মানুষের অত্যাচার থেকে পৃথিবীর আত্মরক্ষার হাতিয়ার

Send
জ.ই. মামুন
প্রকাশিত : ১৩:০৩, মার্চ ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৬, মার্চ ২৫, ২০২০

জ. ই. মামুনচীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে। বিগত বছরের শেষ দিনে হলেও ভাইরাসটির নামকরণ করা হয় কোভিড ২০১৯, সংক্ষেপে কোভিড ১৯। উহানে করোনা আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যু হয় ভাইরাসটি ধরা পড়ার ১০ দিন পর, ৯ জানুয়ারি ২০২০। দ্বিতীয় রোগীর মৃত্যু হয় ১৫ জানুয়ারি, আর তৃতীয়জন ২০ জানুয়ারি। অর্থাৎ প্রথম ২১ দিনে এই ভাইরাসে উহানে মৃতের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন জন। এর দুই মাস পর ২৫ মার্চ সকাল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে ১৯৫টি দেশে, মোট আক্রান্ত ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪৯৮ এবং মৃতের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৬২। এই সংখ্যা এখন রোজই বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। একটি পরিসংখ্যান এখানে উল্লেখ করা যায়—গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ভাইরাসটি প্রথম ধরা পড়ার পর বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখে পৌঁছতে সময় লেগেছিল ৬৭ দিন। তারপর দুই লাখে পৌঁছতে সময় লেগেছে ১১ দিন, আর তিন লাখে পৌঁছেছে পরের ৪ দিনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা, কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে না পারলে এই সংখ্যা অচিরেই দৈনিক এক লাখ পার হতে পারে।

প্রশ্ন উঠেছে—কেন এই সংক্রমণ, কেন করোনা ভাইরাস এত শক্তিশালী, করোনা ভাইরাস কি প্রকৃতির প্রতিশোধ? বিশ্বজুড়ে প্রকৃতিপ্রেমী এবং পরিবেশ সচেতন লোকজন বলতে শুরু করেছেন—হ্যাঁ, করোনা ভাইরাস আসলে মানুষের পাপের ফল। প্রকৃতির সঙ্গে, পৃথিবীর সঙ্গে, মাটির সঙ্গে, পানির সঙ্গে, বৃক্ষের সঙ্গে বা পৃথিবীতে বসবাসরত অন্য প্রাণীদের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ যে অন্যায় করেছে, অবিচার করেছে, করোনা এসে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। এত ছোট একটা অনুজীব, তার কী প্রবল শক্তি! তার কারণে একই সঙ্গে পৃথিবীতে বন্ধ হয়ে গেছে সকল ধর্মের উপাসনালয়। অসহায় মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে ডাকারও জায়গা পাচ্ছে না কোথাও।

এই পৃথিবীকে মানুষ তার ক্রীতদাস ভেবেছিল, মনে করেছিল পৃথিবী এবং সমস্ত প্রকৃতির মালিক সে। তাই পৃথিবীর সঙ্গে যেমন খুশি আচরণ করা যাবে। মানুষের লোভ, দম্ভ এবং বিলাসিতার বলি হয়েছে নদী, সমুদ্র, পাহাড় এবং অন্যান্য প্রাণী। নগরায়ণের নামে মানুষ নির্বিচারে উজাড় করেছে বনের পর বন এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য হত্যা করেছে বন্যপ্রাণী, নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে অনেক প্রজাতি। বিশাল সব অট্টালিকা, কল কারখানা, শিল্প বিপ্লব, হাজার হাজার উড়োজাহাজ, বুলেট ট্রেন, ক্রুজ শিপ, কোটি কোটি গাড়িতে রোজ শত শত টন ফসিল ফুয়েল পুড়িয়ে দূষিত করেছে পৃথিবীর বাতাসকে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যেন মারা যাচ্ছিল পৃথিবী।

পৃথিবীকে বলা হয় ধরিত্রী মাতা। বিশ্বখ্যাত লেবানিজ কবি-দার্শনিক কাহলিল জিব্রান বহুকাল আগে বলে গেছেন, আমরা যাদের নিজেদের সন্তান বলে ভাবি, তারা আমাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে বটে, কিন্তু তারা প্রকৃতির সন্তান। মানুষ প্রকৃতি থেকে আসে আবার প্রকৃতির পঞ্চভূতেই মিশে যায়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মাতাসুলভ আচরণ করে না। প্রকৃতির সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রকৃতির ওপর নিপীড়ন এলে তাকে ধীরে ধীরে মানুষের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং অসহিষ্ণু করে তুলেছে। সেই অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ, মানুষের অত্যাচার থেকে পৃথিবীর আত্মরক্ষার এক হাতিয়ার এই করোনা ভাইরাস।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে মানুষ কী করছে? এখন পর্যন্ত যে সামান্য কাজ মানুষ করতে পেরেছে, সেটি হলো হাত ধোয়া এবং নাকে মুখে মাস্ক পরা, অর্থাৎ নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং একের হাঁচি কাশি থেকে অন্যকে নিরাপদ রাখা। আর এর বাইরে দেশে দেশে এখন যা করা হচ্ছে তা হলো কোয়ারেন্টিন এবং লকডাউন। মানে স্কুল কলেজ, অফিস আদালত, পার্ক সিনেমা হল, থিয়েটার, বার, ক্লাব, ক্যাসিনো, রেস্টুরেন্ট, সমুদ্র সৈকত, পর্যটন কেন্দ্র, রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দিয়ে, সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বসে থাকা এবং সামাজিক সংশ্রব বন্ধ রাখা। পাশাপাশি বন্ধ এয়ারপোর্ট, উড়োজাহাজ, নৌযান, রেল বাস ট্যাক্সি উবারসহ গণপরিবহন এবং অবশ্যই কোটি কোটি প্রাইভেট কার। বহু শিল্প-কারখানা, দোকান রেস্টুরেন্ট শপিং সেন্টার তো বন্ধই।

এর ফল কী দেখছি আমরা। দেখছি গত কয়েক সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে নদী, সমুদ্র এবং সরোবরের পানি আরও স্বচ্ছ হয়েছে, ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অবাধ বিচরণ বেড়েছে। বাতাসে কার্বন নিঃসণের মাত্রা কমেছে। হয়তো বৈশ্বিক তাপমাত্রাও কিছুটা কমে এসেছে। এত নির্মল বাতাসে পৃথিবী যেন বহুদিন পর প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। প্রকৃতি এই গ্রহটির ওপরে আবার তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। অন্য প্রাণীরাও অনেকটা নির্ভয়ে চলাচল করতে পারছে এখানে। এবং বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মানুষের এত কাছের সংস্পর্শে থেকেও কুকুর বিড়ালরা করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে না, অন্য কোনও প্রাণীকে আক্রমণ করছে না এই ভাইরাস।

কিন্তু মানুষকে তো অনন্তকাল কোয়ারেন্টিন বা লক ডাউন করে ঘরে আটকে রাখা যাবে না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়? মানুষ পৃথিবীর সঙ্গে একটি আপস রফা প্রস্তাবে আসতে পারে; সেটি হলো—উইন উইন সমাধান, মানে তোমারও জয় আমারও জয়। আমি তোমার ক্ষতি করবো না, তুমিও আমার ক্ষতি করবে না। মানুষকে শপথ করে বলতে হবে, এই পৃথিবী তার একার নয়, এখানকার অন্য সব প্রাণীর মতো সেও একটি প্রাণী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য সে অন্যদের ধ্বংস করবে না, অকারণে কাউকে হত্যা করবে না, কারও জায়গা দখল করবে না, কাউকে নিশ্চিহ্ন করবে না। সবার সঙ্গে মিলেমিশে বাস করবে এই পৃথিবীতে। অবশ্য মানুষ অতীতে পৃথিবীর সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে এত বেশি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যে প্রথমেই পৃথিবী এই প্রস্তাব বিশ্বাস করবে না। কিন্তু দীর্ঘ দিনের চর্চার মধ্য দিয়ে, জীবনাচরণ বদলের মধ্য দিয়ে মানুষ যদি পৃথিবীর মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে যে তারা আসলেই আর পৃথিবীর জন্য, প্রকৃতির জন্য অন্য প্রজাতির জন্য হুমকি নয়, তাহলে প্রকৃতিও ধীরে ধীরে মানুষের জন্য সহনীয় হয়ে উঠবে।

প্রকৃতির প্রতি, পৃথিবীর প্রতি এই দায়বদ্ধতার কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। আগের মতো এবারও মানুষ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হবে সন্দেহ নেই। হয়ত আরও অনেক প্রাণের বিনিময়ে, আরও অনেক কষ্টের আর ত্যাগের বিনিময়ে। হয়ত আমরা অনেকে সেই না থাকার তালিকায় চলে যাবো কারোর নিষ্ঠুর আঘাতে। তবু একদিন মানুষ এই অনুজীবের বিপক্ষে জয়ী হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি কথা বিশ্ব মানবতাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এবার আপনি করোনা ভাইরাসকে বিদায় করলেন, কিন্তু প্রকৃতির ওপর যদি এই অত্যাচার বন্ধ না হয়, তাহলে আবার অন্য কোনও নামে অন্য কোনও রূপে প্রকৃতি ঠিকই মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসবে।

ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখেছি কলকাতার শিল্পী নচিকেতার। তিনি একটি কবিতা লিখেছেন করোনা ভাইরাস নিয়ে, যেখানে তিনি বলেছেন—করোনা তুমি যাও, কিন্তু তোমার ভয়টি রেখে যাও। তোমার জন্য বন্ধ হয়েছে সভ্যতা নামের দূষণ...

সত্যি এই ভয়টা থাকা দরকার, যাতে মানুষের লোভ কমে, দম্ভ কমে এবং চাই চাই আরও চাই এই মনোভাব কমে। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আক্কু চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন, স্মল ইজ বিউটিফুল—কথাটার অর্থ তখন ভালো বুঝতে পারিনি। এখন করোনা আসার পরে বুঝেছি। জীবনের, জীবন যাপনের চাহিদা যত কমিয়ে রাখা যায়, জীবন ততই সুন্দর হয়ে ওঠে। জীবন যাপনে সারল্য, বিলাসিতা পরিহার এবং প্রচলিত অভ্যাস আর লাইফস্টাইল পরিবর্তন ছাড়া মানবজাতিকে বাঁচানো যাবে না।

আমাদের হাত ধোয়া থেকে শুরু করে, কফ-থুথু ফেলার অভ্যাস বদল করিয়েছে করোনা ভাইরাস। জীবন যাপনের অন্য সব ক্ষেত্রে জননী বসুন্ধরার প্রতি সদয় হয়ে, অন্য সব প্রাণীর প্রতি, গাছের প্রতি, পশুর প্রতি, পাখির প্রতি, ফুলের প্রতি, প্রজাপতির প্রতি সদয় হয়ে আকাশ বাতাস পাহাড় নদী জলকে ভালোবেসে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচতে চেষ্টা করলেই হয়ত প্রকৃতির এমন নিষ্ঠুর প্রতিশোধের কবল থেকে মানবজাতির স্থায়ী মুক্তি আসতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ