আইনি বিষয়ে কী দিক-নির্দেশনা দেয় ‘#মিটু’

Send
ফারজানা আফরিন
প্রকাশিত : ১৭:২২, নভেম্বর ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৮, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

ফারজানা আফরিনদেরিতে হলেও ঝড়টা উঠেছে। সবার আগে নিজের যৌনহয়রানির ঘটনা নামসহ প্রকাশ করে বাংলাদেশের সাহসী যুগের দ্বার উন্মোচন করেছেন সাবেক মিস আয়ারল্যান্ড, বাংলাদেশের মেয়ে প্রিয়তী।
এরপর নাম আসে সিনিয়র সাংবাদিক প্রণব সাহার বিরুদ্ধে। অভিযোগ জানান শুচিস্মিতা সীমন্তি। তিনি ফেসবুক পোস্টে জানান, তার মায়ের সাবেক বন্ধু, ঘরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগে ১৬ বছর বয়সে তাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ’ করে, যা তাকে এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। একইসঙ্গে ১০ বছর ধরে এই কদর্য স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর যাতনার কথাও প্রকাশ করেন তিনি।
সবশেষ জ্যেষ্ঠ সংবাদ পাঠক ও একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন আসমাউল হুসনা নামের এক নারী। 

ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে নারী নিগ্রহের ঘটনাগুলো। এটি একদিকে যেমন চরম আশা জাগানিয়া, অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি এক আশ্চর্য নীরবতাও।

প্রিয়তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এখনও কোনও পদক্ষেপ নিতে শুনিনি। শুচিস্মিতা সিমন্তী ওই সিনিয়র সাংবাদিকের কর্মস্থলে অভিযোগ জানিয়েছেন। জানা গেছে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ দিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, আশ্বাস পাওয়া গেছে কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করবে ডিবিসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো পরের কথা, কাউকে কথা বলতেই দেখা যাচ্ছে না। অথচ #মিটু প্রতিবাদে প্রিয়তি জানিয়েছেন, তাকে রফিকুল নিজ অফিসে ‘ধর্ষণ চেষ্টা’ করেছিলেন। এমন গুরুতর অভিযোগেও আমরা যেন চোখ-কান বন্ধ করে রেখেছি।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে #মিটু আন্দোলনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে কারা, কোন আইনে বা পদ্ধতিতে অপরাধ প্রমাণিত হবে কিংবা কেউ যদি মিথ্যে অভিযোগ করে, সেটিই বা কীভাবে প্রমাণিত হবে। এই আন্দোলন কি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনও দিক-নির্দেশনা দেয়?

বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগিয়েছে যে #মিটু আন্দোলন সে বিষয়ে যতটুকু জেনেছি, তাতে করে এই আন্দোলনের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর ইতিহাস বা পেছনের ঘটনা ইতোমধ্যে অনেকেই জেনেছেন তাই শুরুর গল্পে যাবো না।

২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই আন্দোলনে সময়ের মধ্য দিয়ে কিছু রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু মৌলিকভাবে বলা যায়, #মিটু আন্দোলনে ভিকটিম নারী তার নিজের যৌনহয়রানির কথা প্রকাশ করবে, প্রকাশ করবে হয়রানিকারী ব্যক্তির নাম-পরিচয়। যেন করে সবাই তাকে চিনতে পারে, তার মুখোশ উন্মোচন হয় এবং অন্যরা এ থেকে সতর্ক হয়। এই হয়রানি হতে হবে নারীর কর্মক্ষেত্রে বা কাজের গণ্ডির মধ্যে, এই গণ্ডি অবশ্যই স্থানিক নয়। এর নাম #মিটু এজন্য যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কোনও নারীর হয়রানির ঘটনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, সাহসী হয়ে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনা সে নিজেও প্রকাশ করবে।কারও নিজের ঘটনা না থাকলে বা প্রকাশ করতে না চাইলে সতর্কতা ও সচেতনতার জন্য অন্যের অভিজ্ঞতায় একমত হয়ে সেটি শেয়ার করবে, ছড়িয়ে দেবে।

বলা যেতে পারে সংক্ষেপে এই আন্দোলনের পয়েন্টগুলো এরকম–

১. যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারী চুপ না থেকে ঘটনা প্রকাশ করে সেই পুরুষকে সামাজিকভাবে লজ্জিত করবে।

২. এই প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ায় হতে হবে।

৩. অভিজ্ঞতার বর্ণনা ভিকটিম নিজে দেবে, একজনের পক্ষ হয়ে আরেকজনের ঘটনা প্রকাশ নয়।

৪. শুধু যৌন হয়রানির ঘটনা এর আওতায় আসবে।

মূলত কর্মক্ষেত্রের যৌনহয়রানির ঘটনা এতে যুক্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে পারিবারিক পরিবেশে ঘটা ঘটনাসহ যেকোনও স্থানের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের যৌনহয়রানির ঘটনাকে উৎসাহিত করা হয়।

এই অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে যৌনহয়রানি নিয়ে মুখ বন্ধ রাখার ট্যাবু ভাঙা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

যৌনহয়রানি বন্ধে বিদ্যমান আইনের সংশোধন, পরিমার্জন, সংযোজন, প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নে এই আন্দোলন ভূমিকা রাখতে পারে।

#মিটু প্রকাশের পর ভিকটিম যৌনহয়রানীকারীকে আইনগতভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করবেন, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রমাণের উপায় নেই বলে ভিকটিম একটা দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনা চেপে গেছে–এমন দৃষ্টান্ত বেশি। এ সব ক্ষেত্রে বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে বরং সামাজিকভাবে জানিয়ে সত্য প্রকাশের মাধ্যম হয়েছে #মিটু।

এটি মূলত ‘ম্যাগনিচ্যুড অব দ্য ম্যাটার’ বা ঘটনার ভয়াবহতা যেন সবাইকে স্পর্শ করে, এই উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়। ‘এমপ্যাথি’ আদায় এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যৌনহয়রানিকারী ব্যক্তি সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিকভাবে লজ্জায় ফেলে অন্যদেরও সতর্ক করার একটি পদক্ষেপ হলো #মিটু, যা পরবর্তী সময়ে বিপুল সাড়া পেয়ে আন্দোলনে রূপ নেয়।

অনানুষ্ঠানিক একটি প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগের সত্যতা পেয়ে চাকরিচ্যুতি, অব্যাহতির মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এমনকি ২০১৭ সালে জ্যাকি স্পিয়ার ‘মি টু কংগ্রেস অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল প্রস্তাব করে ইউএস কংগ্রেসে। ২০১৮ সালে কংগ্রেস হাউস তাদের পুরনো আইনের সংশোধনীতে বিলটি পাস করে যুক্ত করে।এই আইনের উদ্দেশ্য হলো যৌনহয়রানির অভিযোগের ক্ষেত্রে ইউএস ফেডারেল গভর্নমেন্টের বিচারিক শাখার পদ্ধতিগুলোর পরিবর্তন আনয়ন।

পূর্বের আইন অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ গোপন রাখা হতো, গোপনে তদন্ত হতো ও প্রচুর সময়সাপেক্ষ ছিল। নতুন পাস হওয়া বিলে তদন্ত ও আমলের সময় কমিয়ে আনা হয়। অভিযোগ প্রকাশ্য রাখার বিধান রাখা হয়।

ভিকটিমের জন্য স্বস্তিদায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অন্য শাখায় স্থানান্তর করার বিধান রাখা হয়। তবে এই আইনে অভিযুক্তের চাকরিচ্যুতির কোনও বিধান রাখা হয়নি।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌনহয়রানির শিকারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সম্প্রতি ভারত সরকারও একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, উপদেষ্টা কমিটিতে জ্যেষ্ঠ বিচারক ও আইন কর্মকর্তারা থাকবেন।

বরাবরের মতো এদেশে কোনও নারী ইস্যু এলেই যেমন একাধিক পক্ষ দাঁড়িয়ে যায় নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ করার জন্য, বাংলাদেশের #মিটু আন্দোলনও এর থেকে বাদ যায়নি। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে অভিযোগকারী নারীর চরিত্র হননের চেষ্টা, অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা। এমনকি এই অভিযোগও এসেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে প্রণব সাহার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ আনা হয়েছে। জানা গেছে, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যানও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক’ কারণে প্রিয়তিকে ব্যবহার করছে অন্য গ্রুপ। সেই গতানুগতিক আত্মপক্ষ সমর্থন পদ্ধতি।

অর্থাৎ আমরা দেখছি বাংলাদেশে #মিটু’র অভিযোগগুলো একটি জায়গায় এসে থেমে গেছে। ভিকটিম বা অভিযোগকারীদের পালটা অভিযুক্ত করার চেষ্টা লক্ষণীয়। এটি চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিত্রই তুলে ধরে।

যদিও এমন নজির খোদ আমেরিকাতেই দেখা গেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক ময়রা ডোনেগান, ‘শিটি মিডিয়া মেন লিস্ট’ (নোংরা মিডিয়া ব্যক্তিত্বের তালিকা) নামে একটি তালিকা তার ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে প্রকাশ করেন, যা তিনি প্রকাশ্য করতে চাননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারাতে হয় এই সাংবাদিককে।  

সাধারণভাবেই অল্প কিছু জায়গা বাদ দিলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে নারীরা প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। যে অবস্থানে থেকে নারী তার সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকাকে নিরাপদ মনে করে। সে মনে করে, যৌনহয়রানির মতো ঘটনা প্রকাশ্যে আনা হলে আরও বেশি সামাজিক হেনস্থার শিকার হতে হবে তাকে। অর্থাৎ যৌনহয়রানির মতো গুরুতর ঘটনা যা একজন নারীর শরীর ও মনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এ সব অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। বাংলাদেশে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ এই আন্দোলনের।

সময় এসেছে পরিবর্তনের। সময় এসেছে আমাদের কন্যা সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার। যৌনহয়রানিকারীদের পরিচয় উন্মোচন করে সামাজিকভাবে তাদের চিহ্নিত করে অন্যদের সতর্ক করা এখন খুব দরকার। লোকলজ্জার ভয়ে মুখ বন্ধ রেখে অন্যায়কারীর সাহস বাড়িয়ে দেওয়ার কালচার বন্ধ হোক।

লেখক: সংবাদকর্মী

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ