মুখোমুখি মুক্তির মার্চ ও অন্ধকার মার্চ

Send
অজয় দাশগুপ্ত
প্রকাশিত : ১৮:২৬, মার্চ ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, মার্চ ২১, ২০১৮

অজয় দাশগুপ্তমার্চ এলেই যে স্বাধীনতার কথা বলি বা গৌরবে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা শুনি তা কি আসলে আজ সত্য? আজ আমাদের বাস্তবতা আর একাত্তরের মার্চের বাস্তবতা কি এক? এক না হলেও কথা ছিল না। কারণ, মানুষ কখনও এক জায়গায় এক বাস্তবতায় থেমে থাকে না। আর থাকে না বলেই তার জীবন সুন্দর ও বিচিত্র। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ যেখানে দাঁড়িয়ে সেটাকে কি এগুনো বলা যায়? না আমরা চলেছি তিমির রাত্রির দিকে? এটা বুঝতে খুব বেশি মেধা বা শ্রমের দরকার হয় না যে সরকার যতটা জনসমর্থন, তারচেয়ে বেশি টিকে আছে নিজেদের বলিষ্ঠতা আর ভয়ার্ত সাধারণ মানুষের সমর্থনে। ভয়ার্ত মানুষের সমর্থন বলতে আমি বোঝাচ্ছি যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, যারা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত, তারাই এই সরকারকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের ভয়, শেখ হাসিনা না থাকলে এদেশ আবার ফিরে যাবে সেই পুরনো শকুনদের কাছে। যারা যেকোনও কিছুর বিনিময়ে আমাদের দেশকে পাকিস্তানের ছায়া রাষ্ট্র আর ছদ্মবেশী মৌলবাদের দুর্গ বানাতে চায়। এই ধারণা অমূলক কিছু না। বরং তার নমুনা, তার নিশানা, তার টার্গেট এখন দৃশ্যমান।
এই মার্চে আক্রান্ত জাফর ইকবাল প্রমাণ করলেন আমরা কেউ নিরাপদ না। তিনি আমজনতা নন। তার খ্যাতি, তার প্রচার  প্রসার ঈর্ষণীয়। বিশেষত শিশু-কিশোরদের কাছে, যুবক-যুবতীদের কাছে তিনি কিংবদন্তি। সেই তাকে সরকার পুলিশ পাহারায় রেখেও কি সামাল দিতে পারলো? পারেনি। কারণ, যখন সাপ আস্তিনে, যখন কুড়াল চাপাতি ছুরি ঘাড়ের নিচে, তখন কে কাকে বাঁচাতে পারে? একদিনে তৈরি হয়নি এই পরিবেশ। একক কেউ করেওনি। শুরুটা করেছিলে জিয়াউর রহমান। তারপর এরশাদ টেনেছেন সেই জোয়ার। শেখ হাসিনা চান বা না চান, তার দলের লোকেরাও টেনে নিয়ে গেছে এই স্রোত। সাধারণ একটা ঘটনা বলি। আমি নিজের চোখে দেখেছি আওয়ামী লীগের নেতা মাঠে ঘরোয়া সভায় পাকিস্তানকে হানাদারের দেশ বলে গালাগাল দিয়ে এসে ক্রিকেট দেখতে বসেছে। খেলা হচ্ছিল ভারত বনাম পাকিস্তান। সে খেলায় তিনি একপর্যায়ে আর থাকতে না পেরে পাকিস্তানের জন্য দোয়া করার ফতোয়া দিলেন সবাইকে। এই যে স্ববিরোধিতা, এই যে মনে এক আর রাজনীতিতে আরেক, এর উত্তর না মিললে এই সমাজ কোনোদিন মুক্ত হতে পারবে না।

যে সময় দেশ স্বাধীন হচ্ছিল তখন আমাদের সংগ্রাম ছিল বাঙালি হওয়ার। নিজের চোখে দেখেছি তারুণ্য আর নারীদের সেই উজ্জ্বলতা। নারীদের ছবিগুলো দেখুন। কতটা সপ্রতিভ আর সংগ্রামী। তাদের আচরণ পোশাক আর মুখাবয়বে যে বাঙালিয়ানা সেটা কি আজ আছে? যদি না থাকে আমাদের দায় কী? দায়িত্ব কী? আমরা কী ভেবে দেখছি কেন নাই? না থাকলে তাকে ফিরিয়ে আনার কী কোনও চেষ্টা করছি আমরা? দেশের শীর্ষ নেতারা বলছেন ধর্মীয় লেখাপড়া মৌলবাদ বানায় না। আবার ঘটনার পর তারাই বলেন এসব ওদের কাজ। কোনটা বিশ্বাস করবে জাতি? গদি আর সরকার যদি বারবার নতজানু হয় হতে থাকে, দায় কি গণজাগরণের? যারা মাঠে নেমে মানুষ জড়ো করবে প্রাণের স্পন্দনে দেশ জাগাবে, তারপর পুলিশের মার খেয়ে ছাত্রসংগঠনের পিটুনি খেয়ে মাঠ ত্যাগে বাধ্য হবে, এ দায়িত্ব তাদের? আজ এসব  প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। সবাই জানেন বিএনপির রাজনীতি কী। ফলে তাদের কাছে এগুলো কেউ আশাও করে না। জাফর ইকবাল আক্রান্ত হওয়ার পর গণস্বাস্হ্য খ্যাত জাফরুল্লাহ চৌধুরীর একটা বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক মিডিয়ায়। তিনি নাকি মীর্জা ফখরুলকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রতিবাদ করার। ফখরুল সাহেব নাকি রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু পরে অন্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন তারা নীরব থাকবেন। যে দল মিত্র জামাতিদের টপ নেতাদের ফাঁসির পর মুখ খোলেনি তারা যাবেন জাফর ইকবালের ব্যাপারে ঝুঁকি নিতে? আমি বলবো তারা তাদের নীতিতে ঠিক আছে। যেটা মানে না সেটা মুখেও আনে না। আর যে দলকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তবুদ্ধির দল হিসেবে খোলা চেক দিয়ে রেখেছি তারা কি তাদের নীতিতে অটল? পোশাকের আবরণে মুগ্ধ হয়ে আপনি কাউকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করবেন আবার বলবেন ধর্মের নামে অশান্তি বরদাশত হবে না, এটা কি যৌক্তিক না গ্রহণযোগ্য?

এই মার্চে আমাদের সামনে যে অন্ধকার সমাজ, না জাগলে তা দূর হবে না। সামাজিক প্রতিরোধ কতটা জরুরি সেটা কি এখনও বুঝিয়ে বলার দরকার আছে? কোনও দেশে বা কোনও সমাজে পুলিশ কাউকে বাঁচাতে পারে না যদি না  মানুষ প্রতিরোধ না গড়ে। দেশে দেশে আমরা দেখেছি নিরাপত্তা বাহিনী সরকার প্রধানকেও বাঁচাতে পারেনি। পাশের দেশ ভারতকে আমরা গণতন্ত্রের পীঠভূমি মনে করি। সেদেশেও কিন্তু ইন্দিরা গান্ধির মতো নেতাকে নিজের বাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। শুধু তাই না, আমেরিকার বেলাতেও পুলিশ মানুষকে বাঁচাতে পারে না। কারণ, মানুষের ভেতর যে শয়তান তাকে নিবৃত্ত করা না গেলে কোনোদিনও কেউ কাউকে বাঁচাতে পারে না।

আজকে আমাদের সমাজে মৌলবাদ এত প্রবল, এত গভীরে, যার ভেতরে না গেলে সমস্যার সমাধান মিলবে না। আগে আমাদের সমাজ ছিল গান-বাজনা কবিতা-সাহিত্যে ভরপুর। ঘরে ঘরে গান শুরু হতো সন্ধ্যায়। বসতো খেলাঘর কচিকাঁচার আসর। বালক-বালিকারা জেনে যেত সংস্কৃতি এক বড় শক্তি। সে শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা তাদের জীবন শুরু করতো। আজ কি তা আছে? কেন নাই? কারণ, সুকৌশলে ধর্মের নামে সমাজে হানাহানির বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ ধর্ম আগেও ছিল এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তার এমন আদল তো আমরা আগে দেখিনি। আসলে রাজনীতি এমন এক জায়গায় চলে এসেছে, যেখানে সমাজ ক্রীড়নক মাত্র।

এই মার্চ একদিক থেকে অন্ধকার মার্চ। যেখানে আশার আলো ক্রমাগত আলেয়া হয়ে উঠছে। আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি শারীরিকভাবে হয়তো একটু নিরাপদে আছি। কিন্তু আমাদের দুঃখ বা রাগ বা অভিমান বা বেদনা দেশের মানুষের মতো এক ও অভিন্ন। ধর্মের নামে এই মাতম বন্ধ না হলে ধার্মিক মানুষেরাও নিরাপদ থাকবেন না। আসলে সব মিলিয়ে যে পচন তার প্রতিফলনে আজ এই হাল। সামাজিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া আর মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যাবে এরা কতটা হিংস্র আর কতটা নোংরা মনের অধিকারী। এদের পচে যাওয়া মগজে শুধু প্রতিহিংসা। এত জঘন্য মন্তব্য আর এত আক্রোশ দেখে মনে হয় সত্যি কি আমরা এই দেশ চাইনি? না আমাদের নেতারা যে দেশ চেয়েছিলেন আমরা তা ঠিক জায়গায় রাখতে পারিনি? এর জবাব মিলতেই হবে। কারণ, এভাবে চলা যায় না। এটা তো মানি জোর করে কিছু রাখা যায় না। পাকিস্তানও আমাদের জোর করে রাখতে পারেনি। তাই বোঝা দরকার কী হলে কেমন হলে এই আক্রমণ আর এই হত্যা বন্ধ হবে। মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। ঈশ্বরের সেই দানকে এভাবে অপমানিত আর চলে যেতে দেওয়ার জন্য কোনও দেশ জন্মায় না। আমরাও জন্মাইনি।

তাই এই মার্চে আমাদের জানা দরকার কী চায় এই জাতি? কী চায় মানুষ? কী তাদের অভিপ্রায়? দ্বৈত সত্তা বা দোটানার দিন শেষ। হয় মুক্ত নয় অবরুদ্ধ- এ দুয়ের মাঝে আজ আর কোনও জায়গা বাকি নেই। গান গাইবো কবিতা লিখবো ছবি আঁকবো সিনেমা দেখবো আবার তলে তলে জঙ্গিদের সমর্থন করবো মধ্যপন্হার নামে রাজাকারদের ও গায়ে হাত বুলিয়ে স্বর্গ-নরকের আশায় দেশের বিরোধিতা করবো এই জাল ছিন্ন করতে হবে। সেটা যেদিকেই যাক। মানুষের জীবনের মূল্য ও তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে দুয়ারে দাঁড়ানো এই মার্চ আর স্বাধীনতার মার্চ আজ মুখোমুখি। কে দেবে এর জবাব?

লেখক: সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ