রাজস্ব আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আয়কর আইনজীবীরা

Send
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, জুন ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৪, জুন ২৯, ২০২০

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনআমরা সবাই জানি, এখন মানুষ করোনাভাইরাস নামক এক বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলা করছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও এ মহামারির আঘাতে বিপর্যস্ত। তাই এ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগ গ্রহণ। আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি, যেখানে সবাইকে নিজের মতো করে এগুতে হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোনও বিকল্প নেই। বিশেষ করে অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখাই হচ্ছে বর্তমানে আমাদের কাছে একমাত্র কাজ। এ কাজ অত্যন্ত কঠিন, অত্যন্ত ঝুঁকির, অত্যন্ত কষ্টের। কিন্তু সবার প্রচেষ্টায় এর সুফল পাওয়া সুখেরও বটে।


এ জন্য বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছে ও করবেন। বাড়তি কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে যারা সরাসরি অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন পেশাজীবীদের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কাজে সরকারের রাজস্ব আদায়ে আয়কর আইনজীবীগণ ও ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছেন। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর যেখানে রাজস্ব ব্যবস্থা উন্নয়ন ঘটেছে, সেখানে আয়কর আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা তত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা এশিয়া প্যাসেফিক জোনে বিজনেস আইনজীবীদের সমন্বয়ে Inter-Pacific Bar Association (IPBA) গুরুত্বসহকারে গড়ে উঠতে এবং কার্যকরভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে দেখছি। সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের রাজস্ব আইনজীবীগণ কোভিড-১৯-এ করণীয় বিষয়ে কার্যকর গাইডলাইন তৈরি করেছে, যা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব ও সরকারের রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আমাদের দেশও এগোচ্ছে। আমরা একটু পেছনে তাকালে দেখবো, বিগত কয়েক বছর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি রাজস্ব আদায়ের টার্গেটও বেড়েছে। একই সঙ্গে আয়কর আইনজীবীদের সংখ্যাও ক্রমানুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত ২০১৭ সালে আয়কর আইনজীবী নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ হাজার। যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় ১৭ হাজার আবেদনকারী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ জন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সনদ অর্জন করেন। এ সংখ্যা নিয়ে সে সময় কর কর্মকর্তাসহ সকল মহলে বেশ আলোচনাও হয়েছিল।

বর্তমানে সব মিলিয়ে ঢাকা ট্যাক্সেস বারের সদস্যভুক্ত আয়কর আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। যদিও প্রত্যাশিত করদাতার তুলনায় এ সংখ্যা খুব বেশি না। তবে ক্রমান্বয়ে এ পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা ইতিবাচক ইঙ্গিতও বটে।

দেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ থাকায় আয়কর আইনজীবীগণ অন্যান্য পেশাজীবীদের তুলনায় এ পেশায় সম্মানবোধ করেন। যে পেশায় সম্মান বেশি, সে পেশায় দায়িত্বও অনেক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মানিত প্রাক্তন চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আয়কর আইনজীবীগণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তারা নিজস্ব দক্ষতায় করদাতাদের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন, আয়কর প্রদানে করদাতাদের উৎসাহ দিচ্ছেন এবং রাজস্ব আদায়ে অবদান রাখছেন’। আমি একজন আয়কর আইনজীবী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে উপরোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে একমত এবং রাজস্ব আদায়ে কিছুটা অবদান রাখতে পেরে সত্যিই গর্ববোধ করছি।

আমাদের দেশে ট্যাক্স পরিশোধের প্রক্রিয়া সাধারণ জনগণের কাছে অনেকটা ভীতিকর। ফলে সরকার ও করদাতা উভয়ের ওপর এটি অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই নেতিবাচক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানোর জন্য একজন আয়কর আইনজীবীর ভূমিকা ব্যাপক। কারণ, করদাতাগণ আয়কর অফিসে আসতে চান না, আবার কর পরিশোধ না করলে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে। তাই একজন আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে কিছু সংখ্যক করদাতা নিজে নিজে কর ফাইল করেন। এটা ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো একজন আইনজীবীর কর ফাইল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা থাকে, থাকে কলাকৌশল এবং পর্যাপ্ত নোট ও ডকুমেন্টস সংযুক্ত, যা একজন করদাতার জন্য খুবই সহায়ক। অন্যদিকে একজন করদাতার নিজের তৈরি করা ফাইলে অসাবধানতাবশত কিছু তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে বা অতিরিক্ত তথ্য চলে আসতে পারে, যা পরবর্তীতে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে ঢাকা ট্যাক্সেস বারের একজন সিনিয়র আয়কর আইনজীবী বলেন, ‘সাবধানতার জন্য আমি নিজের ফাইল তৈরি করতে অন্য আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে থাকি’।

করদাতাদের অনেকের আয়ের বিভিন্ন উৎস থাকে। আবার কারও কারো নানাবিধ খাতের মধ্যে নানাবিধ আয়ের উৎস থাকে। যেমন, কর বছরের মধ্যে জমি ক্রয় বা বিক্রয়, ব্যবসায় বিনিয়োগ, বন্ধুকে আয় ধার বা ঋণ দেওয়া, একই উৎস থেকে ধার বা ঋণ নেওয়া, কোনও অংশীদারি কারবার পরিচালনা করা বা কোম্পানির শেয়ারের মালিক হওয়া ইত্যাদি। এ খাতগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত সমন্বয় করে উপস্থাপন করতে না পারলে ভবিষ্যতে যেকোনও সময় উক্ত করদাতা ঝামেলায় পড়তে পারেন। এমনকি বড় ধরনের জরিমানার মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। তাই একজন আয়কর আইনজীবী করদাতার জন্য একজন প্রকৃত বন্ধুর মতো কাজ করে থাকেন। করদাতার আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি হলেন উপযুক্ত পথনির্দেশক। করদাতার ভবিষ্যতের যেকোনও আর্থিক সমস্যার আগাম বার্তা বাহক ও তা থেকে উত্তরণের নির্দেশক হিসেবে ভূমিকা রাখেন একজন আয়কর আইনজীবী। তাই একজন আয়কর আইনজীবীকে হতে হয় দক্ষ, বিচক্ষণ, পাশাপাশি একজন পরিকল্পনাবিদও।

একইভাবে একজন আয়কর আইনজীবী সরকারের রাজস্ব আদায়, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, ট্যাক্সবান্ধব পরিবেশ বিনির্মাণ, উপযুক্ত করদাতা চিহ্নিতকরণ, উৎসে ট্যাক্স কর্তন, চালানপত্র যাচাই ও ব্যাংকে জমা নিশ্চিতকরণ, আইনের জটিল বিষয়গুলো রপ্তকরণ, করদাতার আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন, চূড়ান্ত করদায় পরিশোধে করদাতাকে পরামর্শ প্রদান, কর কর্মকর্তাগণের আনীত বিভিন্ন অভিযোগের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে কর মামলা নিষ্পত্তি করা এবং সরকার ও করদাতার মাঝে সুসম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন।

বর্তমানে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ে অবদান রাখছেন, অন্যদিকে ট্যাক্স দিতে সক্ষম নাগরিকদের আইনি সহায়তা প্রদানে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। এর ফলে নাগরিকগণ কর দিতে উৎসাহ ও স্বস্তিবোধ করছেন।

তবে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে একজন আয়কর আইনজীবীর অবশ্য করণীয় হলো, আইনের খুঁটিনাটি সব বিষয়ে দখলে রাখা; সরকারের অর্থ আইনে আনীত সংযোজন- বিয়োজন, স্থিতিশীল, ব্যাখ্যা ইত্যাদি সংরক্ষণ ও নিয়মিত চর্চা; করদাতার সঙ্গে বারবার সভা করা, জটিল বিষয়গুলো বোঝার জন্য বারবার প্রশ্ন করা; করদাতা বিরক্ত হলেও ধৈর্য ধরে নিজে পরিষ্কারভাবে বিষয়গুলো জানা এবং বোঝা; আইনের মধ্যে জটিল বিষয়গুলোকে সহজে উপস্থাপন করার কৌশল রপ্ত করা; করদাতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে গভীরভাবে নজর রাখা এবং একইভাবে সরকারও যেন উপযুক্ত কর থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা।

এগুলো ছাড়াও বর্তমান ভার্চুয়াল যুগে একজন আয়কর আইনজীবীকে যে পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা জরুরি তা হলো, আয়কর সংক্রান্ত সকল ফরমের ইলেকট্রনিক কপি সংরক্ষণ করা; ইলেকট্রনিক ফাইলে যাবতীয় ক্যালকুলেশন, নোট তৈরি করা; কম্পিউটারে বাংলা- ইংরেজি টাইপিং দক্ষতা অর্জন; ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন; ই-মেইল ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া; অনলাইনে রিটার্ন প্রস্তুতির দক্ষতা অর্জন; প্রদেয় কর অনলাইনে পরিশোধ ও চালান কপি সংগ্রহের দক্ষতা অর্জন; ই-টিআইএন সেবা গ্রহণের দক্ষতা অর্জন; করদাতাবান্ধব সেবার যাবতীয় তথ্য অনলাইনে সংগ্রহ ও তার গুরুত্ব বোঝায় অভ্যস্ত হওয়া; এবং অনলাইনে করদাতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানে অভ্যস্ত হওয়া।

আত্মসমালোচনায়: বাস্তবতা যদিও কঠিন, তবু আমাদের আয়কর আইনজীবীদের নিজ নিজ দক্ষতা অর্জনে নিজেদেরই তৎপর হতে হবে। এ পেশার আইনজীবীগণের মধ্যে যথেষ্ট রকম আস্থার অভাব আছে। কারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক এখন পর্যন্ত আয়কর আইনজীবীদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়নি। এ আচরণবিধি না থাকায় সিনিয়র-জুনিয়রদের মাঝে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। তাই কর্তৃপক্ষের আয়কর আইনজীবীদের আচরণবিধি তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে আয়কর আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী জটিলতা মনে করে, সনদ অর্জন করার পরও এ পেশায় আসছেন না। তাই আয়কর আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে রাজস্ব বোর্ডের নজর দেওয়া জরুরি ও সময়ের দাবি। কারণ, আগামীর ভার্চুয়াল অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায় ও করদাতা বৃদ্ধিতে একজন দক্ষ আয়কর আইনজীবী রাজস্ব বোর্ডের বড় সম্পদে পরিণত হতে পারেন।

লেখক: আয়কর আইনজীবী। সদস্য, ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশন

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X