X
বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪
৬ আষাঢ় ১৪৩১

খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানবে কে?

এরশাদুল আলম প্রিন্স
২৯ মে ২০২৪, ২১:৫৪আপডেট : ২৯ মে ২০২৪, ২১:৫৪

খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি আবার ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। মার্চ মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব মতেই এই মূল্যস্ফীতি। বিবিএস’র মতে, শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি।

যে হারে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হচ্ছে সে হারে মানুষের আয় রোজগার বাড়ছে না। বেতন বাড়ছে না। কৃষকের ধানের দাম বাড়ছে না। শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না। কিন্তু বাজারে সব পণ্যের দামই বাড়তি।

সাধারণ মানুষ এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। ধনী-গরিব সবাইকে বাজারের আগুন সামলে সংসার চালাতে হয়, পরিবারের খরচ জোগাতে হয়। যারা উচ্চবিত্ত তারা হয়তো কোনোভাবে সামলে নিতে পারে। তাদের পকেটে নগদ টাকা বেশি, তাই বাজারের আগুন গায়ে লাগে না। কিন্তু যারা দিন এনে দিন খায়, সাধারণ চাকরিজীবী বা দিনমজুর, তাদের অনেক কষ্ট করে পরিবারের ব্যয় মেটাতে হয়।

বাজারে এমন কোনও পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। এক দুটি পণ্যের দাম বাড়লে সেগুলো হয়তো বয়কট করা যায়। বিকল্প পণ্য দিয়ে কোনোমতে চলা যায়। কিন্তু যখন সব পণ্যেরই দাম বাড়ে তখন সাধারণ মানুষের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেবো কোথা?’

গরুর মাংসের দাম বাড়লে তা বয়কট করা যায়। গরিব মানুষ পাঙাশ মাছ খেতে পারে। কিন্তু পাঙাশের দামও কি কম? মধ্যবিত্তের পাত থেকে আমিষ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। জেলা শহর বা ঢাকায় শাকসবজির দামেও আগুন। এমনকি শীতেও সবজির বাজার গরম। এ দেশে এখন শীত-গ্রীষ্ম নেই; সারা বছরই বাজার গরম।

এমন না যে শুধু খাবারের দাম বেড়েছে। বেড়েছে চিকিৎসা, পরিবহনসহ সব কিছুরই খরচ। বেড়েছে ডাক্তারের ফি, হাসপাতালের ফি ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ। এদিকে সাধারণ একটি অসুস্থতার জন্যও রোগীদের বহু টেস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরকম টেস্ট একাধিকবার করতে হয়। ফলে অসুস্থ হলে সাধারণ মানুষ ধারদেনা করে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে বাধ্য হয়। যাতায়াত ও পরিবহন খরচও বেড়েছে বহুগুণ। সাধারণ রিকশা ভাড়া থেকে শুরু করে বাস ভাড়া, ট্রেন ভাড়া সবই বেড়েছে। ঢাকা শহরে এখন ২০ টাকার নিচে রিকশা ভাড়া নেই। রিকশাওয়ালারাই বা কী করবে? বাজারে সব কিছুরই দাম বাড়তি। ৫০ টাকার নিচে সবজিও পাওয়া যায় না। একটি পাউরুটি ও একটি কলা খেতেও কমপক্ষে ২০ টাকা লেগে যায়।

গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী, ছেলেমেয়ের খরচ দিতে হয়। ঢাকায় বা জেলা শহরে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ দিতে হয়। রিকশার মালিককে দৈনিক দিতে হয় ৩০০-৫০০ টাকা বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি। এসব খরচ মিটিয়ে তাদের হাতে আর কিছু থাকে না। ফলে তারাও ১০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে চায়। সেই ৫/১০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিয়ে এই ঢাকায় যাত্রী-রিকশাওয়ালা কথা কাটাকাটি লেগেই আছে। বাস ভাড়া নিয়ে যাত্রী-কন্ডাক্টর মারামারিতে এই শহরে প্রাণ হারিয়েছে বহু বাস শ্রমিক ও যাত্রী। এসবই মূল্যস্ফীতির সামাজিক প্রতিক্রিয়া, যা দিন দিনই বাড়ছে।

বাজারে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের কোনও উচ্চবাচ্য নেই। বরং বাজারে সব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের আছে বলে সরকারের দাবি। অতীতের সব সরকারের চেয়ে এই সরকারের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেশি রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। সেটি দাবি করতেই পারে। কিন্তু বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আগের সরকারের চেয়ে বেশি না কম সেটি বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে এত নিয়ন্ত্রণের দাবি করার পরও বাজারের আগুন আয়ত্তে আসছে না কেন?

সরকার প্রায়ই বৈশ্বিক মন্দার ওপর দায় চাপাতে চায়। দায় এড়ানোর এটি খুব সহজ কৌশল। কারণ, এ কৌশলে সরকারের কোনও দায় থাকে না। দেশি কোনও কর্তৃপক্ষ বা সিন্ডিকেটকেও দায়ী করা হয় না। ফলে ওইসব সিন্ডিকেট বা অসৎ ব্যবসায়ী চক্রকে নিয়ন্ত্রণের দায়ও সরকারের ওপর থাকে না। ফলে, ইউক্রেন যুদ্ধের সব ব্যয় যেন আমরাই বহন করি। তাই দেশে সব পণ্যের দাম বাড়ে।

এ দেশে অর্থনীতি পরিচালনায় ব্যর্থতার দায় কেউ নিতে চায় না। দুর্নীতি ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার দায় কেউ নেয় না। বৈশ্বিক মন্দাকে আমরা কেউ অস্বীকার করি না। কিন্তু বৈশ্বিক মন্দার সব দায় কেন আমাদেরই নিতে হবে? বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বিশ্বে অনেক দেশেই যখন খাদ্যপণ্যের দাম কমে তখন সেই একই কারণে এ দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে গেলেও এ দেশে বাড়ে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে এ দেশে সিএনজি চালিত বাসের ভাড়াও বাড়ে। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের কমলে এখানে বাস ভাড়া আর কমে না।

সাধারণত বাজারে পণ্যের সংকট থাকলে দাম বাড়ে। কিন্তু বাজারে পণ্যের কোনও সংকট না থাকার পরও কেন এখানে দাম বাড়ে এর কোনও জবাব নেই। এখানে বাজার সিন্ডিকেটে কেউ হাত দিতে পারে না। বাজারের সব পণ্যের জন্য রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট। তেলের সিন্ডিকেট, পেঁয়াজের সিন্ডিকেট, কাঁচা মরিচের সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন সিন্ডিকেট। প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যন্ত সবাই এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। সিন্ডিকেটের জন্য প্রান্তিক কৃষক ফসলের দাম পায় না, আবার অন্যদিক ভোক্তাকে ঠিকই অগ্নিমূল্যে পণ্য কিনতে হয়। মাঝে এই সিন্ডিকেট মুনাফা খায়। কপাল চাপড়ায় শুধু প্রান্তিক উৎপাদক ও ভোক্তা সমাজ।

বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে আইন আছে কিন্তু  প্রয়োগ নেই। আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। ফলে, সিন্ডিকেটও রয়ে যায় আইনের বাইরে। ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী মূল্যস্ফীতিকে বাংলাদেশের অন্যতম এক অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে আছে জ্বালানি ঘাটতি, অর্থনীতির নিম্নগতি, বৈষম্য, সরকারি ঋণ আর বেকারত্ব ইত্যাদি।

সরকার মূল্যস্ফীতি একটি সীমার মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেটি সফল হয়নি। সরকার চেয়েছে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে। কিন্তু তা ৯ শতাংশের নিচে নামেনি। মূল্যস্ফীতি সীমার মধ্যে ধরে রাখতে অবশ্যই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

মূল্যস্ফীতির এই হার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হবে। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ এমনিতেই মহাসংকটে আছে। এই হারের গতি রোধ করতে না পারলে সাধারণ ও নিম্নবিত্তের খাদ্য চাহিদাও মেটানো যাবে না। থাকা-খাওয়ার পেছনেই দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তদের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায়। এই হার যদি আরও বাড়তে থাকে তাহলে তারা মহাসংকটে পড়বে। খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সাধারণ মানুষকে এখনই ধারদেনা করতে হচ্ছে। তখন ঋণ দেওয়ারও লোক পাওয়া যাবে না। সবাই সংকটে পড়বে, কেউ আগে, কেউ পরে।

তাই সময় থাকতে সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ভোক্তা অধিদফতর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, টিসিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে হবে। সরকার অনেক পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছিল, কিন্তু তা আর মানা হয় না। কৃষি বিপণন অধিদফতর ২৯টি কৃষিপণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছিল। তাও মানা হয়নি। সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম দেয়ালেই বাঁধাই করা থাকে, বাস্তবে কার্যকর হয় না। লাফিয়ে লাফিয়ে সব পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকারকেই এই পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে হবে।

লেখক: আইনজীবী, প্রাবন্ধিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কেনিয়ায় কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ
কেনিয়ায় কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ
সাত নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে
সাত নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে
গুণগত ও মানসম্মত চিকিৎসা চাই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
গুণগত ও মানসম্মত চিকিৎসা চাই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে ২৬ জুন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে ২৬ জুন
সর্বশেষসর্বাধিক