সেকশনস

গণমুক্তির আন্দোলন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরদারি

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৪

 

হায়দার মোহাম্মদ জিতু যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাৎসি বাহিনীর হাতিয়ার ছিল প্রোপাগান্ডা (গুজব ছড়ানো) ব্যবস্থা। যার যোগ্য সঞ্চালক ছিলেন হিটলারের প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থার প্রধান গোয়েবলস। যদিও এই গুজব ছড়ানোর কাজে পশ্চিমারাও কম যান না। যেমন, ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্র আছে, আমেরিকার এই এক গুজব-ধোঁয়ায় মিসমার হয়ে গেলো এক জাতি-রাষ্ট্র। কিন্তু শেষতক দেখা গেলো সবই ছিল নাটক। নিজেদের অর্থনীতির বাজার হাতিয়ে নেওয়ার নাটক।
গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে বাংলাদেশেও বেশ কট্টরভাবে বয়ে চলেছে এই মহামারি। বাংলায় যার নাম গুজব। এই আলোচনার ব্যাপ্তিফল বাড়ানোর পূর্বে বাংলায় একটি প্রবাদ তর্জমা করি—‘হুজুগে বাঙালি’। যার অর্থ দাঁড়ায় সামান্য উসকানিতে যেকোনও অঘটন-ঘটন ঘটাবার রেওয়াজ বাঙালির পূর্বের। আর তাছাড়া সংস্কৃতির ইতিহাস বলে, প্রবাদ-প্রবচন হলো যেকোনও জাতির মানুষের আচরণগত সামষ্টিক ফলাফল।
সম্প্রতি প্রোপাগান্ডা বা গুজবে ভর করেই কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটেছে দেশে, যা চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে প্রমাণ করেছে মানুষের মূল্যবোধের ঘাটতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং বেদনাদায়ক অসংখ্য সিরিজ মৃত্যু। কিন্তু হঠাৎ কেন এই সিরিজ সন্ত্রাস বা অস্থিরতা? এর পেছনের বহুমাত্রিক গল্পগুলো আসলে কী?
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা সামাজিক সন্ত্রাস। আর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা কারো সুদূরপ্রসারী ম্যান্ডেট। তবে তাৎপর্যগত দিক হলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুটো বিষয়ই মোকাবিলা করতে হবে ভিশনারি রোডম্যাপ দিয়ে।
প্রথমটির মহৌষধ ‘পারিবারিক শিক্ষা’। যদিও দুই শব্দেই বলা হয়ে যায় সমাধান। তবে একে বাস্তবায়ন করতে সরকারকে পড়তে হবে পদে পদে তোপের মুখে। কারণ, এখনও এই সমাজে স্বামী বউকে পেটালে সরকার ব্যবস্থা নিতে গেলে বলেন—‘আমার বউরে আমি পিটাই, সরকারের কী?’ আবার ওই লোকটি তার বউ অসুস্থ হলে সরকার কেন দেখছে না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। অর্থাৎ, এখানকার মানুষের মনের ভৌগোলিক চিত্র জোয়ার-ভাটার মতো। কাজেই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রকে হতে হবে কঠোর এবং যেকোনও প্রীতিহীন।
এই অঞ্চলে বহু বাবা-মাই আছেন যারা স্কুলে টিফিনটাই তার সহপাঠীর সঙ্গে ভাগ করে খেতে শিক্ষা দেন না। পরীক্ষায় প্রথম হলে এটা-ওটা কিনে দেবেন এই ধরনের লোভনীয় মুনাফা ধরিয়ে দেন বাচ্চাদের সামনে। পাশের বাসার ওই সন্তান হাতি মেরেছে অথচ তার সন্তান মশাও মারতে পারেননি! এই কষ্টে নিজের সন্তানকে মানসিক-শারীরিক নির্যাতন করেন। অর্থাৎ অসহনশীল পরিবেশের ভেতর দিয়ে মা-বাবাই বড় করে তোলেন তার সন্তানকে।
তাছাড়া পারিবারিক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিযোগিতার মনোভাব লক্ষিত হয় সেই বাবা-মার হাত ধরে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের চোখে-মুখেও। যার প্রামাণ্য দলিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। কে কার আগে একটি তথ্য জানেন ও জানাবেন সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এ কারণে বিশেষ ব্যক্তিবর্গকেও কয়েকবার মিথ্যা মৃত্যুবরণ করতে হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রবিন্দু ‘পরিবার’। এখন নিজেদের প্রশ্ন করলেই হয়, অভিভাবক হিসেবে পরিবারে আমাদের মানসিক এবং সামাজিক শিক্ষা-সংস্কার কতটুকু? আর তাতেই মিলে যাবে সমকালীন সময়কার সামাজিক নৃশংসতা এবং অসহনশীল আচরণের হিসাব।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণে বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বনেতৃত্বের দাবিদার। অর্থনৈতিক মুক্তিতে বিশ্বব্যবস্থার উদাহরণ। পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার মেরুকরণে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এশিয়ার নতুন সমৃদ্ধ সারথী। যার রয়েছে মুক্তবাজার, গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করবার সুযোগ এবং সস্তা শ্রমিক। কাজেই এখানাকার মার্কেট এখন বিশ্বের অনেকের গড় চাহিদার অংশ।
কাজেই এখানকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক সম্পর্কগুলোকে অস্থির করতে পারলেই অনেক বিনিয়োগকারী এখান থেকে মুখ সরিয়ে নেবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে এই রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে, তখন আবারও হাত পাততে হবে এই রাষ্ট্রকে। যা স্বার্থ-অনুগত হয়ে যাবে বৈদেশিক বেনিয়াদের। ফলে অবাধে নিজেদের সুবিধা মতো বেনিয়াবৃত্তি বা ব্যবসা করতে পারবেন ওইসব ঔপনিবেশিক এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতালোভীরা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যখন বৈদেশিক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার দোহাইয়ে চলে যাবেন তখন বন্ধুহীনতার কারণে সুযোগসন্ধানী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে বাধ্য হবে বাংলাদেশ। এতে তাদের অর্থাৎ ভিনদেশি সুযোগসন্ধানীরা লাভবান হতে পারবেন নিজেদের স্বার্থকে গুরুত্বে রেখে। অর্থাৎ, প্রভুত্বের ঘানি টানবে দেশ।
আর তাই এই দেশকে অস্থিতিশীল করতে মরিয়া কয়েক প্রান্তের মানুষ। তার প্রমাণ যখন যে অঘটনগুলো ঘটছে তা বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হলেও চলছে সিরিজ আকারে। বিগত তিন-চার মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রথম মহামারি সামাজিক সন্ত্রাস ছিল ধর্ষণ। যাকে রূপায়িত করা হয়েছে নানা কায়দায়। কখনও বাসে, কখনও পরিত্যক্ত বদ্ধ জায়গায় এবং তা নানান বয়সের ব্যবধানে। শুধু তা-ই নয়, শেষতক একে রূপ দেওয়া হয়েছে নানান কায়দায় নৃশংস হত্যা ভঙ্গিতে।
আবার কিছু দিন ধরে চলেছে দেশের স্পর্ধা এবং শেখ হাসিনার চেষ্টা ‘পদ্মা সেতুকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে মানুষ হত্যার গুজব। রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে চলা এই প্রোপাগান্ডা বা গুজবকে যখন বাঙালি প্রতিহত করেছে চমৎকারভাবে, তখন আরেকটি সিরিজ সামাজিক সন্ত্রাস শুরু হয়েছে ‘ছেলেধরার নামে’ পিটিয়ে মানুষ হত্যার। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, অবিবেচকভাবে কিছু ‘হুজুগে বাঙালি’ দেশি-বিদেশি সেই সামাজিক অস্থিরতা ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়ন করে চলেছে উন্মত্ততার বশে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন পুরো বিষয়গুলোকে ময়নাতদন্তের আদলে নজরদারির। অর্থাৎ, এটা স্পষ্ট যে উন্নয়ন এবং গণমুক্তির সংগ্রাম চালানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের চ্যালেঞ্জ বহুমুখী।
লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
[email protected]

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দুঃখ প্রকাশ

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দুঃখ প্রকাশ

তথ্য সন্ত্রাস: প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ

তথ্য সন্ত্রাস: প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ

মৌলবাদ নয়, বাঙালির অস্তিত্ব বহুত্ববাদ

মৌলবাদ নয়, বাঙালির অস্তিত্ব বহুত্ববাদ

আদর্শিক ধারাবাহিকতা রুখে দেওয়ার কৌশল

আদর্শিক ধারাবাহিকতা রুখে দেওয়ার কৌশল

‘ফেমাসিজম’ দিয়ে ফেমিনিজম হত্যা

‘ফেমাসিজম’ দিয়ে ফেমিনিজম হত্যা

শেখ হাসিনার শুভ জন্মদিনের মাহাত্ম্য

শেখ হাসিনার শুভ জন্মদিনের মাহাত্ম্য

সোনার বাংলা গড়তে চাই সোনার মানুষ

সোনার বাংলা গড়তে চাই সোনার মানুষ

বঙ্গবন্ধু হত্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা

বঙ্গবন্ধু হত্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা

রেকর্ড গড়বার পথে শেখ হাসিনা

রেকর্ড গড়বার পথে শেখ হাসিনা

সাম্প্রদায়িকতা রুখে দিতে হবে

সাম্প্রদায়িকতা রুখে দিতে হবে

প্রিয়জন এবং শত্রুপক্ষকে গাছ উপহার

প্রিয়জন এবং শত্রুপক্ষকে গাছ উপহার

শেখ মুজিব: বাঙালির প্রথাবিরোধী স্পর্ধা

শেখ মুজিব: বাঙালির প্রথাবিরোধী স্পর্ধা

সর্বশেষ

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৯ কোটি ৪৩ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৯ কোটি ৪৩ লাখ ছাড়িয়েছে

সেদিন গণভবনের দরজা ছিল অবারিত

সেদিন গণভবনের দরজা ছিল অবারিত

ব্রিজ ভেঙে নদীতে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিহত

ব্রিজ ভেঙে নদীতে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিহত

গৃহহীনদের পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক

গৃহহীনদের পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক

ভাসানচরে নির্মিত হচ্ছে বিদেশি সংস্থায় কর্মরতদের জন্য ভবন

ভাসানচরে নির্মিত হচ্ছে বিদেশি সংস্থায় কর্মরতদের জন্য ভবন

উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে পরিকল্পনাবিদদের প্রতি আহ্বান

উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে পরিকল্পনাবিদদের প্রতি আহ্বান

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.