লকডাউনকে ‘নকডাউন’ নিয়ে বিতর্ক

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৪:৪৫, মে ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৭, মে ০৯, ২০২০

মো. জাকির হোসেনবিশ্বব্যাপী ভয়ংকর ত্রাস, করোনাভাইরাস। মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এই ভাইরাসের কোনও ওষুধ এখনও উদ্ভাবন হয়নি। আদৌ আবিষ্কার সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তবে বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে আবিষ্কার হয়েছে। এগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক মাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবারই বলছে করোনা সহসা যাচ্ছে না। বেশ কয়েকটি দেশের গবেষকরাও বলছেন করোনা শেষ হবার নয়, ঘুরেফিরে আসতে থাকবে। কতদিন থাকবে কিংবা ঘুরেফিরে আসার পালাটা কতদিন চলবে কেউ জানে না। বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। সরকার শিক্ষার্থীদের মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে ১৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন। ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে সরকার ২৯ মার্চ দেশের সকল সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে আক্রান্ত এলাকা লকডাউন করতে থাকেন। পাঁচ দফা ছুটি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের প্রায় সব এলাকাই এখন লকডাউনের আওতায়। লকডাউনের দীর্ঘ ৪২ দিন পর এবং প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্তের ৬৩ দিন পর আগামী ১০ মে থেকে লকডাউন শিথিল করে শর্তসাপেক্ষে সীমিত আকারে শপিংমল ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য এলাকায় শপিং মল ও দোকানপাট না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। ৭ মে থেকে মসজিদও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তবে মুসল্লিদের নিরাপত্তার স্বার্থে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা বাধ্যতামূলক কিছু নিয়ম প্রতিপালন করার জন্য মসজিদ কমিটিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। লকডাউন শিথিল করে শপিংমল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দেওয়ার পর এর বিপক্ষে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকাশ পাচ্ছে। এটি করোনা সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেউ কেউ উদাহরণ দিচ্ছেন প্রথম সংক্রমণের ৫০তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার, যা এখন দাঁড়িয়েছে ১১ লাখের ওপরে। আর বাংলাদেশে যেখানে প্রথম ৫০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার, সেখানে লকডাউন শিথিল ভয়ংকর ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা ঠান্ডা মাথায় লকডাউনের বিপক্ষে মতামত দিলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লকডাউন ইস্যুকে কেন্দ্র করে বেশ উত্তপ্ত। এখানে পরামর্শের চেয়ে ট্রল, গুজব, নেতিবাচক ও সরকারবিরোধী মন্তব্যই মুখ্য। যারা লকডাউন শিথিল নিয়ে ট্রল করছেন, তারা মুদ্রার একটা দিক অর্থাৎ শপিং করা ও ব্যবসায়ীদের মুনাফালাভকে মুখ্য করে তুলছেন। মুদ্রার যে আরেকটা পিঠ আছে যেখানে জীবিকা, ক্ষুধা, পরিবারের কান্না, কষ্ট, হতাশা, অর্থনীতির সূত্র আছে তা দেখছেন না, কিংবা দেখতে চাইছেন না। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ হারানো কয়েক কোটি মানুষ জীবিকা হারিয়ে স্মরণকালের ভয়াবহতম বিপদে পড়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু চাল-ডাল ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সহায়তা হিসেবে পেলেও বাসাভাড়া পরিশোধসহ পরিবারের অন্যান্য খরচ কে দেবে তার কোনও পথ জানা নেই? কপর্দকহীন পরিবার প্রধানকে যখন দিনশেষে সন্তান আর স্ত্রীর সামনে দাঁড়াতে হয়, কী ভয়ংকর অসহায় সে অভিজ্ঞতা, কে রাখে সে খবর? কোনও সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যখন সৃজনশীলতা ও ইতিবাচকতা পরিহার করে গুজব, ট্রল আর নেতিবাচকতাকে মুখ্য করে তোলে, তখন সে সমাজের অসুস্থতার জন্য ভাইরাসের প্রয়োজন পড়ে না। কারণ সে সমাজ ইতিমধ্যেই অসুস্থ।

লকডাউনের মাঝেই বাংলাদেশে দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনা। বাংলাদেশ এখন আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে ৩৭তম। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় যে দেশগুলো সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল, সেই দেশগুলোর অন্যতম সিঙ্গাপুর। এই সংক্রমণ মোকাবিলায় কঠোরতর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশটির প্রশংসা করেছিল। সিঙ্গাপুরকে রোলমডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সিঙ্গাপুরেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ৭৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে এখন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে দেশগুলোয় (মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন) সংক্রমণ কম ছিল, সেগুলোতেও সংক্রমণ বেড়েছে। এদিকে লকডাউন শিথিল করতেই রেকর্ড সংক্রমণ বেড়েছে নাইজেরিয়ায়। শিথিল লকডাউনে ভারতেও লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। ইউরোপ ও আমেরিকার পর ভারত, রাশিয়া ও ব্রাজিলকে করোনার পরবর্তী হট স্পট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার মানে বিশাল সীমান্ত শেয়ার করা প্রতিবেশী ভারত করোনার হট স্পট হওয়ায় বাংলাদেশেও করোনা মহামারি রূপ নেওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে ৪২ দিন লকডাউন চালানোর পর কেন তা শিথিল করে মার্কেট দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত? আমার অনুমান এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে যেসব বিষয় সরাসরি কিংবা অবচেতনভাবে কাজ করে থাকতে পারে তা হলো—এক. অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। কাজ হারানো কয়েক কোটি মানুষ জীবিকা হারিয়ে স্মরণকালের ভয়াবহতম বিপদে পড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত যা ২০ শতাংশের নিচে ছিল করোনার প্রকোপে তা বৃদ্ধি পেয়ে ইতোমধ্যেই ৪০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু চাল-ডাল ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সহায়তা হিসেবে পেলেও বাসাভাড়াসহ পরিবারের অন্যান্য খরচ কে দেবে? বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাজে সাধারণ মানুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাবশালী। পত্রিকায় দেখেছি বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থীকে ভিক্ষা করে হলেও বাড়ি ভাড়া পরিশোধের জন্য চাপ দিয়েছে বাড়ির মালিক। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে এপ্রিল ও মে মাসের ভাড়া শোধ করে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার রফা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালীদের যদি এ অবস্থা হয় সাধারণ মানুষ যারা কাজ হারিয়ে উপার্জনের অভাবে বাড়িভাড়া শোধ করতে পারছেন না তাদের অবস্থা কী? একটা বিতর্ক আসতে পারে জীবন আগে না জীবিকা? তাত্ত্বিকভাবে দু’টোই পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৫ সালে দায়েরকৃত Olga Tellis & Ors. vs. Bombay Municipal Corp. & Ors মামলার রায়ে বলেছেন, “The right to livelihood is to be treated as a part of the constitutional right to life”. বোম্বে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ও মহারাষ্ট্র সরকার বোম্বের ফুটপাতে ও বস্তিতে বসবাসকারী Olga Tellis ও অন্যদের উচ্ছেদ করে তারা যে জায়গা থেকে এসেছে সেখানে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিলে তার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, এরূপ উচ্ছেদের সঙ্গে তাদের জীবিকার অধিকারও লংঘিত হবে। আমাদের মতো গরিব দেশে যেখানে বেকার ভাতা কিংবা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও নিশ্চয়তা নাই, সেখানে ব্যক্তির উপার্জনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া মানে ব্যক্তির জীবন-মরণের প্রশ্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ গত বছর ‘ঈদের অর্থনীতি’ শীর্ষক কলামে লিখেছেন, মুদি থেকে কাপড় মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ দোকান রয়েছে। সেখানে বছরের অন্য মাসের চেয়ে রোজার মাসে বিক্রি বাড়ে প্রায় তিনগুণ, যার পরিমাণ ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। পোশাক ও অন্য পরিধেয় খাতে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি, জুতা-কসমেটিকস তিন হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্য সাত হাজার কোটি, জাকাত-ফিতরা ও দান-খয়রাত ৩৮ হাজার কোটি, যাতায়াত বা যোগাযোগ খাতে ১০ হাজার কোটি, সোনা-ডায়মন্ড পাঁচ হাজার কোটি, ভ্রমণ খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিকস চার হাজার কোটি, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় এক হাজার কোটি, পবিত্র ওমরাহ পালন তিন হাজার কোটি ও আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য খাতে লেনদেন হয় এক হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে ফার্নিচার, আবাসন, গাড়ি এসবের বেচাবিক্রি বাড়ে। বিত্তশালীরা শুধু জাকাতই দেন প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। এছাড়া রয়েছে পর্যটনসহ ভ্রমণ নির্ভর আয়। সব মিলিয়ে এ এক বিরাট যজ্ঞ। এবার বিশেষ এই পরিস্থিতিতে যার পুরোটাই বন্ধ হওয়ার দশা। রফতানি নির্ভর শিল্পগুলো কার্যত কর্মহীন। রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সে ধস নেমেছে। তাই অভ্যন্তরীণ বাজারেই এখন অর্থনীতি নির্ভরশীল। আর রোজার ঈদ হলো সেই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা। করোনার কারণে রাজস্ব আয় এক লাখ কোটি টাকা ঘাটতি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় খাত ভ্যাট। ঈদের বাজারের এ উপলক্ষটাই হয়তো কাজে লাগাতে চাইছে সরকার। গ্রামে-গঞ্জে দেখেছি অসুস্থতাজনিত কারণে কারও শরীর ঠান্ডা হয়ে আসলে হাতে-পায়ে তেল মালিশ করে শরীরকে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করা হয়। লকডাউন শিথিল করে সীমিত ব্যবসা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা মানে মৃতপ্রায় অর্থনীতির হাত-পায়ে তেল-মালিশ করা। দুই. ঘোষিত লকডাউন কাজে আসছে না। বিধিনিষেধ অমান্য করে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কারণে-অকারণে রাস্তায় বের হচ্ছেন। অলি-গলি দোকানেও ভিড়। লকডাউন কার্যকর করতে হলে খাবারের নিশ্চয়তা দিতে হয়। ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হয়। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে অনেক জায়গায় খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক কোটি মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি সামান্যই। ত্রাণের জন্য অনেক মানুষ একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে। লকডাউন সত্ত্বেও সামাজিক দূরত্ব অমান্য করে ছোঁয়া-ছুঁয়ি, ঘেঁষাঘেঁষি বন্ধ করা যায়নি। অন্যদিকে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার পর এক সপ্তাহেরও বেশি পার হয়েছে। এসব সত্ত্বেও প্রথম আক্রান্তের প্রায় দুই মাসে করোনা মহামারি রূপ নেয়নি বাংলাদেশে। এটি সরকারকে লকডাউনকে শিথিলের ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। তিন. পরিসংখ্যান বলছে করোনা আক্রান্ত ৮০ ভাগ মানুষ সাধারণ শুশ্রূষাতেই সুস্থ হয়ে উঠছে। ২০ ভাগ মানুষের হাসপাতালে সেবা নেওয়ার দরকার হয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের মধ্যে করোনা আক্রান্তের হার .০০৩ শতাংশ। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ৭ শতাংশের নিচে। আর বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ১.৬০ শতাংশ। এটিও সরকারকে লকডাউন শিথিলে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে। চার. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লকডাউন খুলে দেওয়ার বিপক্ষে নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় লকডাউন খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ছয়টি শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। কড়া নজরদারি, আইসোলেশনে রাখা, আশঙ্কা থাকলেই পরীক্ষা করে দেখা, সংস্পর্শে যাওয়া সবাইকে চিহ্নিত করা, কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রাখা এবং লকডাউন পরবর্তী সময়ে জনগণের সম্পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। এটিও সরকারকে লকডাউন শিথিল করতে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। পাঁচ. করোনার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়, আক্রান্তের চূড়ায় গিয়ে আবার তা নিম্নগামী হয়। চীনের পর যেসব দেশে ব্যাপকভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে সেখানে প্রথম সংক্রমণের পর ৩৮ থেকে ৭৬ দিনের মাথায় একদিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ শনাক্ত হতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ৭৬ দিনের মাথায় একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত পাওয়া যায় ৩২,১০৫ জন। এছাড়া যুক্তরাজ্য ৬৭তম দিনে, ফ্রান্স ৬৬, জার্মানি ও স্পেনে ৬১, ইতালি ৫৩, ইরানে ৪২ এবং নেদারল্যান্ডসে ৩৮তম দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ধরা পরে। বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, বাংলাদেশের আক্রান্তের সব ধরনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা যেতে পারে যে, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ কিংবা মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হতে পারে। সে বিবেচনায় হয়তো সরকার মে মাসের ৮ তারিখ থেকে মসজিদ ও ১০ তারিখ থেকে শর্তসাপেক্ষে শপিং মল ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ছয়. এই ভাইরাস হঠাৎ করে আসেনি। করোনাভাইরাস প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৩০ সালে। মুরগির শ্বাসনালিতে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ লক্ষ করা যায়। মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এমন করোনাভাইরাস প্রথম চিহ্নিত হয় ১৯৬০ সালে। ৬০ বছর আগে আবিষ্কৃত মানবদেশে সংক্রমণযোগ্য এই ভাইরাস হঠাৎ করে যেমন আসেনি, হঠাৎ করে চলে যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েই বলছেন। চীনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনা ঘুরেফিরে আসবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় কোনও মহামারিই দ্রুত শেষ হয়নি। দুই-তিন বছর, এমনকি একাধিকবার আঘাতসহ যুগ যুগ ধরে চলেছে এর প্রকোপ। ‘এন্টোনাইন প্লেগ’ (১৬৫-১৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত), ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগ’ (৫৪১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) ও ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ (১৯১৮-১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) এর উদাহরণ। করোনার টিকা আবিষ্কার হলেও তা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে টিকা দিতে ন্যূনতম এক-দেড় বছর সময় লাগবে। অর্থনীতির যে পাটাতনটা বহু কষ্টে তৈরি হয়েছে তা একবার ভেঙে গেলে ভয়ানক দুর্দশায় পড়বে মানুষ। স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশ তাই আক্রান্ত ও মৃত্যুর মধ্যেও লকডাউন শিথিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র অঙ্গরাষ্ট্র মিসিসিপিও মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেই লকডাউন খুলে দিয়েছে। জীবনের সঙ্গে জীবিকার ভারসাম্যের জন্যই লকডাউনকে নকডাউন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাল-চিত্র দেখে আমরা হয়তো ভুলে গেছি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে যাত্রার শুরুতে কী ভয়ংকর অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল। একটা ডিম কয়েকজনকে ভাগ করে খেতে হতো। পারমিট নিয়ে রিলিফের কাপড়, জুতা, গুঁড়া দুধের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। কপাল ভালো হলে মিলতো। আজকে যারা লকডাউন শিথিল নিয়ে সোচ্চার, আল্লাহ না করুন যদি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, এরাই সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে কসুর করবে না। সরকার হয়তো এটাও বিবেচনায় নিয়েছে। সাত. করোনা চিকিৎসায় আশাজাগানিয়া মোটামুটি কার্যকর একটি দাওয়াই ‘রেমডেসিভির’। ‘রেমডেসিভির’ চলতি মাসেই দেশের বাজারে আসছে। করোনার সম্ভাব্য মহামারি মোকাবিলায় এটিও সরকারকে লকডাউন শিথিলে অনুপ্রাণিত করে থাকতে পারে। আট. ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার আচরণ ভিন্ন। বিশ্বের মোট আক্রান্তের মাত্র ১১ শতাংশ ৮টি সার্কভুক্ত দেশের। জনঘনত্ব এখানে অনেক বেশি। পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে থাকা এই দেশগুলোতে বিশ্বের ২১ শতাংশ মানুষের বসবাস। তা সত্ত্বেও বিশ্বের মোট করোনা-মৃত্যুর ১ শতাংশেরও কম ঘটেছে এই ভূখণ্ডে। এটিও সরকারকে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। নয়. দুই মাস ধরে লকডাউন করেও অনেক দেশ সংক্রমণ, মৃত্যু ঠেকাতে পারছে না। নীরবে হলেও পৃথিবী ইতোমধ্যেই হার্ড ইমিউনিটির দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। এটিও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।

সরকার যেসব শর্তে মসজিদ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার অধিকাংশই অবাস্তবায়নযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। বাংলাদেশে আড়াই লক্ষাধিক মসজিদ আছে। এর বিরাট অংশই গ্রামাঞ্চলে। আমাদের জনসাধারণের সচেতনতার সংস্কৃতি বিবেচনায় পাঁচ বেলা জীবাণুনাশক দিয়ে মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কথা কোনও সাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যৌক্তিক মানুষ চিন্তাও করতে পারে না, বাস্তবায়ন দূরে থাক। গ্রামের মসজিদের কথা বাদ দিলাম, শহরের সব মসজিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার সক্ষমতা ও সুযোগ আছে কি? অধিকাংশ মার্কেট, বাজার ও শপিং মলের সামনে-পেছনে প্রশস্ত জায়গা কম। ফলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন হবে সে পরিমাণ জায়গা কোনও মার্কেটেই নেই। গবেষণায় মিলছে অনেকেই করোনার নীরব বাহক। আক্রান্তদের মধ্যে যেসব রোগীর লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে না কিংবা কম প্রকাশ পাচ্ছে, তাদের মাধ্যমেই এটি বেশি ছড়াচ্ছে। নীরব বাহক ক্রেতা দোকানে যেসব জামা-জুতাসহ নানা পণ্য স্পর্শ করলেন, সুস্থ কোনও ক্রেতা একই জিনিস স্পর্শ করে আক্রান্ত হবেন। এখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কোনও কাজে আসবে না। লকডাউনকে নকডাউন করার আগে এর সম্ভাব্য ফলাফল আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। অর্থনীতির লাইফ লাইন বাঁচাতে শিথিল লকডাউনের ফলে যদি দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তা মোকাবিলার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যিক। জীবন ও জীবিকার ভারসাম্যে সরকারের পরিকল্পনা সফল হোক। করোনা জয় করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

এমএমজে

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ