লেখক শেখ মুজিব এবং তার তিন বই

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:১২, মার্চ ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৪, মার্চ ১৮, ২০২০

আনিস আলমগীরআজ ১৭ মার্চ ২০২০। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকদের হাতে আকস্মিকভাবে নিহত হন, তখন চেষ্টা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকেও মুছে ফেলার। আল্লাহতায়ালা সৎ সন্তানের জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সব পুত্র সন্তানকে তার সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল, শুধু দুটি কন্যাসন্তান—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসেছিলেন, ঢাকায় তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে। গত দীর্ঘ চার দশক শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার পিতাকে পুনরায় ইতিহাসের যথাস্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ছেড়েছেন। তিনি প্রকৃতই একজন পিতার সৎ ও যোগ্য কন্যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ রাখলেন।
বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানাদিক নিয়ে নানাজন লিখেছেন। আমিও অনেক সময় নানা দিবসকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি। আমি প্রতি মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনে লিখি। আমার বিশেষ সৌভাগ্য, নির্ধারিত সাপ্তাহিক কলাম লেখার দিনটি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠানও শুরু হচ্ছে আজ থেকে। এমন একটি দিনে আমি আমার আজকের লেখায় বঙ্গবন্ধুর বিশেষ একটি গুণের কথাই তুলে ধরতে চাই। বলতে চাই বঙ্গবন্ধুর লেখালেখি নিয়ে, মানে লেখক শেখ মুজিব সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।

এরমধ্যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২), ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ (২০২০) নামে বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে, আমরা প্রায় সবাই জানি। বই তিনটি বেস্ট সেলার স্থান দখলের মাধ্যমে সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান নামে একজন লেখকের পরিচয়।

আসুন দেখি কেমন করে একজন জননেতা লেখক হয়ে উঠলেন এবং কী লিখেছেন তিনি। কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ৫৪ বছর বয়সের জীবনের সিকিভাগ কেটেছে তার জেলে। এরমধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাতদিন কারাভোগ করেন, বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তার জেলে কাটে পাকিস্তান আমলে। বাংলাদেশের আর কোনও রাজনৈতিক নেতার এত দীর্ঘসময় জেলে থাকার নজির নেই। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকার সময় তাকে তার স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কয়েকটি খাতা কিনে দিয়েছিলেন জেলখানায় আত্মজীবনী লেখা আরম্ভ করার জন্য। তিনি তখন আত্মজীবনী লেখার ব্যাপারে তেমন কোনও উৎসাহবোধ করেননি, যা তিনি তার স্ত্রীকে খাতা দেওয়ার সময় বলেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনও তার স্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করেননি। সম্ভবত সেই কারণে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ তিনটি বই আমরা পড়তে পারলাম।

শেখ হাসিনা তার পিতার বিভিন্ন লেখা কষ্ট করে সংগ্রহ করে প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুকে লেখক হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন এবং অসম্পূর্ণ হলেও একটি গৌরবময় ইতিহাসের অংশকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী জাতির অশেষ উপকার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর তিনটি বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন শেখ হাসিনা। সেখানে বঙ্গবন্ধুর লেখার খাতাগুলো সংগ্রহ করা এবং সংগ্রহের পর পাঠ উদ্ধার করে বাজারে নিয়ে আসার পেছনে কী অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি এবং তার টিম—সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে তার লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি ও চীন ভ্রমণের খাতাগুলো পান। আত্মজীবনীর খাতাগুলো পাননি। বঙ্গবন্ধু জেলমুক্ত হওয়ার পর সম্ভবত তার আত্মজীবনীর চারটি খাতা শেখ ফজলুল হক মনিকে দিয়েছিলেন টাইপ করার জন্য। ’৭৫ ঘটনায় শেখ মনিরও মৃত্যু হয়, কিন্তু শেখ মনির অফিস ধ্বংস হয়নি বলে আত্মজীবনীটি আমাদের কাছে ছাপানোর অক্ষরে এসেছে।

২১ আগস্ট ২০০৪ শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পরপর যখন তিনি এই চারটি খাতা পান, সেই আবেগের কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘খাতাগুলো হাতে পেয়ে আমি প্রায় বাকরুদ্ধ। এই হাতের লেখা আমার অতি চেনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে ডাকলাম। দুই বোন চোখের পানিতে ভাসলাম। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পিতার স্পর্শ অনুভব করার চেষ্টা করলাম। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি; তারপরই এই প্রাপ্তি। মনে হলো যেন পিতার আশীর্বাদের পরশ পাচ্ছি। আমার যে এখনও দেশের মানুষের জন্য—সেই মানুষ যার পিতার ভাষায় বাংলার ‘দুঃখী মানুষ’—সেই দুঃখী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ বাকি, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ বাকি, সেই বার্তাই যেন আমাকে পৌঁছে দিচ্ছেন। যখন খাতাগুলোর পাতা উল্টাচ্ছিলাম আর হাতের লেখাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম আমার কেবল মনে হচ্ছিল আব্বা আমাকে যেন বলছেন, ভয় নেই মা, আমি আছি, তুই এগিয়ে যা, সাহস রাখ। আমার মনে হচ্ছিল, আল্লাহর তরফ থেকে ঐশ্বরিক অভয়বাণী এসে পৌঁছালো আমার কাছে। এত দুঃখ-কষ্ট-বেদনার মাঝে যেন আলোর দিশা পেলাম।’

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী অসমাপ্ত, পরিপূর্ণ নয়। পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কোনও আত্মজীবনী লিখেননি। কিন্তু ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী তার আত্মজীবনী লিখেছিলেন এবং তার নাম দিয়েছিলেন—দ্য স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ। জিন্নাহ, গান্ধী, নেহরু, সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতারা, যারা ব্রিটিশের সময় স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিলেন, তারা সবাই ছিলেন বিলেতি ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত মানুষ। আর বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনও বিলেতি ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু সবার আত্মজীবনী পড়লে বোঝা যায়, লেখার দক্ষতা, পারঙ্গমতা কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে সাধারণ ডিগ্রিধারী শেখ মুজিবেরও কম ছিল না। সমকালীন ঘটনার একেবারে খুঁটিনাটি বর্ণনা, আগামীর ইতিহাসকে দেখার চোখ ছিল তার প্রখর। জাতির দুর্ভাগ্য, তার অমূল্য পরিপূর্ণ আত্মজীবনীটা জাতি পেলো না।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইতে বঙ্গবন্ধু তার বংশ পরিচয়, জন্ম, শৈশব স্কুল ও কলেজে শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার এবং কলকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, দেশভাগ, মুসলিম লীগের রাজনীতি, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন তুলে ধরেছেন। তার কারাজীবনে পিতামাতা সন্তান-সন্ততি এবং সহধর্মিণীর কথা উঠে এসেছে এতে। বঙ্গবন্ধুর বংশ পরিচয় নিয়ে ছোটকাল থেকে মিথ্যাচার শুনেছিলাম, কিন্তু এই বইটিতে আমরা দেখতে পাই তার জন্ম টুঙ্গিপাড়ায় একটি সম্ভ্রান্ত শেখ বংশে। তার ছোট দাদা ইংরেজদের দেওয়া ‘খান সাহেব’ উপাধি পান। ওনার ছেলেকেও খান সাহেব উপাধি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, যার ডাক নাম রেণু, তিনি যখন তিন বছর বয়সী, তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিয়ে হয়। বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন বারো কী তেরো। স্ত্রীর দাদা এবং তার বাবার ইচ্ছাতেই এই বিয়ে হয়েছিল।

‘সাগরে শয়ন যার শিশিরে কী ভয় তার’—তিন বছর আগে এই শিরোনামে আমি একটি কলাম লিখেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। শিরোনামটা নিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বই ‘কারাগারের রোজনামচা’ থেকে। মামলার পর মামলা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৭ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি জেল গেটের সামনে স্থাপিত আফসার উদ্দীন সাহেবের কোর্টে এ সুন্দর কথাটি বলেছিলেন। 

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি একজন রাজবন্দির কারাস্মৃতি অবলম্বনে লেখা ডায়েরি। কিন্তু ডায়েরিটা উপন্যাসের মতো। শরৎ বাবুর উপন্যাসকেও হার মানায়। এ বইটা পড়া আরম্ভ করলে তার ইন্দ্রজাল থেকে বেরুনোর উপায় থাকে না। আমি যখন পড়ছিলাম, ভাবছিলাম জেলখানার জীবনের এত নিখুঁত বর্ণনা কোনও রিপোর্টারের পক্ষেও সম্ভব না। তখন মনে পড়লো বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তো সাংবাদিকতাও করেছেন। ১৯৪৫-৪৬ সালের দিকে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের কাগজ ‘সাপ্তাহিক মিল্লাত’ লিখতেন তিনি। অনিয়মিতভাবে লিখেছেন ইত্তেহাদ এবং ইত্তেফাকে। তিনি নিজে পত্রিকাও বের করেন ১৯৫৬ বা ১৯৫৭ সালের দিকে—সাপ্তাহিক ‘নতুন দিন’। তিনি ছিলেন প্রধান সম্পাদক এবং কবি জুলফিকার ছিলেন সম্পাদক।

কারাগারের রোজনামচার ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘দুপুর বেলা দেখা এক মওলানা সাহেবের সঙ্গে, কোরানে হাফেজ, তাঁর বাবাও খুব বড় পীর ছিলেন, কুমিল্লায় বাড়ি। হাজতিদের মধ্যে নামাজ পড়বার আগে বক্তৃতা করছেন, ওয়াজ করছেন, হাজতিরা বসে শুনছে। আমি দূরে দাঁড়াইয়া তাঁর বক্তৃতা শুনছি। তিনি বলছেন খুব জোরে ‘দরুদ শরীফ’ পড়। শয়তান দূর হয়ে যাবে। জোরে পড়। অনেকক্ষণ বক্তৃতা করলেন; সুন্দর চেহারা, অল্প বয়স, চমৎকার বলার কায়দা। তবে জামাটা খুব বড়। ওটা দেখেই মনে সন্দেহ হলো। একদম পা পর্যন্ত জামা। বোধহয় ছয় সাত গজ হবে কমপক্ষে। তসবি হাতেই আছে। মাঝে মাঝে চক্ষু বুজে কথা বলেন।’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই মওলানা সাহেব কি মামলায় এসেছেন।’ আমাকে এক ‘পাহারাদার’ বললো, ‘জানেন না, রেপ কেস’; একটা ছাত্রীকে পড়াতো, তার ওপর পাশবিক অত্যাচার করেছে, মসজিদের ভিতর। মেয়েটার ১২/১৩ বৎসর বয়স, চিৎকার করে উঠলে লোক এসে দেখে ফেলে। তারপর ধরে আচ্ছামতো মারধর করে। জেলে এসে কয়দিন তো হাসপাতালেই থাকতে হয়েছে। আমি বললাম, ‘হাজতে এসে ধর্ম প্রচার শুরু করেছে। ব্যাটা তো খুব ভণ্ড। জমাইছে তো বেশ।’

এত সরল, সুবোধ্য, স্বচ্ছ ভাষায় লেখার ক্ষমতা থাকলেও ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এ শেখ মুজিব নিরহঙ্কারী হয়ে বলেন, ‘আমি লেখক নই, আমার ভাষা নাই, তাই সৌন্দর্যটা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু গোছাইয়া লেখতে পারি না। পাঠকবৃন্দ আমায় ক্ষমা করবেন।’ বাস্তবতা হচ্ছে গতিশীল ভাষায় এত সহজ সরল বর্ণনা এবং লেখার মধ্যে রস মেশানোর কৌশলে তিনি বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখককেও হার মানান। বঙ্গবন্ধুর সব লেখাতেই আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার এবং সাধু-চলিতের মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। কিন্তু তা পড়তে গিয়ে পাঠককে ধাক্কা খেতে হয় না, এটাই তার লেখার মুন্সিয়ানা।

তরুণ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে চীনে যান। উপলক্ষ, পিস কনফারেন্স অব দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওন্সে অংশ নেওয়া। তখন চীনে কমিউনিস্ট পার্টির নতুন সরকার, বলতে গেলে তাদের দিন বদলের পর্ব চলছে। সেসব অভিজ্ঞতায় এত সুন্দর ভ্রমণকাহিনি তিনি লিখেছেন যে, সেটি ভ্রমণকাহিনির পাশাপাশি রাজনীতির পাঠ হয়ে উঠেছে। এতে অর্থনীতি, রাজনীতি, বৈষম্য, সামাজিক বৈচিত্র্য, বৈদেশিক সম্পর্ক, বিশ্ব বাস্তবতা সব উঠে এসেছে। কারাগারের রোজনামচার মতো এখানেও তার দৃশ্য বর্ণনা যেন পূর্ণাঙ্গ চিত্রে আঁকা, নাম পরিচয়সহ কথাবার্তার নিখুঁত বর্ণনা মুগ্ধ হওয়ার মতো। চীন যাওয়ার পথে রেঙ্গুন এবং হংকংয়ের বর্ণনা এখানে বাড়তি পাওয়ার মতো।

যেমন বার্মা নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ব্রহ্মদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। বিপ্লবীরা বহু স্থান দখল করে আছে। আর মাঝে মাঝেই রেঙ্গুন শহরের পানি বন্ধ করে দেয়। আর একটা ভয়াবহ খবর পেলাম, ‘ব্যান্ডিটরা’ দিনে দুপুরে ডাকাতি করে। ভয়েতে দিনের বেলায়ও কেউ জানাশোনা মানুষ না হলে দরজা খোলে না।’  সেখানে তিনি রেঙ্গুনস্থ পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের অকারণ ফুটানির যে বর্ণনা দেন, যিনি আবার ছিলেন বাঙালি, তা যেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা আমাদের সিংহভাগ রাষ্ট্রদূতদের প্রতিমূর্তি।

রসবোধেও কম যান না লেখক শেখ মুজিব। হংকং সফরসঙ্গী সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সঙ্গে একজন তরুণী রুপাজীবার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আতাউর রহমান সাহেব, মানিক ভাই, ইলিয়াস ও আমি রাস্তায় বেড়াতে বেরিয়েছি। হঠাৎ ১৬/১৭ বৎসরের একটা মেয়ে আতাউর রহমান সাহেবের কোটে একটা গোলাপ ফুল লাগাইয়া দিতে অগ্রসর হয়। মেয়েটি কলারে হাতও দিয়াছে, খান সাহেব হঠাৎ যেন চমকাইয়া উঠলেন। পরে ধাক্কা দিয়া ফুল ছুড়ে ফেলে রাগে ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে এগিয়ে চললেন। মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের মতো যুবকদের দিকে নজর না পড়ে আপনার ওপর পড়ার কারণ কী? আতাউর রহমান সাহেব তো রাগে অস্থির, আর মানিক ভাই তো তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চের’ মতো ঘুরাইয়া ফিরাইয়া ওনার পিছনে লাগলেন। আমরা খুব হাসাহাসি শুরু করলাম। বেচারা ভদ্রলোক রাগে শোকে দুঃখে কথা বলেই যেতে লাগলেন। হংকংয়ে ফুল দেওয়াটা হলো ‘প্রেম নিবেদন’। ফুলটা গ্রহণ করলে ওরা মনে করবে আপনি তার সাথে যেতে রাজি হয়েছেন। আপনাকে হাত ধরে সাথে করে ওদের জায়গায় নিয়ে যাবে।’

এই সফরকালে বিদেশে গিয়ে বা বিদেশিদের কাছে নিজের দেশকে খাটো না করা বা বিরোধী দলে আছেন বলে মুসলিম লীগ সরকার সম্পর্কে কোনও বদনাম না করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং তার সফরসঙ্গীরা। যদিও বঙ্গবন্ধু তার পাসপোর্ট পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন চীনযাত্রার শেষ দিন পর্যন্ত।

লেখক মুজিবকে নিয়ে এত ক্ষুদ্র পরিসরে সব বলা সম্ভব নয়। তাও আশা করছি লেখক শেখ মুজিব এবং তার বই সম্পর্কে পাঠক একটা ধারণা পাবেন। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে আরও লিখবো।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ