প্রসঙ্গ চকবাজার: এ দায় কার?

Send
নাসরীন সুলতানা
প্রকাশিত : ১৮:০৯, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

নাসরীন সুলতানাসারাদিন চেষ্টা করেছি সব ভুলে থাকার। চেষ্টা করেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরতে থাকা সংবাদগুলোর লিংকে যেন ভুল করেও ক্লিক না করে ফেলি। কিন্তু ফেসবুক খুললেই শুধু ধ্বংসস্তুপের ছবি আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। বাঙালি জাতির জীবনে ২১ শে ফেব্রুয়ারি এক শোকের দিন। এদিন গৌরবেরও। আমাদের বাংলা ভাষা যাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল তাদের ত্যাগকে স্বীকৃতি দিয়ে এ দিনটিকে ঘোষণা করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। 
কিন্তু আমাদের সব গর্ব অহংকার ছাপিয়ে আজ দেশের আকাশে যেন এক শোকের মাতম– পলাশ, শিমুল কিংবা আমের মুকুলের রেণু ভেজা বসন্ত বাতাসে কেবল আজ লাশের গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় বন্দি পূর্ণিমার চাঁদ। সে আজ ঝলসানো রুটির মতো কিনা সেও বুঝার উপায় নেই। অন্ধকারে ঢেকে আছে পুরনো ঢাকা। চারদিকে কেবল শোক আর শোক। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকার গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। খবরে দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারারাত ঘুমাতে পারেননি। বিনিদ্র রাত্রি যাপন করেছেন অনেকেই। সংবাদ কর্মীদের দিনভর ব্যস্ততা, সবার আগে সবশেষ সংবাদ দিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি হয়তো কয়েকজন কিংবা কয়েকটি পরিবারের দায়িত্বও নেবেন। কিন্তু যে যমজ সহোদর আর কোনোদিন বাবা বলে ডাকতে পারবেন না, যে মা কোনোদিন আর তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন না, যে ভাই আর কোনোদিন তার ভাইয়ের কাঁধে ভরসায় মাথা রাখতে পারবেন না, যে পিতা কোনোদিন সন্তানের সফলতায় অহংকার করতে পারবেন না, নিত্যদিনের কর্ম ব্যস্ততায় যে স্বামী আর ঘরে ফিরার তাগিদ বোধ করবেন না, তার কিংবা তাদের সেই ক্ষতি কি কোনোদিন পূরণ করা সম্ভব? সম্ভব নয়। তবে এই ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই ব্যবস্থা করা সম্ভব। আমরা একটু সচেতন হলেই এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে পারি।

কয়েক বছর আগের নিমতলীর সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা এখনও আমাদের মনে আছে। কিন্তু আমরা কি সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছি? নেইনি। আমরা এমনই এক জাতি। আমরা শিখতে চাই না। আমরা খুব দ্রুত ভুলে যাই। আমাদের যেকোনও ঘটনায় উৎসাহ যেমন বেশি তেমনই দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি। আমরা এই ঘটনাও ভুলে যাবো, যেমন আমরা প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পর কিছুদিন খুব সোচ্চার হই এবং তা ভুলেও যাই; যেমন নিরাপদ সড়কের দাবির কথা আমরা এখন ভুলে গিয়েছি।

চকবাজারের রাস্তাগুলো অতি সংকীর্ণ। পাশাপাশি দুটো রিকশা চলতে গেলেই অনেক সময় ট্রাফিক জ্যাম বেঁধে যায়। বিল্ডিংয়ের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বিল্ডিং। বেশিরভাগ ভবনই পুরনো। সেগুলো আদৌ নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হয়েছে কিনা সেই বিষয়েও আছে সন্দেহ। তার পরে প্রায় প্রতিটি ভবনেই আছে অবৈধ ব্যবসা এবং এর সরঞ্জাম। আছে কেমিক্যালের মজুদ। মাঝে মাঝেই টিভির ক্রাইম রিপোর্টে দেখা যায় চকবাজারের আবাসিক ভবনে তৈরি হচ্ছে প্রসাধনী এবং ভোজ্য পণ্য- যেগুলো বিদেশি কোম্পানির মোড়কে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের তালিকা থেকে বাদ যায়নি নিষ্পাপ শিশুদের পছন্দের চকলেটও। অর্থ মানুষকে এমনই বিবেকহীন করে দেয়, যে মানুষ তার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করে না। যে দাহ্য রাসায়নিক নিয়ে তারা কাজ করে তার ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেকেই নিশ্চয়ই অবগত। এভাবে কেমিক্যাল মজুদ রাখা নিজের জীবনের জন্য যেমন ঝুঁকির, তেমনি অন্যের প্রাণনাশের কারণও। এই উভয় ক্ষেত্রেই এইভাবে কারখানা পরিচালনা করা অনৈতিক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। অথচ পুরনো ঢাকায় বংশ পরম্পরায় এভাবেই ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রাথমিক তদন্তে দাবি করা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় এবং পরে তা চারদিকে ছড়িয়ে পরে। আমি মনে করি এই অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর মূল কারণ অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা এবং আমাদের অসচেতনতা । একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে দুটো ভবনের মধ্যবর্তী প্রয়োজনীয় শূন্যস্থান না থাকায় আগুনের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া বাইরে বের হতে বাধা পায়। সমস্ত স্থান অন্ধকারে ঢেকে যায়, বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে না পেয়ে দগ্ধ হয়ে মারা যান অনেকে। অনেকের মৃত্যু হয় শ্বাসরোধ হয়ে।

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই একটি বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সকল সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে প্রতিটা বাড়িতে থাকে ফায়ার অ্যালার্মের ব্যবস্থা, আছে বিশেষ পদ্ধতিতে অটো ওয়াটার সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় করণীয় কী সেই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, আছে বিশেষ মহড়ার ব্যবস্থা। অথচ আমরা এখনও জীবনের নিরাপত্তাকে প্রথম গুরুত্ব দিতে পারিনি। এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের জন্য জরুরি কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থাও পর্যন্ত নেই। মাথার ওপরে বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং বিদ্যুতিক তার যেন অতি সাধারণ ঘটনা।

তবে এ কথাও সত্যি যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলেই আমরা প্রথমেই সরকারকে দায়ী করি। দায়ী করি অব্যবস্থাপনাকে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমরা নিজেরা কতটা নিয়েছি। দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করে যে শ্রমিক তার জীবনের নিরাপত্তা কতটুকু সে কি একবারও চিন্তা করে? তার জীবনের সঙ্গে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ কিভাবে জড়িত একবারও কি সেই ভাবনা মাথায় আসে? অশিক্ষা আর দারিদ্র্য মানুষকে মূল্যহীন করে ফেলে। হ্যাঁ, আমাদের দেশে মানুষের মূল্য সবচেয়ে কম। সেই জন্যই অর্থের জন্য সময় বাঁচাতে সিএনজি কিংবা রিকশা চালক বেপরোয়া গতিতে চলতে দ্বিধা করে না। রাস্তা পারপারে আমরা ওভার ব্রিজ কিংবা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে যত্রতত্র চলাচল করতে আমাদের বিবেক বাধা দেয় না। নিজের জীবন নিজের কাছেই মূল্যহীন।

কিন্তু আর কত? এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণের উপায়ই বা কী? অবশ্যই সরকারি কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে। মানুষের জীবনকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। এই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেই জন্য সিটি করপোরেশনকে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ‘আবাসিক এলাকায় আর একটিও কারখানা নয়’– এই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সময় অনেক আগেই হয়েছিলো। এখন এর বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনও আবাসিক ভবনে কারখানা প্রতিষ্ঠা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। সেই সঙ্গে পুরনো ঢাকার রাস্তাঘাট প্রশস্তকরণের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে করে জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিস কিংবা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে কোনও বিঘ্ন না ঘটে। বিদ্যুতের তার এবং পিলার নিরাপদ করণ করতে হবে। কারখানার শ্রমিকের উপযুক্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সবার ওপরে জীবন অতি মূল্যবান সেটি অনুধাবন করতে হবে। আর একটিও অপমৃত্যু নয় এই হোক আমাদের ব্রত।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ