X
মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪
১১ আষাঢ় ১৪৩১

শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কেন সংখ্যালঘু মানসিকতা?

স্বদেশ রায়
১৫ অক্টোবর ২০২৩, ১৮:১৯আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৩, ১৮:১৯

পাকিস্তান আমলে নিজের ওই ছোট গণ্ডির মধ্যে বসেও দেখতাম, পরিচিত মাইনরিটি’র (তখন মাইনরিটির পরিভাষা ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি কেউ ব্যবহার করতো বলে মনে পড়ে না।) ভেতর যারা তৎকালীন উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত ছিলেন তাদের পরিবারের কেউ ম্যাট্রিকুলেশান বা ইন্টারমিডিয়েট পাস করলে  ‘বিলেত’ চলে যেত। তখন বিলেত বলতে তারা শুধু ব্রিটেনকে ধরতো না গোটা ইউরোপকেই ধরতো। কেউ জার্মানি, ফ্রান্স বা অন্য কোনও ইউরোপীয় দেশে গেলেও বিলেত বলতো। আর নিম্ন মধ্যবিত্ত’র ছেলে-মেয়েরা ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েট পাস করলে তারা ভারতে চলে যেত।

বাংলাদেশ হবার পরে পাকিস্তান আমলের অনেক রাস্তাঘাটের যেমন নতুন নামকরণ হলো, অনেক ইংরেজি শব্দের জায়গায় যেমন বাংলা শব্দ হলো তেমনি ‘মাইনরিটি’ও  ‘সংখ্যালঘুতে’ পরিবর্তিত হলো– কিন্তু ওই বিলেত যাওয়া আর ভারতে যাওয়া বন্ধ হতে দেখেনি। শুধু পরিবর্তন হলো, আগে ভারতে গিয়ে তারা বৈধভাবে বাস করতে পারতো ও স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে বৈধভাবে ভর্তি হতে পারতো নেহরু- লিয়াকত চুক্তির বলে; ইন্দিরা- মুজিব চুক্তির ফলে ওই বৈধতা বন্ধ হয়ে গেলো।

বৈধতা বন্ধ হলেও মাইগ্রেশান তো আর কখনও ঠেকানো যায় না। কারণ মাইগ্রেশানের বয়স মানুষের সভ্যতার বয়সের সমান। মাইগ্রেশানের কৌশল মানুষের জিনের ভেতর। একে কোনও চুক্তি, কোনও কাঁটাতারের বেড়া, কোনও দেয়াল এবং পাসপোর্ট দিয়ে বন্ধ করা যায় না। এ কারণে বাংলাদেশ হবার পরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়েরা ভারতের ক্ষেত্রে স্কুল লেভেলে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব দেখিয়ে ভর্তি হওয়া শুরু করলো। আর অন্যদিকে বিলেতের সঙ্গে যোগ হলো ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা সহ পৃথিবীর নানান প্রান্ত। এছাড়া ততদিনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তও বিলুপ্তির পথের প্রাণীর মতো লাল খাতায় উঠে গেছে। আর এই বিলুপ্তির দিকে পথ চলাতে দেখেছি প্রতিটি বাড়ি শেষ অবধি একটি ‘ওল্ড হোমে’ পরিণত হয়েছে। এই ওল্ড হোমের সদস্যদের কেউ কেউ এক পর্যায়ে ছেলে মেয়ের কাছে চলে গেছেন। আর কেউ কেউ শেষ অবধি তারাপদ রায়ের ‘মান্ধাতা’ উপন্যাসের উকিল বাবুর মতো মান্ধতা আমলের শেষ লোকটি হিসেবে তার প্রতিবেশী সংখ্যাগুরু ঘরের ছেলেদের কাঁধে চেপে শশ্মানে গেছেন।

বর্তমানে আমার বন্ধু বান্ধবদের অধিকাংশই যারা ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারায় বাস করেন তারাও তাদের বাড়িকে ওই পাকিস্তান আমলের সংখ্যালঘু উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তদের বাড়ির মতো একটি ‘ওল্ড হোম’ বানিয়েছেন। এবং এ শুধু ঢাকার এই অভিজাত এলাকাগুলোতে নয়, জেলা শহরের বন্ধু বান্ধবদেরও একই অবস্থা। তবে এদের ভেতর পার্থক্য হলো, পাকিস্তান আমলে মাইনরিটি পরিবারের মূল লক্ষ্য ছিল বিলেত আর এদের সন্তানদের মূল লক্ষ্যস্থল আমেরিকা। এমনকি এতবার দিনে তাদেরকে এতবার আমেরিকা বলতে হয় যে নিজেদের কথাবার্তায়ও সংক্ষিপ্ত রূপ চলে এসেছে। ‘স্টেট’ বলতেই তারা আমেরিকাকেই বোঝাচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ নয়। আমার জেনারেশান বা তার সিনিয়ররা যেমন নিজ নিজ বাড়িকে হোল্ড হোম বানিয়েছে আমাদের পরবর্তী জেনারেশ নয়, তারপরের জেনারেশনও তাদের ছেলে মেয়েদের পাঠিয়ে দিয়ে নিজের বাড়িকে ওল্ড হোম বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ প্রস্তুতি এই পর্যায়ে গিয়েছে, কয়েকদিন আগে একটি ছেলে তার বয়স চল্লিশের কিছু বেশি হবে সে নানা বিষয় আলোচনা প্রসঙ্গে এক পর্যায়ে বলে, বর্তমানে সে এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগছে। তার অপরাধ বোধের মূল কারণ হলো, ছেলে মেয়েদেরকে দেশে রাখবে মনে করে সে মেয়েকে হলিক্রস ও ছেলেকে সেন্ট জোসেফ স্কুলে ভর্তি করেছিলো। এখন তার মনে হচ্ছে ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়িয়ে দেশীয় কারিক্যুলামে পড়িয়ে তাদেরকে সে বিদেশে যাবার পথে কিছুটা হলেও পিছিয়ে দিয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট হয়, যদি আমার জেনারেশকে বেস ধরি তাহলে তার আগের অন্তত একটি জেনারেশান ও পরের দুটি জেনারেশান অর্থাৎ  বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মিডল ক্লাসের চার জেনারেশানের সন্তানরা এখন বিদেশমুখী।

কেন বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এই শিক্ষিত মিডল ক্লাসের চার জেনারেশান তাদের সন্তানদেরকে এভাবে অভিবাসী হবার পথে ঠেলে দিচ্ছে? অভিবাসী জীবনে প্রথম জেনারেশানের বড়  অংশই ভালো থাকতে পারে না। তাদের পুরো জীবনটা যায় স্ট্রাগলে। তারপরেও কেন তারা চলে যাচ্ছে? হয়তো সরল রেখায় যে উত্তরগুলো আসবে তা এমন– আসলে উন্নত দেশের আকর্ষণেই চলে যাচ্ছে, উন্নত জীবনের আকর্ষণে চলে যাচ্ছে। কেউ হয়তো বলবে ওরা স্বার্থপর তাই শুধু নিজেদের কথা ভেবেছে। 

বাস্তবে কেন ওরা চলে যাচ্ছে বা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এর উত্তর এত সহজে দেওয়া যায় না। যেমন পূর্ববাংলা, পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমানে বাংলাদেশ এই ভূখণ্ড থেকে যে মাইনরিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা চলে গেছে– তারা কেন গেছে– এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখেছি একটি সরল রেখায় ফেলে সকলের চলে যাওয়ার উত্তর দেওয়া যাবে না। অবিভক্ত ভারতবর্ষ থাকলেও যে এ এলাকা থেকে একটা অংশের মাইগ্রেশান হতো না তাও কিন্তু বলা যায় না। সহস্রটি কারণ আছে। তবে ১৯৪৭ এ পার্টিশানের শুরু থেকে ষাটের দশক অবধি যে শিক্ষিত হিন্দু মিডল ক্লাস এই ভূখণ্ড ত্যাগ করে ইউরোপ ও ভারতে চলে গিয়েছিলো তাদের চলে যাওয়ার একটি কারণের সঙ্গে মিল খোঁজা যেতে পারে বর্তমানের বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এই শিক্ষিত মিডল ক্লাসের চিন্তার সঙ্গে।

ওই শিক্ষিত হিন্দু মিডল ক্লাসের জন্যে কিন্তু পাকিস্তান বা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী বা নাজিমউদ্দিন কোনও সমস্যা ছিল না। যেমন সমস্যা ছিল না শ্যামা প্রসাদ মুখোপধ্যায়ের সঙ্গে শেরেবাংলা এ. কে ফজলুল হকের। কারণ এরা উভয়েই একই শ্রেণি। এরা একে অপরের ভাষা বোঝেন, কালচার ঝোঝেন এবং একে অপরের দ্বারা শাসিত হলেও কোনও সমস্যা হয় না। পরস্পর পরস্পরের মর্যাদা রক্ষা করে।  বরং নিজ নিজ ধর্মের নিম্নবর্গীয়দের থেকে শ্যামা ও হক পরস্পরে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু ধর্মীয় উন্মাদনায় পাকিস্তান সৃষ্টির পরে রাষ্ট্রের প্রশাসনের কিছু অংশ শেরেবাংলা, জিন্নাহ, লিয়াকত আলী বা নাজিমউদ্দিন প্রমূখ নিজেদের হাতে রাখতে পারেননি। আর কোনও সমাজ যখন নিম্নবর্গীয়দের হাতে চলে যায় ওই সমাজ থেকে সবার আগে পালিয়ে যায় শিক্ষিত শ্রেণি। কারণ তারা জানে নিম্নবর্গ সমাজকে টেনে তার কাতারে নিয়ে যাবে। আর সমাজ নিম্নবর্গীয়দের কাতারে চলে গেলে তখন সব থেকে বেশি বিপদে পড়ে শিক্ষিত মিডল ক্লাস। কারণ কোনও সমাজ যখন নিম্নবর্গীয়দের কালচার দিয়ে শাসিত হয় ওই সমাজে শিক্ষিত মিডল ক্লাসের সন্তানরা তাদের সব ধরনের সুযোগ শুধু হারায় না, তাদের পরবর্তী জেনারেশনের মানও নামিয়ে ফেলতে হয় টিকে থাকার জন্যে। তাদের মার্জিত জীবনাচারণের বিপরীতে, নিয়ম মাফিক জীবনাচারণের বিপরীতে তখন ধর্মের নামে, সম্প্রদায়ের নামে উদ্ভট কিছু জীবনাচারণই সমাজের মুখ্য হয়ে ওঠে। যে শিক্ষিত মিডল ক্লাস তিন থেকে তিরিশ জেনারেশন বা তারও বেশি সময় ধরে নিজের পারিবারিক ধারাকে একটি সংস্কৃত আচরণে ও শিক্ষায় নিয়ে গেছে এবং সে জানে এটাই একটা মানুষের মূল সম্পদ­– তখন তার কাছে কিছু আর্থিক সম্পদের থেকে ওই মূল সম্পদ রক্ষা করাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। আর ওই কারণেই সে তখন একটা উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র খোঁজে।

কোনও রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে যখন এভাবে শিক্ষিত মিডল ক্লাসের সন্তানরা পালিয়ে যেতে বা মাইগ্রেশান শুরু করে তা ওই সমাজের জন্যে ভয়াবহ এক সংকেত। কারণ, এর ক্ষতি সুদূর প্রসারী।  সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অঙ্গ যত বেশি পরিশীলিত শিক্ষিত মিডল ক্লাসের সন্তানদের দ্বারা পরিচালিত হবে ততই ওই রাষ্ট্রের আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের পরিশীলিত হয়ে এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কারণ, সমাজ ও রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তাদের সবাইকে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতর এবং রাজনীতি ও সমাজনীতি’র ভেতর যে একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে সে বুঝতে হয়। আর এই বোধটা কোনও একাডেমিক শিক্ষা থেকে আসে না। এ শিক্ষা আসে জেনারেশন বাই জেনারেশন পরিবার কেন্দ্রিক যে চর্চা হয় তার ভেতর দিয়ে। যেমন কাজী মোতাহের হোসেনের ছায়ায় বড় হওয়া সনজিদা খাতুনের হাত ধরে বাঙালি সংস্কৃতির নাগরিক রূপের একটা ছোট্ট কুঁড়ি হলেও জন্ম নেয়। ছোটবেলা থেকে পারিবারিকভাবে দীর্ঘ সময় ব্রেইনস্ট্রমে মাধ্যমে সুস্থ ও সাংস্কৃতিক চিন্তার ভেতর দিয়ে বড় না হলে শুধু মাত্র একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করে প্রশাসনে গেলে তিনি অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য হবেন তবে রাষ্ট্র ও সমাজের সুক্ষ্ম পার্থক্য তার পক্ষে বোঝা কষ্টকর হয়। বরং তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা দিয়ে হাজার বছরের সমাজের কাঠামো কিছুটা হলেও ভেঙ্গে ফেলেন। সে ক্ষেত্রে তার সামনে যদি একজন পরিশীলিত এ. এম মোকাম্মেল হক, আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ থাকেন তাহলে তিনি তাদের কাছ থেকে শিখতে পারেন এবং অনেক সংযত হন। শুধু প্রশাসন নয় সব ক্ষেত্রেই এই একই প্রয়োজন।

তাই সব মিলিয়ে শিক্ষিত মিডল ক্লাসের সন্তানদের দেশ ত্যাগ করার মূল্য একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে কত শত বছর ধরে দিতে হয় তা হিসেব করা কষ্টকর। 

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কেনিয়ায় বিক্ষোভ: পার্লামেন্টের ভেতর পুলিশের গুলিতে নিহত ১০
কেনিয়ায় বিক্ষোভ: পার্লামেন্টের ভেতর পুলিশের গুলিতে নিহত ১০
নারী-শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা দেবে ইউনিসেফ ও ইউএনএফপি
নারী-শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা দেবে ইউনিসেফ ও ইউএনএফপি
সরাসরি অলিম্পিকে জায়গা পাওয়া সাগরকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা
সরাসরি অলিম্পিকে জায়গা পাওয়া সাগরকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা
সর্বশেষসর্বাধিক