করোনা, হোম কোয়ারেন্টিন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি

Send
অর্পিতা শামস মিজান
প্রকাশিত : ১৯:৩১, এপ্রিল ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৫, মে ০১, ২০২০

অর্পিতা শামস মিজানমাওলানা রুমীর এক গল্পের সারমর্ম এই, পূর্বে যে পথিকেরা যাত্রা করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা পরবর্তী যাত্রীদের জন্য শিক্ষাস্বরূপ। কোভিড ১৯-এর ভয়াল থাবায় পুরো পৃথিবী এখন বিপর্যস্ত, আর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এর ভয়াবহতা বুঝতে পারছে। আশার কথা হলো, অন্যান্য রাষ্ট্রে হোম কোয়ারেন্টিন একটি কার্যকরী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে এবং আমরাও এখন সেই পথে চলছি। কোয়ারেন্টিন আমাদের জন্য একটি নতুন ধারণা ছিল। অতএব, আমাদের জনসাধারণের মধ্যে এ নিয়ে বেশ খানিকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। তবে, মানুষ যখন বুঝতে পেরেছে কেন কোয়ারেন্টিন গুরুত্বপূর্ণ, এখন ধীরে ধীরে সবাই এটি মানছেন। তবে সময় আরও লাগবে, তা বলাই বাহুল্য।
কোয়ারেন্টিন নিয়ে সামাজিক ও অন্যান্য গণমাধ্যমে হওয়া বেশিরভাগ আলাপের মূল প্রতিপাদ্য হলো কীভাবে বাড়িতে থাকতে হবে, বাড়ির ভেতর কীভাবে নিজেকে আলাদা রাখতে হবে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে, দূরত্ব মেনে চলতে হবে। একটা বিষয় পরিষ্কার, বাড়িতে থাকাটাই সকলের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও কল্যাণকর।

কিন্তু হোম কোয়ারেন্টিনের সুফলজনিত আলাপের মাঝে একটা বড় আলাপ এখনও আসেনি, তা হলো হোম কোয়ারেন্টিনের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা। মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের দেশে এখনও খুব জরুরি বিষয় হিসেবে গণ্য হয় না। বরং, এও বলা হতে পারে, প্রাণঘাতী করোনার সময় মনের কষ্ট নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করা বিলাসিতা ছাড়া কিছু না। কিন্তু চীন, আমেরিকা, কানাডায় ইতোমধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে চীনে করা জরিপে দেখা যায়, ৪২.৬ শতাংশ ব্যক্তি করোনার ভয়ে অ্যাংজাইটিতে ভুগছেন। এর পূর্বে সার্স, ইবোলা এ জাতীয় মহামারির সময়েও মধ্যপ্রাচ্য ও কানাডাতে মানসিক রোগের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। তাই করোনার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বাতিল করা যাবে না।

লম্বা সময় ঘরে বসে থাকার একটা মানসিক চাপ আছে। প্রতিদিন অফিসে কাজ করে যারা অভ্যস্ত, দিনের পর দিন বসে থেকে এই কর্মোদ্দীপ্ত মানুষদের এক ধরনের হতাশা তৈরি হবে। সেই হতাশা থেকে ধীরে ধীরে হবে ক্রোধ ও বিষণ্ণতা। আমেরিকার সিডিসি বা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ইতোমধ্যে তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, করোনাকালীন দীর্ঘ হোম কোয়ারেন্টিনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে আছে দ্বিধা (confusion), ক্রোধ (anger), বিষণ্ণতা (depression), এবং PTSD (Post Traumatic stress Disorder)।

আসুন দেখা যাক এগুলো কীভাবে হতে পারে।

লকডাউনের ফলে অনেকের কাজ, পড়াশোনা, জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী তাদের পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি, এর ফলে অনেকেই হয়তো চাকরির পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়বেন। অনেক বিয়ের অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে, যার নানামুখী পারিবারিক, সামাজিক প্রতিক্রিয়া হবে। অনেকের ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে, দিনকাবারি ভিত্তিতে কাজকরা মানুষেরা ভীষণ অনিশ্চয়তার মাঝে পড়েছেন। প্রবাসফেরত মানুষেরা জানেন না তাদের জন্য দেশে বা প্রবাসে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষায় আছে। 

সোশ্যাল আইসোলেশন বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক মানুষ এখন পরের মুখাপেক্ষী। কোয়ারেন্টিনের মানুষেরা তাদের খাবার, পোশাক, ওষুধপত্র এসব কিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার প্যানিকের কারণে মুদির দোকানে ভিড়। হয়তো কেউ গিয়ে কোনও খাবার পেলেন না। অথচ তার কেনার সামর্থ্য ছিল। এই ব্যর্থতা তার মনে একটি হতাশার জন্ম দেবে, যে আমি আমার পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ। যে মানুষেরা তাদের নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিয়ে অভ্যস্ত, হঠাৎ করে তারা দেখছেন, তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আর নিজের হাতে নেই। অপরের কথায় তাদের জীবনযাপন করতে হচ্ছে। তারা হয়তো জানেন, রাষ্ট্রের এই নিয়মগুলো সবার মঙ্গলের জন্য, কিন্তু সাবকনশাস লেভেলে মস্তিষ্ক ভাবছে, ‘আমার হাতে আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই’। নিয়ন্ত্রণহীনতার ভয় মানুষকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।

যারা বিষণ্ণতার রোগী, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। অনেকেই এর ফলে রিল্যাপ্স করতে পারেন। অনেকের বডিক্লক নষ্ট হয়ে যায়। যেমন, অনেকেই হয়তো সারারাত জেগে থাকছেন, আর ভোরের আলো ফুটলে ঘুম আসছে। রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়েও কাজ হচ্ছে না। অনেকের মধ্যে ইটিং ডিজঅর্ডার দেখা দিচ্ছে।

হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবার স্ট্রেসে আছেন কারণ তারা জানেন না, কী হতে যাচ্ছে। সামান্য ঠান্ডা লাগলেও মানুষ ‘প্যানিক’ করছেন, যার একটা বড় কারণ সঠিক তথ্যের অভাব।

সামাজিক গণমাধ্যম এবং আলাপ-আলোচনায় প্রচুর তথ্য লেনদেন হচ্ছে, যার কিছু সঠিক, কিছু ভুল। এই ‘মিস-ইনফরমেশন’-কে সঠিক তথ্য থেকে ছেঁকে আলাদা করা বেশ দুরূহ একটি কাজ। এর ফলে মানুষ বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন, একে অন্যের ওপর দোষারোপ করছেন। ফেসবুক খুললেই দেখা যায়, একদল প্রবাসীর ওপর ক্ষিপ্ত, আরেকদল প্রবাসীদের নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, একদল ডাক্তারদের গালিগালাজ করছেন, অনেকে কন্সপিরেসি থিওরি তৈরি করছেন।

সব মিলিয়ে চরম অবিশ্বাসের একটা আবহ তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে নিজের বিচার বিবেচনা ঠিক রাখা কঠিন। দিনের পর দিন এই অনিশ্চয়তায় থাকলে মানুষের মনে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়। বাইরের জগৎ সম্পর্কে সবরকম উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, বাস্তবতার সঙ্গে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। মনোবিজ্ঞানে একে বলে ‘Detachment’, যখন আমার মাথার ভেতর কী ভাবছি আর আমার আশেপাশে কী হচ্ছে, তার মধ্যে সীমারেখা গুলিয়ে যায়।

আরও দুটি দল আছে, যারা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া নারীরা। মনোবিজ্ঞানের একটি বহুল প্রমাণিত ঘটনা হচ্ছে, হতাশ ও নিরুপায় মানুষ তার রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, তার ওপর নির্ভরশীল ও দুর্বল মানুষের ওপর যেমন স্ত্রী ও সন্তানের ওপর অত্যাচার করে। পারিবারিক নির্যাতন যেহেতু লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে, নির্যাতনকারীর সঙ্গে ভিকটিম এক ছাদের নিচে থাকে, তাই এ নির্যাতন চিহ্নিত করা কঠিন। এই পারিবারিক নির্যাতন শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিকও হতে পারে।

লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে, তখন যৌতুকের দাবি করা হবে। পুরুষের আয়ে চলা অনেক বাড়িতে এই ঝুঁকি এখন বেড়ে যেতে পারে। লকডাউনের ফলে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা এখন তাদের নির্যাতকদের সঙ্গে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এক বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে হয়তো নির্যাতনকারী ব্যক্তি বাইরে (অফিসে) গেলে কিছুক্ষণের জন্য ভিকটিম নিরাপদ বোধ করতেন, এখন সে উপায় নেই। এটি শহর-গ্রাম সবখানেই হতে পারে। এতে আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

শিশুরা দিনের দিনের পর দিন বাসায় বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ইনফেকশনের ভয়ে এখন তাদের আশেপাশে খেলতে দেওয়া হচ্ছে না, বারবার পরিচ্ছন্ন থাকতে বলা হচ্ছে, ছোট শিশুদের জন্য এত নিয়ম মেনে চলা বা তার গুরুত্ব অনুধাবন করা খুব কঠিন। এর ফলে শিশুরা ভয় পেতে পারে, তাদের মনে হতে পারে, এটা কী এক ধরনের শাস্তি? মা-বাবা কি রাগ করে তাদের খেলতে মানা করে দিচ্ছে? শিশুরাও বিষণ্ণতায় ভোগে, এটা আমরা অনেকেই জানি না। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডি. ওয়াইন্সটক মন্তব্য করেছেন, ‘এটা কেবল নেটফ্লিক্স দেখা বা ফেসটাইম করার ব্যাপার না। এই শিশু কিশোরেরা তাদের জীবনের বড় একটা সময় হারাচ্ছে যখন তাদের হৈচৈ করার কথা ছিল।’ তাছাড়া, এসব সুযোগ সচ্ছল পরিবারের শিশুদের। নিম্নবিত্ত শিশুরা, যারা পথেঘাটে খেলে অভ্যস্ত, তারা এখন খেললে স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে, না খেললে মানসিক অবসন্নতার ঝুঁকিতে। তাছাড়া, এসময় শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা অনেক দিন পর্যন্ত ধরা পড়বে না। দিনের পর দিন ঘরে থেকে নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশুর সাংঘাতিক মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।

আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ আছে। আমাদের পূর্বসূরি রাষ্ট্রদের ইমারজেন্সি রেসপন্স থেকে আমরা যেমন শিখেছি, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও যেন আমরা সেভাবে গণনায় আনি। দেশে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে, যেগুলো এসময় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম। আমরা কোয়ারেন্টিনে যেন সাবধানে থাকি, সচকিত থাকি, কাউকে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত দেখলে যেন সঠিক পদক্ষেপ নেই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ