প্রতি বছর বন্যা দেখে ‘খুশি হতাম’, যদি…

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৪১, আগস্ট ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, আগস্ট ০৪, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমান‘বাংলাদেশের বন্যা’ শিরোনামের একটা রচনা আমরা ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছি। সেখানে আমরা বন্যার উপকারিতা নিয়ে জেনেছিলাম—বন্যা পলি বয়ে নিয়ে এসে জমিতে দেয়, যেটা মাটির উর্বর শক্তি বাড়ায়। কেউ যদি ভেবে থাকেন বন্যার পরে আমাদের জমিতে পলি পড়ে এবং সেটা আমাদের জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, সে কারণে প্রতিবছর বন্যা হলে আমি খুশি হতাম, তাহলে ভুল করেছেন।
বর্তমানে যেসব জাতের ধান চাষ করা হয়, সেসব ধান চাষের জন্য পলির শক্তিতে আর কাজ হয় না, লাগে অতি শক্তিশালী সব রাসায়নিক সার। তাই ছোটবেলায় শেখা বন্যার ওই উপকারিতা এখন আর খুব একটা প্রাসঙ্গিক না।
কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশ প্রতি বছর বন্যা হওয়া উচিত এবং সেটা অবশ্যই এই বছরের মতো এত বড়ভাবে না। কারণটা জানার জন্য জেনে আসা যাক আমাদের বোরো ধানের চাষ আর শহরগুলোর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। 

অনেক বছর হয়ে গেলো বোরো আমাদের প্রধান ফসলে পরিণত হয়েছে। এটা এখন এতটাই বড় ফসল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের উৎপাদিত কমবেশি ৪ কোটি টন চালের মধ্যে আড়াই কোটি টন উৎপাদিত হয় বোরো মৌসুমে। এর প্রধান কারণ এই ধানটি শুষ্ক মৌসুমে হয় বলে ‌প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যা এই ফসলটির ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু এই বড় উৎপাদন কেনা হয় এক বিরাট মূল্যে, যেটা অনেক সময়ই আমরা খেয়াল করি না।

শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদিত হয় বলে এই ফসলটি পুরোপুরিই সেচ নির্ভর। জলবায়ু এবং পার্শ্ববর্তী দেশের ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় সব নদ-নদী শুকিয়ে যায়, তাই এই সেচের প্রায় শতভাগই দেওয়া হয় ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে। সেই পানি কতটা সেটা আমাদের অনেকের ধারণাতেও নেই। 

বর্তমানের উচ্চ ফলনশীল ধান ভীষণই ‘তৃষ্ণার্ত’–প্রতি কেজি উৎপাদনের জন্য পানি সেচের প্রয়োজন পড়ে ৩৫০০ থেকে ৪০০০ লিটার। 

এদিকে ঢাকাসহ দেশের সব শহর ভূগর্ভস্থ পানি তুলেই পান এবং মানুষের গৃহস্থালি কাজের জন্য ব্যবহার্য পানি সরবরাহ করে। এই অকল্পনীয় পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে তুলে আনার মাশুল ভয়ঙ্কর। ‌বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে প্রতি বছর বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় দুই থেকে পাঁচ মিটার করে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে আমরা দেখি দেশের মধ্যাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলে লাখ লাখ অগভীর নলকূপ এখন আর পানি তুলতে পারে না; শুধুমাত্র গভীর নলকূপই সেটা পারে।

পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় পানিতে আর্সেনিক বিষক্রিয়া পরিমাণ বৃদ্ধি, বড় ভূমিধস, হালকা ভূমিকম্পে অনেক বড় ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি নানা কিছুর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্ভবত এটা, চরমতম দুর্যোগের সময় ব্যবহার করার মতো অত্যন্ত সহজপ্রাপ্য ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমান্বয়ে আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা খাবার এবং আমাদের নিত্য ব্যবহার্য পানির ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বো। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বড় একটা অংশে পানির সংকট এখন প্রতিবছরের খবর। আর যেকোনও ভয়াবহ সংকটে (যেমন—যুদ্ধ) এই পানি না থাকা আমাদের মহা বিপর্যয়ে ফেলবে।  

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও ভূগর্ভস্থ পানি বাঁচানোর জন্য সমন্বিত তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা আমরা দেখি না। একটা নলকূপ স্থাপন করে খুব সহজেই পানিটা তুলে ফেলা যায় দেখেই বরাবর আমরা সেটা করে গেছি। তাই আপাতত আমরা কামনা করতে পারি প্রতি বছর পানির স্তর যেভাবে নেমে যায় তার অন্তত বড় সেটা যাতে পূর্ণ হয়ে যায়। 

পানির স্তর পূর্ণ হয় বৃষ্টিপাত, নদীর পানি এবং বন্যার মাধ্যমে। এই দেশের নদীগুলো সব মরে যাচ্ছে, তাই নদীর পানি থেকে ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ হওয়ার পরিমাণ এখন খুব কম, বৃষ্টির পরিমাণও খুব ভালো নয়। তাই প্রতিবছর যদি কিছু সময়ের জন্য এদেশের বড় একটা অংশে বন্যা হয়, তবে সেটা আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে অনেকটুকু পূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই যখন দেখি দেশে বন্যা হচ্ছে, তখন এটা ভেবে ভালো লাগার কথা যে এই বন্যার পানি বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে পূর্ণ করবে অনেকটুকুই। কিন্তু সেই ভালো লাগাটা আর থাকে না।

এখন পর্যন্ত মিডিয়ার রিপোর্টে আমরা জানতে পেরেছি দেশের ৩১টি জেলা বন্যা ‌ আক্রান্ত হয়েছে। শুধু সেটাই না, এই বছর বন্যা সাম্প্রতিক বহু বছরের মধ্যে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এর মধ্যেই আমরা জেনেছি এই বন্যা ১৯৯৮ সালের বন্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে, এটা এমনকি ১৯৮৮ সালের বন্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হচ্ছে এমন এক সময়ে এই বন্যা বাংলাদেশে হচ্ছে যখন করোনার অভিঘাতে আমাদের দেশের মানুষের জীবন এবং জীবিকা ভয়ঙ্কর চাপের মুখে। মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের খবর আমরা নিয়মিত পড়ছি পত্রিকায়। 

গত ২৮ জুলাই সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বন্যাকবলিত জেলাগুলোয় চাল বিতরণ করা হয়েছে ৭ হাজার ১৪৭ টন। নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে ২ কোটি দুই লাখ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। শিশু খাদ্য, গো খাদ্য বাবদ বিতরণের পরিমাণ যথাক্রমে ৩৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা‌ এবং ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।‌ শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ১২টি। এছাড়া ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে ১০০ বান্ডিল। 

সরকারি হিসাবেই বন্যাদুর্গত হয়েছে ৫০ লাখ মানুষ। করোনার প্রভাবে বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। সেই হিসেবে অন্তত ২৫ লাখ মানুষের ত্রাণের প্রয়োজন হয়েছে। তাহলে মানুষ পেয়েছে মাথাপিছু ২.৮৫ কেজি চাল আর মাথাপিছু ৮ টাকা। 

করোনা না থাকলেও, সামান্যতম ত্রাণ চুরি না হলেও (তাত্ত্বিকভাবে ধরে নেই) এই পরিমাণ ত্রাণ কতটা তুচ্ছ সেটা আমরা বুঝি নিশ্চয়ই। এ কারণেই বন্যা আমাদের দেশে হয়ে ওঠে চরমতম দুর্ভোগের এক প্রতিশব্দ। মানুষের আশ্রয় নেই, খাদ্য নেই, চিকিৎসা নেই সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবন আর চলে না। অথচ প্রাকৃতিকভাবে প্লাবনভূমি এই মাটিতে শুধুমাত্র সরকার যদি আন্তরিক হতো এক বা দুই সপ্তাহের একটা বন্যা মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলতো না। 

‘বন্যার সঙ্গে সহাবস্থান’ কথাটা অনেক দিন থেকেই খুব শোনা যায়; সেই সহাবস্থান নিশ্চিত করতে এমনকি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি বিরুদ্ধেও বলেন অনেকেই। সহাবস্থান বলতে বোঝায় হাসিমুখে সহাবস্থান। বন্যা আসবে, কিছুটা সময় মানুষ ভিন্নভাবে তার জীবন চালিয়ে নেবে। সেই সময়টায় তার কিছু অসুবিধা কষ্ট হবে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র তার সবকিছু নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে থাকলে তাদের নাভিশ্বাস উঠে যাবে না। জনকল্যাণে নিয়োজিত একটা মানবিক সরকার ক্ষমতায় না থাকলে সেই সহাবস্থান আর হয়ে ওঠে না। আমাদের দেশের সেটা ছিল না কোনোকালেই। 

এ কারণেই বন্যা দেখে খুশি হওয়া দূরে থাকুক, সামান্যতম স্বস্তিও পাই না, বানভাসি মানুষদের জন্য হই উৎকণ্ঠিত, আতঙ্কিত।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ