ক্যাফে হামলার উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়নের পথ থামিয়ে দেওয়া

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:৫৫, নভেম্বর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৭, নভেম্বর ২৭, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাপ্রত্যাশিত রায় এসেছে। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার আরেক আসামি নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। মিজান কেন খালাস পেয়েছে, আপিলে কী রায় উচ্চ আদালত থেকে আসে, সেই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে আমাদের।
মামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িতরা কেউ জীবিত নেই। ঘটনাস্থলেই তারা মারা গেছে। তবে ঘটনার পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় যারা ভূমিকা রেখেছে, তাদেরও অনেকে পুলিশের সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে মারা গেছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় জঙ্গিরা। হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জনসহ দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নয়জন ইতালির, সাতজন জাপানি ও একজন ভারতের নাগরিক। বাকি তিনজন বাংলাদেশি। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন—ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন। ওই রাতেই ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে ৫২ কার্যদিবসে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক, পক্ষ-বিপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ রায় হলো।

এটি ছিল এমন এক ঘটনা যে ঘটনা বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। যে বাংলাদেশ আমরা আবহমানকাল থেকে দেখে আসছি, যে বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই বাংলাদেশে অনেক রক্ত ঝরেছে ঠিক, কিন্তু এই গুলশান হামলা ছিল সব ঘটনা থেকে আলাদা। 

এই উদার বাংলাদেশকে বারবার সাম্প্রদায়িক করার চেষ্টা করেছে রাজনীতি, যার চূড়ান্ত আঘাত ছিল হলি আর্টিজানে হামলা। উদ্দেশ্য ছিল, এদেশকে জঙ্গিবাদে ছেয়ে ফেলা। হামলাকারীরা মারা গেছে, তারা সফল হতে পারেনি। সমাজ আরও বিভাজিত, কলুষিত ও ধর্মীয় রাজনীতির বিষে আক্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল জঙ্গিরা। গুলশান হামলার পর জঙ্গি ও সন্ত্রাসী খতমে বড় সাফল্য দেখিয়েছে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোথায় জাতীয় ঐক্য দেখবো আমরা, তা নয়, বরং এই সাফল্যকে কালিমালিপ্ত চেষ্টা করেছে আমাদের এখানে সদা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী সরকারবিরোধী রাজনীতি। বিরোধিতার প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতে না শেখায় আমাদের রাজনীতিকরা দেশের ভেতরেই নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিনাশকারী শক্তিগুলোর মাঝে নিজেদের ঠিকানা খুঁজছে। কোনও সন্দেহ নেই সেই সন্ত্রাসীরা কারও না কারও মদতে এই কাজ করেছে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক যে সহিংস রাজনীতি এই বাংলাদেশ অতীতে দেখেছে, তার সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য অনেক। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্রের রাজনীতি সেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি মানুষের কাছে। তাই নতুন কৌশলে এগোতে চেয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। যারা স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে রাজনীতি করে, এখন তাদের আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। নিজেদের মূল্যায়ন করা দরকার, নতুন এই শক্তির প্রতি রণনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানে প্রচলিত ধারার রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন কী করে সূচিত হবে তা নিয়ে।

বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুত্ববাদী। কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি তা নয়। সংকীর্ণ ধর্মীয় আধিপত্য আসলে সমাজকে অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণের জাল বিস্তারের ষড়যন্ত্র। ধর্ম দিয়ে ভাবনা জগতে সংকীর্ণতা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া। সেটাই সাম্প্রদায়িকতা। আমাদের চিরাচরিত যে রাজনীতি, তার পালাবদল ঘটে স্বাভাবিকভাবে। একদল জেতে, আরেক দল হারে। শাসক দলের বিরুদ্ধে বিরোধীরা আন্দোলনে মুখর হতো, সে আন্দোলনে সংঘর্ষ হতো। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর, এই বিচারকাজ ঠেকাতে যে সহিংসতা দেখেছে মানুষ, দিনের পর দিন পেট্রল বোমা দিয়ে মানুষ ও তার সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া, তার নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এই জঙ্গি আন্দোলনের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট এখনকার সংস্কৃতিবিরোধী রাজনীতি, যে রাজনীতি ভাড়া করা আধা-বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে সুচতুরভাবে সামাজিক হিংসার বিস্তার ঘটানো।

গুলশান হামলার অন্যতম লক্ষ্য রাজনৈতিক সহিংসতা আমদানির পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যকে বিদায় জানানো। তারা উল্লসিত হতে চেয়েছিল যেন প্রগতির পথ, উন্নয়নের পথ থেমে যায়। তাইতো হয়েছিলও কিছুটা। একের পর এক আঘাত এসেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আবার জোর কদমে চলেছে উন্নয়নের চাকা। এতো রক্ত, হিংসা আর আগুনের পরও আট শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি, মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন। 

এ কথা সত্য, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে সংঘাত ও হিংসা পুরোপুরি দূর করা যায় না। ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি, ব্যক্তি বনাম গোষ্ঠী, গোষ্ঠী বনাম গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বনাম সম্প্রদায়, এসব নানাভাবে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব দ্বন্দ্ব নিরসন করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে চলতে হয় বহুপাক্ষিক পথে। কোনও গোষ্ঠী, ধর্মীয় বা অন্য কোনও সংখ্যাতত্ত্বের জোরে যেন নিরঙ্কুশ সুবিধা ভোগ না করে সেদিকে লক্ষ রাখতে হয়। যারা বারবার ধর্মীয় সংখ্যার আধিক্য দিয়ে সব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর চাপাতে চায়, রাষ্ট্র থেকে আদায় করতে চায়, তাদের সেই মনোভাবের মধ্যেই আছে সহিংসতার সবথেকে বড় সম্ভাবনাময় উৎস।

গুলশান হামলার পর এটাই চ্যালেঞ্জ বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সামনে। ধর্মীয় সংকীর্ণতায় মুক্তি নেই বাংলাদেশের। বাংলাদেশের মুক্তি অসাম্প্রদায়িক পথে। সহিংসতার আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতিকে বিদায় জানাতেই হবে আমাদের। ‘যাকে তাকে যখন তখন মুরতাদ, নাস্তিক যারা বলে, তারা দেশবিরোধী’—এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে সবার আগে। বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এটাই হোক নতুন অঙ্গীকার। উদার ও সহনশীল মনোভাবসম্পন্ন মানুষের আবাসভূমি হিসেবে বাংলাদেশের যে সুনাম ও মর্যাদা ছিল, জঙ্গিদের অপতৎপরতার কারণে তার অনেকটাই ম্লান হয়েছে। দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও তাদের দোসর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে নির্মূলে মানুষের ঐক্য আজ সময়ের দাবি। ধ্বংস, খুন ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে যারা ধর্ম কায়েমের চেষ্টা করছে, সমাজকে কলুষিত করছে, সে পথ আদতে ইসলামের পথ নয়, সে কথাও জোরের সঙ্গে বলবার সময় এখন এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ