X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

বাংলা ট্রিবিউনের জন্মদিনে একটি প্রত্যাশা...

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ০৩:১০

অনেক ছোট বয়সের একটা ঘটনা বলি। বাবার চাকরির সুবাদে আমরা সৈয়দপুর শহরে থাকতাম। নীলফামারী জেলা শহরের পাশেই সৈয়দপুর। রেলের শহর। ’৭১-এর মার্চ মাসে শহর ছেড়ে পালাতে হলো। কারণ, শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী ছিল বিহারি অর্থাৎ অবাঙালি। বাঙালি নিধনযজ্ঞে তাদের অনেকেই মেতে উঠেছিল। তাই প্রাণ বাঁচাতে আমার শিক্ষক পিতা পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ট্রেনে চেপে সৈয়দপুর শহর ছাড়লেন। ক্লাসের বইপত্র, জামা-কাপড় আর হাতের কাছে যা পেলাম তা-ই সঙ্গে নিলাম যার যার মতো করে। বইয়ের পাতার ভেতর আমি একটা ছোট্ট ফিল্ম নিয়েছিলাম। তখনকার দিনে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলতে হতো। ছবি তোলার পর ছবির সঙ্গে একটা ফিল্ম দেওয়া হতো। নাম নেগেটিভ ফিল্ম। প্রয়োজনে ওই ফিল্ম দিয়ে আবার ছবি বানিয়ে নেওয়া যেত। যাকে বলা হতো ছবি ওয়াশ করা। যেকোনও ফটো স্টুডিওতে নেগেটিভ ফিল্মটি জমা দিলেই অর্ডার অনুযায়ী ছবি ওয়াশ করে দিতো। অর্থাৎ ছবি প্রিন্ট করে দিতো।

শহর ছেড়ে গ্রামে গেলাম। দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। দেশটা আমাদের। অথচ দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে বর্বর পাকিস্তানিদের সঙ্গে। কেন এই যুদ্ধ ওই বয়সে তেমন একটা বুঝে উঠতে পারিনি। পাকিস্তানিদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা হতো। ওরা এত বর্বর কেন? গ্রামের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাচ্ছে। আমি বয়সে ছোট বলে কেউ সঙ্গে নিচ্ছে না। আমার নিজের চেহারাটা দেখার ইচ্ছে হতো। আমি আসলে কত ছোট তা বোঝার জন্য আয়নায় সময়ে-অসময়ে নিজেকে দেখতাম। হঠাৎ একদিন ওই নেগেটিভ ফিল্মের কথা মনে পড়লো। আহা! যদি প্রিন্ট করা যেত, তাহলে আয়নার দরকার পড়তো না। ছবি পকেটে পুরে রাখতাম। যখন খুশি তখন নিজেকে দেখতাম। কিন্তু যুদ্ধের সময় ছবি ওয়াশ করার সুযোগ কোথায়? অফিস আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজারঘাট, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সবই তো ব্যাহত।

একদিন বাড়ির পাশের রাস্তায় ওই নেগেটিভ ফিল্ম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কী ভেবে পাশেই ঝোপঝাড়ের দিকে নেগেটিভ ফিল্মটি ছুড়ে ফেলে দিলাম। তখন কেবলই মনে হচ্ছিল ওই নেগেটিভ ফিল্মটি থেকে যদি একটি গাছের জন্ম হয়, গাছের নাম হবে ফিল্ম গাছ। মানুষ গাছটির সামনে দাঁড়ালেই গাছের এক একটি পাতা ওই মানুষের ছবি হয়ে টুপ করে মাটিতে পড়ে যাবে। আহা! স্বপ্নের কি ছিরি! নেগেটিভ ফিল্ম গাছ হবে কীভাবে? রূপকথার গল্পে হয়তো সম্ভব। বাস্তবে মোটেই সম্ভব নয়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আজকের এই বিস্ময়কর আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে কেন যেন মনে হচ্ছে নেগেটিভ ফিল্মের ওই গাছটিও হয়তো একদিন জন্ম নেবে। গাছের ডালে থোকায় থোকায় মানুষের ছবি ঝুলবে। কী বললেন, অবিশ্বাস্য, অলীক স্বপ্ন এটি? মানলাম অলীক স্বপ্ন এটি। কিন্তু কেউ কী কোনও দিন ভেবেছিল নিজের ছবি নিজে তুলতে পারবেন? যাকে আমরা বলছি সেলফি। পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে নিজেদের সচল, চলমান ছবি দেখে দেখে যখন-তখন কুশল বিনিময় করতে পারবেন– এমনটাও কি সাধারণ মানুষ ভেবেছিল? একটা সময় ছিল দেশ-বিদেশের সংবাদ জানার জন্য ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। ভোরের সংবাদপত্র আর রেডিও, টেলিভিশন ছিল সংবাদ ও তথ্য প্রবাহের মূল উৎস। বলতে গেলে টেলিভিশন ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে। রেডিও আর দৈনিক পত্রিকাই ছিল তথ্যপ্রবাহের মূল বাহন। আর এখন বাতাসের আগেই গোটা পৃথিবীর সব নতুন তথ্য সাধারণ মানুষও জানার সুযোগ পাচ্ছে। দৈনিক সংবাদপত্র বলতে গেলে একটু যেন কোণঠাসা। অনলাইন সংবাদমাধ্যম এগিয়েছে অনেক দূর। বাংলা ট্রিবিউনের জনপ্রিয়তা এ কথাই প্রমাণ করে।

আমি সংবাদপত্রের মানুষ। সেই আশির দশকে দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেছিলাম। একটানা ১৯ বছর ইত্তেফাকে কাজ করেছি। পরে ইমপ্রেস টেলিফিল্মে বিনোদন পাক্ষিক আনন্দ আলোর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হই। এখনও হাতে লিখি। যদিও এ কথা গর্ব করে বলার মতো নয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিস্ময়কর যুগে হাতে লেখার দিন তো শেষ। তবু আমি হাতে লিখি। তবে এটা বুঝি, যুগের চাহিদার কাছে আমাকেও বদলাতে হবে। হাতে লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে...।

যুগটাই বদলের। আগের দিনে অনেকের ক্ষেত্রে সকাল শুরু হতো দৈনিক পত্রিকা পড়ে। হকার একটু দেরিতে বাসায় পত্রিকা দিয়ে গেলে অনেকেই অস্থির হয়ে উঠতেন। এখন দৈনিক পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। হাতে যদি থাকে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন এবং ফোনের সঙ্গে যদি যুক্ত থাকে ইন্টারনেট কানেকশন, তাহলে নিমিষেই দুনিয়ার তাবৎ সংবাদ সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব। সেখানে ছাপা পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে চান না অনেকে। তাই বলে দেশে ছাপা পত্রিকার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেছে তা কিন্তু নয়। করোনার সময় আগ্রহ কমলেও আবার আগ্রহ বেড়েছে। তবে অনলাইন সংবাদপত্রের প্রতি এখন পাঠকের আগ্রহ বেশি। বাংলা ট্রিবিউনের জনপ্রিয়তা দেখে সেটা বুঝতে পারি। মাস কয়েক আগে ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ এলাকায় গিয়েছিলাম। সংস্কৃতি কর্মীদের এক আড্ডায় একজন তরুণ আমাকে দেখে খুব খুশি। বললেন, আমি বাংলা ট্রিবিউনের একজন নিয়মিত পাঠক। আপনার লেখা পড়ি। ভালো লাগে।

একবার দিনাজপুরে গিয়েছিলাম। আত্মীয়ের বাসায় বসে আড্ডা দিচ্ছি। একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এসে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় দিতেই খুশি হয়ে বললেন, আপনি বাংলা ট্রিবিউনের লেখক না? আপনার লেখা আমি পড়ি।

একজন লেখকের লেখার প্রধান শক্তি হলো তার লেখার পাঠক। বাংলা ট্রিবিউনে লেখা প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠকের যে ফিডব্যাক পাই তা থেকেই বুঝতে পারি বাংলা ট্রিবিউন কতটা জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তা অর্জন করা যতটা কঠিন তার চেয়ে কঠিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। শুভ জন্মদিনে প্রিয় বাংলা ট্রিবিউনকে এ কথা গুরুত্ব দিতে সবিনয়ে অনুরোধ করবো।

লেখাটি শেষ করার আগে একটি ছোট গল্প বলি। একজন রাজনীতিবিদের জন্মদিনে প্রিয়জনেরা অনেক দামি উপহার নিয়ে এসেছেন। সোনার ঘড়ি, বড় আকারের টেলিভিশন সেট, দামি মোবাইল ফোন, স্বর্ণের আংটিসহ আরও অনেক কিছু। তার পরিবারের লোকজন একেকটা উপহারের প্যাকেট খুলছে আর আনন্দে চিৎকার করছে। হঠাৎ তারা চুপ হয়ে গেলো। ঘটনা কী? একটি সাদা খামের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট চিঠি বের করে অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন ভদ্রলোকের এক ছেলে। চিঠিতে ছোট্ট করে লেখা– আজ আপনার জন্মদিন। অনেক শুভেচ্ছা। আশা করি মানুষের পাশে থাকবেন। কারণ, মানুষই আপনাকে নেতা বানিয়েছেন। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ চিঠিখানিকে চুমু খেলেন। পরিবারের সবাইকে বললেন, এই ছোট্ট চিঠিই আমার জন্মদিনের সেরা উপহার।

প্রিয় বাংলা ট্রিবিউন জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আশা করি মানুষের পাশেই থাকবেন। শুভ জন্মদিন বাংলা ট্রিবিউন...।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যায় ফাঁসির আদেশ
শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যায় ফাঁসির আদেশ
‘এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড’
‘এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড’
স্ত্রী-মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা, যুবকের মৃত্যুদণ্ড
স্ত্রী-মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা, যুবকের মৃত্যুদণ্ড
এবার সরকার বেকায়দায় আছে: মান্না
এবার সরকার বেকায়দায় আছে: মান্না
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ