সত্যিকারের প্রতিবাদ হোক ধর্ষণের বিরুদ্ধে

Send
রোকেয়া লিটা
প্রকাশিত : ১৪:৫১, অক্টোবর ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৩, অক্টোবর ৩০, ২০১৬

 

 

রোকেয়া লিটাআমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। ঢাকা শহরে একেবারেই নতুন। হলে সিট না পেয়ে আজিমপুরে একটি বাসায় সাবলেট থাকি। একদিন দুপুরে হঠাৎ আম্মা ফোন করে বললেন, এবার আর কুরিয়ারে আমার জন্য টাকা পাঠাননি তিনি। আমার মায়ের আপন মামাতো ভাই ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। তিনি কদিন আগে আমাদের বাসায় বেড়াতে গেছেন। আম্মা তার হাতেই আমার টাকাটা পাঠিয়েছেন। আমার মায়ের কথাবার্তায় এক ধরণের উচ্ছ্বাস খেয়াল করলাম। হয়তো আম্মা ভাবছিলেন, তার মেয়েটা ঢাকা শহরে একা থাকে, তার খোঁজ-খবর নেওয়ার মত একজন লোক পাওয়া গেল।
নির্ধারিত দিনে, আমার সেই মামা আমাদের সাবলেটের বাসায় এলেন। আমার মায়ের পাঠানো টাকাগুলো আমাকে দিয়ে বললেন, পরে একদিন এসে আমাকে নিয়ে ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখাবেন। মাঝে মাঝে ফোন করে আমার ভালো-মন্দ জিজ্ঞেসও করতেন তিনি। একদিন ছুটির দিনে, আমার সেই মামা তার একটি দামি গাড়ি নিয়ে এলেন আমাকে ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখানোর জন্যে। বেশ কয়েকটা জায়গায় বেড়ানোর পরে আমাকে তিনি নিয়ে গেলেন শিশুপার্কে। শিশুপার্কে ট্রেনে উঠেছি। যেই না ট্রেনটা একটা ছাউনীর ভেতর দিয়ে যাওয়া শুরু করলো, অমনি খেয়াল করলাম একটি হাত আমার ঘাড় হয়ে জামার গলা ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে চাইছে। আমি অনেকটা চিৎকার দিয়ে হাতটা খামচি দিয়ে টেনে সরিয়ে দিলাম। ট্রেনটা থামা মাত্র আমি একাই শিশুপার্ক থেকে একটা অটো নিয়ে বাসায় চলে গেলাম।
এই হচ্ছে আমার উচ্চশিক্ষিত ও বেসরকারি ব্যাংকের উঁচু পদওয়ালা মামা। আমার বয়েসি তার একটি ছেলে তখন বুয়েটে লেখাপড়া করছে। গল্পটা বললাম, কারন ধর্ষক বা নারী নিপীড়ক বলতে আমরা বুঝে থাকি অশিক্ষিত-নেশাখোর, চোর-ছ্যাচ্চর টাইপ লোকজনকে। আসলে তো বিষয় সেটি নয়। ধর্ষক মানেই হলো সুযোগ সন্ধানী বিকৃত মস্তিষ্ক। সুযোগ পেলেই এরা সাপের মতো ফণা তুলে ছোবল মারার চেষ্টা করে। তাহলে কি বলবো যে, আমরা তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছি বলেই তারা ধর্ষণ-নারী নির্যাতন করছে? একেবারেই না। আমরা অসচেতন, আমাদের পরিবার অসচেতন, আর এই অসচেতনতাকে পুঁজি করেই এইসব বিকৃত মস্তিষ্কগুলো সুযোগ খুঁজে বেড়ায়।

আমার মায়ের কথাই ধরুন না, বেশ কিছুদিন সে বিশ্বাসই করতে পারেনি যে তার আপন মামাতো ভাই আমার  সাথে এমন অশোভন আচরণ করেছে। সে নিয়মিত আমাকে ফোন করতো, মেসেজ পাঠিয়ে জ্বালাতন করতো। একদিন বাড়িতে যাওয়ার পর আমার মায়ের সামনে ওই লম্পট কয়েকবার ফোন কল দিয়েছে। আমি ফোন রিসিভ না করায়, সে একটা মেসেজ পাঠালো। ওই মেসেজ দেখার পর আমার মায়ের বিশ্বাস হলো যে তার আপন মামাতো ভাই এই রকমের বিকৃত মস্তিষ্কের একজন মানুষ। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো এইরকম। নিপীড়করা আমাদের আত্মীয় বা কাছের মানুষ। একই সাথে উঠাবসা করতে করতে সুযোগ বুঝে এক সময় ছোবল মারে।

এই মুহূর্তে দেশের সবচে আলোচিত খবর দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ধর্ষিত একটি শিশু। এই শিশুটির বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত ধর্ষককে নাকি শিশুটি বাবা বলে ডাকতো। বোঝাই যায়, ওই পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো এবং শিশুটির পরিবার কখনও ভাবতেই পারেনি এই পাতানো বাবা যে এতটা হিংস্র! বেশিভাগ মেয়েরাই জীবনের কোনও না কোনও একটা সময়ে এমন নিপীড়নের শিকার হয়। আমার চারপাশের বন্ধু-বান্ধবদের অভিজ্ঞতা তো সেই কথাই বলে। আমার স্কুলের এক বান্ধবীকে বিরক্ত করতো তার দূর সম্পর্কের এক চাচা। আমার সন্তানতুল্য একটি মেয়েকে যৌন নিপীড়ন করেছিল তার আপন ৬খালু। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমার সবচে কাছের বান্ধবীটির কথা শুনলাম, সেও নাকি ধর্ষিত হয়েছিল শিশু বয়সে।

আমাদের সমাজে আরও একটি অন্ধ বিশ্বাস আছে। আমরা মনে করি শুধু পুরুষরাই যৌন নিপীড়ক-ধর্ষক হয়ে থাকে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় কোচিং করতে এসে প্রথম যে হোস্টেল উঠেছিলাম, সেই হোস্টেলের রাঁধুনীর বিরুদ্ধে একবার অভিযোগ উঠলো যে, সে তার কাজের সহকারী একটি কিশোরকে রোজ রাতে যৌন মিলনে বাধ্য করে। কিন্তু ওই রাঁধুনীর হাতেই হোস্টেলের মালিক সমস্ত দ্বায়িত্ব তুলে দিয়েছেন, সে বেশে ক্ষমতাবান একজন নারী। কাজেই সে ছিল বিচারের আওতার বাইরে। এরপর যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম, তখন একজন সিনিয়র পুরুষ সাংবাদিকের সাথে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, ছোট বেলায় সেও এক নারীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর তাছাড়া পত্রপত্রিকায় তো হরহামেশাই খবর আসছে মাদ্রাসা শিক্ষকরা ছাত্রদের ধর্ষণ করছে।

অর্থাৎ ধর্ষণ আগেও ছিল, এখনও আছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এবং নিপীড়ন করছেও। এখন যেটি বাড়তি হচ্ছে, সেটি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিছু কিছু ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। আমি আবারও বলছি, সব ঘটনা নয়। কিছু কিছু ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব হইচই হয়, আবার কিছুদিন পর ওই ঘটনা আড়াল হয়ে যায়। প্রকৃত পক্ষে, সামগ্রিকভাবে ধর্ষণ বা নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে একটা সম্মিলিত প্রতিবাদ, সেটি হতে দেখি না। আর যে ঘটনাগুলো খুব বেশি আলোচিত হয়, সেগুলোর পেছনে একটা ইস্যু তৈরির চেষ্টাও বোধ হয় থাকে। যেমন তনু হত্যার কথাই যদি বলেন। তনুর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিলো একটি সেনানিবাসের ভেতরে, কাজেই তনুকে নিয়ে অনেক হইচই হলো। আবার খাদিজাকে নিয়েও খুব হইচই হলো, কারন খাদিজাকে কোপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কথিত ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে। আরও খেয়াল করেছি, দেশে যে সব সম্প্রদায়ের মানুষ কম, সেসব সম্প্রদায়ের কোনো নারী ধর্ষিত হোক বা না হোক, ধর্ষণজনিত কোনও খবর উঠলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেঁপে ওঠে। কদিন আগেই মোল্লারহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক নারীকে নিয়ে এমনই ঘটনা ঘটলো। খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, সেই নারীকে নাকি কয়েকদিন ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণ করার পর পা কেটে দেওয়া হয়েছে। মুহুর্তেই একটি গোষ্ঠী এই ধর্ষণের ঘটনাকে ধর্মীয় কারণে ধর্ষণ হয়েছে বলার চেষ্টা করলো। যদিও পরে কোনও কোনও মিডিয়ায় একেবারেই উল্টো খবর প্রকাশিত হলো, যাতে পরকীয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। অথচ একই সময়ে নারায়নগঞ্জে একটি মেয়ে ধর্ষিত হয় এবং আভিযোগ পাওয়া যায় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বিরুদ্ধে, কিন্তু সেই ঘটনা নিয়ে নীরব সকলেই। দিনাজপুরেরই আরেকটি ঘটনার কথা বলি, দুর্গা পূজা চলাকালে পূজা মণ্ডপে দ্বায়িত্বে নিযোজিত দুজন নারী পুলিশকে ধর্ষণ করার খবর প্রকাশিত হয় একটি পত্রিকায়। ধর্ষণের অভিযোগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এই ঘটনাটি নিয়েও নীরব ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

অর্থাৎ বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের কোনও প্রতিবাদ চাওয়া হয় না। যেসব প্রতিবাদ হয়, সেগুলো ইস্যু ভিত্তিক। সেনানিবাসে নারীর মৃতদেহ নিয়ে সমালোচনা হলে সেনাবাহিনীকে চাপে ফেলা যায়, ছাত্রলীগের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে কোপানোর অভিযোগ নিয়ে তুলকালাম বাধালে, এই দলটিকে প্যাচে ফেলা যায়, সংখ্যালঘু পরিবারের নারীদের ধর্ষণ নিয়ে কথা বললে, পাশের দেশ ভারতের দাদাদের সুবিধে হয় এবং তারা এদেশে এসে পত্রিকায় বলতে পারে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা ভালো নেই। সবগুলো প্রতিবাদই ইস্যুভিত্তিক। সত্যিকার অর্থে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ যদি হতো, তাহলে প্রতিটি ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনায় জেগে উঠতো ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেনীর মানুষ। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় কেঁপে উঠতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু সেটি তো হয় না। যে সব নিপীড়নের ঘটনা ইস্যু তৈরির ডিব্বা, সেসব ডিব্বার মুখ উন্মোচন করা হয়। বাকি ধর্ষণের ডিব্বাগুলো অতলে তলিয়ে যাক, কারও মাথা ব্যথা নেই।

বাংলাদেশে প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়লেই ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। একটা-দুইটা ইস্যু নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে, একটা সম্মলিত প্রতিবাদ করতে না পারলে, এই অবস্থার উন্নতি হবে কিভাবে? আর বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা বা বিচার পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে নতুন করে কি বলবো? শাজনীন হত্যার বিচার পেতে সময় লেগে গেলো দীর্ঘ আঠারো বছর! নিপীড়করা তো জানে, তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, তড়িৎ গতিতে কোনও বিচার হবে না। তবে, সে থামবে কেন? অতএব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, লম্পট-সাধু সবাই আছে সুযোগের সন্ধানে। তারা সুযোগ পেলেই ধর্ষিত হবো আমি বা আপনি।

বাকি থাকলো এনজিওগুলো। এনজিওগুলো আসলে কি করছে বাংলাদেশে আমি নিজেও বুঝি না। তাদের কথিত গবেষণা আর কর্মীদের বেতনের পেছনেই তো সব অনুদান শেষ। শিশুর মায়েদের জন্য দুই একটা সচেতনতা মূলক ক্যাম্পেইন করার অর্থ কই তাদের? কই টেলিভিশনে তো এ ধরণের কোনো ক্যাম্পেইন দেখি না! কে সচেতন করবে মায়েদের? কে তাদের বোঝাবে এসব পাতানো বাবা-টাবা, মামা-খালুর কাছে তার কন্যা নিরাপদ নয়? কে শেখাবে শিশুদের ভালো স্পর্শ আর নোংরা স্পর্শ সম্পর্কে? আগে তাও বিটিভিতে কিছু সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন দেখা যেত, এখন তো শুনি গ্রামের মানুষও বিটিভি দেখে না।

একদিনেই তো বাংলাদেশটা কোনও আদর্শ দেশে পরিণত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটা সম্মিলিত প্রতিবাদ। দেশে তো একটা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ