোধীরাই সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা চালাচ্ছে’

'হামলার দায় এড়াতে পারেন না রাজনৈতিক নেতারা'

'হামলার দায় এড়াতে পারেন না রাজনৈতিক নেতারা'

বেগমগঞ্জে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটের ঘটনায় সুজনের স্বীকারোক্তি 

বেগমগঞ্জে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটের ঘটনায় সুজনের স্বীকারোক্তি 

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি বদলি

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি বদলি

ভারতে পাচারকালে স্বর্ণের বারসহ আটক এক

ভারতে পাচারকালে স্বর্ণের বারসহ আটক এক

মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানালো হামাস

মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানালো হামাস

ঢাকাতেও রোনালদোদের কাছে হারের বর্ণনা দিতে হলো গ্রান্টকে

ঢাকাতেও রোনালদোদের কাছে হারের বর্ণনা দিতে হলো গ্রান্টকে

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

মনোনয়ন ফরমে অ্যানালগই রয়ে গেলো আওয়ামী লীগ

মনোনয়ন ফরমে অ্যানালগই রয়ে গেলো আওয়ামী লীগ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune