X
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২
২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

তলোয়ার-বন্দুকের নির্বাচনে কমিশনের কাজটা কী?

রুমিন ফারহানা
১৭ জুলাই ২০২২, ২১:১০আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ২১:১০

২০২৩ সালের শেষে কিংবা ২০২৪-এর শুরুতে হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রত্যাশা যত না, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আছে অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব আর আশঙ্কা। এই আশঙ্কা, ভয় যেমন আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোও খুব স্বস্তিতে নেই। যার ন্যূনতম রাজনৈতিক বোধ আছে, সে-ই জানে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে যদি কেউ থেকে থাকে, সেটি সরকারি দল। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন কিংবা ২০১৮ সালের মধ্যরাতের ভোট কোনও দলের রাজনীতিকে যদি শেষ করে দেয় তা হলো সরকারি দলের। তারা খুব ভালো করেই জানে, ন্যূনতম স্বচ্ছ ভোট হলে সরকার গঠন দূরেই থাকুক, সামান্য কয়েকটি আসন নিশ্চিত করাই তাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

ক্ষমতাসীন দলে এখন একজন কর্মীও আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। সে কারণে একেবারে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনেও নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীদের জানে মেরে ফেলা থেকে শুরু করে তাদের শারীরিকভাবে আহত করা, এলাকা ছাড়া করা, ভয়ভীতি দেখানো সবই হয়েছে। এবং এসব হয়েছে পুলিশ, প্রশাসনকে সামনে রেখে, ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের সাহায্য নিয়ে। ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকটি নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীরা বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক উক্তি দিয়েছিলেন। আমার অনেক কলামে এসব নিয়ে আলোচনা করেছি, তাই পুরনো সে বিষয়গুলো আর উল্লেখ করলাম না।

এই উক্তিগুলো এমন নির্বাচনের যেটি কিছু দিন আগে পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতো। এমনকি একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য পর্যন্ত একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো, বিনা ভয়ে আনন্দের সাথে। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যখন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েই, তখন সংসদ নির্বাচন, যেটায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হয়, সেখানে কী হতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়। আর সে বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই সম্ভবত আউয়াল কমিশন শপথ পাঠের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলকে সবক দিয়ে বলেন, ‘আমি বলতে চাচ্ছি, মাঠ ছেড়ে চলে আসলে হবে না। মাঠে থাকবেন, কষ্ট হবে। এখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হয়তো দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু উনি পালাননি। তিনি বলছেন, “আমি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করবো।” তিনি রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধ করে যাচ্ছেন।’

এতদিন যা ছিল আড়ালে আবডালে, যা সকলে জানতো কিন্তু দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে কখনও যার স্বীকৃতি মেলেনি সেই সত্য এখন অকপটে বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন এ দেশে নির্বাচন স্রেফ একটি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, যেখানে পেশিশক্তির লড়াইটাই হবে মূল। যার শক্তি বেশি, যে মাঠ দখলে রাখতে পারবে সে-ই জিতবে নির্বাচনে। এখানে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, সকলপক্ষের সমান সুযোগ পাওয়া নির্বাচন একটি স্বপ্ন মাত্র। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরোধী দলকে জেলেনস্কির মতো মাঠে থাকবার যে উপদেশ সেটি ভীষণভাবে সমালোচিত হলেও তিনি যে স্রেফ কথার কথা বা মুখ ফসকে কথাটি বলে ফেলেছেন তেমনটি নয়। না হলে একই ধাঁচের কথা বারবার বিভিন্ন ফোরামে তিনি বলতেন না।

১৭ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের প্রথম দিনে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সঙ্গে সংলাপে সিইসি বলেন, ‘সব দল সহযোগিতা না করলে আমরা সেখানে ব্যর্থ হয়ে যাবো। আপনাদের সমন্বিত প্রয়াস থাকবে, কেউ যদি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ায়, আপনাকে রাইফেল বা আরেকটি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াতে হবে। আপনি যদি দৌড় দেন, তাহলে আমি কী করবো?’ তাহলে আমি কী করবো- কথাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই কথাটির মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন স্বীকার করে নিচ্ছেন যে নির্বাচনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। সংবিধান কিংবা নির্বাচনি আইন যাই বলুক না কেন, কমিশন যদি নিজেই নিজেকে অসহায় দেখাতে চায় তবে সেই কমিশনকে শক্তিশালী করার সাধ্য কোনও সংস্থা বা আইনের নেই।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এবং ইচ্ছে আসলে কতটা, সেটা কিছু দিন আগেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ই দেখা গিয়েছিল। সেখানকার নির্বাচনে আর সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জনাব বাহাউদ্দিন বাহার। তিনি সেখানে থেকে গিয়ে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। এরপর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বাহাউদ্দিনকে নির্বাচনি এলাকা ত্যাগ করতে ৮ জুন নির্দেশ দেয় ইসি। তাকে পাঠানো এক চিঠিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই চিঠিকে ন্যূনতম পাত্তা না দিয়ে বাহার থেকে যান এলাকায় এবং কৌশলে চালিয়ে যান তার প্রচারণার কাজ। মজার ব্যাপার, নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে একজন নির্বাচন কমিশনার এবং সিইসি জনাব বাহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের অক্ষমতার কথা বললেও দফায় দফায় তারা এটুকু অন্তত বলেছিলেন যে জনাব বাহার নির্বাচনি আইন ভঙ্গ করেছেন।

মজার ব্যাপার, নির্বাচনটি শেষ হয়ে যাবার পর নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম এই অবস্থান থেকে সরে যান। ২০ জুন সিইসির নেতৃত্বে পুরো নির্বাচন কমিশন রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে সিইসি বলেন, ‘কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন কোনও আইন ভঙ্গ করেননি। তিনি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোনও নির্দেশ ভঙ্গ করেননি। আর তাঁকে ইসিও কোনও নির্দেশ দেয়নি’। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দূরেই থাকুক, তিনি নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন, এটুকু বলারও নৈতিক শক্তি এবং সাহস রাখে না বর্তমান নির্বাচন কমিশন।  

এবার জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘তলোয়ার’ আর সেটি প্রতিরোধে বন্দুকের যে কথা বলেছেন নির্বাচন কমিশন সেটি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে আমি মনে করি। তার এই কথার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘মল্লযুদ্ধে’ সরাসরি আহ্বানের একটা ইঙ্গিত আছে। তিনি একভাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এবং আসন্ন নির্বাচনে দলগুলোর হার-জিতের ফায়সালা তাদের নিজেদেরই করে নিতে হবে এবং সেটা রাজপথেই রক্তারক্তির মাধ্যমে। সাদা বাংলায় এটি একটি উসকানিমূলক বক্তব্য। সেই রক্তারক্তির নির্বাচনে কমিশন যে দর্শকের বেশি কিছু হবে না, কুমিল্লা সিটি নির্বাচন দেখার পর সেটি একেবারেই স্পষ্ট।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপির গণসমাবেশ: ব্যস্ততা বেড়েছে পল্টন থানায়
বিএনপির গণসমাবেশ: ব্যস্ততা বেড়েছে পল্টন থানায়
ব্রাজিলের বিপক্ষে ‘অঘটন’ চান সনও
ব্রাজিলের বিপক্ষে ‘অঘটন’ চান সনও
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
মাটির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিতে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা দুর্বল: কৃষিমন্ত্রী
মাটির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিতে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা দুর্বল: কৃষিমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ