X
শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪
১ আষাঢ় ১৪৩১

রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবনে সংস্কৃতির উদারতা চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ

স্বদেশ রায়
০৬ আগস্ট ২০২৩, ১০:১১আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৩, ১৭:১৯

রবীন্দ্রনাথ সিঙ্গাপুরে দেওয়া এক ভাষণে বলেছিলেন, “মানুষ যে দেশে বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জন্মায় সে তার জন্মসূত্রেই সেই ক্ষেত্রের সমস্ত অতীতের, সমস্ত ইতিহাসের সহজ অধিকারী হয়ে থাকে।” রবীন্দ্রনাথ জন্মসূত্রে বাঙালি, জন্মভূমি বঙ্গদেশ কিন্তু ওই বঙ্গদেশ ও বাঙালি’র সংস্কৃতি হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতারই পরিশীলিত অংশ। যেকোনও সিভিলাইজেশন নানান উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে এগোয়। তাই সেটা অনেকটা কয়লার খনির মতো। কয়লার খনির কালো কয়লা যেমন সুস্বাদু খাদ্য তৈরির জ্বালানি থেকে অন্ধকারকে দূর করতে আলো’র জোগান দেয়, আবার তেমনি ওই কয়লা-খনির সোনা ও হীরা দুই-ই দ্যুতিও ছড়ায়। সোনা’র দ্যুতি কম কিন্তু সে রমণীকে কে আরও রমণীয় করে। আর হীরার দ্যুতি সূর্যের আলোকেও আরও বেশি উজ্জ্বলতা দেয়। আর এই কালো কয়লা থেকে হীরা’র দ্যুতি মিলেই একটি জনগোষ্ঠীর সভ্যতা থেকে উঠে আসা সংস্কৃতি।

সভ্যতা ও সংস্কৃতি কখনোই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নয়, তার সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে মিলন ঘটে নানান প্রান্তরে গড়ে ওঠা নানান ভূখণ্ডের সভ্যতা ও সংস্কৃতির।

দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ মানুষ চড়ুই পাখির মতো ভোরের আলো ফোটা থেকে সন্ধ্যার নরম আলো নামা অবধি খুট খুট করে খাদ্য খোঁজার জন্যেই ব্যস্ত থাকে। তারপরও একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, বিকালে সূর্য পাটে বসলে চড়ুই পাখি গাছের ডালে ফেরে– আর সন্ধ্যার অন্ধকার নামা অবধি সে গান গায়। ওই গানটুকুই তার জীবনের আলো। ওই আলো শুধু তার মনে নয়, মানুষের মনেও দ্যুতি ছড়ায়। মানুষ আনন্দিত হয়। ওই গান গাওয়ার সময় চড়ুই পাখি যেমন স্বাধীন থাকে– যে মানুষ ওই গান শোনে সেও সে সময়টুকু পরিপূর্ণ স্বাধীন এক মানুষ থাকে। এই স্বাধীন মানুষ আসলে আনন্দিত মানুষ, যার আনন্দ জোগায় তার সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত স্রোতধারা বা আনন্দধারা। কী সে আনন্দধারা? আসলে কোনও স্রোতধারাকে কোনও একটি একটি উদাহরণে কখনোই প্রকাশ করা যায় না। তারপরও সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত এই আনন্দধারাকে জালালউদ্দিন রুমি বলেন, “আমি তোমার বীণা, আমার প্রত্যেক তারে তুমি আঘাত করিতেছ, আমি তাহাতে রণরণিয়া উঠিতেছি!” (গদ্য অনুবাদ:  সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়)। ঠিক একই রকম শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে– “তোমার হাওয়া যখন জাগে/ আমার পালে বাধা লাগে-/ এমনি করে গায়ে পড়ে সাগর- তরানো।”

মানুষ জৈবিকতার ঊর্ধ্বে নয়। তাকে বেশি সময়ই জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে দৈনন্দিন কাজের কাছে পরাধীন থাকতে হয়। তারপরও চড়ুই পাখি যেমন একটু সময় হলেও স্বাধীনতা পেয়ে গান গেয়ে ওঠে তার আপন স্বভাবে। মানুষের বীণায় বা পালে এসে ওই গানের সুর বা সাগর তরানোর হাওয়া লাগে তার স্বাধীন সময়ে। যদি মনে করা হয় সভ্যতা বা সংস্কৃতি মানুষের শুধু ওই সাগর তরানোর হাওয়া বা বীণা রণরণিয়ে ওঠার সময়টুকু– তাহলে একটা মস্ত ভুল হয়ে যায়। সেই ভুলের দিকটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন লেখায় বারবার বলেছেন। যদিও শব্দচয়নের ক্ষেত্রে তিনি সংস্কৃতির সমার্থক শব্দ কৃষ্টিকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। কারণ, কৃষ্টি শব্দটি তাঁর কানে ঠিক ততটা মধুর লাগতো না। কিন্তু কালচার বলি, সংস্কৃতি বলি আর কৃষ্টি বলি, এর সঙ্গে মানুষের উৎপাদন ও নির্মাণের একটা যোগ আছে।

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকে এই উৎপাদন ও নির্মাণকে অনেকটা সংকীর্ণ গলিতে নিয়ে গেছেন। তাঁরা এটাকে কর্ষণের মাধ্যমে ভূমি থেকে ফসল উৎপাদন ও মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের নানান নির্মাণ এমনকি কলকারখানার নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তারা মার্কসীয় এই চিন্তারও হাজার হাজার বছর আগে উপনিষদে একই মানুষের ভেতর দুটি পাখির স্বরূপের প্রকাশ ঘটেছিল, সেদিকে হয়তো খেয়াল করেননি। যেখানে একটি পাখি খাবার খায়, একটি পাখি গান গায়।

উপনিষদ বাস্তবে  মানুষের এই দুটি পাখিকে আলাদা করেনি। একই সঙ্গে মানুষের ভেতরে রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথে এই দুইয়ের মিলনের মধ্য দিয়ে  সৃষ্ট এক মানুষ বারবার উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ সিঙ্গাপুরে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, মানুষ তার আপন সংস্কৃতির সহজ উত্তরাধিকারী হন। রবীন্দ্রনাথ নিজে শুধু তাঁর সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী নন, তিনি তাঁর বিকাশ ও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাই রবীন্দ্রনাথ যেকোনও সংস্কৃতির উৎপাদন ও নির্মাণকে শুধু ভূমি জাত উৎপাদন ও যন্ত্রজাত নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা এই সংকীর্ণ গলিতে আটকে রাখেননি।

রবীন্দ্রনাথ আসল উৎপাদন ও নির্মাণের ক্ষেত্রকে দেখেছেন মানুষের মনোজগতে। মনোজগতের উৎকর্ষতা বা সেখানে কর্ষণ হলেই মূলত মানুষের ভেতরের দুই পাখিকে এক করে দেয়, তখন মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হয়। যেখানে আলোর পথের স্বপ্নভরা প্রাণ থাকে। যা তিনি এমন করেই বলেছেন, “ অকারণে তাই এ প্রদীপ জ্বালাই আকাশ পানে-/ যেখান হতে স্বপ্ন নামে প্রাণে।/”

মানুষের এই প্রাণভরা স্বপ্ন যখন কোনও একটি অন্ধ কুঠিরে বা কোনও ক্ষুদ্রতার গণ্ডিতে আটকে পড়ে তখনই মানুষ তার সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে ছিটকে পড়ে। আর তখন ধীরে ধীরে সে মানুষের বদলে অন্ধ নিয়মের শেকলে বাঁধা অদ্ভুত জীব হয়ে ওঠে। তা মূলত মানুষের বা মানবাত্মার মৃত্যু। যে মৃত মানুষকে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন তার ‘তাসের দেশে’তে। সেখানে কেবল দেশের নিয়মের নিগড়, রাজার নিয়মের আর সমাজের অন্ধত্বের নিয়মের বন্ধন। সকল বন্ধনই কঠোর শেকলের মতো। যেটাই মূলত মানুষের মূল পরাধীনতা। যেখানে স্বাধীন হাওয়া, স্বাধীন সূর প্রবেশের কোনও পথ নেই। যেখানে দেশ আছে, রাজা আছে, সমাজ আছে কিন্তু মানুষ পরাধীন।

রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশে, অচলায়তনে শুধু নয় তাঁর সহস্র লেখার উদাহরণ টানা যায় যেখানে তিনি বারবার এই সত্য তুলে এনেছেন, মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার মূল কারণ বাস্তবে সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার অন্ধ অনুশাসনগুলো। আর নাটকে, উপন্যাসে, কবিতায়, প্রবন্ধে বারবার রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে গেছেন, এই অন্ধ অনুশাসন আসে সমাজ যখন অশিক্ষা-কুশিক্ষায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখন সমাজ থেকে। সমাজের নানান কুসংস্কার ও নীতি মানুষকে তখন এক ধরনের চিন্তাহীন দাসে পরিণত করে। ঠিক তেমনি চিন্তাহীন দাসে পরিণত হয় মানুষ তার সংস্কৃতিজাত মানব-ধর্মকে পরিত্যাগ করে যখন পরলৌকিক লোভ জাত ধর্মের মিথ্যা অনুশাসনের দাস হয়ে যায়। আর সেই অনুশাসনকে শুধু একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী ধর্ম ব্যবসায়ী নয়, রাজাও আনুকূল্য দেয় তার রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বার্থে– তখন সে দেশের মানুষ তাসের দেশের মতো আলো বা নতুন পথকে নিজের জীবনে নিতে ভীত হয়ে পড়ে বা গ্রহণ করার ক্ষমতা হারায়। আর তখন মানুষ সত্যি অর্থে পরাধীন হয়– তার সব ধরনের স্বাধীন চিন্তার দ্বার রুদ্ধ করে।

রবীন্দ্রনাথ এই স্বাধীন চিন্তার দ্বার রুদ্ধ করার অনেক উপাদান দেখেছিলেন তাঁর কালে পরাধীনতা থেকে বের হয়ে আসার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল ওই রাজনীতিতে। তিনি বারবার আহ্বান করেছিলেন তাঁর নানান লেখায়, রাজনৈতিক লোভ, হিংস্রতা ও উগ্রতা থেকে সরে এসে ভারতীয় সংস্কৃতিসহ সব সংস্কৃতির উদারতাকে রাজনীতিতে গ্রহণ করার। যে কারণে শুধু ভারতীয় সভ্যতার উদারতা শুধু নয়, পঞ্চ দশক শতকে মধ্য এশিয়ার যে উদার সুফিবাদ ভারতের সভ্যতার সঙ্গে মিশেছিল, যার থেকে কবীর, নানক, বৈষ্ণবীয় ধারা এমনকি বাংলার লালন সাঁই অবধি পুষ্ট হয়েছিল, এই উদারতার চর্চাকেও তিনি তাঁর শান্তি নিকেতনের শিক্ষা ও চর্চায় নিয়ে এসেছিলেন। নিজের লেখায় শুধু নয়, পণ্ডিত ক্ষিতি মোহন সেনের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সভ্যতার সহস্র মিলনের এমন উদার মিলনের দিকগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছিলেন।

কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির উগ্রতা, হঠকারিতা ও ক্ষমতালোভ কেউই রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে পারেনি। বরং একশ্রেণি তাঁকে আপসকামীও মনে করেছিল তাদের নিজ নিজ অজ্ঞতার ভূমিতে দাঁড়িয়ে। তার উপন্যাস ঘরে বাইরে অপব্যাখ্যাও হয়েছিল এই অন্ধত্বর কারণে।

কিন্তু আজ তো এই সত্য বোঝার সময় হয়েছে, নিজ জীবনের বিপ্লব না হলে, নিজের চরিত্রকে মনোজগতের বিপ্লবের মাধ্যমে বদলাতে না পারলে, বাস্তবে সে জীবন যদি ঘরে বাইরের নায়কের ওই বিপ্লবীর মতোই হয়– তা হলে তার পরিণাম কী?

রবীন্দ্রনাথের সৌভাগ্য তাকে আরও পাঁচটি বছরের দীর্ঘ জীবন পেতে হয়নি। তাহলে তিনি তার সভ্যতা ও দেশকে ঘিরে যতটুকু আশা নিয়ে মারা গেছেন সে আশাটুকুও তাঁর নিভে যেতো। তাঁকে অন্তত দেখতে হয়নি, রাজনীতিকদের ক্ষমতা লোভের পথ হিসেবে ধর্মের নামে ভয়াবহ নরমেধ যজ্ঞ। দেখতে হয়নি মানুষকে বাস্তুচুত করার রাজনীতি। ক্ষমতার কারণে একক ভূগোলকে কলমের টানে ভাগ করা। আর ক্ষমতা লোভের এই রাজনীতির পথ সবসময়ই হিংস্রতা ও অন্ধত্বে ভরা। সেখানে তার আপন সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতি ক্রমেই হারিয়ে যায়। যা হারিয়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির গোটা ভূমিজুড়ে। এমনকি যে বিশ্ব সভ্যতার প্রতীক তিনি হয়ে উঠেছিলেন, সেই বিশ্ব সভ্যতায়ও তা আজ ঝুঁকির মুখে।

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপির বিদেশ বিষয়ক দুটি কমিটি গঠন, প্রধান তারেক রহমান
বিএনপির বিদেশ বিষয়ক দুটি কমিটি গঠন, প্রধান তারেক রহমান
এবার ঢাকার নাটকে ও ওয়েব ফিল্মে ‘ভাইরাল বেবি’ দর্শনা
এবার ঢাকার নাটকে ও ওয়েব ফিল্মে ‘ভাইরাল বেবি’ দর্শনা
ঈদে কুড়িগ্রামে বন্যার শঙ্কা
ঈদে কুড়িগ্রামে বন্যার শঙ্কা
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদল
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদল
সর্বশেষসর্বাধিক