X
রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪
৩০ আষাঢ় ১৪৩১

খতনাকালে মৃত্যু: হাসপাতাল-ক্লিনিক কি মৃত্যুর কারখানা?

মোস্তফা হোসেইন
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:৪২আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:৪২

বাড়ির যমজ দুই ছেলের মুসলমানি। বিয়ের আয়োজন যেন। বৈঠক ঘরের ভিট নিকানো হয়েছে অতি যত্নসহকারে। চৌকিতে মোটা কাঁথার ওপর বিছানো হয়েছে ধোয়া ধবধবে চাদর। বিছানায় নতুন দুই জোড়া মাটির পাতিল। দুজন পাতিলে পা রাখবে কোলবালিশের মতো। যা আগেই সোনা-রুপার পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ঘরের মাঝখানে একটি পিঁড়ি এবং জলচৌকি।

পিঁড়িতে বসা হাজাম। পাশে কলাপাতার ওপর ডেটলের বোতল, কাপড় পোড়ানো ছাইয়ের দলা। এবং খুবই ধারালো বাঁশের চামড়া। বাঁশের বাকল (চামড়া) দিয়েই খতনা করা হলো যমজ দুই ভাইয়ের। আগেই নতুন লুঙ্গি পরানো হলো দুই জনকে। এই দুয়ের একজন এই নিবন্ধকার। ৬৫-৬৬ বছর আগের কথা এটা।

গ্রামেরই খলিফা পাড়ার বিজ্ঞ হাজাম। এমবিবিএস, এফসিপিএস সার্জারির শিক্ষা ছিল না, এমনকি স্কুলের সাধারণ শিক্ষাও না। বংশ পরম্পরায় মুসলমানি করাই ছিল তাদের পেশা। ওষুধপত্র কিছুই ব্যবহার হতো না। ডেটলের শিশিটা দিয়েছিলেন আম্মা। বাঁশের বাকলটা ডেটলে চুবিয়ে নিতে। গায়ে ব্যবহার হয়েছিল কিনা মনে নেই। হাজাম সঙ্গে ছুরিও এনেছিল। কিন্তু ছুরিটা মনে হচ্ছিল ভোঁতা। তাই  সঙ্গে আনা বাঁশের বাকলই ছুরির বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।

এই আধুনিক শিক্ষাবঞ্চিত হাজামরা যুগ যুগ ধরে মুসলমানি করতো। কোথাও এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি, মুসলমানি করতে গিয়ে কিংবা এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তারপরও আধুনিক চিকিৎসার প্রসারের কারণে অধিকতর নিরাপদ ভেবে মুসলমানির মতো অতি সাধারণ অপারেশনেও অভিভাবকরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।

কিন্তু এই স্বাভাবিক ব্যাপারটিও যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা আমাদের চোখের সামনে ধরা দিয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি ঢাকার ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মুসলমানি করার সময় চিকিৎসকের গাফিলতিতে প্রাণ হারালো শিশু আয়ান আহমেদ। ইউনাইডেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই গাফিলতিতে নাগরিক সমাজে ক্ষোভ সৃষ্টি হলো। সরকার তদন্ত করতে গিয়ে দেখে ওই হাসপাতালটি নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা সেবার নামে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। কী ভয়াবহ অবস্থা।

মাত্র দেড় মাসের মাথায় একই ঘটনা ঘটলো আরেকটি। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ আয়হামের মৃত্যু হলো খতনা করানোর সময় অ্যানেস্থেসিয়ার প্রতিক্রিয়ায়। এই ঘটনা ঘটেছে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার একটি ক্লিনিকে। দুরন্ত বয়সের এই শিশুটির মা-বাবা বুক ফাটিয়ে চিৎকার করছেন সন্তান হারিয়ে। সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বজ্রাহতের মতো হয়ে যায়। এটাও কি হতে পারে!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুলস্থুল। জানা যায়, আয়হামের বাবা নাকি ছেলেকে অ্যানেস্থেসিয়া করাতে বারণও করেছিলেন। কিন্তু তারপরও শিশুটিকে অ্যানেস্থেসিয়া করানো হয়েছে। পরিণতিতে মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে। অভিযুক্ত দুই ডাক্তার এখন বিচারাধীন। বিচারাধীন হওয়ায় এই বিচার নিয়ে কিছু নাই বা বললাম। তবে চিকিৎসায় গাফিলতি এবং তদন্ত কমিটি ও তদন্ত প্রতিবেদনে যে কখনোই চিকিৎসকের অবহেলা প্রমাণ হয় না এটা বোধকরি সবাই স্বীকার করবেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর মানুষের আস্থা নেই এটা বাস্তবতা।

এই বিষয়েও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। আমার চাচাতো বোন সুরাইয়া খানম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রেস ক্লাবে একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে যোগদানকালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাকে ধানমন্ডির একটি ক্লিনিকে ভর্তি করানোর পর সেখান থেকে নেওয়া হলো বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৩ সালের আগস্ট মাস ছিল। তাকে ইসিজি করানোর জন্য কেবিন থেকে বের করা হলো। ইসিজি রুমে ঢোকানোর সময় জানা গেলো, ইসিজি রিডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রুল কিংবা এমনই কিছু একটা সামগ্রী নেই। জরুরি কিন্তু সাধারণ এমন আরও  কিছু সামগ্রীও সেখানে নেই। স্টোর থেকে আনতে গেলে আমলাতান্ত্রিক কারণে সময় লাগবে। ছোট ভাগ্নে দৌড়ে গেলো শাহবাগের দোকানে।

এদিকে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। আমার বোন তখন প্রচণ্ড ঘামাচ্ছিলেন। এয়ার কন্ডিশন্ড ছিল না ওই জায়গায়। বড় ভাগ্নেকে বললেন– পোর্টেবল এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। ততক্ষণে তার মায়ের অবস্থার চরম অবনতি হয়ে গেছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। তার ইসিজিটাও করানো গেলো না স্পষ্টত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে।

তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল। সেই একই পদ্ধতি। চিকিৎসকই তদন্ত করবেন। একই অবিশ্বাস-তদন্তে নির্দোষ প্রমাণ হবে চিকিৎসক। এগোয়নি আর।

দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, দুলাভাই তওফিক আজিজ খানের মৃত্যুও হয়েছিল ভুল চিকিৎসায়। তিনি ছিলেন ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক। ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। তাকে ভুল চিকিৎসা করা হয়, সেটা চিকিৎসকদেরই মন্তব্য। ভুল প্রমাণ হওয়ার পর নেওয়া হয় বিদেশে। কিন্তু ততদিনে চিকিৎসা আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আয়ান এবং আয়হামের মতো কত মানুষ যে ভুল চিকিৎসা, অবহেলার কারণে প্রাণ হারায় এর কোনও পরিসংখ্যান নেই। যেমন উদাহরণ চোখে পড়ে না চিকিৎসকের অবহেলার কারণে কোনও চিকিৎসকের চিকিৎসা সনদ বাতিল হওয়ার। সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ক্লিনিক। ক্লিনিকগুলোর অবস্থা কেমন তা নিবন্ধনহীন ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অস্তিত্ব থেকে প্রমাণ হয়। মাঝে মাঝেই সংবাদ হয় নিবন্ধনহীন ক্লিনিক বিষয়ে। সরকারি পরিদর্শক দল মাঝে মাঝে পরিদর্শন করেন, ইউনাইটেডের মতো নিবন্ধনহীন ক্লিনিকের অস্তিত্বের কথাও জানা যায়। শুধু জানা যায় না সেগুলোর কি শাস্তি হয়েছে সেই বিষয়ে।

মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাকেন্দ্রও বেড়েছে। গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী সবখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চিকিৎসা ব্যবসাও সম্প্রসারিত হয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশই চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নামে মানুষের পকেট কাটছে প্রতারণা মাধ্যমে। চোখের সামনেই ঘটছে এসব। মৃত্যুর কারখানাগুলো বন্ধ এবং প্রতারকদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা হোক।

শুরুর প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করতে চাই। চিকিৎসা সুবিধা আধুনিক হয়েছে তাই হাজামে নির্ভরতা নয়, আমরা আধুনিক চিকিৎসা সেবাই পেতে চাই। তবে যাদের সেবা গ্রহণ করা হবে তাদের আধুনিকতাটা বড় প্রয়োজন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুফল পেতে হলে চিকিৎসককেও মন-মানসিকতায় আধুনিক হতে হবে। অন্তত অবহেলা-গাফিলতিটুকু ঝেড়ে ফেলতে হবে। তারা যেন ভুলে না যান মানুষ তাদের কাছে বাঁচতেই যান, মরার জন্য নয়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সেলেনিয়াম আমাদের কেন প্রয়োজন জানেন?
সেলেনিয়াম আমাদের কেন প্রয়োজন জানেন?
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে স্প্রিং-২০২৪ শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে স্প্রিং-২০২৪ শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত
সর্বশেষসর্বাধিক