সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে ‘এনকাউন্টার মাস্ট’!

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২৪, জানুয়ারি ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৪, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকারঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ধর্ষককে ধরে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন। বোঝা যায়, সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় এবং এর কোনও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ক্রসফায়ারের দাবি এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তবে বিস্ময়কর হলো, জাতীয় সংসদের আলোচনায় সরকারি এবং বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যও সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলার প্রস্তাব করেছেন। সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন, পুরনো আইন যুগোপযোগী করার জন্য সংস্কার-সংশোধন করার দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের। আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যখন আইনপ্রণেতারা সওয়াল করেন, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

দেশে ধর্ষণের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। ধর্ষকরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে ধরা পড়ছেও না। যারা ধরা পড়ছে, তাদের সবাই উপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছে না। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে যাচ্ছে অথবা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অভিযুক্তদের এক প্রকার সহায়তা দিচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক আছে। তবে কিছু আইন আছে ত্রুটিপূর্ণ, আবার কিছু আইন যুগোপযোগী নয়। আবার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আছে চরম শৈথিল্য। তাছাড়া আছে দৃষ্টিকটুভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যা ধর্ষকদের উৎসাহিত করছে বলে ধারণা করা যায়। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রশ্রয়ও পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে ভূমিকা রাখছে।

ধর্ষণের সব ঘটনাই আবার সমাজে একরকম আলোড়ন সৃষ্টি করে না। কোনও ঘটনা কেন গণমাধ্যমের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অথবা নানুষের মনোযোগ কাড়ে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ধর্ষণের একাধিক ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। সব না হলেও তার কিছু কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। ১৭ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে সাতটি ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এতগুলো ধর্ষণের খবর স্থান পেয়েছে ভেতরের পাতায়। স্বভাবতই এ নিয়ে কোনও হইচই নেই। সেজন্য ধর্ষণের সব ঘটনার জন্য সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিবাদ হতে দেখা যায় না। ধর্ষণের শিকার নারী এবং ধর্ষকের সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়েই প্রতিক্রিয়া হতে দেখা যায়। ধর্ষণের শিকার নারী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষিত পরিবারের হন, তাহলে তার জন্য মধ্যবিত্ত বিবেক যেভাবে জেগে ওঠে, সাধারণ ঘরের নারীর ক্ষেত্রে তা হতে দেখা যায় না। একইভাবে ধর্ষক যদি আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ বা লীগ নামের অন্য কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধতা করতে অনেকের মধ্যে যে প্রবল উৎসাহ দেখা যায়, ধর্ষক একেবারে ভবঘুরে বা হাভাতে হলে বিষয়টি হয় আগুনে পানি ঢেলে দেওয়ার মতো। যেমন কুর্মিটোলা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মজনু নামের একজন ‘সর্বহারা’ গোছের মানুষ গ্রেফতার হওয়ায় অনেকেই খুশি হতে পারেননি। মজনু নিজে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, ধর্ষণের শিকার ছাত্রীও তাকে শনাক্ত করেছেন, অথচ মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো একজন রাজনৈতিক নেতা এটাকে ‘সাজানো’ বলে মনে করছেন! ‘অপরাধী' সাজানোর ঘটনা আমাদের দেশে ঘটে না তা নয়, তবে সেটাও রাজনীতিসংশ্লিষ্টতায় বেশি হয়। কুর্মিটোলার ঘটনা নিয়ে রাজনীতি জমাতে না পারার দুঃখ হয়তো মান্নাকে ব্যথিত-আহত করেছে। এই ঘটনায় সরকারদলীয় কেউ গ্রেফতার হলে বা কারও নাম এলে তা নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করা যেতো। মজনুকে নিয়ে তো আসর জমছে না।

ধর্ষণ যে একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, ধর্ষণ এবং ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যুর ঘটনা যে ক্রমে বাড়ছে, তা আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় আছে কি? রাজনৈতিক দলের এজেন্ডায় কি বিষয়টি আছে? কেন একশ্রেণির মানুষ এভাবে ধর্ষকামী হয়ে উঠছে, শুধু শক্তিমত্তা দেখানো, নারীকে অধস্তন ভাবার মানসিকতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে? এটা একধরনের অপরাধ। কীভাবে এই অপরাধ দূর করা যায়, তার উপায় বের করার কোনও গরজ কি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে আছে? কোনও রাজনৈতিক দলকেই এনিয়ে কোনও সেমিনার-গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করতে দেখা যায় না।

জাতীয় সংসদে বক্তৃতায় যারা ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন, তারা কি ভেবেচিন্তে এটা বলেছেন? একজন ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করলে কি আরেকজন ধর্ষক দেখা যাবে না? মৃত্যু কিংবা কঠোর শাস্তি গুরুতর অপরাধ নির্মূলে সহায়ক হয় না। এতে অপরাধ সাময়িক প্রশমিত হতে পারে। তবে এটাও ঠিক, নিয়মিত বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে অপরাধীরা আশকারা পায়। তাই বিচারব্যবস্থাকে জটিলতামুক্ত করা এবং আইনের প্রয়োগপদ্ধতি ত্রুটিমুক্ত করার বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়।

জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ সংসদে বলেছেন, এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে হলে এনকাউন্টার মাস্ট। ধর্ষককে গুলি করে মারতে হবে। তিনি বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হয় ১৫-২০ বছর পর। মানুষ এটা মনে রাখে না।

জাপা এমপির বক্তব্য যারা সমর্থন করেছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদও আছেন। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, তারা আবেগতাড়িত হয়েই ‘মেরে ফেলা’র কথা বলেছেন। তাদের কথায় এক ধরনের অসহায়ত্বও ফুটে উঠেছে। সংসদে দাঁড়িয়ে আইনপ্রণেতারা বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে কথা বললে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ ব্যাহত হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করলে দেশে চরম অরাজক অবস্থা তৈরি হবে। ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে নিরপরাধ মানুষ হত্যার উৎসব শুরু হবে। যাদের দায়িত্ব অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা, তারা যদি এনকাউন্টারের স্বাধীনতা পায় তাহলে তার পরিণতি কী হয়, সেটা আমরা নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করতে পারি।

এটা ঠিক, ধর্ষণের ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন। ধর্ষণের শিকার নারীকে আদালতের কাঠগড়ায় অত্যন্ত অরুচিকর ও লজ্জাজনক জিজ্ঞাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের আইন-আদালত কিছুই এখনও যথেষ্ট নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। বিচারক, আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তা—সবাই সংবেদনশীল না হলে ভিকটিক নারীর ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের এখন অধিক সচেতন ও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আর সবকিছুর আগে প্রয়োজন নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। নারীকে পণ্য হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা বদলাতে না পারলে, নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করলে কেবল আইন করে নারীর জীবন নিরাপদ করা যাবে না। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাস্তায় মানববন্ধন বা মিছিল করে ঘরে ফিরে যে পুরুষ স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে শয্যাগত হতে বাধ্য করেন, তিনিও তো আদতে একজন ধর্ষক! তার মনোজগতে পরিবর্তন আনার চেয়ে গুলি করে হত্যা করা কি বেশি জরুরি?

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ