রাঙ্গার ‘বান্দর’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৪০, নভেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪২, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমান‘বান্দরকে লাই দিলে গাছের মাথায় ওঠে’–জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা সম্পর্কে কথাটা বলেছেন তারই দলের আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। এরসঙ্গে তিনি সংসদে রাঙ্গার বিরুদ্ধে আরও অনেক ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ‘লাই’ দেওয়ার কথাটা তিনি ভুল বলেননি নিশ্চয়ই, তবে এই কথাটা শুধু রাঙ্গার ক্ষেত্রে নয়, রশীদের দল সম্পর্কেও একইভাবে প্রযোজ্য। আর সেটাই মূল সমস্যা। এই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।
রাঙ্গার বক্তব্যের যে দিকটি নিয়ে ভীষণ সমালোচনা হচ্ছে, সেটিতে যাওয়ার আগে অন্য একটা দিক নিয়ে একটু কথা বলে নেওয়া যাক। তিনি বলেছেন, ‘নূর হোসেন ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর ছিল’। খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে একজন মানুষ যদি ‘ইয়াবাখোর’, ‘ফেনসিডিলখোর’ হয়েও থাকে, তাকে আপনি গুলি করে মেরে ফেলতে পারেন? পরে তিনি তার বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন, বলেছেন তিনি ভুলে গিয়েছিলেন সেই সময় ইয়াবা, ফেনসিডিল পাওয়া যেতো না, নূর হোসেন আসলে অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। তাহলেও পাল্টা প্রশ্ন, একজন অপ্রকৃতিস্থ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা যায়? অর্থাৎ একজন নেশাখোর কিংবা অপ্রকৃতিস্থ মানুষকে যদি খুন করে ফেলা হয়, তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না বলেই রাঙ্গার অনুমান।

নূর হোসেন সম্পর্কে রাঙ্গা যা বলেছেন, তাতে একটুও অবাক হইনি। কারণ মানুষের জীবনকে তাচ্ছিল্য করা এই ভদ্রলোকের অনেকটা মজ্জাগত। এই দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায় প্রতি বছর, বিকলাঙ্গ হয় তার কয়েক গুণ মানুষ, কিন্তু একটি সড়ক আইন কার্যকর করার বিপক্ষে তীব্র শক্তিতে দাঁড়িয়েছিলেন যে দুই ব্যক্তি, তার একজন শাজাহান খান, অন্যজন এই রাঙ্গা। মানুষের জীবনের ন্যূনতম মূল্য যে এসব মানুষের কাছে নেই, সেটা অনেক আগে থেকেই জানা।

আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে আমরা এত অবাক হলাম কেন? রাঙ্গাদের মুখ থেকে কি এমন কথাই শোনার কথা না? আমি তো বিন্দুমাত্র অবাক হইনি তার এই বক্তব্য শুনে। যেই জাতীয় পার্টি আজ আস্তাকুঁড়ে থাকার কথা ছিল, সেই জাতীয় পার্টি আজ ভীষণ গলা চড়িয়ে কথা বলবে, এটাই তো খুব স্বাভাবিক।

ফিরোজ রশীদ বলেছেন, ‘বান্দরকে লাই দিলে সে গাছের মাথায় উঠে যায়’। বিস্তারিত বক্তব্যে দেখা যায় রাঙ্গাকে মন্ত্রী বানানো নিয়ে তিনি সরকারের সমালোচনা করেছেন। আর এই ‘লাই’-এর কারণেই রাঙ্গা আজ এমন সব কাণ্ড করছেন বলেই  ফিরোজ রশীদের অভিযোগ। তিনি আক্রমণাত্মক ভাষায় আরও অনেক কথা বলেছেন সেই প্রসঙ্গে, সেগুলোতে আর যাচ্ছি না।

তার মতো আমিও বিশ্বাস করি আর  একটা ‘বান্দরকে লাই’ দেওয়া হয়েছে, বছরের পর বছর ধরেই দেওয়া হয়েছে। সেই ‘বান্দর’টার নাম হচ্ছে জাতীয় পার্টি। পৃথিবীর ইতিহাসে এরশাদ বিরলতম স্বৈরশাসকদের একজন, যার পতনের পরও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এবং তার পার্টি দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক থেকেছেন এবং কখনও কখনও অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।

১৯৯৬ সালের জাতীয় পার্টির সমর্থনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। জানা যায়, ওই সময় আওয়ামী লীগের কাছাকাছি সংখ্যায় আসন পাওয়া বিএনপি নানা প্রলোভন নিয়ে জাতীয় পার্টির পেছনের প্রচণ্ড ঘোরাঘুরি করেছিল তাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য। এরপর মহাজোট গঠনের আগে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে দুই দলের টানা-হেঁচড়া আমরা খুব স্পষ্টভাবেই দেখেছি। দুই দলই ভয়ঙ্কর মরিয়া হয়ে পড়েছিল এরশাদকে নিজ জোটে পাওয়ার জন্য।

দুটো ‘বড়’ দলই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার হিসাব-নিকাশে মরিয়া হয়ে এরশাদকে এবং তার দলকে নিজের সঙ্গে রাখার সব রকম চেষ্টা করেছে। কেউ সফল হয়নি, আবার কেউ দারুণভাবে সফল হয়েছে। ২০১৪ সালে যখন সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন জাতীয় পার্টিও সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে এককাট্টা হয়ে নির্বাচনে যেতে চায়নি। কিন্তু এরশাদকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে একরকম বন্দি করে রেখে, জাতীয় পার্টিকে জোর করে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর যা হয়েছে, সেটা তো ইতিহাস, জাতীয় পার্টি হলো, সংসদের ‘সরকারি’ বিরোধী দল, সোনার পাথর-বাটি। সেই সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। তাকে মন্ত্রী করা নিয়ে ফিরোজ রশীদের ভীষণ উষ্মা দেখা গেলো। এটা অবশ্যই এই কারণে না যে, বিরোধী দলের কেউ কেন মন্ত্রী হবেন, এটা বরং এই কারণে যে, রাঙ্গার মন্ত্রী হওয়া রশীদের মতো অনেকের মন্ত্রী হওয়ার পথ রুদ্ধ করেছিল।

১২ নভেম্বর এক টকশোতে আমিসহ আলোচক ছিলেন ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত।  তিনি আলোচনার এক জায়গায় বললেন, ‘[…] আওয়ামী লীগের এক নেতা আজকে বলছেন, ওকে একটু সেইভ করা যায় কীভাবে, একটু সময় পেলে চিন্তা করেন। এ রকম লোকও আছে আওয়ামী লীগে। দুর্ভাগের বিষয়। [...]।’এমনকি একটা চ্যানেল রাঙ্গাকে নিয়ে রিপোর্ট করার বিষয়ে উল্লেখ করেন, ‘[…] একটি চ্যানেলের চিফ বললো আমাকে যে তারা মশিউর রহমান রাঙ্গার বক্তব্যটা নিয়ে একটা স্টোরি করতে চায়। কোনও মন্ত্রী নাকি বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।[...]’ এটি হচ্ছে ‘লাই’ দেওয়ার আরও নমুনা।

 শুরুতেই বলেছিলাম, রাঙ্গা যা বলেছেন, তার জন্য আমাদের আসলে প্রস্তুত থাকার কথাই ছিল, কিন্তু আমরা সেটা না থেকে এখন অবাক হচ্ছি কিংবা করছি অবাক হওয়ার ভান। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যখন তথাকথিত গণতন্ত্র কায়েম করে জাতীয় পার্টি নামের এক ‘বান্দর’কে নিয়ে, তখন সেটাই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ ‘লাই’। তার অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে সেই ‘বান্দরের’ রাঙ্গার মতো কিছু ব্যক্তি আস্ফালন করবেই। সেই আস্ফালনের আরও কদর্য রূপ দেখবো আমরা অচিরেই। জাতীয় পার্টি যদি টিকে থাকে, তাহলে আমরা যেন রাঙ্গা বা তার দলের আরও অনেকের মুখে আরও অনেক কথাই শোনার প্রস্তুতি নিয়ে রাখি।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ