X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

রাজনীতিতে কূটনীতি সমাচার

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ১৯:৩৬

ড. প্রণব কুমার পান্ডে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি কূটনীতিবিদদের নাক গলানোর বিষয়টি নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে চলেছেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে এবং পরেও নির্বাচন কেন্দ্রিক সমঝোতার নামে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বিভিন্ন সময়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে। কখনও কখনও তারা নিজেদের সমস্যা সমাধানের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।

কূটনীতিকদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শিষ্টাচারবহির্ভূত একটি কাজ। তবে শিষ্টাচারবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কূটনীতিকরা যেমন একদিকে দায়ী, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান না থাকাও সমানভাবে দায়ী। সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর জনসমর্থনে ঘাটতি থাকে বিধায় নির্বাচন এলেই তারা মনে করে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে পারবে না।  ফলে বিদেশি বিভিন্ন শক্তির ওপর নির্ভরতা তাদের বেড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের কাছে সাহায্য প্রত্যাশা করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য।

গত ১৩ বছর আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার ফলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষত বিভিন্ন দল থেকে আসা নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গঠিত বিএনপির মতো রাজনীতির দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতৃবৃন্দ বা সমর্থক না থাকার কারণে দলের সমর্থকদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, লম্বা সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে দলের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও এক ধরনের বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

এছাড়া দলে রয়েছে নেতৃত্বের সংকট। দলে একটি গোষ্ঠী রয়েছে যারা বিএনপি চেয়ারপারসনের অনুরক্ত। অন্যদিকে দলের মধ্যে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে পরিচালিত হয়।  এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এক ধরনের নেতৃত্বের সংকট রয়েছে।  যেহেতু ২০২৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, অতএব এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে।

একটি নতুন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বাংলাদেশে অবস্থিত একটি দেশের কূটনৈতিক মিশনে যোগাযোগ করার খবর কিছু দিন আগে পত্রিকার মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। আবার সেই রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সেই দেশের কূটনৈতিক মিশনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অগ্রিম খবর প্রচার করেছিল এই বলে যে বাংলাদেশে আরও অনেক ব্যক্তিবর্গের ওপরে সেই দেশের নিষেধাজ্ঞা আসতে চলেছে।  তাছাড়া বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গত ১৭ মার্চ বৈঠক করেন জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার।
বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাদের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন ও  মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত কী বলেছেন, সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন- "বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সম্বন্ধে বিশ্বব্যাপী সবাই অবগত আছে। এখানে নতুন করে বলার কিছু নেই। এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে"। তবে বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত"।

জার্মান রাষ্ট্রদূতকে উদ্ধৃত করে বিএনপি নেতার এই ধরনের মন্তব্য মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত 'ডিক্যাব টকে' জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, "এটাতে আমি কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছি। আমার কর্তৃত্বের মধ্যে যা আছে সেই সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি আমি। এই উদ্ধৃতি নিয়ে আমি অসন্তুষ্ট"। কোন বক্তব্য নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট এই সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি যে উদ্ধৃতি পড়েছি তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। সেখানে বলা হয়েছে আমি এ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এমন শব্দচয়ন সত্য নয়।’

পরে ২১ এপ্রিল দুপুরে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার  যে কথাগুলো বলেছেন সেটা সঠিক নয়।

জার্মান রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের বক্তব্যের ফলে দলটি কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে চলে গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি দেশের রাষ্ট্রদূতের যে আলোচনা হয়েছিল সেটি বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃবৃন্দ অনেকটাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। জার্মান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দিয়েছেন সেখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, তিনি সেই কথাগুলো হয়তো বলেননি। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতি কখনোই আসলে কাম্য নয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ একটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত। সব রাজনৈতিক দলকে বিষয়টি মাথায় রেখেই রাজনীতি করা উচিত। রাজনৈতিক দলের রাজনীতির মূলশক্তি হচ্ছে জনগণের সমর্থন। যারা জনগণের সমর্থন হারিয়ে বিদেশি শক্তির ওপরে ভর করে ক্ষমতায় আসতে চায়, তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।

এমনকি বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে চাকরিরত কূটনীতিকদের একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত যে তাদের দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নাক গলানো তাদের কাজের আওতার বাইরে। তবে এটা ঠিক, একটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েই যোগাযোগ রাখবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সেই সম্পর্ক উন্নয়নের নির্দিষ্ট একটি মাত্রা থাকতে হবে। বিদেশি কূটনীতিকদের যদি আমরা মাথায় চড়িয়ে রাখি তবে তারা সেখান থেকে নামবে না- এটাই স্বাভাবিক।  পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী দেশগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ প্রশস্ত করছে সেই দেশের রাজনৈতিক নেতারা।

আমরা ইতোমধ্যে স্বাধীনতার ৫০ বছরে অতিক্রম করেছি। বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।  বাংলাদেশ এশিয়ান টাইগার উপাধিতে ভূষিত হয়েছে। এমতাবস্থায় সবার উচিত দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য প্রয়োজন সরকার এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সহাবস্থান।

প্রত্যেকের অবস্থান থেকে যদি প্রত্যেকে দেশের জন্য কাজ করে, তাহলে দেশের উন্নতি যেমন সম্ভব হবে, ঠিক তেমনি গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। এটা ঠিক যে দেশে গত ১০ বছরে নির্বাচন কেন্দ্রিক এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। এই অবস্থার জন্য শুধু সরকারি দলকে দোষ দিলে হবে না। এখানে বিরোধী দলেরও যথেষ্ট দায় রয়েছে। দুই পক্ষেরই উচিত নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও ছাড় দিয়ে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক আকার প্রদান করা। এই প্রক্রিয়ায় সবার উচিত বিদেশি কূটনীতিকদের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা। জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশের ওপর ভর করে কারও পক্ষে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে বসা সম্ভব নয়।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
বরিস জনসনের পদত্যাগ চান যুক্তরাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ: জরিপ
বরিস জনসনের পদত্যাগ চান যুক্তরাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ: জরিপ
বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে ২ ঘণ্টা, অতিষ্ঠ যাত্রীরা
বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে ২ ঘণ্টা, অতিষ্ঠ যাত্রীরা
১৮ লাখ টাকায় নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় পাস, গ্রেফতার ৩
১৮ লাখ টাকায় নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় পাস, গ্রেফতার ৩
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ