এবারের স্বাধীনতা দিবস ও মৃত্যুর নীরবতা

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ২৩:৫৪, মার্চ ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৮, মার্চ ২৬, ২০২০

স্বদেশ রায়১৯৭১ সালের এপ্রিলের মধ্য দুপুর। সূর্য যেন সেদিন আরও বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কার ওপর ওইদিন সূর্যের এত ক্রোধ, যার জন্যে এত উত্তাপ, তা কেউ বুঝতে পারছেন না। কিন্তু সাতক্ষীরার গুলতিরবিল ধরে যে মানুষের কাফেলা ভারত সীমান্তের দিকে এগিয়ে চলছে, তাদের ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করারও সময় নেই—হে, ঈশ্বর! তুমি সূর্যের তাপ কমিয়ে দাও। তারা সবাই গরমে ঘেমে ভিজে গেছে। তাদের মাথা উনানে বসানো গরম হাঁড়ির মতো তাপ ছড়াচ্ছে। আর তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অথচ তারা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু হাঁটছে আর হাঁটছে। তাদের পায়ের জোর যে ক্রমেই কমে আসছে তাও তারা বুঝতে পারছেন না। এই কাফেলাটি তাদের নিজ বাড়ি ছেড়েছে বিশ দিন আগে। তারপরে কুকুরের মতো তাড়া খেতে খেতে আজ এখন এই চল্লিশ মাইল চওড়া গুলতিরবিল পাড়ি দেওয়া প্রায় শেষ করে ফেলেছে। এই বিল পাড়ি দিলেই তারা দূরে ভারত সীমান্ত দেখতে পাবে। এই আশায় কাফেলার মানুষগুলোর পায়ে যেন শেষ জোর এসেছে। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় কাতর দেহের শেষ শক্তি দিয়ে তারা জোরে হাঁটার চেষ্টা করতে থাকেন। এই সময়ে সুরেন্দ্রনাথ নিজেকে পিছিয়ে নিয়ে আসেন তার স্ত্রীর কাছে। স্ত্রীর কাঁধের অপর পাশে তখন তার ছোট ছেলের মাথা ঝুলে পড়েছে। সুরেন্দ্রনাথ গলার মাংসপেশীগুলোতে অনেক জোর দিয়েও কোনও শব্দ বের করতে পারেন না। ডাকতে পারেন না তার স্ত্রীকে নীলা বলে। শুধু শুষ্ক একটা বাতাস তার দুই ঠোঁটের মাঝ দিয়ে বের হয়। নীলা শুধু একটু স্বামীর মুখের দিকে তাকান। ডাক্তার সুরেন্দ্রনাথ নিজেকে এতটা অসহায় জীবনে কখনও মনে করেননি। তারপরও যেন ভাবতেও ভুলে গেছেন, তিনি অসহায়। কেবল তার চোখ-মুখই প্রকাশ করছে। সুরেন্দ্রনাথ হাঁটতে হাঁটতে নীলার কাঁধে থাকা চার বছরের ছেলেটির হাতের পালস পরীক্ষা করলেন। কোনও সাড়া তিনি পেলেন না। একবার মনে হলো নীলাকে বলে, পাশে কোথাও নামিয়ে রাখো। বয়ে নিয়ে লাভ নেই। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। ওই সময়ে নীলার মুখ দিয়ে অনেক কষ্টে চারটি শব্দ বের হলো—‘এখনও শরীর গরম আছে’। নীলার পাশে হাঁটছে তার ভাসুরের ছেলে, সে শুধু শব্দ কয়টা শুনতে পেলো। কিন্তু তারও বোঝার কোনও ক্ষমতা নেই। নীলার কাঁধের ছেলেটি আর কাঁধে বমি করছে না। তার পায়ুপথ দিয়ে আর পানির মতো পায়খানা বের হচ্ছে না। নিস্তেজ শরীরটির তাপমাত্রাও কমে যাচ্ছে। তারপরেও নীলা তাকে বয়ে নিয়ে চলছে ভারত সীমান্তের দিকে। তারিখটি তারা মনে করতে পারে না, তবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে হবে।

নীলা যেদিন হাসনাবাদ সীমান্ত দিয়ে তার নিস্তেজ ছেলেকে নিয়ে ভারতে ঢোকে ওইদিন নদীয়া ক্যাম্প নিয়ে ফ্রান্সের একটি পত্রিকায় খবর ছাপা হয়। শুধু নদীয়া ক্যাম্পে ১৫ হাজার শিশু কলেরা আক্রান্ত, এবং আগামী জুন থেকে যখনই বৃষ্টি শুরু হবে তখন এ সংখ্যা ৩ লাখে পৌঁছাবে। সেদিন হাসনাবাদ, বশিরহাট, টাকি, লবণ হ্রদসহ পশ্চিমবঙ্গের নানান ক্যাম্পে বর্ষাকলে প্রতিটি তাঁবুতে তাঁবুতে কলেরা আক্রান্ত হয়েছিল শিশু ও বৃদ্ধ। মেঘালয়ের ক্যাম্পের পাশে যেখানে মৃত শিশুদের ফেলে দেওয়া হতো সেখান থেকে শকুন কখনোই গাছে ওঠার সময় পেতো না। সেদিন ইউনিসেফের একটি হিসাবে বলা হয়েছিল, বর্ষা শেষ হবে অক্টোবরে, ততদিন প্রতি মাসে তিন লাখ করে শিশু মারা যাবে। ওই মৃতের হিসাব রাখা হয়নি। তবে সে হিসাব ধরলে আমাদের শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখের অনেক বেশি হবে।

সেদিনের বাংলাদেশের শরণার্থী শিশু ও বৃদ্ধদের মৃতের সংখ্যা দেখে ফ্রান্সের লা ফিগারো পত্রিকা লেখে, ‘ট্র্যাজেডি ইজ ওরস দ্যান হিরোশিমা’। বাস্তবে সেদিন বাংলাদেশের শরণার্থী শিশু ও বৃদ্ধরা যেভাবে মারা গিয়েছিল, তা হিরোশিমা থেকেও অনেক ভয়ঙ্কর। কারণ, তখন শরণার্থী শিবিরে ছিল প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল। এপ্রিলের শুরু থেকে যখন শরণার্থীর ঢল ভারতের দিকে যেতে শুরু করে তখন আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড গরম। ওই গরমে পানির অভাবে ডিহাইড্রেশনের ফলে শুরু হয়ে যায় কলেরা। আর তারপরে সে বছর ছিল অতিবৃষ্টি। এই অতিবৃষ্টির জন্যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা সহজে কাবু করতে পেরেছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে। কিন্তু এই অতিবৃষ্টির মাশুল দিতে হয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম , ত্রিপুরা ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা এক কোটির বেশি শরণার্থীকে। কলেরা, বসন্ত আর রক্ত আমাশয়ে সেদিন যে কত শিশু ও বৃদ্ধ মারা গিয়েছিল তার হিসাব কোনোদিন হবে না।

আমরা একটি মোটা দাগে হিসাব পাই দেড় কোটির মতো মানুষ সেদিন ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। হয়তো সেটা ১ কোটি বিশ তিরিশ লাখ হবে। তবে সরকারি হিসাবে সেদিন ভারত থেকে শরণার্থী ফিরে আসে ৯,৮৯৯,৩০৫ জন। বলা হয় আরও ৬০ হাজারের মতো শরণার্থী ফিরে গেছে, যারা ক্যাম্পে ছিল না। তারা সম্ভবত তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ছিল। এছাড়া কিছু শরণার্থী আর ফিরে আসেনি বলে ধরা হয়। কিন্তু যাই হোক, ফিরলো এক কোটিরও কম। অথচ সেদিন যারা ক্যাম্পে ছিলেন বা সেদিন ওই ক্যাম্পগুলোর রিপোর্ট করতে বিদেশি যেসব রিপোর্টার এসেছিলেন, বা রঘু রাই,  কিশোর পারেখের মতো ফটো জার্নালিস্টরা যারা সারাক্ষণ যুদ্ধক্ষেত্র ও শরণার্থী শিবিরের ছবি তুলেছেন, তাদের ছবি আজও প্রমাণ করে, রোগ আর অনাহারে কীভাবে সেদিন মারা গেছে মানুষ। সেদিন আমেরিকার সিনেটর কেনেডি নিজ চোখে দেখে যান কীভাবে স্যুয়ারেজের পাইপের ভেতর মানুষ বাস করেছেন। তিনি নিজ চোখে দেখেন মৃত্যুর মিছিল। আর এই মৃত্যু সেদিন ঠেকানোর জন্যে গোটা বিশ্ব প্রথমে এগিয়ে আসেনি। অন্যদিকে আজ যে অর্থনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী ভারত আমরা দেখতে পাই, সেদিন সে ভারতও ছিল না। ছিল অনেক দরিদ্র একটি ভারত। আর তার ভেতর তাদের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের শরণার্থীরা। সেদিন পশ্চিমবঙ্গে খুব কম পরিবার ছিল, যাদের দিনে একবারের বেশি দুবার ভাত খাওয়ার সঙ্গতি ছিল। বাকি দুইবার তারা একটি বা দুটি রুটি খেয়ে কাটাতো। ঠিক একই অবস্থা মেঘালয়, ত্রিপুরা ও আসামের। এই দরিদ্র রাজ্যগুলোতে গিয়ে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের ঢল। অন্যদিকে দেশ হিসেবে ভারতেরও তখন সামর্থ্য কম। তাই সত্যিকার অর্থে এখন আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন মাথাপিছু যে খাবার দেই তার পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগও প্রথমে ভারত সরকার এই এক কোটির বেশি শরণার্থীর জন্যে জোগাড় করতে পারেনি। অন্যদিকে বৃহৎ খাদ্যভাণ্ডারের দেশ আমেরিকা ছিল আমাদের বিরুদ্ধে। যাহোক, সেদিন ভারতের অনুরোধে যুক্তরাজ্য ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের শরণার্থীদের যথাসমর্থ সাহায্য দেয়। তারপরেও তা ছিল অপ্রতুল। চিকিৎসার জন্যে ছিল কেবল মেকশিফট হাসপাতাল। আজ যেটা সল্টলেক টাউন কলকাতার, যা নিউ ক্যালকাটা, সেটা সেদিন ছিল লবণ হ্রদ। এখানে দিনে রাতে সব সময়ই ভাসতে দেখা যেতো মৃত শিশুর দেহ। পুরুষরা রিলিফের জন্যে গেছে, তাদের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মুষলধারে বৃষ্টি। আর ওই বৃষ্টির ভেতর তাঁবুতে মহিলারা বসে আছে মৃতদেহকে ঘিরে। কখন পুরুষেরা ফিরবে, তারপরে ফেলে দেওয়া হবে পরিবারের এই ছোট্ট সদস্যটিকে। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেই সে নিজ বাড়ির আঙিনায় ফুলগাছের পাশে আরেকটি ফুল হয়ে কত হেসেছে, কত খেলেছে। সে আজ সূর্যের আলোহীন দিনে, মুষলধারার বর্ষার নিচে একটি তাঁবুর মধ্যে ঘোর অন্ধকারে শিশু নয়, একটি শিশুর লাশ হিসেবে হিমশীতল দেহে অবস্থান করছে। আর তার পাশে বসে আছে কিছু নারী, যাদের চোখের পানি অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। তাদের মুখে কেবল মৃত্যুর মতো নীরবতা।

১৯৭১ সালে বাঙালি এই মৃত্যুর নীরবতার ভয়াবহতা পার করে স্বাধীনতার সূর্য আনে। আর তারপর নানান চড়াই উৎরাই পার হয়ে যখন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের দ্বারে তখন বাঙালির দুয়ারে আবার এসেছে মৃত্যুভয়। মৃত্যুর নীরবতা। তবে এবার শুধু বাঙালির দ্বারে নয়। গোটা বিশ্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ ও মৃত্যু ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর ভূ-ভাগের অনেক দেশে। তার মাশুলও বাঙালিকে দিতে হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে জেতার জন্যে বাংলা থেকে খাদ্য সরিয়ে নিয়েছিল ইংরেজরা। যারা ফলে ১৯৪৩ ও ৪৪-এর দুর্ভিক্ষ হয় বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গ ও আমাদের বাংলাদেশ মিলে। তখনকার এই যুক্তবঙ্গে প্রায় তিরিশ লাখ মানুষ না খেয়ে এবং কলেরা ও ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। ১৯৪৩ ও ৪৪-এর পরে মাত্র ২৬ বছর পরে ১৯৭১-এ আমরা তিরিশ লাখের বেশি মানুষ হারিয়েছি পাকিস্তানিদের অস্ত্রে ও শরণার্থী শিবিরে খাদ্যাভাবে এবং কলেরা, ডায়েরিয়ায়।

এরপরে বলা যেতে পারে এই প্রথম বাংলাদেশ একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এসে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরকে সামনে রেখে। আর তখনই শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা পৃথিবীর আকাশে এক অশনি সংকেত। মৃত্যুর এক বিভীষিকা। এবার আর কোনও মানুষ মানুষের শত্রু নয়। এবার প্রকৃতি এসে দাঁড়িয়েছে মানুষের বিপরীতে। মানুষের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে বায়োলজিক্যাল মহাযুদ্ধ। গোটা পৃথিবী এখন নোভেল কভিড-১৯-এর কাছে অসহায়। গোটা পৃথিবী এখন লকডাউন করে যার যার মানুষকে বাঁচানোর জন্যে, এই ছোঁয়াছে ভাইরাস থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে তার মানুষকে ঘরবন্দি করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবারের স্বাধীনতা দিবসে তাই আমরা এক ধরনের মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার অবস্থায় বসে আছি। এখানে সাধারণ মানুষের করার কিছু নেই। সব আশা আকাঙ্ক্ষা এখন বিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের দিকে। ডাক্তাররা কিছুটা হলেও এর চিকিৎসার পন্থা বের করে তা দিয়ে তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা দিন রাত ল্যাবরেটরিতে কাজ করছেন। তবে এখন অবধি প্রকৃত কোনও আশার বাণী আসেনি এই বায়োলজিক্যাল ওয়ারের বিরুদ্ধে।

তবে তারপরেও আশাহত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখন সময় শৃঙ্খলা পালনের। এবারের স্বাধীনতা দিবস পালন তখনই সার্থক হবে যদি আমরা সবাই সুশৃঙ্খলভাবে ঘরের ভেতর থাকি। করোনা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেই কাজগুলো করি। পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশকে এখন চিন্তা করতে হবে অতিরিক্ত অর্থনীতির মজুত, অতিরিক্ত সমরাস্ত্র তৈরি থেকে এখন বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপদ রাখার গবেষণায়। প্রতিটি দেশকে এখন এই গবেষণায় মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের এবারের স্বাধীনতা দিবসের তাই অঙ্গীকার হোক, বিজ্ঞানে বিশ্বাস ও গবেষণায় রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। এই হোক আমাদের স্লোগান।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ