করোনাকালে মানবতাবাদ

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১২:৩৯, মার্চ ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪১, মার্চ ২৭, ২০২০

মাসুদা ভাট্টি২০২০ সালের শুরুতেই যে ক্যালেন্ডার করেছিলাম নিজের জন্য, সেখানে মার্চ মাসটা ছিল পুরোপুরি লেখালেখির জন্য। বিশেষ করে যে লেখাগুলো জমা দেওয়ার কথা এ বছরের জুনের মধ্যে সেগুলো শেষ করার কথা ছিল মার্চের মধ্যেই। আগেই জানতাম যে ফেব্রুয়ারি মাসের পুরোটা এবং মার্চের মধ্যভাগ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে থাকতে হবে, একটা কোর্সের জন্য। ওদিকে ডিসেম্বর থেকেই সুদূর চীন দেশ থেকে যে করোনাভাইরাসের খবর চাউর হচ্ছিলো দিকে দিকে তা নিয়ে বাংলাদেশে বসে ভাবনাটা তেমন জোরালো হয়নি। এমনকি অনেককে হাসাহাসি করতে দেখেছি ফেসবুকে; বাদুড়-সাপ ইত্যাদি খাওয়া নিয়ে চীনাদের একহাত নিয়ে লেখালেখি দেখে কখনও কখনও মন্তব্যের ঘরে গিয়ে একথাটিই বলতে চেয়েছি যে, চীনাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে হাসাহাসি করে কী হবে, এই ভাইরাসের বিপদ নিয়ে ভাবী চলুন। নিজেও যে খুব বেশি এই ভাইরাস নিয়ে চিন্তিত হয়েছি সে কথা হলপ করে বলতে পারবো না। বরং ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে আসার প্রস্তুতি নিতে এবং কীভাবে নিজেকে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সময়টুকু সম্পূর্ণ কাজে লাগাতে পারি তার স্ট্র্যাটিজি ঠিক করেছি। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সেটা করতেও পেরেছি, এই প্রথম নিজেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত করার কৌশল নিজেই আয়ত্ত করতে পেরে যখন নিজেকে বাহাবা দেবো ভাবছি ঠিক তখনই দেখতে পাচ্ছি যে, গোটা বিশ্বেই মানুষ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, বাধ্য হয়ে, সরকারি নির্দেশে। লন্ডনের রাস্তায় চোখের সামনে মানুষ কমে যাচ্ছিলো, সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে কেন্টে নিজের বাড়িতে পৌঁছাতে কখনও রাত একটু বেশি হয়ে গেলে স্বাভাবিকের তুলনায় যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়াটা চোখের সামনে ঘটলো। আর এখন তো তিন মাস আগে দেখা আমার নিজস্ব পৃথিবী আর এখনকার পৃথিবীকে মেলাতেই পারছি না- আর কখনও আমার আগের পৃথিবীর সঙ্গে করোনাকাল-পরবর্তী পৃথিবীকে মেলাতে পারবো কিনা সেটাও জানি না, যদি করোনাকাল পার হয়েও বেঁচে থাকি।

এই মুহূর্তে আমি, আমরা, আমাদের পরিচিত সবাই নিজ নিজ দেশে কিংবা পরদেশে, নিজ নিজ ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে জীবন পার করছি। যুক্তরাজ্যের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও মোবাইল মেসেজে সরকার থেকে জানানো হয়েছে, কোনও সুনির্দিষ্ট কারণ (খাবার, ওষুধ ও ব্যায়াম) ছাড়া বাইরে বেরুলে জরিমানা কিংবা আইনের আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সরাসরি বলতে পারছে না যে, এ জন্য জেল-জরিমানা হবে, কারণ এখনও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও আইন করা হয়নি, তবে তড়িঘড়ি আইনের কিছু ধারা যোগ-বিয়োগ হয়েছে, যাতে পুলিশের ক্ষমতা বেড়েছে। এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই দোকানপাটে খাবার-দাবার বিশেষ করে টয়লেট পেপারের মতো তুচ্ছ সামগ্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি রীতিমতো হাস্যরস তৈরি করেছিল, কিন্তু এখন আর এই না-থাকাটা হাস্যকর নয় কারো জন্যই, বরং এটাই বাস্তবতা যে, গৃহবন্দি মানুষের আর বড়জোড় সপ্তাহখানেক চলার মতো খাবারদাবার আছে, এরপর মানুষকে এই ভয়াবহতা উপেক্ষা করে বাইরে বেরুতে হবে, যেখানে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে তা কিনতে হবে। আর কিনতে না পারলে? থাক, সেই ভয়াবহতার কথা আগেই না বলি। লেখাটি যখন লিখছি তখন টেলিভিশন সংবাদের স্ক্রলে বলা হচ্ছে যে, সারা পৃথিবীতে ৫ লাখের কাছাকাছি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং এরইমধ্যে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজারের মতো। এত অল্প সময়ে একটি মাত্র রোগে গোটা বিশ্বে এই সংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনার জীবিত কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই বলেই আমরা জানি। তার মানে গোটা বিশ্বের কাছেই এই অভিজ্ঞতা নতুনতর। এতদিন আমরা সন্ত্রাসী হামলা কিংবা ভূমিকম্প বা সুনামির আঘাতে মানুষের গণমৃত্যুর ঘটনা জেনেছি, যারা সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছেন তাদের ভাগ্যাহত বলে মেনেছি- আজ আমরা সবাই ভাগ্যাহত, সবাই এই মৃত্যুপুরীর অভিজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে আছি, কিংবা করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা ভাবছি; আমরা কেউই জানি না যে, এরপর কী হবে? আমরা কি আগের মতো জীবনযাপন করতে পারবো? নাকি তিন মাস আগেও যে জীবন আমরা যাপন করেছি, এই করোনাকাল পার হওয়ার পর কি সেই একই জীবন আমরা ফিরে পাবো? নাকি বদলে যাবে আমাদের জীবনযাপন এবং মূল্যবোধ? সবই অনিশ্চিত, সবই এক অন্ধকার পর্দায় আচ্ছাদিত।

খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। তখনও বাংলাদেশে এলাকাভেদে কলেরা হানা দিতো। এরকম ফাল্গুন-চৈত্র মাসেই ঘটতো কলেরা সংক্রমণ। ১৯৮৫ সালেই বোধহয় সর্বশেষ কলেরার সংক্রমণ ঘটেছিল আমাদের এলাকায়। ওর স্যালাইন বের হলেও আমাদের এলাকায় সে সময় কারো মুখে তার নাম শুনিনি। তখনও কলেরার জন্য গ্রামের বিখ্যাত মৌলভী সাহেব রাতে দলবল নিয়ে বালা তাড়াতে বের হতেন। দোয়া পড়তে পড়তে গ্রামের একপাশ থেকে আরেক পাশ দিয়ে পাশের গ্রাম হয়ে যেখানে শুরু করেছিলেন সেখানেই শেষ করতেন, এই প্রক্রিয়াকে বলা হতো ‘রোন ফেরা’। আমি জানি না এতে কাজ হতো কিনা, তবে সেবার দুটো মৃত্যু আমার মনে ভয়ঙ্কর দাগ কেটেছিল। আমাদের খেলার সঙ্গী ছরোয়ার আর গ্রামের সবচেয়ে তাগড়া জওয়ান বলে যে মানুষটাকে সবাই ভালোবাসতো সেই আব্দুল আলী ভাই মারা যান কলেরায়। দিনভর ঘরের ভেতর বসে থাকতে হতো তখন আমাদের, বাইরে “ভুঁই-ফাটা” রোদ, চষা জমির দিকে তাকালে মরীচিকা দেখা যেতো জানালা দিয়ে, গ্রামের লোক বলতো ‘বিলাই দৌড়ায়’, বলা হতো যেদিন এই ‘বিলাই দৌড়ানি’ বন্ধ হবে সেদিনই কলেরার বালা দূরে চলে যাবে- বৃষ্টির জন্য মানুষ হাহাকার করতো, কারণ বৃষ্টির পরেই কলেরার বালা ভেসে যাবে বলে মুরুব্বিরা বলতেন। পৃথিবী এগিয়েছে, কিন্তু এখনও এই করোনাকালেও আমার মনে হয়েছে, মানুষ মনেপ্রাণে এরকম এক অলৌকিক বৃষ্টি কিংবা অদৃশ্য ‘বিলাই দৌড়ানি’ বন্ধের প্রতীক্ষায় যে যার অবস্থান থেকে প্রার্থনা করে চলেছেন। এখানেই বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্তরাজ্য কিংবা ইতালি বা স্পেনের সাধারণ মানুষের মিল, সবাই এক অলৌকিকের অপেক্ষা নিয়ে বেঁচে আছে, যারা বেঁচে আছেন।

 চীনের পরে যখন করোনাভাইরাস কোরিয়া, জাপান হয়ে ইতালিতে আক্রমণ হানতে শুরু করলো তখন থেকেই পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়ে উঠলো। তার আগে কী বাংলাদেশ, কী আমেরিকা বা যুক্তরাজ্য, কেউই তেমনভাবে এই ভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে প্রত্যয় হয় না।  কারণ, আমরা দেখতে পেলাম যে, এই প্রস্তুতির অভাবেই করোনাভাইরাস সুযোগ পেয়ে ব্যক্তির শরীরে প্রথমে ঢুকে গেলো এবং তারপর ‘কমিউনিটি’র শরীরে প্রবেশ করতে শুরু করলো। খবর আসতে লাগলো একের পর এক মৃত্যুর। চীনকে ছাড়ালো ইতালি, ইতালিকে ছাড়ালো স্পেন, এরপর কে কাকে ছাড়াবে বলা মুশকিল। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো ঘনবসতির দেশে করোনা ঢুকে কতটুকু কী করতে পারছে তা আসলে ততক্ষণ জানা যাবে না যতক্ষণ না দেশের সরকার সেটা জানাচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ যতটুকুই নেওয়া হোক না কেন, প্রয়োজনের তুলনায় সেটা সব সময়ই কম।  কারণ, স্বাস্থ্যসেবা খাতটি বাংলাদেশ বা ভারতের মতো সরকারের জন্য মুখ্য সেবাখাত এখনও হয়ে ওঠেনি।  প্রথমে ‘অন্ন’, তারপর ‘বস্ত্র’, তারপর ‘বাসস্থান’ এবং তারপর ‘চিকিৎসা’ - এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতটির অবস্থান এরকমই।  হয়তো করোনাকাল পার হওয়ার পর এই ধারাক্রমে পরিবর্তন এলেও আসতে পারে কিন্তু ততদিনে কীসে কীসে পরিবর্তন আসবে বা আসতে পারে তা নিয়ে এই দুঃসময়ে ভেবেচিন্তে শরীর-মন বিষাক্ত করার কোনও মানে হয় না।

আপাতত এই করোনাকাল মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপগুলো মেনে নিয়ে যার যার নিরাপত্তা বজায় রেখে সমষ্টির নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে সময়োচিত পদক্ষেপ। এতে আমরা স্বার্থপর হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি বটে কিন্তু একই সঙ্গে এই সত্যও স্বীকার করতে হবে যে, দূরত্বই যদি বাঁচায় জীবন তাহলে দূরত্বকেই মেনে নিতে হবে। ভয় হচ্ছে এটা ভেবে যে, দূরত্বের এই বাস্তবতা পরিবার ও সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, কতটা দূরে নিয়ে ফেলবে একজনকে আরেকজন থেকে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রই বা শেষাবধি কতটা ব্যক্তিকে দূরে রেখে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে, কতটা প্রয়োগ করবে সেটাও চিন্তকদের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অজুহাতে রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এই বলে যে, হয় রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারিতে থেকে বেঁচে থাকো না হলে করোনার মতো অনাগত আরও কোনও মারণ-ভাইরাসের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করো, তাহলে বলাই বাহুল্য যে, নাগরিক সব অন্তত বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রের এই ক্ষমতার প্রয়োগকে মেনে নেবে, গণতন্ত্রের প্রশ্ন তখন আরও অবান্তর হয়ে যাবে। আর এই করোনাকাল পার হওয়ার পর এর অভিঘাতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে যারা ভাবছেন তারা আসলে নতুন করে কিছুই ভাবতে পারছেন না অনাহার, যুদ্ধ আর মৃত্যু ছাড়া- সেটাও মানুষেরই মৃত্যুই।

তবে বিখ্যাত ও মানবতাবাদীদের কেউ কেউ  (যেমন ইওভাল নোয়াহ্ হারারি) বলতে চাইছেন যে, করোনাভাইরাস মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে বটে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের তীব্র সুযোগ করে দিচ্ছে যদিও, তবু মানুষ চাইলে এই করোনাকালেই আন্তর্জাতিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, দেশে-দেশে সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও মানবতাবাদী করে তুলতে পারে। সেটা কীভাবে? খুব সহজ, চীন বা কোরিয়ার অভিজ্ঞতা ইতালি কাজে লাগাবে, ইতালির সাহায্যে এগিয়ে যাবে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকের জন্য তৈরি চিকিৎসা সরঞ্জাম বাংলাদেশ বা ভারতকে দিয়ে সেখানকার মানুষের জীবন বাঁচাবে এবং সর্বশেষ জার্মানির মতো দেশগুলো বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মানুষের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিজেদের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে এসব দরিদ্র, জনবহুল, ক্ষুধার্ত রাষ্ট্রগুলোর মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে। করোনাকাল মানুষকে আরও মানবিক করবে, রাষ্ট্রগুলোকে করবে মানবিকতম- এটা হয়তো কেবলই আশাবাদ, তবু আশাবাদী না হলে এই করোনাকালে বেঁচে থাকাটাই হবে চরম এক নিষ্ঠুরতা; এখন নির্বিকার থাকার কাল নয়, এখন করোনাকাল।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ