জেগে ওঠো, দাঁড়াও এক কাতারে

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৩:৫৬, আগস্ট ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৭, আগস্ট ১২, ২০১৮

সাইফুল হাসানসাংবাদিকতা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশার একটি। হত্যা ও নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, হামলা, ভয় দেখানো, লাঠিপেটাসহ নানা ঝুঁকি আছে এই পেশার। কিন্তু ভয়ে গুটিয়ে না থেকে সাংবাদিকরা কাজ করে যাচ্ছে। তথ্য বা সত্য তুলে ধরছে নির্ভয়ে। রাষ্ট্র, সরকার, প্রভাবশালী করপোরেট, হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল, লুটেরা, সমাজবিরোধী রাজনীতিক, ব্যবসায়ীদের মুখোশে উন্মোচন করে যাচ্ছে। গণমাধ্যম কর্মীদের ঝুঁকিটা এখানেই। অন্যান্য পেশার মতোই সাংবাদিকতাও একটি পেশা মাত্র। গণমাধ্যম-সাংবাদিক কারও প্রতিপক্ষ নয়।
বাংলাদেশে, সাধারণ মানুষ থেকে মহাপরাক্রমশালীদের বড় একটা অংশ সাংবাদিকতাকে ‘সাংঘাতিক’-‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং বিপজ্জনক বিবেচনা করে। অনেকেই উপহাস করেন–অযাচিত জ্ঞান দেন। পারলে কীভাবে রিপোর্ট লেখা বা টিভিতে দেখানো উচিত সেটাও বলে দেন। চেপে ধরলে রসিকতা বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু তাদের জ্ঞানদান স্রেফ রসিকতা নয়। তাদের অভিযোগ-অনুযোগের সব দাবি যে মিথ্যা তা হয়তো নয়। মজাটা হচ্ছে, সকলেই তথ্য চায়, কিন্তু নিজের মতো করে। এর ব্যত্যয় হলেই, গণমাধ্যম কর্মী ‘সাংঘাতিক’। তথ্য পক্ষে থাকলে ভালো, বিপক্ষে গেলে সাংবাদিক খারাপ, এই হচ্ছে জাতীয় মানসিকতা।

অথচ কেউ বোঝে না, গণমাধ্যম আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা এক নয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যম, প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের স্বাধীনতা চায়। অবাধ ও মুক্ত হতে চায়। কিন্তু সাংবাদিকের (কর্মীর) স্বাধীনতার বিষয়ে চুপ। নিজে শক্তিশালী হতে চায় কিন্তু তার কর্মীকে করতে চায় না। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে ভূমিকা রাখতে চায় কিন্তু সাংবাদিকদের অংশীদার করতে চায় না। এই সংকটই কাজের পরিবেশকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা হচ্ছে, ভয়মুক্ত কাজের পরিবেশ, আক্রমণ থেকে সুরক্ষা, সত্য তুলে ধরা এবং মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তার মতো জরুরি অনেক বিষয়। এ তথ্য সবার জানা ভালো যে সাংবাদিকতা কোনও স্বাধীন পেশা নয় (নাগরিক সাংবাদিকতা বাদে)। অনেকে সাংবাদিকদের মহাক্ষমতাধর মনে করেন। বাস্তবে কোনও ক্ষমতা নেই। কোন খবর ছাপা, কোন পাতায় ছাপা হবে না হবে না–এটা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বা নীতির বিষয়, সাংবাদিকের নয়।   

মানুষ, এই পার্থক্য বোঝে না বলেই সাংবাদিকরা বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সাংবাদিকরা বেধড়ক মার খেয়েছে। এমন ঘটনা এই প্রথম নয়, অহরহ ঘটছে। এক্ষেত্রে পুলিশ, রাজনীতিবিদ, ছাত্রসংগঠন, মাস্তান সবাই এগিয়ে। সাংবাদিক হত্যা বা পেটানোয় কারো বিচার হয়েছে– মনে করতে পারি না। বরং গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কলম নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে আইন হয়েছে, হচ্ছে। রাষ্ট্র একদিকে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করছে আইনিভাবে। অন্যদিকে নানা ধরনের প্রতিবদ্ধকতাও তৈরি হচ্ছে। যদিও ফেসবুক বা অন্যান্য বিকল্প গণমাধ্যমের কারণে তথ্য আটকে রাখা কঠিন। কিন্তু জনগণ বিশ্বাস করে, সাংবাদিকরা অনেক তথ্য গোপন করে।

সাংবাদিকের ঝুঁকি অফিস-রাস্তা উভয় ক্ষেত্রেই। সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য বা ছবি সংগ্রহ করে, জনগণের পাশে থাকে। কিন্তু বিপদে কেউ তার পাশে থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিককে প্রতিষ্ঠান-মালিক-সম্পাদকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় মাথায় রাখতে হয়। এরপরও চাকরির নিশ্চয়তা নেই, ঝুঁকি ভাতা নেই, পেনশন নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, শুক্র-শনি, ৯ট-৫টা নেই। এমনকি মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তা নেই। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা প্রায় ‘দুঃসহ’ একটি পেশায় পরিণত হয়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করে মেলে না ন্যূনতম বাহবা বা প্রশংসা। এর বদলে মেলে চাপাতি আর লাঠির বাড়ি। হাসপাতালে শুয়ে ব্যথায় কাতরায় সাংবাদিক। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায় সন্ত্রাসী।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ মনে করেন, ‘যদি সাংবাদিকতা ভালো হয় তবে তা প্রকৃতিগতভাবেই বিতর্কিত হবে’। কিন্তু যেখানে সাংবাদিকতা করাই কঠিন সেখানে বিশৃঙ্খলা হতে বাধ্য। এবং তাই ঘটছে। এজন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়ও কম নয়। বহু ধারা-উপধারা, মতাদর্শ, দল-উপদলে বিভক্ত সাংবাদিক সমাজ। একই মতাদর্শের মধ্যেও ভয়ানক কোন্দল, কাদা ছোড়াছুড়ি বিদ্যমান। দেশে সাংবাদিকদের এত সংগঠন। কিন্তু সরকার-প্রশাসন, রাজনীতিবিদদের ওপর প্রভূত চাপ প্রয়োগের মতো সংগঠন নেই। নেই তেমন ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বও। ফলে পরিস্থিতি বদলায় না।

‘মুক্ত সাংবাদিকতা ভালো বা খারাপ দুই-ই হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া সাংবাদিকতা শুধু খারাপই হতে পারে’– এই ধারণা একজন আমেরিকান সাংবাদিকের। বাংলাদেশের সাংবাদিকতাও যে ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে, তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়া লাগে না। নানামুখী চাপ, সেলফ সেন্সরশিপ, সংবাদ কর্মীদের দলীয় আনুগত্যসহ আরও অনেক কারণেই গণমাধ্যম বিশ্বাস হারাচ্ছে।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের মান নিম্নমুখী। প্রায় ভঙ্গুর বলা চলে। গণমাধ্যমকে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। যার স্বার্থে যতটুকু প্রয়োজন গণমাধ্যমে ততটুকুই তার বিশ্বাস বা আস্থা। ফলে, সাংবাদিক খুন হলে/মার খেলে সমাজে প্রতিক্রিয়া হয় সামান্য। এরমধ্যেও অনেক ভালো কাজ, ভালো সাংবাদিকতা হচ্ছে। কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য তা যথেষ্ট নয়। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে মূলধারার গণমাধ্যমকে কোনও পক্ষই আস্থায় নিতে পারেনি। যে কারণে গালি শুনতে এবং মার খেতে হয়েছে।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘journalism: an ability to meet the challenge of filling the space.’– সেটা কি করতে পারছে আমাদের গণমাধ্যম? সাংবাদিকের রাজনৈতিক বিশ্বাসে দোষ নেই। কিন্তু সংবাদিক পরিচয়ে দলীয় কর্মীর ভূমিকা পালন অবশ্যই দোষের। দুনিয়াতে বহু সাংবাদিক রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন। সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্বে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি যতক্ষণ সাংবাদিক ততক্ষণ নির্ধারিত নীতি-নৈতিকতা মেনে চলবেন। এটাই কাম্য।

সাংবাদিকরা আক্রান্ত হওয়ার পর বিচারের দাবিতে ইউনিয়ন নেতারা বিৃবতি দেন। মানববন্ধনের মতো কিছু কর্মসূচি থেকে  সংগঠনগুলো কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে থাকে। কিন্তু অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যেতে লেগে থাকে না। তাই, সরকার প্রশাসন তেমন চাপও বোধ করে না।  সাগর-রুনি ঘরের মধ্যে খুন হয়ে যায়, কঠোর হতে পারলাম না। কত কত বন্ধু, সহকর্মী মাইর খেলো, আহত হলো, কঠোর হতে পারলাম না। বহুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম কঠোর হতে পারলাম না। নৈতিকতা বন্ধক রাখতে রাখতে, দালালি করতে করতে অধঃপতনের শেষ ধাপে নেমে গেলাম... আর কবে কঠোর হবে সাংবাদিক সমাজ সেটা কেউ জানে না। সাংবাদিকরা যখন বিভক্ত এবং বাড়ি-গাড়ি, সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ, তদবির বা অন্য সুবিধা নিতে থাকে, তখন তার বা তাদের পক্ষে সঠিক অবস্থান নেওয়া কঠিন।

সাংবাদিকদের বিভক্তি, দলবাজি, ‍সুবিধাবাদিতার সুযোগ নিচ্ছে সবাই। ফলে আঘাতপ্রাপ্ত হলেও, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কেউ এগিয়ে আসে না। অথচ সাংবাদিকতা হচ্ছে সেই শক্তি, যা প্রগতিশীল সামাজিক পরিবর্তন ও কার্যকর গণতন্ত্র বজায় রাখতে কাজ করে। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেই সাংবাদিকরা এ পেশায় আসে এবং কাজ করে। ঝুঁকি হচ্ছে এই পেশার সৌন্দর্য। বাংলাদেশের সমস্যা হচ্ছে, পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। সেটা পুনরুদ্ধার করাই আপাত জরুরি। পাশাপাশি, লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে সবাই একতাবদ্ধ হলে, একটি দলনিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম বা ইউনিয়ন দাঁড় করানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তখন সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলার আগে দ্বিতীয়বার ভাববে সবাই। বন্ধ হবে হুটহাট ছাঁটাই। বেতন দিতে বাধ্য থাকবে মালিক সম্পাদক।

‘সাংবাদিক জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সাংবাদিকতায় আসে না। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হচ্ছে, সত্য খুঁজে বের করা, জবাব না পাওয়া পর্যন্ত নেতাদের ওপর অব্যাহত চাপ ধরে রাখা’– যত বিচ্যুতিই থাকুক না কেন, সাংবাদিকতা মহান পেশা এবং মহানই থাকবে।

কমিউনিটির স্বার্থে দরকার সাংবাদিকদের একতা। কোটারি স্বার্থ, দলবাজি দূরে রেখে জেগে ওঠা। সব তথ্য প্রকাশযোগ্য নয়, এই সীমাবদ্ধতা দুনিয়ার সব গণমাধ্যমের আছে। এই বার্তাটিও জনগণকে জানাতে হবে। বিখ্যাত সাংবাদিক ক্রিশ্চিন আমানপোরের মতো বিশ্বাস করতে হবে, ভালো সাংবাদিকতা,  ভালো টেলিভিশন আমাদের এই পৃথিবীকে আরো সুন্দর করে তুলতে পারে। 

শেষ করতে চাই সাংবাদিক হেনরি গ্রুন ওয়াল্ডের কথা দিয়ে– ‘সাংবাদিকতার মহান গুণ এবং দোষ হচ্ছে, সে কখনও চুপ থাকে না, থাকতে পারে না। বিস্ময়ের প্রতিধ্বনি, বিজয়ের দাবি কিংবা সর্বনাশের আলামত বাতাসে হারিয়ে যাওয়ার আগেই, তাকে কথা বলতে হয় এবং তখনই বলতে হয়’।  

অতএব, আসুন সাংবাদিক ভাই-বোন-বন্ধুরা, চুপ না থেকে কথা বলি। একতাবদ্ধ হই। বলতেই থাকি পেশার মান সমুন্নত রাখতে এবং ওরা যতক্ষণ না থামে।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ