মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কানে কি এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব?

Send
জুলফিকার রাসেল
প্রকাশিত : ২১:১৬, অক্টোবর ২১, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৬

জুলফিকার রাসেলআমার সাম্প্রতিক দিল্লি সফরের ধারাবাহিক বৃত্তান্ত শেষ করবো ছোট অথচ মূল্যবান একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে।
আমার মনে হয়েছে দিল্লিতে দেখা আসা ওই আয়োজনটা বড় কোনও কঠিন ব্যাপার নয়– কিন্তু গণতন্ত্রে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ খুব জরুরি, আর বাংলাদেশেও তা অনায়াসে চালু করা যেতে পারে। এই কারণেই সফরনামায় আলাদা করে সে দিনটার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। সরাসরি অভিজ্ঞতাটা বলেই ফেলা যাক!
দিল্লিতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র সদর দফতর ১১ নম্বর অশোকা রোডে। সেন্ট্রাল দিল্লির ছায়াঘেরা যে এলাকাটা ল্যুটিয়েন্স বাংলো জোন নামে পরিচিত। বড় বড় সবুজ গাছে সাজানো প্রশস্ত রাস্তার দুপাশে ভিভিআইপিদের সুদৃশ্য একতলা সব বাংলো আর সুবিশাল লন। তেমনই একটা রাস্তার ওপর বিজেপি’র এই কার্যালয়।
কংগ্রেসসহ ভারতের সব জাতীয় দলই নিজেদের দফতর চালানোর জন্য এমন বাংলো পেয়ে থাকে। তবে বিজেপি এখন শাসক দল বলেই বোধহয় তাদের অফিসের চেহারা আলাদা। সারা ভারত থেকে আসা নানা ভাষা, নানা জাতির লোকে আর নেতাকর্মীদের ভিড়ে পার্টি অফিস চব্বিশ ঘণ্টাই গমগম করছে। ভেতরের ক্যান্টিনে বিশাল চায়ের কেটলি দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছে না।
সেই ভিড়ের মধ্যেই দেখলাম কনফারেন্স রুমের সামনে আলাদা একটা জটলা। একদল দর্শনার্থী- যার মধ্যে স্যুট-কোট পরা করপোরেট কর্তার চেহারার লোকজনও আছেন, আবার ধুলোমলিন পোশাকের চাষাভুষোরাও আছেন। সবাই দেখি বিকেল তিনটে থেকেই ওই ঘরের সামনে অপেক্ষায়। ব্যাপারটা কী? খোঁজ করে জানলাম আজ রোস্টারে আছে ‘উমাদিদি’র আসবার কথা, তাই দিদির সঙ্গে দেখা করে নিজের অভাব-অভিযোগ জানাতে অফিসে ভিড় করেছেন তারা।

দলের সব মন্ত্রীকেই পালা করে রোজ পার্টি অফিসে এসে কয়েক ঘণ্টা বসতে হবে। শুধু বসার জন্য বসা নয়, নিজের সচিব-কর্মকর্তাসহ পুরো টিমকে নিয়ে এসে প্রত্যেকের অভাব-অভিযোগ নোট করতে হবে।

উমাদিদি মানে সুশ্রী উমা ভারতী, ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রী ও বিজেপির ডাকাবুকো সন্ন্যাসিনী মন্ত্রী। পার্টির রোস্টারে আছে আজ তিনি এসে দুঘণ্টা সাধারণ মানুষের সামনে বসবেন, তার কর্মকর্তাদের নিয়ে সবার অভিযোগ নোট করবেন এবং সেই অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা নেবেন। আজ যতগুলো কেস জমা পড়বে– তার ঠিকঠাক নিষ্পত্তি হল কি না, সেটা দেখার ভার থাকবে উমাদিদির ওপরেই। কোনও কারণে কিছু নিষ্পত্তি না হলে কেন হল না, সেটাও জানাতে হবে তাকেই।

গত বছর নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই পার্টি অফিসে চালু করেছেন এই অভিনব ব্যবস্থা। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি কেন্দ্রে সরকার গড়েছে, বাছাই করা নেতা-নেত্রীরা মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু সাধারণত দেখা যায় এর পরই সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বাড়তে থাকে, যারা ভোট দিয়ে তাদের মন্ত্রী করেছেন তারা আর কখনওই সেই সব মন্ত্রীর নাগাল পান না।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, দলের সব মন্ত্রীকেই পালা করে রোজ পার্টি অফিসে এসে কয়েক ঘণ্টা করে বসতে হবে। আর শুধু বসার জন্য বসা নয়, নিজের সচিব-কর্মকর্তাসহ পুরো টিমকে নিয়ে এসে প্রত্যেকের অভাব-অভিযোগ নোট করতে হবে। আর কারা কবে বসবেন, সেই রোস্টার তৈরি হয়ে আসবে খোদ পার্টি সভাপতি অমিত শাহর দফতর থেকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাতে ছাড়পত্র দেবে। তারপর সেই নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হবে পার্টি অফিসে আর দলের ওয়েবসাইটে– যেটা দেখে দর্শনার্থীরা ঠিক করবেন কোনদিন তারা দেখা করতে আসবেন।

আগেই বলেছি, আমি যেদিন বিজেপি অফিসে যাই সেদিন এই ‘ফাস্ট-ট্র্যাক শুনানি’তে ছিল উমা ভারতীর পালা। ঠিক তার আগের দিন বসেছিলেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পমন্ত্রী কলরাজ মিশ্র। পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই মিশ্রসাহেব উত্তরপ্রদেশের বর্ষীয়ান নেতা। কিন্তু পার্টির এই ডিউটি থেকে তারও ছাড় নেই। আবার উমা ভারতীর পরদিনই দেখলাম অফিসে আসবেন ভারতের তরুণ পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর। রোস্টারে টাঙানো আছে পরের সাতদিন কোন মন্ত্রীরা আসবেন, কখন থেকে কখন কোথায় কাকে পাওয়া যাবে।

সুদূর রাজস্থানের বিকানের বা দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের কাছের কোনও গ্রাম থেকেও লোকজন এসেছেন। ইন্দোরের কাছের কোনও মফস্বল শহর থেকে এক যুবক তার পঙ্গু মাকে কাঁধে করে নিয়ে এসে হাজির হয়েছে-তার মা প্রতিবন্ধীদের ভাতা কেন পাচ্ছেন না, সে অভিযোগ জানাতে।

মানুষ কী ধরনের অভিযোগের প্রতিকারের আশায় মন্ত্রীদের এই দরবারে আসছেন?

উমা ভারতীর আসার কিছুক্ষণ আগে থেকেই দেখলাম বিজেপি কর্মীরা জড়ো হওয়া লোকজনের মধ্যে এক পাতার একটা ফর্ম বিলি করছেন। ওই ফর্মে আপনার নাম-ধাম লেখার পাশাপাশি সংক্ষেপে জানাতে হবে ঠিক কী নিয়ে অভিযোগ জানাতে চান। অভিযোগটা যে ওই মন্ত্রীর দফতর বিষয়কই হতে হবে এমন কোনও মানে নেই।

অর্থাৎ উমা ভারতীর কাছে শুধু জলসম্পদ নিয়ে নয়, আপনার কাছের হাসপাতাল সম্পর্কে কোনও অভিযোগ থাকলে সেটাও পেশ করতে পারেন। ওইদিন যে মন্ত্রী হাজির থাকবেন তারই দায়িত্ব হবে যথাস্থানে সেটা নিয়ে গিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। ফর্ম লিখতে কোনও অসুবিধা হলে বিজেপির দলীয় কর্মীরাই এগিয়ে এসে আপনাকে সাহায্য করবেন বা নিজেরাই লিখে দেবেন।

উমা ভারতীর এজলাসে দেখলাম শুধু দিল্লি বা তার আশেপাশের এলাকা নয়, সুদূর রাজস্থানের বিকানের বা দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের কাছের কোনও গ্রাম থেকেও লোকজন এসেছেন। ইন্দোরের কাছের কোনও মফস্বল শহর থেকে এক যুবক তার পঙ্গু মাকে কাঁধে করে নিয়ে এসে হাজির হয়েছে– তার মা প্রতিবন্ধীদের ভাতা কেন পাচ্ছেন না, সে অভিযোগ জানাতে। কেউ এসেছেন স্কুলে শিক্ষকের চাকরিতে ঘুষ চাওয়ার প্রতিবাদ জানাতে, কারও আবার দেখলাম ভর্তুকিপ্রাপ্ত হজযাত্রীদের তালিকায় কেন নাম উঠছে না অভিযোগ সে বিষয়ে।

দল হিসেবে বিজেপির নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপনি একমত না-ই হতে পারেন, কিন্তু ব্যবস্থাটা যে খুবই ভালো তাতে কোনও সংশয় নেই। সব দেখেশুনে প্রথমেই যে কথাটা মনে হল, আমাদের বাংলাদেশে এটা চালু করা কী এমন কঠিন?

মানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বহু নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও তো ঠিক একই অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার পর মানুষ আর তাদের নাগাল পায় না। সাধারণ মানুষ তাদের অভাব-অভিযোগের প্রতিকারের আশায় অসহায়ভাবে এখানে-ওখানে ছুটে বেড়ায়। মন্ত্রীরা পাজেরো হাঁকিয়ে ছুটে বেড়ান, তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা সাধারণ লোককে তাদের কাছে ঘেঁষতে পর্যন্ত দেয় না। আমি বলছি না মন্ত্রীরা নিয়ম করে দরবারে বসলেই সব অন্যায়ের প্রতিকার হয়ে যাবে, কিন্তু মানুষ একটা ভরসা তো অন্তত পাবে! মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে অনেক সমস্যা যে মেটানো সম্ভব, এটা কে না জানে।

এখন জানি না, এই পরামর্শটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানে কোনওভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব কি না!

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ