‘যদি কিছু মনে না করেন’

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৫, এপ্রিল ০২, ২০২০

আবদুল মান্নানলেখার শিরোনামটা আমার নয়, ধার করা। সত্তর ও আশির দশকে বিটিভিতে ফজলে লোহানি (বর্তমানে প্রয়াত) প্রতি সপ্তাহে অনুষ্ঠান করতেন। সেটি ছিল বিটিভি’র সোনালি যুগ। বহুপ্রতিভার অধিকারী ফজলে লোহানি ছিলেন এ যাবৎকালের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সেরা ‘শোম্যান’। ষাটের দশকে তিনি লন্ডন হতে তার জাগুয়ার গাড়িটি চালিয়ে ঢাকায় এসে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। অধুনালুপ্ত পাকিস্তান অবজারভারে লিখেছিলেন তার সেই দুর্দান্ত ভ্রমণ কাহিনি ‘Crossing from Europe to Asia.’ তার অনুষ্ঠানে সহকারী ছিলেন হানিফ সংকেত আর খেয়ালি নামের একজন তুখোড় তরুণী। খেয়ালি আমার এক সাবেক সহকর্মীকে বিয়ে করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সংসার পেতেছেন। অনুষ্ঠানটি অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল, কারণ ফজলে লোহানি কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নির্দ্বিধায় তুলে ধরতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার যদি কোনও বস্তুনিষ্ঠ সমলোচনায় অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে আমি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবো। আমি বিশ্বাস করি আমি যাদের সমালোচনা করি, তারা আমাকে বন্ধু জ্ঞান করবেন, কারণ তাতে তাদের মঙ্গল হবে।’ ফজলে লোহানিকে তার জীবদ্দশায় কোনও অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হয়নি। তিনি একদিন হঠাৎ করে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

মরহুম ফজলে লোহানির অনুষ্ঠানের শিরোনাম ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে সারা বিশ্ব এবং বাংলাদেশ করোনাভাইরাসজনিত সমস্যা নিয়ে যখন নাকানি চুবানি খাচ্ছে, বাংলাদেশে তখন কিছু অসৎ ও ধান্ধাবাজ ব্যক্তি এমন কিছু বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আচার আচরণে জনগণকে কথায় বিভ্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত করে তুলছে, তা হয় তারা বুঝতে পারছেন না অথবা বুঝলেও তারা তাদের অসৎ কর্মকাণ্ড চালু রেখেছেন স্রেফ সরকার ও জনগণের ক্ষতি সাধন করার জন্য। তাদের প্রধান আক্ষেপ কেন বাংলাদেশে প্রতিদিন শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে না, আর গণ্ডায় গণ্ডায় মারা যাচ্ছে না। এদের মধ্যে যেমন আছেন শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ, তেমন আছেন অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত মহামূর্খ মানুষ, যাদের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তাদের ব্যাপারে সরকার বা মিডিয়া তেমন একটা সোচ্চার হতে পারছে না বা পদক্ষেপ নিতে পারছে না, কারণ কখন কে কী মনে করেন সেই ভয়ে। সেজন্যই লেখার শিরোনামটি ধার করেছি। অনুরোধ করেছি কিছু বক্তব্য পছন্দ না হলেও যেন কিছু মনে না করেন।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে করোনাভাইরাস বাস্তব সমস্যা, কিন্তু তার চেয়েও বাস্তব হচ্ছে গুজব। এই সমস্যা শুধু যে বাংলাদেশের সমস্যা তা নয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার পুলিশের সাইভার ক্রাইম পেট্রোল এমন একটি সিন্ডিকেটকে গত সোমবার আটক করেছে, যাদের কাজই ছিল করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ছড়ানো। তেমন খবর দিচ্ছে মঙ্গলবারের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দি প্রিন্ট’। সেই সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন একজন সাবেক আমলার স্ত্রী, কয়েকজন কলেজ অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ, সরকারি স্কুলের কতিপয় শিক্ষক, একজন সাবেক সংসদ সদস্য, কলকাতার একটি অভিজাত ক্লাবের একজন চেয়ারম্যান, ভারতের একটি বড় টিভি চ্যানেলের একজন সিনিয়র সম্পাদক। নিয়মিত তারা রাজ্যে করোনাভাইরাস বিষয়কে তথ্য বিকৃত করে সংবাদ ছড়াতেন। কলকাতা পুলিশ সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর দায়ে সর্বমোট ৪৩টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তিকে আটক করেছে। বাংলাদেশে এমন কাণ্ড নিয়মিত ঘটছে। একটি বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক তাদের অনলাইন ইংরেজি সংস্করণে সোমবার খবর দিচ্ছে, গত নয় দিনে দেশে আঠারজনের মৃত্যু হয়েছে করোনাভাইরাসে। মঙ্গলবার খবর পেলাম কয়েকটি জনপ্রিয় প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের ভুয়া পেজ খুলে ফেসবুকে বাংলাদেশের একটি বড় সিন্ডিকেট নিয়মিত মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে, আর এই কাজটি যারা করছে তারা বেশিরভাগই আওয়ামী লীগে অন্য দল হতে অনুপ্রবেশকারী, যাদের বেশিরভাগই আবার জামায়াত-শিবির হতে এসেছে। 

সরকার করোনাভাইরাসের ঝড় রুখতে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। যেহেতু এই পরিস্থিতি শুধু আমাদের দেশের জন্যই নয় সারা বিশ্বের জন্যই একটি নতুন অভিজ্ঞতা, সেহেতু আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু চেষ্টার ঘাটতি আছে তেমন একটা কি বলা যাবে। আমাদের চেয়ে ঢের শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ইরান, উত্তর কোরিয়া বা ভারত। তার ওপরে এসব দেশের প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের ধারেকাছেও নেই। ভারতকে বাদ দিলে এসব কোনও একটি দেশে একটি কক্ষে নয়-দশ জন মানুষ গাদাগাদি করে থাকে না বা একটি কলতলা পানির জন্য পাড়ার সকলে ব্যবহার করেন না। ইউরোপ ও আমেরিকায় যাদের বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে, তাদের জন্য বাস্তবে হাসপাতালের দরজা বন্ধ। সেসব দেশের সরকারের বক্তব্য হচ্ছে এসব বুড়াকে বাঁচিয়ে কী হবে? ইতালিতে অনেক বৃদ্ধ নিজ বাড়িতে নীরবে মৃত্যুবরণ করে পড়ে আছেন, দেখার কেউ নেই। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় মনে হয় বিশ্বের বৃহত্তম ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ ‘ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের’ শিক্ষার্থী সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও এই ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বন্ধ তো হয়ইনি, বরং বর্তমানে চব্বিশ ঘণ্টা চালু আছে। চারিদিকে একধরনের মাতম। বাংলাদেশে পিপিই কেন নেই? বাংলাদেশ নাকি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ, তাহলে এই পিপিই তারা বানাতে পারছে না কেন? টেস্ট কিটের সংখ্যা এত কম কেন? সরকার নাকি দেশটাকে উন্নয়নের মডেল বানিয়েছে। তাহলে এই ভাইরাস রোধে কেন কিছু করতে পারছে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো প্রতিদিন জনগণের সামনে এসে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। শেখ হাসিনা গণভবনের ভিতরে ঠান্ডা বাতাসে বসে আরাম করেন। অভিযোগের সীমা নেই।

আমি যারা পিপিই নিয়ে জেরবার, তাদের কয়েকজনের কাছে জানতে চেয়েছি এটি কী এবং কাদের জন্য প্রয়োজন? একজন সবজান্তাও তার কোনও উত্তর দিতে পারেননি। তাদের সকলেরই ধারণা ডাক্তাররা যে অ্যাপ্রোন পরে কাজ করেন, সেটাই পিপিই। যখন বলেছি ‘ভাই বিষয়টা না জেনে হৈচৈ করা সহজ। জানলে করতেন না’। তাদের বলি পিপিই হচ্ছে ‘Personal Protection Equipment’। যারা বিপজ্জনক পেশায় নিয়োজিত, তাদের এসব জিনিস কাজে লাগে। যেমন একজন ক্রিকেট খেলোয়াড় ব্যাট করতে নামার আগে বা একজন উইকেট কিপার মাঠে নামার পূর্বে হেলমেট, প্যাড, এভডোমেন গার্ড, গ্লাভস ইত্যাদি পরে মাঠে নামেন। এসবের সমন্বয়ে হয় একজন ক্রিকেট খেলোয়াড়ের পিপিই। যিনি আগুন নেভানোর পেশায় আছেন তারও নির্ধারিত পিপিই আছে, যেমন আছে একজন পর্বত আরোহীর বা একটি ফাইটার বিমানচালকের। প্রত্যেক পিপিই’র নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাদের কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকদের বেলায়ও তাই। যিনি সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা করবেন, তার প্রয়োজন বিশেষ ধরনের কাপড় দিয়ে সেলাই করা অ্যাপ্রোন, গ্লাভস, বিশেষ ধরনের মাস্ক ও চোখের চশমা, যা তাকে রোগীর সান্নিধ্যে এলে পরতে হবে। একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের পিপিই আর একজন সংক্রামক ব্যাধি যেমন করোনাভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসকের পিপিই একই রকমের হবে না। আর এগুলো চানাচুর নয় যে মুদির দোকানে পাওয়া যাবে। সারা বিশ্বে এই সময় লাখ লাখ পিপিই প্রয়োজন। কোনও দেশ তো এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। থাকলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালি অথবা স্পেনে এগুলোর ঘাটতি হতো না। একই কথা টেস্টিং কিট ও ল্যাব। সারা বিশ্বে এসব জিনিসের চাহিদার একটি বিস্ফোরণ তো হয়েছে। সেটা সামাল দিতে বাংলাদেশের সময় তো লাগতেই পারে। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা তো ছিলই। তবে এখন সরকার নিজের সাধ্যমতো যে চেষ্টা করছে, তার কিছুটা হলেও প্রশংসা তো করা যেতে পারে। যারা বলেন শেখ হাসিনা এই সময়ে গণভবনে হাওয়া না খেয়ে ট্রুডোর মতো কেন সামনে এসে দিনের চিত্র তুলে ধরছেন না, তাদের উদ্দেশে বলি—প্রথমে আমাদের সকলকে কানাডার জনগণের মতো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমরা ট্রুডোর মতো শাসক চাইবো আর আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাবো, তা তো হবে না। আর যারা মনে করেন শেখ হাসিনা গণভবনে বসে হাওয়া খান, শেখ হাসিনার পিতাকে যারা চিনতে পারেননি তারা তাদেরই সন্তান বা একই চিন্তাধারার মানুষ। শেখ হাসিনা আগে বলতেন, তিনি রাতে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান। এখন তাও ঘুমান কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

অনেকে মনে করেন বাংলাদেশে উত্তর কোরিয়ার কিম উন জং-এর মতো একজন শাসক প্রয়োজন। সেই দেশে কোনও করোনাভাইরাস নেই যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় দশ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃত্যুবরণ করেছিল দুইশ’র মতো। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মতে উত্তর কোরিয়ায় কোনও মানুষের করোনা না হওয়ার একটি সরকারি হুকুম আছে। হলে মাথায় একটা গুলি। বাংলাদেশ বা অন্য কোনও দেশ তো এত নির্দয় হতে পারবে না। এর মধ্যেও কিম মিসাইলের বোতাম টিপছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জুনিয়র শিক্ষক দশদিন ঘরবন্দি থাকার পর কিছু বাজার করতে বের হয়েছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন বাজার তো নয় যেন বৈশাখি মেলা। সব আগের মতো ঠিক যেমনটি ঢাকার অনেক এলাকায়। চায়ের দোকানে, নাপিতের দোকানে মানুষ আড্ডা মারছে, সরকারের ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে আসর গরম করছে, একজন মুরুব্বি নাকি বলছে ‘এই সরকার নামাজ বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে। সৌদি আরবে নামাজ বন্ধ হয়েছে বাদশার হুকুমে। শেখ হাসিনা কি আমাদের বাদশা?’ সকলে বলে উঠলেন—‘ঠিক ঠিক।’ নাও যদি শোনেন তারপরও সরকারকে বলি কখনও কখনও জনস্বার্থে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাস্তায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। কেউ মারা গেলে যখন স্বজনরা মৃত ব্যক্তির জানাজার ব্যবস্থা বা কবর খোঁড়া হতে দূরে থাকছেন, তখন পুলিশরাই কবর খুঁড়ে মৃত মানুষটির জানাজা পড়ে কবর দিচ্ছেন। মৃত ব্যক্তি হয়তো অন্য কোনও অসুখে মারা গিয়েছিলেন। তারা সকলে মানুষকে বুঝাচ্ছেন। এই সব নিষ্ফল চেষ্টা। যেহেতু বাংলাদেশ উত্তর কোরিয়া হতে পারবে না, আর শেখ হাসিনাও কিম জং উন নন, তাই অন্তত আগামী দশদিন দেশে কারফিউ জারি করা হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করার জন্য দিনে দু’ঘণ্টা বিরতি দেওয়া হোক, আর যারা দিনে আনে দিনে খায় তাদের সরকারিভাবে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করার ব্যবস্থা করা হোক। মিডিয়াসহ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কারফিউর আওতামুক্ত রাখা হোক। যেসব প্রতিষ্ঠান ত্রাণ বিতরণ করছে, তাদের এই কারফিউর আওতার বাইরে রাখা হোক। একটু কঠোর না হলে আদর অনুরোধ করে কোনও কাজ হবে না, আর করোনাও এখান হতে বিদায় হবে না। এত আদর আপ্যায়ন তারা অন্য কোথাও পায়নি যে। কথায় বলে মারের ওপর ওষুধ নাই।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ