X
শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে ‘স্মার্ট বাজেট’ কি হয়েছে?

ড. খুরশিদ আলম
০৩ জুন ২০২৩, ২০:৩৩আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩, ০০:০১

এ বছর যথাযথ নিয়মে ১ জুন ২০২৩ এ জাতীয় সংসদে অনুমোদনের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার জন্য কতটা স্মার্ট বাজেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে সেটি এক বড় প্রশ্ন।

চলতি বছরে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে তার পরিমাণ হচ্ছে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পরিচালন ব্যয় হচ্ছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বা ৬২.৩৯ শতাংশ, আর উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা বা ৩৭.৬১ শতাংশ। এটি দেখলে মনে হতে পারে যে সরকার ১ টাকার উন্নয়ন ব্যয় করার জন্য প্রায় ২ টাকা খরচ করছে কিন্তু বিষয়টি এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আরও বিভিন্ন ভাতাসহ জনকল্যাণমূলক অনেক ব্যয় রয়েছে। কেবল জনকল্যাণমূলক ব্যয় ধরা হয়েছে বাজেটের ৫.৩ শতাংশ। সরকারের সুদের জন্য এ বছরের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৪ শতাংশ যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। এ বছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা।

এ বছরের বাজেটের ক্ষেত্রে আরও যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে এটিও ঘাটতি বাজেট যেখানে তা পূরণ করা হবে দেশি এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে। এই বাজেট হচ্ছে মোট জিডিপির ১৫.২ শতাংশ। আর যে ঘাটতি বাজেট করা হয়েছে তা হচ্ছে মোট জিডিপির ৫.২ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণ করতে  বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা আর অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। এর একটি অংশ ব্যাংকিং খাত থেকে সংগ্রহ করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার যদি বেশি পরিমাণ বিদেশি ঋণ কম সুদে নেয় আর দেশীয় উৎস থেকে যদি কম ঋণ বেশি সুদে নেয় তাহলে তা ভালো হয় কিনা? এর একটি সমস্যা হচ্ছে সরকার যখন দেশি উৎস থেকে ঋণ নেয় তখন তা দেশি টাকায় শোধ করা যায় এবং দেশের লোকেরা সে সুদের টাকা পায়। আর সেটি যদি বিদেশি টাকায় নেওয়া হয় তাহলে তার সুদ কম কিন্তু তার জন্য বিদেশি টাকায় তা শোধ করতে হবে এবং তার সুদও বিদেশিরা পাবে। ফলে সরকারকে এখানে একটি ভারসাম্য চিন্তা করে তা করতে হয়। দেখা যায় বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ বেশি নেয় যার সুবিধা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাজেটের মাত্র ১৩.৪৫ শতাংশ আসবে বৈদেশিক ঋণ থেকে আর বাকি ৮৬.৫৪ শতাংশ আসবে দেশীয় অর্থায়ন থেকে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে এটি আরও ভালো হতো যদি দেশীয় অংশ সবটা নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে করা হতো। এটি সংগ্রহ করা সম্ভব যদি একটি স্মার্ট রাজস্ব বোর্ড থাকতো। অভ্যন্তরীণ ঋণ যে ২০.৪ শতাংশ ধরা হয়েছে তা অনায়াসে আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ থেকে করা যেত। কিন্তু এটি না করার ফলে দেশের বহু সম্পদ বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। যেমন, এখন অনেকে বিভিন্ন রকমের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে যে অর্থ আয় করছে তা তাদের আয়ে দেখাবে না কারণ তাহলে তাদের বিপুল পরিমাণ কর দিতে হবে। তারা এ অপ্রদর্শিত আয়ের টাকা দেশে বিনিয়োগ করবে এমন কোনও কথা নেই।

আর দ্বিতীয় যে বিষয়টি হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বনাম মূল্যস্ফীতি। এখানে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ আর মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। মনে করা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি কম দেখানো হচ্ছে আর প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হচ্ছে– যাতে মানুষ এটিকে গ্রহণ করে। কার্যত মূল্যস্ফীতি বেশি হতে পারে প্রবৃদ্ধির চেয়ে, তাহলে কী হবে? 

মূল্যস্ফীতির হার ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের চেয়ে বেশি যা বাংলাদেশে সঞ্চয়কে ঋণাত্বক করছে। এটি সকল মানুষের সঞ্চয়কে কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে মানষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যাবে এবং মানষ অনুউৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করবে। এ সমস্যার সমাধানে এ বাজেটে তেমন কিছু বলা হয়নি যদিও বলা হচ্ছে যে মূল্যস্ফীতি থেকে প্রবৃদ্ধি বেশি হবে। তাহলে ধরে নেওয়া হচ্ছে এ প্রবৃদ্ধি যিনি সঞ্চয় করছেন তার কাছেও সমভাবে পৌঁছাবে। এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

তিনি যে অংক আমানত থেকে ব্যাংকে হারাবেন সে টাকা তিনি কীভাবে ফেরত পাবেন? দ্বিতীয় যারা এখন আর কোনও টাকা আয় করেন না তার ক্ষেত্রে কী ঘটবে? এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনও পরিসংখ্যান আছে কিনা জানা নেই। বিষয়টি আরও ভালোভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল।

যাদের কোনও আয় নেই কিন্তু টিন নম্বর যে কোনও কারণে রয়েছে তাদের রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক রয়ে গেছে এবং এ বছর উল্টো তাদেরকে আবার দুই হাজার টাকা কর পরিশোধ করতে বলা হচ্ছে। এ ধরনের একটি অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি? আয়কারী কোটি মানুষ থেকে কর সংগ্রহ না করে যার কোনও আয় নেই তার কাছ থেকে কর আদায় করার চেষ্টা একটি অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ। যেটি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয় সেটি পরিহার করা বাঞ্চনীয়।

স্মার্ট বাংলাদেশ সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কিছু কথা বলেছেন যেমন স্মার্ট সরকার, স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সোসাইটি এবং স্মার্ট ইকোনমি। এটি অর্জনের ক্ষেত্রে বাজেটের পাশাপাশি আরও যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া দরকার সেটির কথা তেমন উল্লেখ করেননি। যেমন, স্মার্ট রাজস্ববোর্ড, স্মার্ট বিচারবিভাগ, স্মার্ট অর্থবিভাগ, স্মার্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, স্মার্ট বাণিজ্যবিভাগ, স্মার্ট শেয়ার মার্কেট, স্মার্ট শিক্ষাবিভাগ, স্মার্ট স্বাস্থ্য বিভাগ, স্মার্ট শিক্ষিত নাগরিক, স্মার্ট রাজনীতিবিদ, স্মার্ট মন্ত্রী, স্মার্ট ব্যবসায়ী, স্মার্ট জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রভৃতি। এসব ক্ষেত্রে স্মার্ট অর্জন করতে কী কী পূর্বশর্ত রয়েছে এবং সেগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে তার বর্ণনা দরকার। এর সব কিছু অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে নয়, এর একটি প্রধান অংশ রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হাতে। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কতটা স্মার্ট হতে পেরেছে?   

গবেষণার জন্য আলাদা বাজেট দেওয়ার যে দাবি ছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি হ্রাসের জন্য এর কোনও বিকল্প নেই। বিভিন্ন সেক্টরে যে কিছু বরাদ্দ আছে তা থেকে গবেষণার জন্য কিছু টাকা পাওয়া যাবে কিন্তু তা একটি প্রগতিশীল এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর এটি এমন একটি ক্ষেত্র যার সফলতা পেতে এমনিতে কয়েক বছর লেগে যায়।

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে যা প্রশংসনীয়। গাড়ির ওপর কার্বনকর বৃদ্ধিও একটি ভালো পদক্ষেপ।

আজীবন পেনশন মিলবে ১০ বছর চাঁদা দিলে। এটি ছিল জনদাবি যা এবছর থেকে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা যায়। সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যবধান যত কমিয়ে আনা যাবে দেশে উৎপাদন এবং উন্নয়নে তত গতি আসবে। এখন যেভাবে বেসরকারি খাত দিয়ে যাচ্ছে আর সরকারি খাত নিয়ে যাচ্ছে তা পরিবর্তন হওয়া দরকার। তা না হলে এটি হবে এক ধরনের উপনিবেশিক কায়দার রাষ্ট্রীয়ভাবে শোষণের মতো। আর এটি এমনকি হতদরিদ্র মানষও পরিশোধ করে যাচ্ছে যা কোনোভাবে কাম্য নয়। এক সময় মনে করা হতো আওয়ামী লীগ হচ্ছে গরিব মানষের তথা আমজনতার দল– এটি বলে মুসলিম লীগ সমালোচনাও করতো। কিন্তু আজ এই বাজেটে কি তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে? গরিব মানষের দল কি গরিবকে ভুলে গেছে?

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গত বজেটে ছিল জিডিপির ২.৬ শতাংশ তা এই বাজেটে কমিয়ে করা হয়েছে ২.৫ শতাংশ। একজন হয়তো যুক্তি দেখাতে পারেন যে গরিব যেহেতু কমেছে তাহলে বাজেটে তা কম রাখলে চলে। কিন্তু পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে তার কি সুযোগ এতে আছে?   

এ বাজেটের ফলে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে আর কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। তা দিয়ে দেশের বাজারের সার্বিক পণ্যের দামে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে বলে মনে করা যায় না। এখানে যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এটি আরও বুঝা যায় যখন একজন মন্ত্রী বলেন যে, ব্যবসায়ীরা দাম না কমালে আমদানি করা হবে। তার অর্থ হচ্ছে ব্যবসায়ীরা অন্যায্যভাবে দাম বাড়িয়েছে বলে মন্ত্রী মহোদয়ও মনে করেন।

সার্বিকভাবে এ বাজেট সাধারণ মানষের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে সরকারের আরও অনেক কিছু করা দরকার ছিল। বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে আমদানি জনিত মূল্যস্ফীতি বলে দাবি করা হলেও এর কতটা আমদানিজনিত আর কতটা ব্যবসায়ীক কারসাজি তা সরকারের ব্যাখ্যায় থাকা দরকার ছিল। বাজেট বক্তৃতা দেখে মনে হচ্ছে সরকারের কাছে এ ধরনের কোনও বিশ্লেষণ আছে কিনা সন্দেহ।

যত দোষ নন্দঘোষের মতো ডলারের সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু ডলারের সংকট লাঘবে কী করা হবে এবং কীভাবে তা থেকে উত্তরণ ঘটবে তার কোনও রোডম্যাপ নেই। বরং বিভিন্নভাবে দেশ থেকে ডলার বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কতগুলো পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। যেমন কতগুলো ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিদের বাংলাদেশে অফিস খুলে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে যা আগে কখনও ছিল না। ফলে সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপকে আত্মঘাতী বলে বলা চলে।            

পরিশেষে বলা যায় যে, জনতুষ্টিমূলক বাজেট দেওয়া যে সম্ভব হয়নি এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ খুব কম রয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর সুযোগ নেই এমন কথা কেউ মনে করে না। এখানে আরও অনেক কিছু করা দরকার ছিল।

লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট।

 

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল ছুটলেন তৌসিফ-তটিনী
ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল ছুটলেন তৌসিফ-তটিনী
কোরবানিতে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত
কোরবানিতে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ তুলে শুরু হচ্ছে ইউরো
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ তুলে শুরু হচ্ছে ইউরো
ঈদ আসছে, ‘আওয়াজ’ বাড়ছে কামারপাড়ায়
ঈদ আসছে, ‘আওয়াজ’ বাড়ছে কামারপাড়ায়
সর্বশেষসর্বাধিক