কঠোর আইনের শাসন প্রয়োজন

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:১৫, জুলাই ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৫, জুলাই ১৭, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীসাহারা খাতুনের জানাজায় লোক জমায়েত হলে কীভাবে দূরত্ব বজায় রাখবে, করোনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশি কীভাবে প্রতিরোধ করবে—এমন সাধারণ নির্দেশনাও যখন প্রধানমন্ত্রীর মতো এত উচ্চপর্যায় থেকে আসে, তখন প্রশ্ন আসতে পারে এত শক্তিশালী নির্দেশনা থাকার পরও দেশে করোনা প্রতিরোধে সর্বত্র হ-য-ব-র-ল অবস্থা কেন? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন মিডিয়ার পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী। তার কথার ওপর কোনও কথা নেই। করোনা তিনি প্রত্যক্ষভাবে তদারকি করছেন। তবু করোনা ক্রমবর্ধমান কেন, আর মো. সাহেদ বা ডা. সাবরিনারা কীভাবে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশ্রয় পায়?
২৫০ যাত্রী নিয়ে ইতালিতে বিমান পৌঁছার পর করোনা টেস্টে বহু করোনা পজিটিভ রোগীকে যাত্রী হিসেবে পাওয়া গেছে। ফলে ইতালি বাংলাদেশের ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ করোনার টেস্টের ক্ষেত্রে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। যেসব হাসপাতাল জীবন-মরণ নিয়ে জালিয়াতি করে, তারা টেস্ট করার অনুমোদন পায় কী করে! হাসপাতালে মালিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে পূর্ব তদন্তের কোনও নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করা হলো না কেন!

কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ১২৫ জন বাংলাদেশি যাত্রী ছিল। গত ৮ জুলাই সেই ফ্লাইটকেও ফেরত পাঠানো হলো, অথচ এই ফ্লাইটে অন্যদেরও বহু যাত্রী ছিল। একই ঘটনা ঘটেছে চীনের গুয়াংজু বিমানবন্দরে। ফলে চীনও বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব দেখে বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশ থেকে হয়তো কোনও এক সময় বহির্বিশ্বে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থগিত হয়ে যাবে, কারণ স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বের কোনও দেশ এত বড় জুয়াচুরি কখনও সহ্য করবে না। এমনিতেই বিশ্বমিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশে করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট বেচাকেনা হয়।

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরম রক্ষা করে চলতো। স্বাস্থ্য অধিদফতর চোর-বাটপারদের আখড়া প্রমাণিত হচ্ছে একের পর এক ঘটনা দিয়ে। করোনা পরীক্ষার কিটের বেসরকারি মূল্য নাকি ১৪০০ টাকা, আর সেই কিট নাকি এতদিন সরকারিভাবে অধিদফতর কিনেছে ২৭০০ টাকা করে। প্রতিটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সময় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মালামাল ক্রয় নিয়ে নানা কেলেঙ্কারির কথা আমরা শুনেছি। এরপরও একজন সৎ মন্ত্রী পাওয়া কি সম্ভব ছিল না এই দফতরের জন্য!

মতিয়া চৌধুরীর মতো একজন সৎ মন্ত্রীকে কেন বাদ দেওয়া হলো? যেখানে বিদেশ থেকে সৎ লোক হায়ার করে আনার মতো অবস্থা, সেখানে পরীক্ষিতভাবে একজন সৎ নেত্রীকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হলো না—এটা একটা পরিতাপের বিষয়। দীর্ঘদিন তিনি কৃষিমন্ত্রী ছিলেন আর মন্ত্রী হিসেবেও তার দক্ষতা প্রমাণিত। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পেছনে তার প্রচেষ্টাও ছিল।

আমরা একটা বিষয় লক্ষ করছি, এযাবৎ যত কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশ পেয়েছে সব কেলেঙ্কারিতে যারা জড়িত ছিল তারা সরকারি দলের বড় বড় নেতার সঙ্গে উঠাবসা করতো। গত কয়েকদিন ধরে মো. সাহেদ নামে যে প্রতারকের কথা গণমাধ্যমে উঠে আসছে এই সাহেদ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এমন কোনও বড় নেতা নেত্রী নেই যাদের সঙ্গে ছবি নেই তার। লোকটি বড় ধরনের প্রতারক। আমাদের নেতৃবৃন্দ তার মতো একজন প্রতারককে এত উপরে বিচরণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেন কেন, তা বুঝা মুশকিল।

এই প্রতারক মো. সাহেদ রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক এবং তার হাসপাতালে মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্স রিনিউ পর্যন্ত করায়নি সে। যে কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার অনুমতি পেয়েছিল, সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

স্বাস্থ্য খাতের বড় প্রতারকের নাম মিঠু। বিএনপির সময়ে নাকি তার উত্থান। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের কোমর ভেঙেছে নাকি এই মিঠু। শামীমা নূর পাপিয়ার উত্থান নাকি আরও চাঞ্চল্যকর। পাঁচ তারকা হোটেল ভাড়া করে সেখানে আধুনিক হেরেম বানিয়ে ছিলেন নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদিকা পাপিয়া। ক্যাসিনো কেলেংকারির শামীম-সম্রাটদের কথা তো কেউ ভোলেনি। আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন দলের এই করুণ অবস্থা দেখলে রাজনীতির প্রতি ঘৃণা আসে।

দেখা যাচ্ছে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সততার খুব অভাব রয়েছে। সাহেদের মতো লোকেরা মন্ত্রীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে পারে। মন্ত্রীদের পয়সা রোজগারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে বলে যতক্ষণ কঠোর আইনের শাসন দেশে না থাকবে, ততক্ষণ কেউ সততার চর্চা করবে না। সাহেদের বিরুদ্ধে ওয়ান-ইলেভেন কালে গ্রেফতারি ফরোয়ানা জারি হয়েছে। পুলিশ কী করেছিল এতদিন? গোয়েন্দারা কী করেছে! এতবড় একজন ক্রিমিনাল কী করে রাষ্ট্রের সবাইকে নাকানি চুবানি দিতে পারে! এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবে?
এই প্রসঙ্গে একটা ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা দরকার। ফিরোজ শাহ তুঘলকের সময় খুব ব্যাপকভাবে ওজনের হেরফের করার বদ অভ্যাসে লিপ্ত ছিল ব্যবসায়ীরা। বহু চেষ্টা-তদবির করার পরেও সম্রাট যখন ব্যবসায়ীদের এই বদ অভ্যাস ত্যাগ করার ব্যাপারে ব্যর্থ হলেন তখন তিনি কঠোর আইন তৈরি করলেন। মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে যে ব্যবসায়ী ওজনে হেরফের করবে, ওজনে যা কম দিয়েছিল তার শরীরের মাংস কেটে তা পূর্ণ করে দেওয়ার নিয়ম প্রবর্তন করলেন। এই নিয়ম চালু করার ছয় মাসের মধ্যে ওজনে কম দেওয়ার বদভ্যাস থেকে ব্যবসায়ীরা বিরত হয়েছিল।

যে সমাজ অসততার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে বিলুপ্ত হতে বসেছে, সে সমাজকে ঠিক করতে হলে কঠোর আইনের শাসন প্রবর্তন করতে হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 
/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ