X
বুধবার, ২৯ জুন ২০২২
১৫ আষাঢ় ১৪২৯

অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাতিঘর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আপডেট : ২৩ জুন ২০২২, ১৪:৩০

বাঙালির যা কিছু অর্জন তার সবকিছুর সঙ্গেই রয়েছে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধ থেকে পদ্মা সেতু, স্যাটেলাইট-সাবমেরিন থেকে নদীর তলদেশে টানেল, অর্থনৈতিক উত্থানের বিস্ময় থেকে অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন সবকিছুতেই আওয়ামী লীগ। ৭৩ বছরের ঝঞ্চা বিক্ষুব্ধ পথচলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্যতম মূলনীতি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে ও পরে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রচলন ও অনুসরণের পথিকৃত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূল কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’ পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় কর্মী হয়েও বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এই বিষয়ে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষেও মুসলমান থাকবে এবং পাকিস্তানেও হিন্দুরা থাকবে। সকলেই সমান অধিকার পাবে। পাকিস্তানের হিন্দুরাও স্বাধীন নাগরিক হিসাবে বাস করবে। ভারতবর্ষের মুসলমানরাও সমান অধিকার পাবে। পাকিস্তানের মুসলমানরা যেমন হিন্দুদের ভাই হিসাবে গ্রহণ করবে, ভারতবর্ষের হিন্দুরাও মুসলমানদের ভাই হিসাবে গ্রহণ করবে।’

অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতার দুই দিকেরই আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি যেমন প্রত্যাখ্যান করেছেন, তেমনি হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনাও করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচারে বাংলার মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, আর অন্যদিকে ইংরেজদের সঙ্গে অসহযোগিতার পথ ধরে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ছিল। তাই মুসলমানরা ইংরেজদের সঙ্গে অসহযোগ করেছিল। তাদের ভাষা শিখবে না, তাদের চাকরি নেবে না, এই সকল করেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল।… যখন আবার হিন্দুরা ইংরেজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন অনেকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মরতে দ্বিধা করে নাই। জীবনভর কারাজীবন ভোগ করেছে, ইংরেজকে তাড়াবার জন্য। এই সময় যদি এই সকল নিঃস্বার্থ (হিন্দু) স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানের মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা এত বাড়তো না। হিন্দু নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষ বসু এ ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তাই তাঁরা অনেক সময় হিন্দুদের হুঁশিয়ার করেছিলেন। কবিগুরুও তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে হিন্দুদের সাবধান করেছেন।’ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতার কিছু অনুসারী সাম্প্রদায়িকতার এক পিঠ দেখেন অন্যটির বিষয়ে চুপ থাকেন। এইভাবে তারা নতুন আরেক ধরনের সাম্প্রদায়িকতার লালন করছেন।

আজ ঐতিহাসিক ২৩ জুন। বাঙালির জীবনে এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৭৫৭ সনের এই দিনে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। সেই সাথে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শত্রুতামূলক বিভাজন সৃষ্টি ও ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতার পথও প্রশস্ত হয়। ইংরেজ শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে ঘৃন্য ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির পথ ধরে ব্রিটিশ সরকার ভারতে প্রতিষ্ঠা করে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতা। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের স্মৃতিকথামূলক বই ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: আ মেমোয়ার’ এ উল্লেখ করেছেন সাম্প্রদায়িক হিংসার সূচনা ব্রিটিশ শাসনামলে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক মার্কান্দে কাটজু ‘দ্য নেশন’-এ লিখেছেন, সমস্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দ্বারা কৃত্রিমভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করে শুরু হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিষ দশকের পর দশক ধরে আমাদের রাজনীতিতে প্রবেশ করানো হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল। পলাশীর যুদ্ধের ১৯২ বছর পর ১৯৪৯ সনের ২৩ জুন সাম্প্রদায়িক সমাজ কাঠামোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে অসাম্প্রদায়িক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যদিও শুরুতে দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল আপৎকালীন সময় উত্তীর্ণ হলে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য জাতির সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম শব্দটি ১৯৫৫ সনে বাদ দিলেও একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই শুরু করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থাৎ ভারত বিভাগের মাসখানেক পরই বঙ্গবন্ধু ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন: ‘আমি বললাম, এর (গণতান্ত্রিক যুবলীগের) কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা করা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে- যাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমনি’, তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল…।’

এই গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনই ছিল সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতির স্থলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি প্রবর্তনের পথপ্রদর্শক। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিগড় ভেঙে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় ১৯৫৩ সালে মুসলিম ছাত্রলীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া হয়। দলের অসাম্প্রদায়িক নাম দিলেই কিংবা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে ওষ্ঠ সেবার বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে সমাজে, রাষ্ট্রে, রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তিকে রুখতে হলে অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতা ও উন্মত্ততার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে হয়। ১৯৪৬ সালে যখন কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলো, তখন বঙ্গবন্ধু দাঙ্গাপীড়িত এলাকায় গিয়ে কাজ করেছেন, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। ১৯৪৮ সালের দিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কায়েম রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় সভা করে বেড়াতেন। এ সময় পরিবেশ এমন উত্তাল ছিল যে, যে কোনও সময় হামলা হতে পারতো। সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে বললেন– ‘তোমার উপরও অত্যাচার আসছে। এরা পাগল হয়ে গেছে। শাসন যদি এইভাবে চলে বলা যায় না কি হবে! আমি বললাম, স্যার, চিন্তা করবেন না, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি খোদা আমাকে দিয়েছেন। আর সে শিক্ষা আপনার কাছ থেকেই পেয়েছি’।

১৯৫৬ সনে শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ঘোষণা করা হলে এর তীব্র বিরোধিতা করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান শাসনতান্ত্রিক পরিষদে তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান শুধু মুসলমানদের জন্য সৃষ্টি হয়নি।’ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত সাহসী ভূমিকার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রামেন্দু মজুমদার লিখেছেন, ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি শাসকদের মদতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, বিশেষ করে ঢাকায় একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় তার বড় ভাইয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে তিনি থাকতেন। দাঙ্গার প্রথম রাতে তাদের বাসার পাশের রেললাইনে ট্রেন থামিয়ে কয়েকজন সংখ্যালঘু যাত্রীকে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে তাদের আত্মীয় অধ্যাপক অজিত গুহ বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে বলেন, ‘তার এক আত্মীয় পরিবার তেজগাঁওয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছে, তিনি যদি তাদের উদ্ধার করতে পারেন।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু তাদের বাসায় এসে উপস্থিত। বললেন, দুই মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে তার সঙ্গে যেতে। তিনি একটা জিপ নিয়ে এসেছিলেন, ড্রাইভারের পাশে তিনি বসলেন, পেছনে সবাই। ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন কোথাও না থামিয়ে সোজা তার বাসায় যেতে। ৩২ নম্বরে তার বাড়িতে গিয়ে রামেন্দু মজুমদার দেখলেন শহরের অন্যান্য এলাকা থেকে কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারকে তিনি এরই মধ্যে এনে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছেন। বেগম মুজিব পরম যত্নে সবার খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করছেন। রামেন্দু মজুমদার লিখেছেন, এই যে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীদের সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করা, কয়জন নেতা এ কাজটি করেন? মুখে বলা সহজ, কিন্তু কাজে করে দেখানো কঠিন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন, জীবনাচরণে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ। তবে সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি বর্জন করেছিলেন। প্রকৃত ধার্মিক কখনও সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।

ইসলাম ধর্ম এই শিক্ষা দেয় না। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে এবং জীবন উৎসর্গ করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, ৫১২৩) অন্য ধর্ম ও মানুষের প্রতি সহনশীলতা ও ভালোবাসা ধার্মিকের বড় গুণ। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘... রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে সে সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন তিনি রাব্বুল আল আমিন- রাব্বুল মুসলেমিন নন’।

বঙ্গবন্ধুর এই নিরন্তর অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ চর্চা ও বাস্তবে তার প্রতিফলন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িকতাকে দৃঢ়ভাবে গেঁথে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যে মুক্তিসংগ্রাম করেছেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তার অন্যতম মূলমন্ত্রই ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতাকে যুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ইশতেহার মানুষ গ্রহণ করেছিল। এর ভিত্তিতেই আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন: ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর এই রাষ্ট্রের ভিত্তি ধর্মভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’

বাংলাদেশের সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার প্রতিফলন ঘটিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার চার মূলনীতির মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করা হয়। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনও রকম বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করা। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের মন বুঝতেন অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার এই জটিল প্রত্যয় সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে জনগণের একটি অংশ বিভ্রান্তির চেষ্টা করতে পারে। সেটা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

তাই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সকল ধর্মের মানুষ নিজ-নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন-ব্যভিচার এই বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না’।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই প্রথম রাষ্ট্র যেখানে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সনে ভারতের সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধান একমাত্র সংবিধান যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনও ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোনও বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার ওপর নিপীড়ন, বিলোপ করা হইবে।’ আর ২৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ধর্ম, প্রভৃতি কারণে কোনও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। বঙ্গবন্ধু শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসা বাঙালির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিশেষ ইতিহাসকে ধরতে পেরেছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণগুলোও বুঝতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতির হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি বিকশিত হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের গড়ার কাজ শুরু করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ধারায় ফিরিয়ে নেয় সামরিক শাসকরা ও পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রে’র নামে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী দল এবং পাকিস্তানের দোসর যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন।

দেশে শুরু হয় ধর্মের অপব্যবহারের রাজনীতি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর আঘাতের পর আঘাত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়। ধর্মের নামে শুরু হয় হানাহানি। রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উৎসাহিত করার কারণে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, হামলা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় মদতে উত্থান হয় জঙ্গিবাদের।

বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িকতার নিগড়-বন্দী রাষ্ট্র মেরামত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন– ‘এই বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে, সমান সুযোগ নিয়ে বসবাস করবে। আমরা সেই নীতিতে বিশ্বাস করি।’ দেশে-বিদেশে অনেকেই প্রশ্ন করেন সংবিধানে একটি বিশেষ ধর্মকে উল্লেখ রেখে রাষ্ট্র কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হবে? আমি তাদের বলি, বিড়াল সাদা, না কালো সেটি বড়ো কথা নয়; বিড়াল ইঁদুর ধরে কি না সেটাই আসল বিবেচ্য। ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানে যুক্ত রেখে রাষ্ট্রে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতা চর্চার উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অনুপস্থিত এমন রাষ্ট্র দারুণভাবে অসাম্প্রদায়িক তার নজিরও রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন খুশিতে ভরে উঠবে এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের যারা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে।’

অসাম্প্রদায়িক নীতি-আদর্শ ও রাজনীতির বাতিঘর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সকল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ও সরব রয়েছে।

লেখক:  অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
খেলাটা ফেয়ার হতে হবে: টুকু
খেলাটা ফেয়ার হতে হবে: টুকু
বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে বৃদ্ধাকে হত্যা
বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে বৃদ্ধাকে হত্যা
শাহবাগে ট্রাকচাপায় যুবক নিহত
শাহবাগে ট্রাকচাপায় যুবক নিহত
সাবিলাকে নিয়ে অপূর্বর ‘আবারও অঘটন’
সাবিলাকে নিয়ে অপূর্বর ‘আবারও অঘটন’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ