ক্রসফায়ার নয়, ধর্ষকের ফাঁসি চাই

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:২৩, জানুয়ারি ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩১, জানুয়ারি ১৩, ২০২০

প্রভাষ আমিনবলা হয়, অপরাধী কোনও না কোনোভাবে একটা ক্লু ফেলে যায়। কিন্তু কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনাটি ক্লুলেস ছিল। এই ঘটনার পর সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ধর্ষককে গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা ধর্ষককে গ্রেফতারের আলটিমেটাম দিয়েছিল। আমি খালি ভাবছিলাম, কীভাবে ধরা পড়বে ধর্ষক। প্রথম কথা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য কুর্মিটোলা অপরিচিত এলাকা। ঘটনাস্থলে কোনও সিসিটিভি ছিল না। তাই দ্রুততম সময়ে আসামি ধরা নিয়ে আমার কিছুটা সংশয় ছিল। আবার বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব না থাকলে পুলিশ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। জনকণ্ঠ ভবনের সামনে মধ্যরাতে এক মাতালের গুলিতে দুজন আহত হন এবং পরে মারা যান। দুই নিম্নবিত্তের মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যম বা সামাজিকমাধ্যম, কারও কোনও মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু পুলিশ থেমে থাকেনি। তারা খুঁড়তেই থাকে। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে অজগর সাপ।
সরকারি দল আওয়ামী লীগের তখনকার সাংসদ পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির গুলিতেই মারা গিয়েছিলেন দু’জন নিম্নবিত্তের মানুষ। কোনও চাপ ছাড়াই যদি তারা ক্লুলেস মামলার আসামি ধরতে পারে, তবে প্রবল জনমতের কারণে ধর্ষককে ধরা যাবে না কেন? আসলে সংশয়ের চেয়ে আমার আস্থাটাই বেশি ছিল। আমার আস্থার প্রতিদান দিয়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। তবে মামলাটিকে যতটা জটিল মনে হচ্ছিল, আসলে ততটা জটিল ছিল না। র‌্যাবের কাজটা সহজ করে দিয়েছিল ধর্ষক নিজেই।

ভিকটিমের ফোনটি নিয়ে গিয়েছিল সে। ৫০০ টাকায় সেটি বিক্রি করে দিয়েছিল একজনের কাছে। সে আবার বিক্রি করে আরেক মহিলার কাছে। মোবাইল ট্র্যাক করে র‌্যাব প্রথমে সেই মহিলাকে আটক করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয় মোবাইলের প্রথম ক্রেতাকে। আর তার দেওয়া তথ্যে গ্রেফতার করা হয় ধর্ষক মজনুকে। র‌্যাব দাবি করেছে, মজনু একজন সিরিয়াল রেপিস্ট। এর আগেও সে ধর্ষণ করেছে। তার আগের ভিকটিমরা ছিল ভিক্ষুক বা প্রতিবন্ধী নারীরা। মজনু মাদকাসক্ত, ছিনতাইকারী। কিন্তু আগে কখনও সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি।

এবারের ভিকটিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হয়ে ভিক্ষুক বা প্রতিবন্ধী হলে এবারও হয়তো সে বেঁচে যেতো। তার মানে ভিক্ষুক বা প্রতিবন্ধী নারীরা ধর্ষিত হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। বিচার নিয়েও আমাদের কোনও মাথাব্যথা থাকে না। আর পুলিশ রিপোর্টের চেয়েও যে ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেশি, সিরিয়াল ধর্ষক মজনু আবারও সেটা প্রমাণ করলো। আর ধর্ষক ভিকটিমের মোবাইলটি না নিলে হয়তো এবারও তাকে ধরা কঠিন হতো।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্লুলেস ঘটনার আসামিকে গ্রেফতার করায় সবাই মিলে র‌্যাবকে অভিনন্দন জানানোর কথা। কিন্তু বেশিরভাগই সন্দেহ করছেন। অনেকেই বলছেন, মজনু আসল ধর্ষক নয়। সরকার নিজেদের মান বাঁচাতে আরেক জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছে। মজনুকে গ্রেফতার করার পর তার ছবি দেখানো হয় ভিকটিমকে। তিনি নিশ্চিত করেন, মজনুই ধর্ষক। ভিকটিম আগেই বলেছিলেন, এই চেহারা তিনি জীবনে কখনও ভুলতে পারবেন না। আর ধর্ষককে শনাক্ত করার আরেকটা সহজ উপায় ছিল তার সামনের দুটি দাঁত নেই। ধর্ষক নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি ভিকটিমও জেনেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে বলেছেন, ধর্ষককে নিয়ে তার মনে কোনও সংশয় নেই। এতকিছুর পরও আমাদের সন্দেহ যায় না। এরপর আর কী করলে আমাদের সংশয় যাবে?

আমি খুব বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছিলাম, কেন এমন গণঅবিশ্বাস? আসলে র‌্যাব, পুলিশ, সরকার মিলে বিভিন্ন সময়ে এমন সব কাণ্ডকারখানা করেছে; তাদের ওপর মানুষের বিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সেই রাখাল বালকের মতো হয়ে গেছে পরিস্থিতি। র‌্যাব বা পুলিশ দিনের পর দিন ক্রসফায়ারের নামে মানুষ ‘খুন’ করে মিথ্যা গল্প ফাঁদছে। তাই এখন তারা সত্য বললেও মানুষ বিশ্বাস করছে না।

মজনুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই ঘটনা হয়তো সত্যি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার বিষয়টি সরকারের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। যাতে আস্থা ফিরে আসে, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এটা শুধু মুখে বললে হবে না।

এটা ঠিক, বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। প্রতিদিনই কোনও না কোনও অপরাধ হয়। হত্যা, ধর্ষণ আমাদের নিত্যদিনের ঘটনা। তবে সব অপরাধ আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় না। কখনও কখনও একটা-দুইটা ঘটনা আমাদের কাঁদায়, ক্ষুব্ধ করে; দেশজুড়ে তোলপাড় তোলে। এটা ঠিক এখন ফেসবুক বা গণমাধ্যমে বা রাজপথে তোলপাড় না উঠলে কোনও ঘটনার দ্রুত বিচার হয় না, ন্যায়বিচার হয় না। যেমন প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর দিয়া ও রাজীবের মৃত্যুর পর সারাদেশ অচল হয়ে গিয়েছিল। আসলে এই প্রতিবাদের মধ্যেও যেন একটি শ্রেণি চেতনা আছে। যতক্ষণ বিষয়টি আমার ঘাড়ে না আসে, ততক্ষণ আমরা প্রতিবাদ করি না। অপরাধের নৈকট্যের ওপর নির্ভর করে আমাদের প্রতিবাদের মাত্রা। যখন ভিকটিম আমাদের শ্রেণির হবে, আমাদের কাছাকাছি হবে; তখন আমরা প্রতিবাদ করি, ক্ষুব্ধ হই, রুখে দাঁড়াই। আমি এটাকে খারাপ বলছি না। কারণ সব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে হলে আমাদের সারাদিন রাজপথেই কাটাতে হবে। তবে নৈতিকভাবে আমাদের সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। সরকারের কাজ হলো অন্যায় কমিয়ে রাখা, অন্যায় যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করা। আর হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। যদি সেটা ঠিকমতো না হয়, তখন আমরা রাস্তায় নামবো, প্রতিবাদ করবো, দাবি জানাবো। একেকটি আন্দোলন থেকে আমাদের অর্জন করতে হবে, একটু একটু করে আগাতে হবে। নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের পর নতুন আইন হয়েছে। আমরা চাই এই আন্দোলনের পরও যেন ধর্ষণের বিচার সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন হয়, ধর্ষকের সাজা যেন মৃত্যুদণ্ড হয়। এই আন্দোলনে থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি, সারাদেশের সকল নির্যাতিত নারী যেন ন্যায়বিচার পান। কুর্মিটোলার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার আগে মজনু যেসব ভিক্ষুক বা প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণ করেছে; তারাও যেন বিচার পান। কুর্মিটোলার ঘটনার পর আরও দেশের বিভিন্নস্থানে আরও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আমরা সকল ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে মনে মনে যারা ধর্ষক, যারা সুযোগ খুঁজছেন; তারা ভয় পায় এবং এ ধরনের কাজ করতে না পারে।

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ধর্ষিত হওয়ার ঘটনায় আরেকটি ব্যাপারও ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অদ্ভুত এক জনমত গড়ে উঠেছে। সবাই ধর্ষকের বিচার চায়। বিচার আমিও চাই, ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। কিন্তু ধর্ষকের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ফেসবুক আদালতের রায় আছে। কেউ চান ধর্ষককে নিয়ে যেন পুলিশ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যায়, কেউ সরাসরি ক্রসফায়ারের দাবি তুলেছেন, কেউ ধর্ষকের বিশেষ অঙ্গ কেটে দিতে চান, কেউ পাথর মারতে চান, কেউ প্রকাশ্যে জনসমক্ষে ক্রসফায়ার চান। কেউ ফাঁসি চান, তবে সেটা হতে হবে উন্মুক্ত স্থানে এবং টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হতে হবে। অধিকাংশ চাওয়াই বিচারবহির্ভূত। সাধারণভাবে সরকার বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড করলেও নাগরিকরা তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু এটা বিস্ময়কর, একটা দেশে এত মানুষ বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সমর্থন শুধু নয়, দাবি জানাচ্ছে। বুঝতে পারছি, ক্রমশ বাড়তে থাকা ধর্ষণ এবং বিচারহীনতা বা বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে জমা হওয়া ক্ষোভ থেকেই মানুষ এমন বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সমাধান খুঁজছে। তারচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে এখনও ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। তার মানে ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার পরও তার ফাঁসি হবে না। আর প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমরা তার মৃত্যু কামনা করছি। একটা সভ্য, সুস্থ সমাজ চাইলে; একটা আইনের শাসনের দেশ চাইলে আমাদের দাবি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার, বিনা বিচারে হত্যা নয়।

এমনকি এ ঘটনায় ভিকটিম নিজেও ন্যায়বিচার চেয়েছেন, ক্রসফায়ার চাননি। আমি বুঝতে পারছি না, ভিকটিম শনাক্ত করার পরও আমরা ধর্ষককে নিয়ে সন্দেহ করছি, ভিকটিম বিচার চান আর আমরা চাই ক্রসফায়ার। আমাদের ভাবনায় এমন তালগোল পাকিয়ে গেলো কীভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ দেশজুড়ে যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, এই আন্দোলন থেকে আমরা বরং ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং ধর্ষণের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের দাবি করতে পারি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, দেশের সব নির্যাতিত নারী যাতে ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।

নয়াদিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যা তোলপাড় তুলেছিল গোটা ভারতে। বিচারের বিভিন্ন ধাপ শেষে আগামী ২২ জানুয়ারি তিহার জেলে চার ধর্ষকের ফাঁসি কার্যকর হবে। অভিযুক্ত বাকি দু’জনের একজন আত্মহত্যা করেছে, আরেকজন বয়সে ছোট ছিল। সাত বছরেরও বেশি সময় লাগছে, তবুও কিন্তু নির্ভয়ার পরিবার ন্যায়বিচার পাচ্ছে। তারা কিন্তু এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে ন্যায়বিচারের জন্য। আমাদের সবার দাবি হওয়া উচিত, ন্যায়বিচার পাওয়ার সময়টা যাতে কমে আসে। ধর্ষণ একটি অপরাধ, ক্রসফায়ার আরেকটি অপরাধ। একটি অপরাধ দিয়ে কখনও আরেকটি অপরাধের শাস্তি হতে পারে না।

আর মজনু এখনও অভিযুক্ত ধর্ষক, প্রমাণিত নয়। এখন তাকে ক্রসফায়ারে দিলে অভিযুক্ত হিসেবে তার মৃত্যু হবে। আর বিচারে ফাঁসি হলে, তার মৃত্যু হবে ধর্ষক হিসেবে। তবে এই ঘটনায় আমাদের ভাবনার চেয়ে সরকারের ভাবার অবকাশ অনেক বেশি। ধর্ষক গ্রেফতারের পর অবিশ্বাস এবং ক্রসফায়ারের দাবি—দুটিই সরকারের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের প্রবল আস্থাহীনতার প্রমাণ। অব্যাহত উন্নয়নের পাশাপাশি জনমনে আস্থা সৃষ্টি করাটাও জরুরি। সবকিছু তো জনগণের জন্যই করা। তারা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে, নারীরা যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে; সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার এই বোধটা তৈরি করতে হবে। কোনও অন্যায় হলে তার বিচার হবে, এই আস্থার বোধটা তৈরি করতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ