ভারত কি বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ করবে না?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:১৭, জানুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকারপ্রকাশ্যে স্বীকার করা না হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সম্ভবত কিছুটা টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। পরপর ভারত সফরের তিনটি কর্মসূচি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাতিল করা হয়েছে। প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর বাতিল করেন বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেঘালয় সফর স্থগিত করেন। সর্বশেষ দিল্লি যাওয়া থেকে বিরত থাকেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। দুই দেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়, তাতে এই সফর বাতিলের বিষয়গুলো স্বাভাবিক বলে মানতে নারাজ বিষয়-অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। প্রকাশ্য কারণ যা বলা হয়েছে সেটাই সব নয়, নেপথ্যে ‘আরও’ কিছু আছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকদের ধারণা। 
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশকিছু সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে ছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একে একে তার প্রায় সবকটিরই সমাধান হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যাকণ্ডসহ কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত আছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর  আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে সংকট তৈরি হবে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করেছিলেন। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিএনপি মহলে কিছুটা উল্লাসও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে কোনও ছেদ না পড়ে তা অব্যাহতভাবে এগিয়েছে। বরং এটাই মনে করা হয়, নতুন  হলেও মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোঝাপড়া এককথায় চমৎকার। 


২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের বর্জন ও বিরোধিতার মুখে যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা দেশে-বিদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। সেসময় ভারতে কংগ্রেস দলের সরকার ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং। মনমোহন সিংয়ের সরকারের বলিষ্ঠ সমর্থন শেখ হাসিনার সরকারের জন্য একটি বড় সহায়ক শক্তি হয়েছিল। পাঁচ বছর পরের একাদশ সংসদ নির্বাচনও বিতর্কমুক্ত হয়নি। এবার দিল্লিতে ক্ষমতায় বিজেপি, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা এবারও দিল্লিকে পাশেই পেয়েছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি প্রবল ছিল। ভারতপন্থি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ছিল কোণঠাসা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার পরও একশ্রেণির মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা ছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো ভারতকে আস্থায় নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কোনও সমস্যারই সমাধান হয়নি। সরকারগুলোর নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ভারতকে কার্যত বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়েছে। তবে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা বেড়েছে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলেই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ফারাক্কা চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার পরবর্তী সময়কালে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমাগত নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যেই গভীর স্বস্তি লক্ষ করা গেছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ভারতকে ‘হিন্দু’ রাষ্ট্রে পরিণত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধিত আইনের পর বাংলাদেশের অস্বস্তি বাড়ে। ভারতের বিজেপি সরকার মনে করে সেখানে বিপুল সংখ্যক ‘অনুপ্রবেশকারী’ আছে এবং এরমধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও আছে। এই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নাকি কোটির ঘর ছাড়িয়ে যাবে। এটা অবিশ্বাস্য অভিযোগ। বিপুল সংখ্যক অসহায় মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হলে তা বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, এনআরসি কিংবা নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কিছু নেই, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু কয়েক দফায় কয়েকশ’ মানুষকে বাংলাদেশে পুশব্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কী বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেটা অনেকেই বুঝেছেন। বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টিকে হয়তো হালকাভাবে নেয়নি। কয়েকটি সফর স্থগিত করে বাংলাদেশ দিল্লিকে তার অসন্তোষের কথাই হয়তো জানিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশের আবেগ-অনুভূতির বিষয়টিও ভারতকে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশে কেউ কেউ এটা মনে করেন, বন্ধুত্বের নামে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত নেয় বেশি, দেয় কম। এই পারসেপশন যে একেবারে অমূলক, তা বলা যাবে কি?
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার তার ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে যে ধর্মকার্ড নিয়ে কৌশলের খেলা খেলছে তা শুধু ভারতের অভ্যন্তরেই অস্থিরতা তৈরি করছে তা নয়, বাংলাদেশেও তার অভিঘাত লাগবে। ভারতের পক্ষে হয়তো বলা হবে, প্রতিবেশী দেশগুলো যদি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে পারে তাহলে ভারত কেন পারবে না? এই কূটতর্ক অনেকে করতে পারেন, কিন্তু সেটা ভালো কিছু অর্জনে সহায়ক হবে না। অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদী রাজনীতিই বিশাল ভারতের অখণ্ডতার রক্ষাকবচ। সেখান থেকে বিচ্যুতি নানা রকম চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
ভারতের মতিগতি নিয়ে যে বাংলাদেশ খুব খুশি নয়, ভারত যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, সেটা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম আবদুল মোমেন সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারত রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে কিছু বাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, তারা মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করলে মিয়ানমার তাদের কথা শুনবে। এ ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে গ্যাপ রয়েছে। ভারত আমাদের এক নম্বর প্রতিবেশী। এখন তো ভালো সম্পর্ক। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের পক্ষে থাকবে। মিয়ানমারে তাদের প্রভাব আছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখেনি।’
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালনের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগামী মার্চ মাসে ঢাকায় আসার কথা। বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণে যদি তেমন কোনও কিছু এই সময়ের মধ্যে না করা হয়, তাহলে সম্পর্কের উচ্চতা কি খর্ব হবে না? ভারতের প্রত্যাশা বাংলাদেশ ষোলো আনাই পূরণ করেছে। এখন ভারতের পালা। সমতাপূর্ণ এবং সম্মানজনক না হলে বন্ধুত্ব টেকসই হয় না।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ