ডেল্টা প্ল্যান বনাম পরিবর্তন

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:৩৫, নভেম্বর ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪০, নভেম্বর ২৫, ২০১৮

মোস্তফা হোসেইনএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে হরদম। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের এই নির্বাচনে দু’টি ইশতেহারের প্রতিই মানুষের আকর্ষণ থাকবে, এটা নিশ্চিত। আর ইশতেহারের বিষয়বস্তু কী হতে পারে, তা আগাম অনুমানেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। দলগুলোর দাবি-কর্মসূচি থেকে তা স্পষ্ট। এই সুবাদে দু’টি জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সীমিত থাকবে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ধারায় তাও মানুষ আঁচ করতে পারে। তাদের কিছু অভিন্ন দিক আছে। আবার কিছু বিষয় আছে একান্তই নিজস্ব চিন্তা-চেতনাভিত্তিক।
দু’টি দলই ক্ষমতায় থাকার স্বাদ পেয়েছে। ফলে তাদের নিজস্ব সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান আছে। ব্যর্থতাগুলোকে সরাসরি স্বীকার না করেও সেগুলো থেকে উত্তরণের কথাও উভয়ের কণ্ঠেই শোনা যায়। আবার ভোটার আকৃষ্ট করার জন্য প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থাকলেও কিছু আছে দীর্ঘস্থায়ীনির্ভর।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ নামে ইশতেহার প্রকাশ করে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ইশতেহার অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ছিল। খাতওয়ারি তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য অর্জনের দিকনিদের্শনাগুলো ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ার সুফলও আওয়ামী লীগ পেয়েছিল। মাঝখানে দু’টি সরকারের মেয়াদ গত হওয়ায় সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগের এবারের প্রতিশ্রুতি এবং নিকট অতীতের সাফল্যগুলোকে ভোটাররা কষ্টিপাথরে যাচাই করবেন এটা স্বাভাবিক। ২০১৪ সালে ‘শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’–শিরোনামের ইশতেহারটি পরিস্থিতিগত কারণে ‘দিনবদলের সনদের’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে এবার। ফলে আওয়ামী লীগকে দু’টি ইশতেহার মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হবে। ২০১৪ সালের ইশতেহারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২০৪১ সালকে লক্ষ্যকাল নির্ধারণ করে ভোটার আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। আর এবার যে ২১০০ সাল লক্ষ্যকাল নির্ধারিত হচ্ছে, দলীয় প্রধানের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৮ সালের ইশতেহারে সময়নির্ভর পরিকল্পনা উপস্থাপন করে মানুষের সমর্থন পাওয়ার পর তিনবারই তারা এই সময়নির্ভর পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে–এই সময়নির্ভর পরিকল্পনার পাশাপাশি তাদের অর্জনগুলোকে ভোটাররা কীভাবে দেখবেন। জবাবটাও সহজ। মোটামুটি দুই মেয়াদ সরকারে থাকাকালে তাদের অর্জন বা সাফল্যগুলোর নিরিখে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনা ভোটারদের বিবেচ্য হবে।


অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট তাদের ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্য উপস্থাপনকালে স্পষ্ট করে দিয়েছে, মূলত তাদের ইশতেহারে কী কী বিষয় প্রাধান্য পাবে। তাদের ১১ লক্ষ্যের বিস্তারিত রূপই যে হবে ইশতেহার, তা তাদের নেতাদের মুখ থেকেও শোনা গেছে। সংবাদপত্রের বিশ্লেষণমূলক সংবাদেও এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যতটা জানা যায়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কিছু ধারা সংযোজন করতে যাচ্ছে তারা। বিশেষ করে সংবিধান থেকে ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের অঙ্গীকার থাকছে ইশতেহারে—এমন আভাস পাওয়া যায় পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে। শোনা যাচ্ছে, যুক্ত হতে পারে প্রধানমন্ত্রী পদে একই ব্যক্তি পরপর দুইবার নির্বাচিত হতে পারবেন না, এমন বিধানও। আর জাসদ (রব)-এর দাবি অনুযায়ী দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রতিশ্রুতিও থাকছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কিছু দিকনির্দেশনা থাকছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। যা নিয়ে ভোটারদের বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগও তৈরি হবে।

ড. কামাল হোসেনের হাত দিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রস্তাবনা যখন আসবে, তখন ভাবতে হবে–এই বিধান বাতিলের প্রয়োজনীয়তা কী এবং তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা সুফল বয়ে আনতে পারে। নাকি জাপানের মতো সরকার পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। নাকি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্র হবে। ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিধিনিষেধ থাকায় বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশত বছর কী কী সমস্যার মুখে পড়েছে, কী কী সুবিধা পেয়েছে, সেগুলো অবশ্যই এই মুহূর্তে বিশ্লেষণ হতে পারে। এখন তা ফলদায়ক হোক আর না হোক, অন্তত বুদ্ধিদীপ্ত একটি উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে মনে করি। অন্তত নির্বাচনকালে ভোটারদের ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দেবে এটি। দুই রকম ভাবনা আসতে পারে এক্ষেত্রে—প্রথমত বলা হবে, গণতন্ত্রের সামনে ৭০ অনুচ্ছেদ শক্ত দেয়ালের ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয়ত, ফ্লোর ক্রসিংয়ের অবাধ সুযোগ দিলে সংসদের স্থায়িত্ব তথা সরকারের স্থায়িত্বও সংকটে পড়তে পারে। এমনকি নৈতিক দুর্বলতার সুযোগে অর্থের ব্যবহার হতে পারে। যা হবে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। অবশ্য বহুবছর ধরে ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে।

কিন্তু পরপর কেউ দুইবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, এমন আইন সংযুক্তির প্রস্তাবনাটি যে একেবারেই রাজনৈতিক আপসকামিতার একটি ধারা, তা বলতে দ্বিধা নেই। এটি কি ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বের সংকটের বহিঃপ্রকাশ? নাকি ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এর সঙ্গে কতটা সাজুয্যপূর্ণ? বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তির ইমেজনির্ভর। কেউ হয়তো মনে করতে পারেন এটি সংযোজিত হলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথ তৈরি হবে। বাস্তবতার সঙ্গে এর যোগসূত্র আছে কি?

রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ আসেনি? বঙ্গবন্ধুর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের চোখের সামনে। আব্দুল মালেক উকিল, মিজানুর রহমান চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, ড. কামাল হোসেন, জোহরা তাজউদ্দীন, সাজেদা চৌধুরীর মতো নেতা থাকার পরও কয়েক বছরের মধ্যে শেখ হাসিনাকে বিদেশ থেকে এসে দলের হাল ধরতে হয়েছিল। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মতো প্রবীণ মানুষও দলকে সংহত রাখতে পারেননি। তখন খালেদা জিয়াকে দলের ভার নিতে হয়েছিল। এই উদাহরণ দিয়ে কাউকে ছোট কিংবা কাউকে বড় করার উদ্দেশ্য নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, একটা দলে শীর্ষপর্যায়ের একটা স্তম্ভ থাকে, যিনি সর্বদিক থেকে তুলনামূলক দৃঢ় অবস্থানে থাকেন।

এই মুহূর্তে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে থাকার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কিন্তু তারেক রহমানও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় বিএনপিকে নেতা খুঁজতে ড. কামাল হোসেনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এতবড় একটা দল, যাদের দীর্ঘ সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, সেই দলটির নির্বাচনি বৈতরণী পার করে দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনও গ্রহণযোগ্য নেতা পাওয়া যায়নি। হয়তো কেউ দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করতে পারেন। আমাদের এখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিই এমন দ্বিতীয় কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার চিন্তাও কেউ করেন না। হয়তো দ্বিতীয় কাউকে প্রধান ব্যক্তি বিশ্বাস করেন না। না হয় বিকল্প নেতার যোগ্যতা অন্য কারও থাকে না। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে–বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে কখনও দলের নেতৃত্ব কারও হাতে অর্পণ করে যাননি। যেমনটা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বহুবার বিদেশ যাওয়ার আগে দলীয় সভাপতির দায়িত্ব প্রেসিডিয়ামের সিনিয়র সদস্যের হাতে দিয়ে যেতেন।

দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রস্তাব দিয়েছিলেন জাসদের তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান। সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক সাগরেদরা নেতৃত্ব কোন্দলে জর্জরিত এবং দ্বিধাবিভক্ত। সেই রাজনৈতিক সাগরেদদের অন্যতম আ স ম আব্দুর রব যুক্ত হয়েছেন ঐক্যফ্রন্টে। ধারণা করা যায়, ঐক্যফ্রন্টে এই প্রস্তাবনাটি তারই দেওয়া। এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে শুধু এটুকু বলা যায়–ভাগবাটোয়ারার সংখ্যা বাড়ানোই কি এর উদ্দেশ্য? ছোট একটা দেশ বাংলাদেশ। উত্তর থেকে হাঁক দিলে দক্ষিণের মানুষ যেখানে শুনতে পায়, সেই দেশটিকে প্রদেশে ভাগ করে উন্নয়নের কি সাফল্য আসবে? দুর্নীতিকে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়াস কি এটা? নাকি শত শত রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার ভাগ দেওয়ার চিন্তায় এই প্রস্তাবনা। কী অগ্রগতি হবে এই বিভাজনে? স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে এবং সংসদকে শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ রাখলে এমনিতেই উন্নয়নের গতি বাড়বে। অথচ কোনও দলই এমপিদের দায়িত্ব আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলে না। প্রদেশের কী সুফল, সে তো আমরা পাকিস্তানের ২৩ বছরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। তাই মনে হয় না, এসব অবাস্তব চিন্তা জনগণ গ্রহণ করবে।

তবে ঐক্যফ্রন্ট প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির যে প্রস্তাবনা এনেছে, তা বোধকরি বিবেচ্য হতে পারে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু একচ্ছত্র ক্ষমতাধর করে রাখাটা নিয়ে সব সরকার আমলেই আলোচিত হলেও তা পরিবর্তনের কোনও উদ্যোগ কেউ গ্রহণ করেনি। হয়তো এই প্রস্তাবনাটা ভোটারদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

ইশতেহার প্রণয়নকারীরা এই মুহূর্তে চূড়ান্ত মুসাবিদা করছেন নিজ নিজ দলীয় ভাবনা থেকে। তারা হয়তো বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েই ইশতেহার প্রণয়ন করবেন। তবে এমন কিছু না হওয়াই উত্তম হবে, যার সূত্র ধরে দেশে আবার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথা তোলার সুযোগ পায়। কিংবা আইন দ্বারা যেন অস্থিতিশীলতাকে উসকে দেওয়া না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ