X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

কাশিম বাজার কুঠিগুলো কি আবার সচল হলো?

আবদুল মান্নান
১৬ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:১৭আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:২৩

বাংলার ইতিহাসে কাশিম বাজার কুঠি স্থায়ী নাম করে নিয়েছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে কাশিম বাজার একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। এই বাজার দিয়েই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ও ইউরোপে যেত বাংলার জগৎ বিখ্যাত রেশমের কাপড়, মসলা, লবণসহ আরও অনেক পণ্য। বাণিজ্যে আধিপত্য ছিল ওলন্দাজ, ফরাসি আর ইংরেজদের। সুবেহ বাংলা, যার পরিধি বিস্তৃত ছিল বিহার উড়িষ্যা আর আসামের অংশবিশেষ, তাদের সমকক্ষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ভারতবর্ষের আর কোনও অঞ্চল কখনও ছিল না। বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ ছিল লন্ডন শহরের চেয়ে অনেকগুণ বেশি উন্নত। ইংরেজরা বাংলার সঙ্গে শুধু বাণিজ্য করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের চোখ পড়েছিল বাংলার রাজ সিংহাসনের ওপর। একবার শাসনভার কব্জা করতে পারলে বাংলার সব সম্পদ তাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো নবাবের বিশাল সেনাবাহিনী, যাদের সঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। এর বিকল্প হচ্ছে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেওয়া।

এসব পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্র শুধু বাইরের মানুষ দিয়ে হয় না। প্রয়োজন কিছু ভেতরের মানুষ। নানা ধরনের টোপ দিয়ে পাওয়া গেলো এমন কিছু ভেতরের মানুষ, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন নবাবের সিপাহি সালার মীর জাফর আলী খান। তাকে বলা হলো সিরাজকে যদি ক্ষমতা থেকে হটানো যায় তাহলে তিনিই হবেন বাংলার নবাব। ইংরেজরা জানালো তাদের রাজ্য শাসন করার কোনও অভিপ্রায় নেই। তারা শুধু বাণিজ্য করতে এসেছে। শুধু একজন মীর জাফরকেই তো আর হাত করলে হবে না। আরও মানুষ চাই। নানা ধরনের টোপ দিয়ে চতুর ইংরেজরা হাত করলো সিরাজউদ্দৌলার একান্ত কাছের মানুষ রাজা রাজবল্লব, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠসহ আরও বেশ কিছু নবাবঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে। ইংরেজরা বাংলা দখল করার জন্য যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল তা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত বৈঠকের জন্য নবাবের প্রাসাদের অদূরে কাশিম বাজারে একটি কুঠিকে বেছে নিলো। সন্ধ্যা হলেই সেখানে বসতো বাইজিদের নাচের আসর। সুরা ব্যবস্থার কমতি ছিল না। তারপর শুরু হতো নবাবকে উৎখাত করার আসল নীল নকশা আর তার বাস্তবায়নে পরিকল্পনা কাজ। এমন কুঠি আরও একাধিক জায়গায় স্থাপিত হয়েছিল। ইংরেজরা সাধারণত বেছে নিতো কোনও একটা নীল কুঠি।

বলা হয়, পলাশীর যুদ্ধের আগে শেষ বৈঠকটি হয়েছিল পলাশী থেকে আনুমানিক কুড়ি মাইল দূরে, আমঝুপি কুঠির, যা বর্তমানে মুজিবনগরে সংরক্ষিত আছে। নবাব তাঁর বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র চলছে জানতেন, কিন্তু তিনি অনেকটা অসহায় ছিলেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর একান্ত কাছের মানুষরাই বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছে। তার পরেরটা তো শুধু বাংলার জন্যই নয়, গোটা ভারতবর্ষের জন্য করুণ ইতিহাস। ষড়যন্ত্রের শেষ ফসল হলো পলাশীর যুদ্ধ আর তার সিপাহীসালার মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতা। সেই করুণ ইতিহাসের সমাপ্ত  হলো সিরাজউদ্দৌলাকে তার দুধভাই মোহাম্মদি বেগকে দিয়ে হত্যা।

পাঠক হয়তো ভাবছেন আমি কি ইতিহাসের সবক দিতে বসেছি? না, তা নয়। দেশে ও দেশের বাইরে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে একজন নতুন মীর জাফর আলী খানকে ক্ষমতায় বসিয়ে এই দেশকে ইরাক লিবিয়া বানানোর জন্য একই সঙ্গে অনেক কাশিম বাজার সচল হয়েছে। নব্য মীরজাফররা বৈঠক করছেন লন্ডনে, কলকাতায়, কাঠমান্ডু, সিঙ্গাপুর আর ব্যাংককে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রায় ১৩ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে। যে দলটির জন্ম ক্ষমতায় থেকে সেই দল এতদিন ক্ষমতার বাইরে থাকবে তা তারা কীভাবে মেনে নেবে। চেষ্টা করেছিল ২০০৬ সালে তাদের মেয়াদ শেষ হলে তা কীভাবে প্রলম্বিত করা যায় সেই পথ খুঁজতে। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার আর নিজেদের পছন্দসই ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করে শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করেছিল দলটি।

গণ-আন্দোলনের মুখে সফল হয়নি। এলো এক এগারোর সরকার। কথা ছিল তারা নব্বই দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজ নিজ পেশায় ফিরে যাবে। অবৈধভাবে ক্ষমতার স্বাদ পেলে কি আর কেউ ছাড়তে চায়? তারা সবকিছু করা শুরু করলেন, শুধু নির্বাচনের কথা বললে তাদের শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে যায়।

তাদের সঙ্গে পেলো কিছু মিডিয়া আর একশ্রেণির নাগরিক সমাজের সদস্য। এরা সেই সরকারের কৃপাধন্য। কেউ গেলেন রাষ্ট্রদূত হয়ে আর কেউ নামলেন ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা হস্তগত করতে।

শেষতক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনের মুখে দিতে হলো নির্বাচন, ছাড়তে হলো ক্ষমতা। সরকার গঠন করলেন শেখ হাসিনা। তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ সরকারের’ কাজ কারবার নিয়ে দেশে ২০০৫ সালে একজন আইনজীবী উচ্চ আদালতে মামলা করলেন। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। তারা এই মামলার ব্যাপারে তেমন কোনও খোঁজ-খবর নেওয়া থেকে বিরত ছিল। ২০১৩ সালে এসে উচ্চ আদালত রায় দিলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এমন সরকারের কোনও স্থান নেই। বাতিল হলো সেই ব্যবস্থা ।

২০০৯-এ শুরু করা শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার মেয়াদ শেষ করলো ২০১৪ সালে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলো। কিন্তু গোঁ ধরলো বিএনপি আর তাদের মিত্র জামায়াত। সঙ্গে অতীতের মতো কিছু গণমাধ্যম। আর সবসময় আওয়ামী লীগবিরোধী কিছু বুদ্ধিজীবী আর নাগরিক সমাজের সদস্য। বিএনপি ও তার মিত্রদের এক কথা। সংবিধানের বাতিল হওয়া ধারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে তারা নির্বাচনে যাবে না। নির্বাচনে কমিশনের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। শেখ হাসিনা অনেকটা নিজে যেচেই নানা রকমের ফর্মুলা দিলেন বিএনপিকে। টেলিফোন করলেন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে। গঠনমূলক কোনও আলোচনা তো হলোই না উল্টো তিনি অপমানিত হলেন। নির্বাচন বানচালের উপায় হিসেবে বিএনপি-জামায়াত বেছে নেয় সারা দেশে ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাস। মারা পড়লো কয়েকশ’ নিরীহ মানুষ। জনসম্পদ পুড়লো কয়েক শত কোটি টাকার। টললেন না শেখ হাসিনা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে লিখিত সংবিধান তো তিনি নাকচ করে দিতে পারেন না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সরকারে আবার শেখ হাসিনা।

এলো ২০১৮ সালের নির্বাচন। আবারও বিএনপি’র একই কথা। কিন্তু পরিস্থিতির তো কোনও পরিবর্তন হয়নি। ২০১৩-২০১৪ সালে তাদের সন্ত্রাস তো কোনও কাজে আসেনি। তারা এবার নেতা মানলেন ড. কামাল হোসেনকে। তাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন লন্ডনে পলাতক বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হয়ে আছেন। দলে হাল ধরার মতো কাউকে পাওয়া গেলো না। ড. কামাল হোসেন তাঁর নতুন মিত্রদের নিয়ে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। তিনি তাঁর পিতার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন। কিন্তু মনোনয়নের নামে শুরু হলো এক লাগামহীন বাণিজ্য। একেকটি আসনে একাধিক প্রার্থী। কেউ ধানের শীষ তো কেউ স্টিমার। নির্বাচনের দিন প্রায় কোনও সেন্টারে কোনও এজেন্ট ছিল না এই নব্য ঐক্যজোটের। কোনও পোস্টার না ছাপিয়ে কৃচ্ছ্র সাধন করলেন প্রার্থীরা। ভোটাররা বিভ্রান্ত। ফলাফল নতুন ঐক্যজোটের ভাগ্যে জুটলো ছয়টি আসন । সংরক্ষিত আসন নিয়ে মোট সাতটি। এখন তো তাও নেই। সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এই বলে তাদের পদত্যাগের ফলে সরকার বেকায়দায় পড়বে আর তার সঙ্গে থাকবে এক নজিরবিহীন গণআন্দোলন। পড়ে যাবে সরকার। তারপর নির্বাচন। কিন্তু মানুষের কাছে পরিষ্কার নয় সরকারই যদি পড়ে যায় নির্বাচন হবে কীভাবে? এটা কি সরকারের বিরুদ্ধে অন্য কোনও ষড়যন্ত্রের আলামত?

এই বছরের শেষে দ্বাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া কথা। অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত করা যায়নি। সুতরাং এখন ষড়যন্ত্রের সব কাশিম বাজার কুঠির দরজা খুলে গেলো। গজালো নানা শাখা প্রশাখা। ইনসাফের বার্তা নিয়ে কিছু ঋষি ব্যক্তি মাঠে নামলেন। একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ডাক পড়লো সব কুশীলবের, ডিনারসহ সেই তারকা খচিত হোটেলে গরিবদের নিয়ে আলোচনা হবে। বলে কিনা ডিনারের নিমন্ত্রণ, না গেলে কি হয়। এই ডিনারে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন সুধীজন বিদেশের একটি অনলাইন টিভিতে এই বিষয়ে একটি টকশোতে অংশ নিয়ে পরিষ্কার করে বলেন কারা কারা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেলো যারা সকাল বিকাল শেখ হাসিনাকে টোকা মেরে ফেলে দেওয়ার ঘোষণা দেন তাদের প্রায় সবাই ডিনার মাহফিলে ছিলেন। উড়ে এসেছিলেন দূরের এক দেশ থেকে, যে দেশ কথায় কথায় গণতন্ত্র রফতানি করে সে দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেই দেশে গণতন্ত্র রফতানি করা আর সরকার উৎখাতের একটি বিখ্যাত সংস্থা আছে। তারা এই কাজটি অন্য আরেকটি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করেছে কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশে তারা বেশ সক্রিয়। ডজন খানেক এনজিওকে অর্থায়ন করে।

জানা গেছে, সরকারের কিছু অঙ্গসংগঠনের কতিপয় ব্যক্তিও ডিনার খেতে গিয়েছিলেন। আয়োজকদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সেই মাহফিলে ঘোষণা করলেন এই দেশে ইনসাফ কায়েম করতে হলে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করতে হবে। রচনা করতে হবে নতুন সংবিধান। বিএনপি’র একজন ভাইস চেয়ারম্যান নিয়মিত এমন কথা বলে থাকেন। কোনও রাখঢাক নেই। লন্ডনের কাশিম বাজার তো এখন ওভারটাইম কাজ করছে। কলকাতায় কী হচ্ছে তা কলকাতার একটি অত্যন্ত বহুল প্রচারিত দৈনিক বিস্তারিত জানিয়েছে। দেশের রাজধানীতে প্রায় প্রতি সপ্তাহে প্রতিদিন বড় বড় বাজারে আগুন লাগলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। দু’দিনের জন্য চট্টগ্রামে এসেছিলাম। বিদ্যুৎ যায় প্রতিঘণ্টায়। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি থাকে না। শনিবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণকেন্দ্রে আগুন লাগলো। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এসব ঘটনা দুর্ঘটনার পেছনে কোনও নাশকতার ষড়যন্ত্রের হাত আছে কিনা তদন্ত করতে। যখন সরকার প্রধান এই ধরনের আশঙ্কা করেন তাকে তো গুরুত্ব দিতেই হবে।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৩০ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলছে চিনিকলে
৩০ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলছে চিনিকলে
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এসি চালুর আগে যে ৫ সতর্কতা জরুরি
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এসি চালুর আগে যে ৫ সতর্কতা জরুরি
গর্ভপাতকে সাংবিধানিক অধিকার দিলো ফ্রান্স
গর্ভপাতকে সাংবিধানিক অধিকার দিলো ফ্রান্স
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ