প্রসঙ্গ গণআদালত: ইতিহাসের নেপথ্যে সঠিক তথ্য

Send
শফী আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:০৪, জুন ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৮, জুন ০৩, ২০২০

শফী আহমেদ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক।
এর একদিন পরে কাজী আরিফ, আব্দুল রাজ্জাকদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি গঠন হয় শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। এর তিন-চারদিন পর ছাত্রনেতাদের চাপে যৌথভাবে তারা একটি সভা ডাকে জাসদ অফিসে। সেখানে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।

এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

গণআদালতের এ ১২ জন বিচারকের মধ্যে ছিলেন, অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, ড. আহমদ শরীফ, স্থপতি মাযহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বেগম সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শরাফী, কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমান, লে. কর্নেল (অব) কাজী নূর-উজ্জামান, লে. কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।

১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে হাইকোর্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে নাগরিকত্ব প্রদানের বিরুদ্ধে যে গণআদালত গঠিত হয় ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সেই গণআদালতের প্রেক্ষিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বিষয়টি আমাদের আলোচ্য বিষয়।

গণআদালতের প্রস্তুতি যখন চলছিল তখন একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতা জননেতা মরহুম আব্দুল রাজ্জাক এবং জননেতা জনাব কাজী আরিফ আহমেদ আমাকে, অসীম কুমার উকিল, এস এম কামাল হোসেন, জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু এবং সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখকে কমিউনিস্ট পার্টির মাঠে ডেকে বলেন যে, গণআদালত করার জন্য তো জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতা লাগবে, তোমরা একটু জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করো এবং জাহানারা ইমামের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করো। আমরা ওনাদের বললাম ঠিক আছে বিষয়টা আমরা দেখছি। আমরা ২৯ মিন্টো রোডে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করলাম। আমরা আপার সঙ্গে দেখা করে ওনাকে বললাম আপনার সঙ্গে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেখা করবেন। তিনি বললেন, ‘কখন? কে বলছে তোমাদের?’ আমরা বললাম, আমাদের সঙ্গে কথা হইছে, আপনি সময় দিলে উনি আসবেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা একটু চিন্তা করে বললেন: ‘ঠিক আছে আগামীকাল সকাল ১১টায় উনাকে নিয়ে আসো। আর আমার লাল নিশান জিপটা থাকে ওটা নিয়ে যেও।’ তারই ধারাবাহিকতায় আমরা এলিফ্যান্ট রোড শহীদ জাহানারা ইমামের কাছে গেলাম। আমরা উনার সঙ্গে কথা বললাম যে, ‘খালাম্মা আপনি যে গণআদালত করবেন, তার জন্য তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ভর্তি করতে লাখ লাখ লোক লাগবে। আমরা যারা এটার উদ্যোক্তা তাদের তো এতো লোক জমায়েত করার সক্ষমতা নেই। সেক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় নেত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা দরকার। আপনি কি উনার সঙ্গে কথা বলেছেন?’ জাহানারা ইমাম বললেন, ‘না। তিনি কি আমার সঙ্গে কথা বলবেন?’ তখন আমরা বললাম, কথাতো অবশ্যই উনি বলবেন। আপনি উনার সঙ্গে দেখা করেন। তখন জাহানারা ইমাম বললেন তাহলে ব্যবস্থা করো। সে অনুযায়ী আমরা নিচে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে বললাম, ‘আগামীকাল সকাল সাড়ে দশটায় জননেত্রী শেখ হাসিনা আপনাকে সময় দিয়েছেন। আমরা আপনাকে এসে নিয়ে যাবো।’ পরদিন আমরা জাহানারা ইমামকে তার বাসা থেকে নিয়ে মিন্টো রোডের শেখ হাসিনার বাসায় নিয়ে গেলাম। সেখানে দোতলায় আপার যে নিজস্ব কক্ষ সেখানে গেলাম। পরে তারা দুজন খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। আমরা নিজেরাই আপাকে বললাম যে আপনারা কথা বলেন আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। তিনি বললেন, তোমরা থাকলেও কোনও অসুবিধা নেই। আমরা বললাম কোনও অসুবিধা নেই, আপনারা কথা বলুন। আমরা বাইরে আছি। আমরা বারান্দায় ছিলাম, আমরা বারান্দা থেকে শুনলাম যে, গণআদালত সফল করার জন্য যা যা প্রয়োজন সেটা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে বললেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাৎক্ষণিকভাবেই অনেক সমস্যার সমাধান করলেন। যেমন গাজীপুর টেলিফোন করলেন, নারায়ণগঞ্জ টেলিফোন করলেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া ভাই বীরবিক্রম গণআদালতের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিল। তারপর মায়া ভাইকে ফোন করলেন। অন্যান্য বিষয় আলোচনা করে আপা আমাদের ডাকলেন এবং বললেন ‘সবই ঠিকমতো হবে, কিন্তু তোমরা কি জানো যে খালেদা জিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরী পাকিস্তানপন্থী লোক। আমরা বললাম জি জানি। তখন জননেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ওরাতো কারফিউ বা ১৪৪ ধারা দিবে, তখন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বসে আছেন। আমরা বললাম যে, কারফিউ বা ১৪৪ ধারা দিলে আমরা সেটা ভাঙব। আপা বললেন, তোমরা কারফিউ, ১৪৪ ধারা ভাঙবা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আছে ওরা কী করবে? ওরা বাধা দেবে না। আমরা বললাম, ছাত্রদলের যে অংশটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, সে অংশটা গণআদালতের পক্ষেই মৌনভাবে কাজ করছে। যেহেতু বিষয়টা বিএনপি সরকার চায় না, সেহেতু তারা ওপেনলি কিছু করতে পারছে না। সেক্ষেত্রে তারা বাধা দেবে না বরং সহযোগিতাই করবে। আমরা সেভাবেই অ্যারেজমেন্ট করব। আপা বললেন, তোমরা সব হলের ছেলেদের রেডি থাকতে বলবা এবং তোমরা সবাই এক জায়গায় থাকবা যাতে মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে পারো। আমরা বললাম আপা এটা আপনাকে চিন্তা করতে হবে না, আপনি শুধু খেয়াল রাইখেন। তো এই হচ্ছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সাক্ষাৎকার। পরে আমরা আবার শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় দিয়ে আসি। এরপর তাদের মধ্যে পরিচয় হওয়ার সূত্রে ভিন্ন ভিন্নভাবে সাক্ষাৎ করেছেন, কথা বলেছেন বিভিন্ন সভা সমাবেশ নিয়ে, আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে।

এ বিষয়টা গত কিছুদিন আগে বাংলা ট্রিবিউনে সাংবাদিক স্বদেশ রায় লিখেছেন অন্য কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় অবতারণা করেছেন। আসলে সেটা না, ইতিহাস ইতিহাসই। এটাই হচ্ছে ইতিহাস যে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রথম সাক্ষাৎকারটি এভাবেই অনুষ্ঠিত হয়।

লেখক: ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও গণআদালতের অন্যতম উদ্যোক্তা

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ