X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

কেমন গেলো ২০২১?

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ২২:০৩

আবদুল মান্নান একটি খ্রিষ্টীয় বা বাংলা বছর শেষ হলে ‘কেমন গেলো বছরটি’ এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক। অনেকটা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী বা সীমিত চলাচলকে নিত্যদিনের সঙ্গী করে ভালো-মন্দ মিলিয়ে বছরটি ভালো গিয়েছে,  তার মানে বছরটি আরও ভালো হতে পারতো। চীনে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হওয়া আর দ্রুততার সঙ্গে তা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কারণে কোনও দেশ বলতে পারবে না বছরটি ভালো গিয়েছে। কম-বেশি এই মহামারির কারণে প্রায় প্রত্যেকটি দেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা বিশ্বে এই মহামারির কারণে এই পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এই মৃত্যুর দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে বিশ্বের সব চেয়ে শক্তিশালী ও ধনী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তারপর আছে ভারত। কয়েক মাস আগে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে ভারত। তার আগে ছিল ব্রাজিল। 

এদিক দিয়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এই মহামারিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় তুলনামূলক ভাবে বেশ ভালো করেছে বাংলাদেশ, যদিও এই দেশে ২৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর মিছিলে সামিল ছিলেন দেশের অনেক প্রতিথযশা ব্যক্তি যাদের স্থান দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে বড় কৃতিত্ব ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের।

তবে এটাও ঠিক এই মহামারি এত সহজে মানব সমাজকে ছেড়ে যাচ্ছে না। থাকবে আরও বেশ কিছু দিন। দেখা গেছে শুরু থেকে এই পর্যন্ত একাধিক ধরনের কোভিড-১৯ বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা মানুষকে ঘায়েল করেছে। তবে এই মহামারিকে দমন করার জন্য বিজ্ঞানই যে মানুষের একমাত্র ভরসা তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এই বিজ্ঞানের কারণেই বিশ্বে এই পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে যা বিশ্বের দেশে দেশে প্রয়োগের কারণে অনেক মানুষের জীবন বেঁচে গেছে বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞান ও রোগ বালাইয়ের যুদ্ধ অনেক পুরনো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরই মধ্যে এই মহামারির তিনটি নতুন-নতুন ঢেউ অনেক দেশে আঘাত করেছে। সর্বশেষ ঢেউ ওমিক্রনে জেরবার পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউরোপ। ভারতও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশেও তা কড়া নাড়ছে।

এই মহামারিকালে, বিশেষ করে ২০২১ সালে বিশ্বের প্রায় সব দেশে যে খাতগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে আছে শিক্ষা ও অর্থনীতি। অর্থনীতির ক্ষতিটা দীর্ঘ সময়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও শিক্ষার ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তবে যেহেতু সমস্যাটি একেবারেই নতুন ও অনেকাংশে বহুমাত্রিক সেহেতু মহামারিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সৃজনশীল চিন্তাভাবনা। মাস্ক না পরাতো সকলের জন্য মারাত্মক বিপদজনক। এটি বাংলাদেশর ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।

অনেকের ধারণা ছিল এই মহামারিকালে বাংলাদেশের মতো একটি মাঝারি মানের উন্নয়নশীল দেশ ধরাশায়ী হয়ে যাবে। তা কিন্তু সার্বিক অর্থে হয়নি। এটি ঠিক এই সময়ে দেশের অনেক মানুষ তাদের পেশা হারিয়েছেন, অনেকে বেকার হয়েছেন আবার দেশের দারিদ্রের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে সকলকে অবাক করে দিয়ে দেশের গড় প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক উচ্চগতি (যদিও স্বাভাবিকের চেয়ে কম) রাখতে বাংলাদেশ সক্ষম হয়েছে যার সিংহভাগ কৃতিত্ব বাংলাদেশের কৃষকদের।

গত কয়েক বছর বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের উৎপাদনে কোনও ঘাটতি ছিল না। সরকারের অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার সম্প্রতি অর্থনীতিবিদদের এক সেমিনারে বলেছেন বিশ্বের ৪১টি শীর্ষ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের মধ্যে মাত্র আটটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (ডিডিপি) প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল গত অর্থ বছরে। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সব চেয়ে বেশি ইতিবাচক ছিল। এর পূর্বে গত নভেম্বর মাসে আইএমএফ বা বিশ্ব মুদ্রা তহবিল তাদের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলেছিল বিশ্বে এই মহামারিকালে মাত্র ২৩টি দেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পেরেছে যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তৃতীয় ও এশিয়ায় প্রথম। শুরুতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত হোঁচট খেলেও এখন তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ চীন ও ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহামারিকালে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে গেলেন গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে। শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে ছয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন যার মধ্যে ছিল জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদাসিনতা ও সর্বশেষে কোভিড-১৯ এর টিকাকে বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর কাছে সহজলভ্য করে তুলে ও তাকে জনগণের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। 

দেশে এই মুহূর্তে বিরোধী দলের কোনও রাজনীতি না থাকলেও বিএনপি তাদের দণ্ডপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রোগকে পুঁজি করে দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে বেশ তৎপর। বেগম খালেদা জিয়া অর্থ আত্মসাতের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে এখন ১৭ বছর মেয়াদের জন্য কারাবন্দি। তাঁর বয়স হয়েছে। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারেন তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি এর আগে তাঁর ও দলের পছন্দসই চিকিৎসক দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর দেশে কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা বলে বেগম খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাঁকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে থাকতে দিয়েছেন এবং তাঁর পছন্দসই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার স্বাধীনতাও দিয়েছেন।

এমন একটি নির্বাহী আদেশ এসেছে সেই শেখ হাসিনা হতে যাকে হত্যা করার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট  গ্রেনেড ছুঁড়ে  হত্যা করার  চেষ্টা করেছিল। এই অপচেষ্টাটা বেগম খালেদা জিয়ার জ্ঞাতসারেই হয়েছিল। গত প্রায় দেড় মাস যাবৎ বিএনপি দেশের অন্যতম একটি সেরা হাসপাতালে নিজস্ব চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাধারণত এই ধরনের একজন ভিআইপি,  যিনি এক সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত বুলেটিন প্রচার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখানে দেখা গেলো তার ব্যতিক্রম। ‘বেগম জিয়া জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে’ তা বলে বেড়াচ্ছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল যিনি কোনও চিকিৎসক নন।

একবার কয়েকজন চিকিৎসক একটি সংবাদ সম্মেলন করে একই কথা বলেছেন যারা সকলে ছিলেন দলের অনুগত ড্যাবের সদস্য। বিএনপি দাবি করেছে বেগম খালেদা জিয়াকে বাঁচাতে হলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বিদেশে প্রেরণ করতে হবে যা আইনগতভাবে সম্ভব নয় বলে আইনমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন। তদুপরি বিশ্বে এমন কোনও নজিরও নেই যেখানে দণ্ডিত আসামিকে চিকিৎসা বা অন্য কোনও কারণে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনেকে জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবের উদাহরণ টেনে আনেন। তারা ভুলে যান রব দণ্ডিত হয়েছিলেন জেনারেল জিয়ার সামরিক আদালতে, কোনও সাধারণ আদালতে নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার সহজ পদ্ধতি ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে একটি আবেদন করা যা বিএনপি নেতৃবৃন্দ তাঁকে  করতে দেবে না। তা হলে তাদের আর রাজনীতি থাকে না। বাস্তবে তারা বেগম খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে খেলছেন। অন্যদিকে তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন, বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমানও হত্যা ও অস্ত্র চোরাচালান মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে পলাতক জীবন যাপন করছেন। তিনি ইতোমধ্যে সেই দেশের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। একদিন বিএনপি দাবি তুলে তাদের নেত্রীকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠাতে হবে আর ঠিক পরদিন বলে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে।

একদিন বলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যে বৈঠক করছেন তাতে যোগ দেবেন কিনা তা তারা আমন্ত্রণ পেলে বিবেচনা করবেন আর ঠিক তার পরদিন বলেন তারা যাবেন না। তারা ইদানিং প্রায় বলেন অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া তারা ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে যাবেন না কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা ঠিকই নির্বাচনে যাবেন কারণ নির্বাচন মানে কয়েকশত কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য। তারা এই সব অসংলগ্ন কথা বলে যে শেষতক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন ২০১৮ সালের নির্বাচন তার বড় প্রমাণ।

বছরটা ভালো ভাবে শেষ হতে পরতো। বাধ সাধলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সহিংসতা আর ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে লাগামহীন কোন্দল ও মনোনয়ন বাণিজ্য যা দলের জন্য একটি অশনি সংকেত।  তার সাথে যোগ হয়েছে দলের ও প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের ভয়াবহ রকমের দুর্নীতি। এটি শুধু আর্থিক দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহার পর্যন্ত গড়িয়েছে। 

বঙ্গবন্ধুর গড়া দলের আগামী দিনের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই সব জঞ্জাল পরিষ্কার করা ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন দফতরে পদায়ন করা। সকল পাঠককে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা। আসুন সকলে মাস্ক পরি, সকলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলি,  নিজেকে ও অন্যদের নিরাপদ রাখি।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
পাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
আইপিএলপাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ