বহুরূপী করোনা এবং বিশ্বনেতাদের নির্লিপ্ততা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৩৮, এপ্রিল ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪০, এপ্রিল ৩০, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীএক বহুরূপী ভাইরাসের কবলে পড়েছে সারা বিশ্ব। চীনের জেঝিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি-লেনজুয়ান গত ১৯ এপ্রিল এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছেন করোনাভাইরাস ৩০টি জিনগত রূপ বদলেছে। চীনের হেংঝোউ নগরীতে আক্রান্ত ১ হাজার ২৫০ রোগীর মধ্যে থেকে বেশকিছু রোগীর নমুনা পরীক্ষায় কমপক্ষে ১৯টি করোনার নতুন প্রজাতি পাওয়া গেছে। এজন্য গবেষকরা বলছেন, ভাইরাসটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে সময় নেবে, আর তার প্রতিষেধক বের করাও জটিল হবে।
এতদিন ধরে উপসর্গ নিয়ে রোগী শনাক্ত করা যেতো। এখন কিন্তু উপসর্গ ছাড়াও রোগী পাওয়া যাচ্ছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ৩০০ সুস্থ লোকের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেখেছেন তার মধ্যে শতাধিক লোকের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে।
প্রাচীনকালেও ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছিল। এটা নতুন কিছু নয়। তিন হাজার বছর আগে ব্লাড অ্যালার্জির আক্রমণে মিশরীয় সভ্যতা লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। ব্লাড অ্যালার্জির কথাটা বাইবেলেও আছে এবং বাইবেলের সূত্র ধরে জেরুজালেমের টেম্পল স্কুল এবং বার্লিনের ইনস্টিটিউট অব ইকোলজি গবেষণা করে বলছে ব্লাড অ্যালার্জির সংক্রমণে প্লেগ মহামারি আকারে হয়েছিল। তাতে শুধু ইউরোপে পাঁচ কোটি এবং অবশিষ্ট দুনিয়ায় ১৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। সংক্রমণ দীর্ঘ পাঁচ বছরব্যাপী স্থায়ী হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা বলেন ফ্লোরিডার উপকূলে ব্লাড অ্যালার্জির উপস্থিতি এখনও আছে। তবে তা নিষ্ক্রিয় এবং বংশবিস্তার থেকে বিরত রয়েছে। এটা যদি সক্রিয় হয়ে বংশবিস্তার আরম্ভ করে, তবে বিশ্ব আরেক দুর্যোগের সম্মুখীন হবে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্লেগের কারণে যে ক্ষতি হয়েছিল বিশ্বে, তা পূরণ করতে দুই শতাব্দী সময় লেগেছিল। করোনাভাইরাসের কারণে ঠিক সারাবিশ্ব অনুরূপ একটা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, যে কারণে কিছু কিছু রাষ্ট্র লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিওবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান এতে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, দ্বিতীয় আক্রমণে করোনার চেহারা আরও ভয়াবহ হবে। কিন্তু মানুষ তো লকডাউন মানতে চাচ্ছে না। মানুষ করোনায় মরতে রাজি, কিন্তু অনাহারে মরতে রাজি নয়।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের কোনও সাহায্য ছিল না, এখন তো বিজ্ঞান তার উন্নতির শীর্ষে রয়েছে। আর গবেষক এবং বিজ্ঞানীরা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রতিষেধক আবিষ্কার করার জন্য। গত ২৩ এপ্রিল ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী মানবদেহে কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক প্রয়োগ আরম্ভ করেছেন। অন্যদিকে জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বায়োএনটেক মহামারি নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সম্ভাব্য একটি ভ্যাকসিন স্বেচ্ছাসেবীদের দেহে প্রয়োগ করা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অপর কোম্পানি পিজফারের সঙ্গে মিলে বায়োএনটেক এই ভ্যাকসিনটি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বায়োএনটেক জানিয়েছে, গত ২৩ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত জার্মানিতে ১২ জন স্বেচ্ছাসেবীর দেহে বিএনটি১৬২ নামের এই সম্ভাব্য ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ গবেষকরা বলেছেন, তারা ৯৫ শতাংশ আশাবাদী যে এবারও তারা সফল হবেন। স্রষ্টা যদি চান তিনি তার সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দেবেন, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। আর না হয় হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ব পরিক্রমায় এইরূপ বহু দুর্যোগ এসেছে। মানবসন্তানেরা তার মোকাবিলায় প্রতিষেধকও তৈরি করেছে। এবারও তাই হবে। হয়তোবা ভাইরাসটি বহুরূপী বলে একটু সময়ক্ষেপণ হবে বেশি।

সব মানুষকে লকডাউন কর্মসূচি নিয়ে ঘরে বসে থাকলে তো হবে না। খাদ্য উৎপাদন না করলে, প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল না হলে বিশ্ব তো অচল হয়ে যাবে। ৭৮০ কোটি লোকের বোঝা তো সহজ কথা নয়। ত্রাণ দিয়ে তো এত লোকের লালন পালন করা সম্ভব হবে না। উৎপাদন ছাড়া ত্রাণ তো অফুরন্ত নয়। আরও একটি কথা এখানে আলোচনা করা দরকার—এটা কোনও যুদ্ধ নয়, এখানে শত্রুপক্ষ-মিত্রপক্ষ নেই। বিশ্বব্যাপী করোনার আক্রমণ চলছে আর এই আক্রমণ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে। সুতরাং পৃথিবীর এই দুঃখের সময় সব রাষ্ট্রের একটা সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গবেষণা, ত্রাণ, পরস্পরের সহযোগিতার একটা ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার। কিন্তু তার অভাব প্রচণ্ড। বরং মাঝেমধ্যে মনে হয় বড় রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করছে। আমেরিকা চীনকে দোষারোপ করছে, চীন আমেরিকাকে দোষারোপ করছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। নিউইয়র্ক রাজ্যে তো মানুষ মরে সাফ হয়ে যাচ্ছে।

এমন দুর্যোগের সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তাদের অনুদান বন্ধ করে দিয়েছেন। তার অভিযোগ সংস্থাটির প্রধান চীনের পক্ষে কথা বলে। বিশ্ব নেতাদের এমন আচরণ ছোট ছেলেদের ঝগড়ার মতো। বিশ্ব যদি আরও বেশি সময় করোনায় ভোগে তবে বড় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বহীনতার কারণেই ভুগবে। ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, তিনি এখন যুদ্ধ অবস্থায়। আর তিনি আমেরিকার যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্টের আচরণে তো এত অস্থির ভাব থাকতে পারে না।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নির্বাক মানুষ। তিনি কনফুসিয়ান অর্থাৎ কনফুসিয়াস দর্শনে বিশ্বাসী মানুষ। কনফুসিয়াস দর্শন আগাগোড়ায় মানবতাবাদী দর্শন। আমরা বিশ্ববাসী আশা করব বিশ্বের বৃহৎ শক্তি বাগ্‌যুদ্ধ বন্ধ করে সবাই মিলে একটা সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিশ্বে নবজীবন সঞ্চালন করার উদ্যোগ নেবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেই আবেদন ইতোমধ্যে করেছেন। সারাবিশ্ব করোনায় দিশেহারা হয়েছে। সুতরাং একা কারও পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। এখন সমন্বিত উদ্যোগ সবার কাম্য হওয়া উচিত। ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের বিকল্প নেই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ