X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

আমলার ‘মাস্তানের চেয়ে খারাপ ভাষা’ হওয়ার কারণ

ডা. জাহেদ উর রহমান
০৩ আগস্ট ২০২২, ১৮:৪৫আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ১৮:৪৫

‘নিচু জায়গায় নির্মাণ করা উপহারের ঘর পানিতে ভাসছে’ শিরোনামে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় নিচু জমিতে উপহারের ঘর নির্মাণ নিয়ে সেখানকার ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি অনলাইন নিউজপোর্টাল, ঢাকা পোস্ট। পোর্টালটির কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধির করা ওই সচিত্র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা হোয়াব্রাং এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের সব নতুন ঘর পানিতে ভাসছে। ফলে সেখানে থাকা ২৭টি পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।’

এর পরপরই ওই উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ কায়সার খসরু এই সাংবাদিককে তার অফিসিয়াল নম্বর থেকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অডিওটিকে ভিত্তি করে সংবাদ প্রকাশ করেছে অনেক গণমাধ্যম। ভাষাটা আমাদের হাইকোর্টের কাছে এতই ভয়ংকর মনে হয়েছে যে একজন আইনজীবী এই সংবাদটি হাইকোর্টের নজরে আনলে হাইকোর্ট বলেছেন–

‘একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও আপত্তিকর। কোনও রং হেডেড ব্যক্তি ছাড়া কেউ এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারেন না।....সংবাদ প্রকাশ নিয়ে ইউএনও যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা খুবই অবজেকশনেবল ও দুঃখজনক। তিনি একজন মাস্তানের চেয়েও খারাপ ভাষা ব্যবহার করেছেন।’

রিপোর্টটিকে কেন্দ্র করে যা যা হলো তার প্রতিক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক গিয়েছিলেন সরেজমিন প্রকল্পের অবস্থা দেখতে। সেখানে তিনি নিশ্চিত হন প্রকল্পের বাড়িগুলো অবশ্যই বেশ নিচু জায়গায় হয়েছিল, ফলে জোয়ারের সময় সেগুলোতে পানি উঠে যায়। অর্থাৎ রিপোর্টটির সত্যতা আছে। তারপরও আমরা তর্কের খাতিরে ধরে নিই, ওই গণমাধ্যমের সাংবাদিক ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ করেছেন।

সব সাংবাদিক ধোয়া তুলসী পাতা নন। কোনোকালে, কোনও দেশে সব প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সব সাংবাদিক কিংবা মালিক ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না। সত্য লুকানো, সত্য বিকৃত করা, সংবাদের উদ্দেশ্যমূলক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে চাঞ্চল্য বাড়িয়ে তোলা, নানা রঙচঙে উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো অপেশাদার, এমনকি অনৈতিক সাংবাদিকতার ইতিহাস অনেক পুরনো। হ্যাঁ, এমন সাংবাদিকতাকেই আমরা ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ নামে চিনি।

১৮৯০-এর দশকে জোসেফ পুলিৎজারের মালিকানার ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’ এবং উইলিয়াম হার্স্টের মালিকানার ‘নিউ ইয়র্ক জার্নাল’-এর মধ্যে সার্কুলেশন বৃদ্ধির জন্য এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার জেরে সংবাদ নির্বাচন, প্রকাশ এবং প্রচারের ধরনে যে অনৈতিকতা শুরুর প্রেক্ষাপটে ইয়েলো জার্নালিজম শব্দগুলো ব্যবহৃত হতে শুরু করলেও এই চর্চা আরও আগেও কম-বেশি ছিল। বর্তমান বাংলাদেশে সার্বিকভাবে নৈতিকতার যে স্খলন তৈরি হয়েছে সেটা আর সব সেক্টরের মতো প্রত্যাশিতভাবেই প্রভাবিত করেছে সাংবাদিকতাকেও।

বর্তমান বাংলাদেশে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’-এর ব্যাপকতা আগের যেকোনও সময়ের চাইতে বেশি– এটা মানতে আমার দ্বিধা নেই। সংবাদমাধ্যম যেহেতু এই সমাজ, রাষ্ট্রের অংশ, তাই তারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকবেন, এটা হতে পারে না। আর সব পেশার মতোই কিছু সাংবাদিকের মধ্যে অনৈতিক, বেআইনি এমনকি অপরাধমূলক কাজ করার প্রবণতা আছে নিশ্চয়ই। একজন সাংবাদিক যদি সত্যি সত্যি সাংবাদিকতার নামে ভয়ংকর কোনও অপরাধ করেন তাহলেও কি কোনও ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাকে ফোনে এমন ভয়ংকরভাবে গালিগালাজ করতে পারেন?

দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতাজনিত যেকোনও অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রেস কাউন্সিল, এমনকি আদালতও তো আছে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতাশালী ব্যক্তি যদি দেশের শাসন ব্যবস্থা, আইন-কানুন সম্পর্কে স্পষ্ট সম্পূর্ণ ধারণা রেখেও একজন সাংবাদিককে গালিগালাজ করেন, সেটাকে আমরা কীভাবে দেখবো? দেশের প্রশাসনের মধ্য পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ইউএনও’র তো না জানার কোনও কারণ নেই একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে তার কী করা উচিত। একজন ইউএনও’র এমন আচরণের ব্যাখ্যা পেতে ঠিক একই ধরনের আরেকটি অতি আলোচিত ঘটনা আবার স্মরণ করা যাক।

২০২০ সালে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের ঐতিহ্যবাহী ‘নিউ টাউন পার্ক’ নামের পুকুরটি কাবিখার টাকায় সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর পুকুরটির নামকরণ নিজের নামে ‘সুলতানা সরোবর’ করতে চেয়েছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন। জেলার মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় নামকরণের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেজুলেশন করিয়েছিলেন সুলতানা পারভীন। শুধু সেটাই নয়, তিনি এই পুকুরের সামনে রাতের বেলা দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেইজে স্ট্যাটাস শেয়ার করেন। এই স্ট্যাটাসে পুকুরটির নাম ‘সুলতানা সরোবর’ সে তথ্যটিও উল্লেখ করেন তিনি।

সবকিছু একেবারে ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু ডিসির পরিকল্পনা সফল হয়নি বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের কারণে। তার একটি রিপোর্টে এটা নিয়ে চরম সমালোচনা শুরু হয় এবং সেই সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে অকল্পনীয় রকম অন্যায় ক্ষমতাভোগী ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর’ অহমে তীব্র আঘাত করে এটি। এক ‘তুচ্ছ’ সাংবাদিককে শায়েস্তা করতে মোটেও দেরি করেননি তিনি।

মধ্যরাতে আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত আরিফুলকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। তার বাড়িতে আধা বোতল মদ এবং গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এই সংবাদ প্রকাশিত হলে ডিসি এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর তিন কর্মকর্তার ওপর চাপ তৈরি হয়। সরকার বিভাগীয় তদন্ত করে শাস্তি দেয় অভিযুক্তদের।

ওই ঘটনায় একটি ফৌজদারি মামলা হলেও সেটার ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। এই বছরের বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট আমাদের জানায়, এই নির্যাতনের ঘটনায় সাংবাদিক আরিফুলের করা মামলার তদন্ত দুই বছরেও শেষ হয়নি। সেটাই নয়, আরিফুল জানান তার ওপর নানাভাবে চাপ তৈরি করছেন অভিযুক্তরা মামলায় সমঝোতা করার জন্য।

ওই ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল যেটা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত যেই বিভাগে এরা চাকরি করেন তারাই তাদের অপরাধী হিসেবে প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের লঘুদণ্ড দেওয়া নিয়ে ভুক্তভোগীসহ নানা মহলে অসন্তোষ ছিল কিন্তু তৎকালীন ডিসি সুলতানা এবং আরডিসি নাজিমের বিরুদ্ধে এই বিভাগীয় ব্যবস্থাও রাখা যায়নি।

কয়েকজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী (সংবিধান অনুযায়ী) ভয়ংকর একটা অপরাধ করেছেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া দূরেই থাকুক অতি লঘু বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েও সেটা রাখা যায়নি- এমন ঘটনা প্রশাসনের অন্যদের কাছে কি বার্তা দেয় সেটা আমরা নিশ্চয়ই বুঝি।

অপরাধ করেও ন্যূনতম শাস্তি না পাওয়া একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এরপর কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন, সেটা আমরা জানতে পারি এই বছরের ২ মে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট থেকে। সেই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সাংবাদিক আরিফুলকে নির্যাতনে অভিযুক্ত সাবেক আরডিসি নাজিম বর্তমানে সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সেখানে তিনি কী কী করছেন, তার একটা বর্ণনা পাওয়া যাবে বাংলা ট্রিবিউনের সেই রিপোর্টের এই প্যারাগ্রাফটিতে–

‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন নাজিম উদ্দিন। ঘুষ বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, ক্রসফায়ারের হুমকি, নির্বাহী কোর্ট বসিয়ে জেল-জরিমানা ও চাকরি থেকে অব্যাহতির হুমকি, এমনকি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে মাদক সেবন ও বহনের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। আরও আছে পৌরসভার মেয়রকে অপসারণ চক্রান্ত ও নিয়মবহির্ভূত ছুটি কাটানোর অভিযোগ’।

নানা কারণে বর্তমান সরকার ভীষণভাবে আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে। এই অভিযোগ শুধু বিরোধীরাই করেন না, করেন সরকারি দলের লোকজনও। সেটা যদি সবাই বোঝে তাহলে আমলাদের তো না বোঝার কোনও কারণ নেই। সে কারণেই একজন মাঝারি পর্যায়ের আমলা ভয়ংকর এক অপরাধ থেকে শাস্তি মওকুফ পেয়ে হয়ে ওঠেন আরও অনেক বেশি বেপরোয়া আর আরেকজনের ভাষা হয়ে ওঠে ‘মাস্তানের চাইতে খারাপ’।

কুড়িগ্রামের ঘটনার তুলনায় টেকনাফের ঘটনাটি কম ভয়ংকর। সেজন্যই বোধকরি ইউএনওকে ওএসডি করার মাধ্যমেই দায়িত্ব সেরেছেন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। কুড়িগ্রামের বিষয়টির পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহ স্মরণে রাখলে বুঝবো এই ওএসডি করাটা ‘আইওয়াশ’-এর চাইতে বেশি কিছু নয় নিশ্চয়ই।

সবচেয়ে বড় কথা, একের পর এক ঘটনা ঘটে আর দেশের নানা পর্যায়ের আমলারা প্রমাণ পেয়ে যান, তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন যে তারা থাকবেন ধরাছোঁয়ার একেবারে বাইরে। আর তাই নিজেদের আর ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ তারা মনে করেন না, মনে করেন ‘প্রজাতন্ত্রের মালিক’। তাই যাচ্ছেতাই করতে তাদের অনেকেরই আর বাধে না।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ