স্টেম-শিক্ষা: একটি জীবনব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম

Send
ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
প্রকাশিত : ১৪:১২, জুলাই ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২২, জুলাই ২৬, ২০২০

ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীপিএইচ-ডি গবেষণার একটি গল্প দিয়ে শুরু করি। তখন কানাডায়, আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মলিকুলার বিম এপিটেক্সি মেশিনের একটি যন্ত্রাংশ খুলে তুলে রাখার। আমি অনেক চেষ্টাতেও দুটি নাট খুলতে পারছিলাম না। ও দুটো খুব জোরে আটকানো ছিল। কিন্তু আমার টেকনিক্যাল ম্যানেজার মশাই ব্যাপক হাসাহাসি করলেন, 'দেখ দেখ বাংলাদেশের ফারসীম নাট খুলতে পারছে না। বাবা, তুমি কি কখনওগাড়ির ইঞ্জিন খুলোনাই?' বলা বাহুল্য, না। কেননা বাংলাদেশে আমাদের প্রতিনিধিত্বকারী শ্রেণি কখনও ইঞ্জিন খোলে না, সেটা গ্যারেজের শিশু-শ্রমিকদের দায়িত্ব। এটা আমাদের শিক্ষা–এমনকি সমাজ-ব্যবস্থাতেও নাই যে হাতে-কলমে কিছু করার অভিজ্ঞতা অর্জন জীবনের একটি অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু পশ্চিমে এটা উল্টো, গাড়ি সারাবার সুলভ কোনও গ্যারেজ সেখানে নেই, কিচেন-সিংক আটকে গেলে সেটা বাড়ির লোকেরই দায়িত্ব সারাবার, কেননা ছুতোর মিস্ত্রি বা ইঞ্জিন-সারিয়ের ঘণ্টা-প্রতি সেবামূল্য অত্যধিক।
এই 'বাস্তবতা থেকে দূরবর্তী' শিক্ষা-ব্যবস্থার আলোকেই হয়তোবাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা ২০১২-এরধারা ১২৯-তে লেখা আছে–"মাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান/গণিত বিষয়ের পাঠ্যক্রম সহজতর, আকর্ষণীয় ও বাস্তবধর্মী করা" যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এখানে শেষের 'বাস্তবধর্মী' অংশটার প্রতি যদি নজর দেওয়া যায় তাহলে STEM-শিক্ষার বিষয়টা বোঝা সহজ হয়। Science, Technology, Engineering and Mathematics (STEM)–এই চারটি পৃথক বিষয়ের সুসমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কারিকুলামে যে গণিতাশ্রয়ী এবং বিজ্ঞানধর্মী পদ্ধতির সূচনা করার কথা বলা হচ্ছে, ঐ 'বাস্তবধর্মী' শব্দটি এই পুরো বিষয়টিকে সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছে। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের একজন নাগরিক যে শিক্ষাটি প্রাপ্ত হবেন তা কতখানি বাস্তবধর্মী সেটা ভাবতে হবে, আর সেই ভাবনাকর্মেই নিহিত আছে স্টেম-শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্যটি।

স্টেম-শিক্ষা বলছে যে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিষয়গুলোর সমন্বয় করে গণিত এবং প্রযুক্তির সহায়তায় এমন এক সুসমন্বিত শিক্ষা-ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরা হবে যাতে তার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, বাস্তবজ্ঞান, যেকোনও কিছুকে তার উপাংশে ভেঙে মূল সমস্যায় পৌঁছনোর ক্ষমতা আয়ত্ত হবে। এই দক্ষতার্জন একুশ শতকে ভীষণ জরুরি হয়ে গেছে। এখন জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষারও প্রয়োজন। 'দক্ষতা' শুনলেই ঐতিহ্যবাদীরা নাক সিঁটকান, কিন্তু এ দক্ষতা লেদ মেশিন চালানোর দক্ষতা বা সেলাই মেশিন সারানির দক্ষতা, বা ইলেকট্রিক ফ্যান বা একটি ডিসি মোটর সারানোর 'বৃত্তিমূলক' দক্ষতার কথাই শুধু বোঝাচ্ছে না। সেটা তো বটেই, উপরন্তু আধুনিক প্রকৌশলীয় কুশলতা এবং প্রাযুক্তিক দক্ষতার মাধ্যমে গাণিতিক বিশ্লেষণী টুল ব্যবহার করে বাস্তবধর্মী সমাধান করার ক্ষমতাকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে। এই 'উচ্চতর' দক্ষতা শুধু বিশ-শতকীয় দক্ষতা নয়, এটা একুশ-শতকীয় দক্ষতা। আমাদের বর্তমানের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞানের অভাব রয়েছে। জ্বরের ওঠানামা বা মাছের বাজারে ইলিশ মাছের দরের বাড়াকমা যে গ্রাফ-চিত্রে প্লট করে বিশ্লেষণ করা যায় এবং এই সামান্য বিশ্লেষণ থেকে জগৎ-সংসার সম্পর্কে দারুণ বোধগম্যতা অর্জন হয়–এটা আমাদের এখনকার পাঠক্রম শেখায় না। ফলে অনেক বিজ্ঞান-শিক্ষার্থীই নিউটনের গতিসূত্রগুলো জানলেও এর কোনও প্রয়োগ জানে না। বাস্তববর্জিত হাতেকলমে কাজবিহীন কুড়ি শতকের পাঠক্রমকে তাই ঢেলে সাজানোর দরকার হয়ে পড়েছে।

এজন্য বলা হচ্ছে–"বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে শিখন-পঠনের নয়া পথটির নাম স্টেম-শিক্ষা। প্রাক-স্কুল থেকে পোস্ট-ডক্টরেট‘সকল স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমই এর অন্তর্ভুক্ত’ আনুষ্ঠানিক (শ্রেণিকক্ষ) কিংবা অনানুষ্ঠানিক (সান্ধ্যকালীন স্কুল) যা-ই হোক না কেন।" [১] একুশ শতকের পরিবেশে আধুনিক নাগরিক অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। এই শতকে বিজ্ঞান মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু এই শতকে, একটি বহুল-প্রচারিত বিজ্ঞাপনে যেমন বলা হয়, সকল সমস্যার প্রতিষেধক হিসেবে "প্যারাসিটামল দুই বেলা", সেটি সম্পূর্ণ অচল। আমরা আশা করি, বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান আমরা এমন জায়গায় পৌঁছে দেবো যাতে একজন তরুণী পোশাক-শ্রমিক প্যারাসিটামল ওষুধের মাত্রা বুঝে সেবন করতে পারবে এবং একটি সাত-বছুরেকেও যদি বলা হয় "যাও প্যারাসিটামল দুই বেলা খাও", তাহলে সেও জিজ্ঞেস করবে, কতদিন ধরে সে খাবে, প্রতিবেলায় কয়টি করে খাবে, ওষুধটি খেলে তার কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এই শতকে ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশলীয় নানা ব্যবস্থা মানুষকে ঘিরে রেখেছে। দেয়ালের একটি সকেট থেকে ২২০ ভোল্ট ৫০ হার্টজ বিদ্যুৎ আমি পাচ্ছি, এর ব্যবহার, এর সতর্কতা, এর মূল্য–এসবই তাকে বুঝতে হবে। আর কানেক্টিভিটি বা সংযুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তা, সর্বোপরি ডেটার অধিকার, বিশুদ্ধ শক্তির অধিকার একুশ শতকে মানুষের মৌলিক চাহিদার অংশ হয়ে যাবে। এরকম অবস্থায় গণিত জানবে না এমন মানুষ সমাজে পাওয়া বিরল হবে। ফলে সার্বিকভাবে জীবনের মানদণ্ড একটু উঁচু হবে। স্টিফেন হকিং বলেছেন, "জীবনে বিজ্ঞান-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এ কারণে যে আধুনিক সমাজে তথ্যভিত্তিক সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা সাহায্য করে"। আর একুশ শতকে সময়োপযোগী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত দরকারি একটি ব্যাপার।

জীবনের সমস্যা এই শতকে কমবে না, বিপদসংকুলতাও কমবে না, পৃথিবী হয়তো এমন কোনও স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠবে না, কিন্তু মানুষের জৈবনিক দক্ষতা ও জ্ঞানের মাত্রা এমন হবে যে কিছু প্রাথমিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষ বিপত্তারণের উপায় খুঁজে নিতে সক্ষম হবে। এটা এক রকমের 'সার্ভাইভাল টেকনিক' যেটা প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার কৌশল খুঁজতে মানুষকে সাহায্য করবে। 'রিয়াল লাইফ সিচুয়েশন' বা 'বাস্তব পরিস্থিতিতে' কীভাবে অবস্থা-বুঝে-ব্যবস্থা নিতে হয়–সেই কারিগরিও বৈজ্ঞানিক দক্ষতা আনাই স্টেম-শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এই স্টেম-শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে লিখেছেন "একুশ শতকে, বিশ্বায়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সুবিধা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এই কালে, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবন এখন অনেক গুরুত্ববহ। তথ্যভিত্তিক ও ব্যাপক প্রযুক্তিমণ্ডিত এই সমাজে সফলতা পেতে হলে শিক্ষার্থীদের স্টেম-বিষয়গুলোতে অনেক বেশি ব্যুৎপত্তি প্রয়োজন, যেটা কিনা বিগত শতাব্দীতে যতটুকু প্রয়োজন ছিল এখন তার চাইতে অনেক বেশি"।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশের নাগরিক কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে? সবচেয়ে প্রথমে যেটা মনে আসে, সেটি হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং তৎসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সমস্যাদি- আকস্মিক ও তীব্র বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের আধিক্য, স্থানীয় আবহাওয়ায় চূড়ান্ত রকমের অবস্থা (extreme local weather conditions), প্রাণিসম্পদের ঘাটতি, কৃষিজ পণ্যের জটিল ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির সঙ্কট, জ্বালানির সংকট, স্বাস্থ্য সমস্যা ও পরিবেশ দূষণ, সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও ব্লু-ইকোনমি, বদ্বীপ ও জলাশয়ের সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা,ভয়ঙ্কর জীবাণুর মড়ক, ডেঙ্গু বা এই জাতীয় অন্যান্য মড়ক, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর আবির্ভাব, ক্লাইমেট রিফিউজি ইত্যাদি। এগুলোর প্রায় প্রতিটি আমাদের দৈনন্দিন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এগুলো সমাধানের জন্য আমাদের দরকার হবে স্টেম-শিক্ষিত আধুনিক নাগরিক সমাজ।

স্টেম-শিক্ষা শুধু প্রথাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় নয়, বরং যারা বৃত্তিমূলক শিক্ষার ধারায় বা অন্য ধারায় থাকবে, তাদের জন্যও জরুরি হয়ে দাঁড়াবে। কেননা জলবায়ুর সমস্যা শুধু একজনের সমস্যা নয়, এটা শুধু বাংলা মিডিয়ামের সমস্যাও নয়, এটা সবার সমস্যা। ফলে এরকম একটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে আমরা চাইবো আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন–

- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ইচ্ছা রাখে

- তাদের যথেষ্ট সৃজনশীলতা থাকে এবং তার চর্চা করে

- চুলচেরা বিশ্লেষণের ক্ষমতা থাকে

- দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা থাকে

- একইসঙ্গে চিন্তার নিজস্বতা ও স্বকীয়তা প্রদর্শন করে

- তারা উদ্যোগী হয়

- তারা যোগাযোগে আগ্রহী হয় এবং তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক বা বন্ধুত্বের বলয় থাকে

- যথেষ্ট এবং উপযুক্ত ডিজিটাল স্বাক্ষরতা থাকে

- ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডিজাইন কৌশলাদি সম্পর্কে সাধারণ পরিচিতি থাকবে

- তথ্য, খাদ্য, বস্তু ও পরিবেশ সম্পর্কে সাধারণ কৌতূহল এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা থাকবে

এগুলোই একুশ শতকীয় দক্ষতার মূল উদ্দেশ্য। এগুলো স্টেম-শিক্ষারও উদ্দেশ্য। এটা গতানুগতিক বিজ্ঞান শিক্ষা কিংবা কারিগরি এবং ল্যাবরেটরি দক্ষতার ঊর্ধ্বে এক সার্বজনীন অ্যানালিটিক্যাল দক্ষতা যা ক্রিটিক্যালি যেকোনও প্রপঞ্চকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষজ্ঞরা স্টেম-শিক্ষার সঙ্গে কীভাবে মানববিদ্যা এবং চারু ও কারুপাঠকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটাও ভাবছেন। কেননা শুধু চুলচেরা বিশ্লেষণই নয়, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানবীয় আবেগ এবং সৃষ্টিশীল জিজ্ঞাসাও মানবমনের বৈশিষ্ট্য। আর এটাই টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের চতুর্থ মাইলফলক ‘মানসম্পন্ন শিক্ষার’ একটি মূল প্রতিপাদ্য বিষয় যেখানে বলা আছে–"সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতিকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি" [২]।

জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের এই সুযোগ কেন বাংলাদেশে আসবে না?

তথ্যসূত্র:

[১] Heather B. Gonzalez & Jeffrey J. Kuenzi, "Science, Technology, Engineering, and Mathematics (STEM) Education: A Primer ", Congressional Research Service Report, 2012. 7-5700 , www.crs.gov , R42642.

[২] " টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট, লক্ষ্যমাত্রা ও সূচকসমূহ", ইংরেজি থেকে অনুবাদ, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ২০১৭।

লেখক: অধ্যাপক, তড়িৎ কৌশল বিভাগ এবং পরিচালক, সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

 
 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ